মিয়ানমারে ফিরে যেতে অনিচ্ছুক ক্যাম্প ছেড়ে পালাচ্ছেন সচ্ছল রোহিঙ্গারা

31

মিয়ানমার সেনা নির্যাতনে এদেশে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গারা উখিয়ার ৮টি অস্থায়ী ক্যাম্পে আশ্রয় নিয়েছেন। তারা সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন দাতা সংস্থা কর্তৃক প্রদত্ত ত্রাণসামগ্রী ভোগ করছেন। উদ্বৃত্ত ত্রাণসামগ্রী খোলা বাজারে বিক্রি করছেন। এমতাবস্থায় ক্যাম্প থেকে বেশ কিছু রোহিঙ্গা নাগরিক স্বপরিবারে পালিয়ে গেছেন বলে প্রত্যক্ষদর্শী রোহিঙ্গারা জানিয়েছেন। তারা বলছেন, যে সব রোহিঙ্গা মিয়ানমারে স্বচ্ছল জীবনযাপন করেছেন এরাই মূলতঃ ক্যাম্প ত্যাগ করে বিভিন্ন স্থানে বাসাবাড়ি ভাড়া নিয়ে স্থায়ীভাবে থেকে যাওয়ার সুযোগ খুঁজছেন। আবার অনেকের ছেলেমেয়ে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে অবস্থান করছেন। তারা সেখান থেকে যাবতীয় কাগজপত্র তৈরি করে জাল ভিসার মাধ্যমে পরিবার পরিজনদের নিয়ে যাচ্ছেন। একাধিক রোহিঙ্গা তাদের অভিমত প্রকাশ করে বলেন, মিয়ানমারের সাথে বাংলাদেশের যে প্রত্যাবাসন চুক্তি সম্পাদন হয়েছে তা দায়সাড়া গোছের। ওই চুক্তিমতে, অনেকেই মিয়ানমারে ফিরে না যাওয়ার বিষয়টি প্রকাশ্যে না বললেও এ নিয়ে ক্যাম্পে রোহিঙ্গাদের মধ্যে ব্যাপক আলোচনা চলছে। স্থানীয় এনজিও সংস্থা হেলপ কক্সবাজারের নির্বাহী পরিচালক এমএ আবুল কাশেম বলেন, মিয়ানমার থেকে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গাদের মধ্যে ২৫ শতাংশ পরিবার ধনাঢ্য। যাদের ছেলেমেয়েরা মালয়েশিয়া, আরব আমিরাত, সৌদিআরব সহ মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে অবস্থান করছেন। বাকী ৭৫ শতাংশ পরিবারের মধ্যে ২০ শতাংশ পরিবার স্বচ্ছল, যারা দেশের বিভিন্ন স্থানে উন্নত জীবন যাপনের জন্য গোপনে দালালের মাধ্যমে ক্যাম্প ত্যাগ করছেন। ৫৫ শতাংশ পরিবার হতদরিদ্র। যারা মিয়ানমারের চাইতে এখানে ভালো রয়েছে বলে রোহিঙ্গারা স্বীকার করেছেন। এসব রোহিঙ্গাদের দাবি তাদের বসতভিটায় ফিরে যাওয়ার নিশ্চিয়তা ও স্বাধীন চলাফেরার সুযোগ নিশ্চিত করলে তারা মিয়ানমারে ফিরে যাবে। তারা আরো জানান, কুতুপালং ক্যাম্প থেকে ইতোমধ্যে প্রায় শতাধিক বড় বড় পরিবার বিদেশে চলে গেছে। আরো কিছু পরিবার চলে যাওয়ার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছে।
