টেকনাফ সীমান্ত

মিয়ানমার থেকে ইয়াবা আসছেই

মো. শাহীন, টেকনাফ

20

সারাদেশে মাদকবিরোধী অভিযান অব্যাহত থাকলেও কক্সবাজারের টেকনাফ সীমান্ত দিয়ে মিয়ানমার থেকে ইয়াবা আসা বন্ধ হয়নি। তবে আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের দাবি, আগের তুলনায় ইয়াবা পাচার অনেক কমেছে।
জানা গেছে, মাদকবিরোধী অভিযানে টেকনাফে পাঁচ ‘মাদক ব্যবসায়ী’ নিহত হয়েছেন। এর মধ্যে দুই জন জনপ্রতিনিধি ছিলেন। বিজিবি, র‌্যাব, পুলিশ, কোস্ট গার্ড ও মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের অভিযানে গত আগস্ট মাসে ১১ লাখ ৫৯ হাজার ৪৭৩টি ইয়াবা উদ্ধার কর হয়। এসব ঘটনায় ১০১টি মামলায় ১০১ জনকে আটক করা হয়েছে। তার মধ্যে একাধিক মাদক ব্যবসায়ীও রয়েছে। এছাড়া চলতি মাসে ১ লাখ ৩৫ হাজার ২৯৬টি ইয়াবাসহ ছয় জন পাচারকারীকে আটক করে তিনটি মাদক মামলা করেছে বিজিবি, র‌্যাব ও মাদকদ্রব্য অধিদপ্তর।
স্থানীয়রা জানান, টেকনাফে আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নজরদারি বাড়লেও মিয়ানমার থেকে ইয়াবা আসা বন্ধ হয়নি। ইয়াবা বহনকারী ধরা পড়লেও ধরা-ছোয়ার বাইরে থেকে যাচ্ছে শীর্ষ মাদক ব্যবসায়ীরা। ফলে ইয়াবা ব্যবসা বন্ধ হচ্ছে না। আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সতর্ক অবস্থানের পরও টেকনাফ সীমান্ত দিয়ে ইয়াবার চালান আসছে।
এদিকে টেকনাফ সীমান্তে রাতদিন দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছেন আইন প্রয়োগকারী সংস্থা। ইতোপূর্বে অভিযানে দুই
জনপ্রতিনিধিসহ পাঁচ জন নিহত হয়েছেন। তারা সবাই মাদক ব্যবসায়ী বলে দাবি আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর। এরপর থেকে মাদক কারবারীরা আত্মগোপনে চলে যান। এরপর কিছুদিন যেতে না যেতেই আত্মগোপন থেকে তারা ইয়াবা ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছেন। মাদক পাচাররোধে গত ২৫ জুলাই থেকে টেকনাফে র‌্যাবের অতিরিক্ত ৫টি ক্যাম্প স্থাপনসহ ডগ স্কোয়াড মোতায়েন করা হয়েছে। ফলে কৌশলে মিয়ানমার থেকে ইয়াবা পাচারে নাফ নদী ও সমুদ্র পথ ব্যবহার করছে ইয়াবা ব্যবসায়ীরা
অনুসন্ধানে জানা গেছে, আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের ফাঁকি দিয়ে রাতের আঁধারে এখনও কয়েকটি পয়েন্ট দিয়ে মিয়ানমার থেকে ইয়াবার চালান ঢুকছে দেশে। সেগুলো হচ্ছে টেকনাফের হোয়াইক্যং, হ্নীলা, নাজির পাড়া, মৌলভী পাড়া, সাবরাংয়ের নয়াপাড়া, শাহপরীর দ্বীপ, জালিয়াপাড়া, নাইট্যং পাড়া, লেদা, আলীখালী, মেরিন ড্রাইভের লম্বরী, পর্যটন ও দরগারছড়া ঘাট।
সূত্রে জানা গেছে, মিয়ানমারের সীমান্ত রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা ইয়াবা ব্যবসায় জড়িত। সে দেশের ৮ সংগঠনের নিয়ন্ত্রণে ৩৭ কারখানায় উৎপাদিত ইয়াবা মিয়ানমার ভিত্তিক ১০ জন ডিলারের মাধ্যমে আসছে টেকনাফের মাদক ব্যবসায়ীদের কাছে।
ইয়াবা পাচারে জড়িত রোহিঙ্গারা : মিয়ানমার থেকে পালিয়ে টেকনাফ-উখিয়ার ৩০টি শিবিরে ১১ লাখেরও বেশি রোহিঙ্গা অবস্থান করছেন। এসব রোহিঙ্গাদের অনেকেই ইয়াবা পাচারে জড়িত।
টেকনাফ ২ বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ-বিজিবি ব্যাটলিয়নের অধিনায়ক লে. কর্নেল আছাদুদ জামান চৌধুরী জানান, রোহিঙ্গাদের মধ্যে কিছু রোহিঙ্গা ইয়াবা পাচারে জড়িয়ে পড়ছে। বিষয়টি মাথায় রেখে শিবিরে নজরদারি বাড়ানো হয়েছে।
বিজিবি সূত্রে জানিয়েছে, গত আগস্ট মাসে বিজিবির তৎপরতায় প্রায় ২১ কোটি টাকার ইয়াবা, মাদকদ্রব্য ও চোরাই পণ্য জব্দ করা হয়েছে। এসব ঘটনায় ৩৮ জন আটক ও এক জনকে পলাতক আসামি করে মামলা দায়ের করা হয়। বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন টেকনাফ ২ বর্ডার র্গাড ব্যাটলিয়নের উপ-অধিনায়ক মেজর শরীফুল ইসলাম জোমদ্দার।
