রোহিঙ্গা সংকট

মিয়ানমারকে দৃশ্যমান অগ্রগতি দেখাতে হবে : শাহরিয়ার

9

পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলম বলেছেন, মিয়ানমার কর্তৃপক্ষ যদি সত্যিই রোহিঙ্গা সঙ্কটের সমাধানে আগ্রহী হয়ে থাকে, তাহলে রাখাইনের ওই জনগোষ্ঠীর বঞ্চনা ঘোচাতে তাদের রাজনৈতিক সদিচ্ছার পরিচয় দেওয়ার পাশাপাশি দৃশ্যমান পদক্ষেপ নিতে হবে। বিশ্বকে নাড়িয়ে দেওয়া এই মানবিক সঙ্কটের বছর পূর্তিতে রোহিঙ্গা নারী ও শিশুদের দুর্দশা নিয়ে অক্সফামের প্রতিবেদন প্রকাশ উপলক্ষে গতকাল মঙ্গলবার এক অনুষ্ঠানে তিনি ওই মন্তব্য করেন তিনি।-খবর বিডিনিউজের
প্রতিমন্ত্রী বলেন, ‘আন্তর্জাতিক অংশীদারদের প্রতি আমাদের অনুরোধ, তারা যেন রোহিঙ্গা সঙ্কটের স্থায়ী সমাধানের চেষ্টা আরও জোরদার করেন।’
মিয়ানমারের রাখাইনে সেনাবাহিনীর দমন-পীড়নের মুখে গতবছর অগাস্ট থেকে এ পর্যন্ত সাত লাখের বেশি রোহিঙ্গা পালিয়ে এসে বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছে। আর গত কয়েক দশক ধরে বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়ে আছে আরও প্রায় চার লাখ রোহিঙ্গা। আন্তর্জাতিক চাপের মুখে মিয়ানমার সরকার রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নিতে গত ডিসেম্বরে বাংলাদেশের সঙ্গে চুক্তি করলেও গত দশ মাসে প্রত্যাবাসন শুরু করা যায়নি। রাখাইনের পরিস্থিতি রোহিঙ্গাদের জন্য কতটা নিরাপদ তা নিয়েও সংশয় প্রকাশ করে আসছে আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো।শাহরিয়ার আলম বলেন, মিয়ানমারের ওপর আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের চাপ অব্যাহত রাখতে হবে, যাতে তারা সাহায্য সংস্থাগুলোকে রাখাইনে যাওয়ার এবং কাজ করার সুযোগ দেয়। কেবল তখনই বোঝা যাবে- এই নারী আর শিশুদের রাখাইনে ফেরার পরিবেশ তৈরি করতে কী কী করতে হবে।
‘ওয়ান ইয়ার অন: টাইম টু পুট উইমেন অ্যান্ড গার্লস অ্যাট দা হার্ট অব দা রোহিঙ্গা রেসপন্স’ শিরোনামে এই প্রতিবেদন প্রকাশ অনুষ্ঠানে বাংলাদেশে অক্সফামের কান্ট্রি ডিরেক্টর দীপঙ্কর দত্তও উপস্থিত ছিলেন।প্রতিবেদনে বলা হয়, কক্সবাজারে শরণার্থী ক্যাম্পে যে পরিবেশে রোহিঙ্গা নারীরা থাকছেন, তাতে তাদের মধ্যে নানা ধরনের স্বাস্থ্য সমস্যা বাড়ছে, সেই সঙ্গে বাড়ছে তাদের নিরাপত্তার ঝুঁকি। অক্সফাম যে রোহিঙ্গা নারীদের সাক্ষাৎকার নিয়েছে, তাদের এক তৃতীয়াংশই বলেছেন, ক্যাম্পের পরিবেশে যেভাবে তাদের পানি আনতে বা টয়লেটে যেতে হয়, যেভাবে গোসল করতে হয়, তাতে তারা নিরাপদ ও স্বস্তি বোধ করেন না। এই নারীদের অর্ধেক এবং বয়ঃসন্ধিতে থাকা কিশোরীদের এক তৃতীয়াংশ বলেছে, মাসিকের সময়টাতে তাদের যা দরকার তা তারা পান না। এই পরিস্থিতিতে রোহিঙ্গা নারী ও শিশুদের জন্য আলাদাভাবে ৭২ মিলিয়ন ডলারের জরুরি সহায়তার আহবান জানিয়েছে অক্সফাম।
প্রতিমন্ত্রী বলেন, নারী ও শিশুদের এই প্রয়োজনগুলো অনুধাবন করে সরকার বিশেষ সহায়তার ব্যবস্থা নিয়েছে। ৩৪ হাজার ৩৩৮ জন অন্তঃস্বত্তা নারীকে চিহ্নিত করে তাদের প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যসেবা দেওয়া হয়েছে। এই সেবার আওতায় এ পর্যন্ত তিন হাজার ৫৫৪টি শিশুর জন্ম হয়েছে। এছাড়া রোহিঙ্গা ক্যাম্পে আট হাজার ১৭০টি টিউবওয়েল, ৫০ হাজার ৫০৮টি ল্যাট্রিন এবং ১১ হাজার ১৯০টি গোসলখানা তৈরি করে দেওয়া হয়েছে।
শাহরিয়ার আলম বলেন, এই রোহিঙ্গা নারীরা রাখাইনে মানসম্মত স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা এবং আর্থিক কর্মকাÐে অংশগ্রহণের অধিকার থেকেও বঞ্চিত ছিল। তার ওপর যেসব ভয়ঙ্কর যৌন নিপীড়নের ঘটনার মধ্যে দিয়ে তাদের যেতে হয়েছে, তাতে মানসিকভাবেও তাদের বড় ধরনের ক্ষতি হয়েছে।
রাখাইন থেকে রোহিঙ্গা মুসলমানদের বিতাড়িত করতে তাদের মনে আতঙ্ক সৃষ্টির জন্য মিয়ানমারের সেনাবাহিনী ধর্ষণকে যে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করেছে, সে বিষয়টি আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংস্থার প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।
পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী বলেন, রোহিঙ্গা সঙ্কটের স্থায়ী সমাধানের চেষ্টায় এই সম্প্রদায়ের নিরাপত্তার দিকটিতে গুরুত্ব দিচ্ছে বাংলাদেশ সরকার। এর অংশ হিসেবে রোহিঙ্গা ক্যাম্পের চেকপোস্টগুলোতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ১২০০ সদস্যকে মোতায়েন করা হয়েছে। রাতে ক্যাম্পের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ১৩ কিলোমিটার বিদ্যুৎ সঞ্চালন লাইনে টেনে আলোর ব্যবস্থা করা হয়েছে। বাংলাদেশ বিশ্বাস করে, রোহিঙ্গা নারী ও শিশুদের এসব সমস্যার স্থায়ী সমাধান খুঁজতে হবে। আর সেজন্য আমরা মিয়ানমারের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সঙ্গে কূটনৈতিক যোগাযোগ চালিয়ে যাচ্ছি।
শাহরিয়ার আলম বলেন, আমাদের অতীত অভিজ্ঞতা বলছে, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় চাপ না দিলে মিয়ানমার তাদের প্রতিশ্রæতি পূরণের আগ্রহ দেখায় না। রোহিঙ্গা নারী ও শিশুদের সমস্যার বিষয়গুলো আলাদাভাবে তুলে আনায় অক্সফামকে ধন্যবাদ জানান প্রতিমন্ত্রী।