কুতুপালং আনরেজিস্ট্রার্ড রোহিঙ্গা ক্যাম্পের সেক্রেটারি মোহাম্মদ নুর জানান, গত ১ মাসে ২ শতাধিক রোহিঙ্গা নাগরিককে ক্যাম্পে দেখা যাচ্ছে না। খোঁজ খবর নিয়ে জানা গেছে, কুতুপালং ডি-১ বøকের মো. জুবাইর, মো. আলম, নুর মোহাম্মদ, আব্দুল লতিফ, মো. ইউছূপ, আবু তাহের, মো. জুবাইর, মো. আবু তাহের মালয়েশিয়া চলে গেছেন। এছাড়া কুতুপালং ই-২ বøকের আতাউর রহমান, আলী জুহার সৌদি আরবে, ছৈয়দ নুর, নুরুল আলম, কামাল উদ্দিন কাতার ও হোছন আহাম্মদ, আমেরিকা চলে গেছেন। তারা কিভাবে গেছেন জানতে চাইলে ক্যাম্প সেক্রেটারি বলেন, প্রবাসে অবস্থানরত তাদের স্বজনেরা পাসপোর্ট ভিসা সহ যাবতীয় কাগজপত্র পাঠিয়েছেন। গত ১৮ নভেম্বর সৌদি যাওয়ার জন্য পাসপোর্ট করতে গেলে চট্টগ্রাম বিভাগীয় পাসপোর্ট অফিস থেকে ৭ জন রোহিঙ্গা নাগরিককে আইনশৃংখলা বাহিনী আটক করে ক্যাম্পে ফেরত পাঠিয়েছে। ২৯ নভেম্বর চট্টগ্রামের পাঁচলাইশ আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিসে জাল পাসপোর্ট করতে গেলে আরজু বেগম(২৪) সহ ২ রোহিঙ্গা নারীকে আটক করে পাঁচলাইশ থানা পুলিশের নিকট সোপর্দ করে আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিসের উপ-পরিচালক মো. আজিজুল ইসলাম। পাঁচলাইশ থানার ওসি (তদন্ত) ওয়ালী উদ্দীন আকবরের সাথে আলাপ করা হলে তিনি জানান, আইনশৃংখলা বাহিনীর চোখ ফাঁকি দিয়ে সংঘবদ্ধ দালালের মাধ্যমে বিপুল টাকা ব্যয় করে রোহিঙ্গারা বিদেশে পাড়ি জমাচ্ছেন। ১৯৯১ সালে কুতুপালং ক্যাম্পে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গা নাগরিক ডাক্তার জাফর আলম বলেন, বাংলাদেশ-মিয়ানমারের মধ্যে সাম্প্রতিক সম্পাদিত চুক্তির উপর নির্ভর করে রোহিঙ্গারা মিয়ানমারে ফিরে যেতে নারাজ। তাই যাদের অঢেল টাকা পয়সা আছে তারা দালালের মাধ্যমে ভুয়া পাসপোর্ট বানিয়ে বিদেশে চলে যাচ্ছেন। যারা আর্থিকভাবে স্বচ্ছল, বিদেশ যাওয়ার মতো অঢেল টাকা পয়সা নেই তারা ক্যাম্প ছেড়ে দেশের বিভিন্ন স্থানে চলে যাচ্ছেন।
এ প্রসঙ্গে উখিয়া উপজেলা রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন সংগ্রাম কমিটির আহবায়ক অধ্যক্ষ হামিদুল হক চৌধুরী জানান, রোহিঙ্গাদের ৫ হাজার একর জায়গার উপর একত্রিত করে কাটাতারের বেড়া দিয়ে নিরাপদ বেষ্টনীর মধ্যে রাখার কথা থাকলেও তা এখনো বাস্তবায়ন হয়নি। তিনি বলেন, যেভাবে রোহিঙ্গারা ক্যাম্প ছেড়ে অন্যত্র চলে যাচ্ছেন তা অব্যাহত থাকলে সারা দেশে ছড়িয়ে পড়বে রোহিঙ্গা জনগোষ্টি। তখন আর প্রত্যাবাসন করেও কোন লাভ হবেনা। উখিয়া থানার অফিসার ইনচার্জ মো. আবুল খায়ের বলেন, ক্যাম্প ছেড়ে বাইরে যাওয়া প্রতিরোধের ব্যাপারে রোহিঙ্গাদের তল্লাশী অভিযান অব্যাহত রয়েছে। পুলিশের পাশাপাশি সামরিক বাহিনীর লোকজন যাত্রীবাহি গাড়িতে তল্লাশী চালিয়ে যাত্রীদের নিকট আইডি কার্ড, নাম-পরিচয়, এমনকি চেয়ারম্যান-মেম্বারের নাম জানা আছে কিনা জানতে চাইছে। যারা বলতে পারছেনা তাদেরকে ক্যাম্পে ফেরত পাঠানো হচ্ছে।