তিনি আরও জানান, সীমান্ত এলাকায় বিজিবির টহল জোরদার করা হয়েছে। বিজিবির জওয়ানরা সীমান্তে রাতদিন পাহারা দিচ্ছেন।
বিজিবি ছাড়াও র‌্যাব, পুলিশ, কোস্ট গার্ড ও মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের পৃথক অভিযান অব্যাহত রয়েছে। এতে মাদকদ্রব্য উদ্ধারসহ নানা অপরাধের তথ্য জানা গেছে সংশ্লিষ্ট সূত্রসমূহ থেকে।
র‌্যাব সূত্র জানিয়েছে, সরকার প্রধানের নির্দেশে ‘চল যায় যুদ্ধে, মাদকের বিরুদ্ধে’ এ ¯েøাগানে র‌্যাবের মাদকবিরোধী অভিযান অব্যাহত রয়েছে। মাদক নির্মূলে র‌্যাব-৭ সদস্যরা টেকনাফ সীমান্তে রাত-দিন টহল দিয়ে যাচ্ছেন। এতে মাদক উদ্ধারের ঘটনাও ঘটছে।
গত মাসে ৭ কোটি ৩০ লাখ টাকার মাদক উদ্ধার করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন টেকনাফ র‌্যাব-৭ ক্যাম্প ১ এর ইনচার্জ লে. মির্জা শাহেদ মাহতাব (এক্স) বিএন।
তিনি জানিয়েছেন, গত মাসে র‌্যাবের অভিযানে ১ লাখ ৪৫ হাজার ৯৯৫ পিস ইয়াবা বড়ি উদ্ধার করা হয়। এ ঘটনায় ১৮টি মামলায় ২১ জনকে আটক করা হয়েছে। এছাড়া ৩ হাজার ৭৭৭ ক্যান বিয়ার, একটি ওয়ান শুটার গান, একটি পিস্তল, তিনটি বুলেট ও একটি কিরিচ উদ্ধার করা হয়েছে। আটককৃতদের মধ্যে কয়েকজন শীর্ষ মাদক ব্যবসায়ী রয়েছে।
র‌্যাব-৭ টেকনাফ ক্যাম্প-১ এর ইনচার্জ লে. মির্জা শাহেদ মাহতাব বলেন, সর্বশেষ গত মঙ্গলবার টেকনাফ পৌরসভার মধ্যে জালিয়া পাড়া অভিযান চালিয়ে ১ লাখ ইয়াবাসহ মো. হোসেন নামে এক মাদক ব্যবসায়ীকে আটক করা হয়েছে।
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, গত মাসে টেকনাফের বিভিন্ন জায়গায় অভিযানে ১৬ জন মাদক ব্যবসায়ীকে আটক করেছে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের সদস্যরা। এ সময় তাদের কাছে ১৫ হাজার ৯শ ইয়াবা উদ্ধার করা হয়েছে। এ ঘটনায় ১৬টি মামলায় ১৬ জনকে আটক করা হয়েছে।
কক্সবাজার জেলা মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক সুমেন মÐল জানান, নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে, এতে ইয়াবার চালানও ধরা পড়ছে। আগের তুলনায় ইয়াবা কারবার কমেছে।
পুলিশ সূত্র জানিয়েছে, গত মাসে টেকনাফে পুলিশের বিশেষ অভিযানে ২১ মাদক ব্যবসায়ীকে আটক করা হয়েছে। তাদের কাছ থেকে ২ লাখ ১৬ হাজার ৯শ ইয়াবা উদ্ধার করা হয়। এ ঘটনায় থানায় ১৩টি মামলা করা হয়েছে।
টেকনাফ মডেল থানার ওসি রনজিত কুমার বড়ুয়া জানান, টেকনাফকে ইয়াবার দুর্নাম থেকে রক্ষা করতে অভিযান অব্যাহত রয়েছে। মাদকের সাথে সম্পৃক্ত কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না।
কোস্ট গার্ড সূত্র জানিয়েছে, নাফনদী ও সমুদ্রে অভিযান চালিয়ে ১ লাখ ২৪ হাজার ৫৮৯টি ইয়াবা উদ্ধার করেছে কোস্ট গার্ড। ইয়াবা পাচারের অভিযোগে পাঁচ পাচারকারীকে আটক করা হয়। এ ঘটনায় টেকনাফ থানায় ৪টি মাদক মামলা করা হয়েছে। উদ্ধার করা ইয়াবার দাম ৬ কোটি ২২ লাখ ৯৪ হাজার ৫০০ টাকা।
কোস্ট গার্ড চট্টগ্রাম পূর্ব জোনের অপারেশন কর্মকর্তা লে. কমান্ডার এম সাইফুল ইসলাম জানিয়েছেন, ইয়াবা পাচার ঠেকাতে নাফনদী ও সমুদ্রে কোস্ট গার্ডের সদস্যরা জীবন বাজি রেখে দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছেন। ইয়াবাও ধরা পড়ছে, তবে আগের তুলনায় ইয়াবা পাচার কমেছে।
টেকনাফ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ রবিউল হাসান বলেন, ইয়াবা ঠেকাতে আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের টহল জোরদার করা হয়েছে। ইয়াবা নির্মূল করতে সকলের সহযোগিতা কামনা করছি।