মা তিনি একক

লিটন দাশগুপ্ত

31

‘মা কথাটি ছোট্ট অতি
কিন্তু যেন ভাই,
ইহার চেয়ে নাম যে মধুর
ত্রিভুবনে নাই।’
কাজী কাদের নেওয়াজ কর্তৃক রচিত স্বরবৃত্ত ছন্দের এই ছড়াটি, আমার দৃষ্টিতে এবং অনুভবে মা বিষয়ক পঠিত সকল ছড়ার মধ্যে সর্বসেরা। আমার মা ও আমার মধ্যে যে স্নেহ মমতা ও ভালোবাসা শ্রদ্ধার বন্ধন ছিল, তা দেখেই যেন কাদের নেওয়াজ এই ছড়াটি লিখেছিলেন। আমাদের সময় প্রাথমিকে পাঠ্যবইয়ে অন্তর্ভুক্ত ছিল এই ছড়াটি। সেই সময় আমার ভালো লাগত বলে কত শত বার পড়া হয়েছে তার হিসাব নেই!
যাই হোক, এই ছড়াটি নিয়ে আলোচনা বা বিশ্লেষণ করা আজকের লেখায় অভিপ্রায় আমার নাই। আজ আন্তর্জাতিক মা দিবস; মা’কে নিয়ে কিছু বলার বা লেখার উদ্দেশ্যে ভূমিকাস্বরূপ এই লেখা। মা দিবসে আমার প্রতি আমার মায়ের স্নেহমমতা সম্পর্কে কিছু বলতে গেলে, হয়ত অনেকে বলতে পারেন সকলের মা সকলের জন্যে বড় সম্পদ। অস্বীকার করবো না; কেবল মানব জাতিতে নয়, অন্যান্য প্রাণিকূলেও অনাবিল মাতৃস্নেহ আমরা অহরহ দেখে আসছি। অনেক সময় মনেহয় মানবকূলের চেয়ে ইতর প্রাণি, হিংস্র জন্তু বা পশুপাখির মধ্যে মাতৃস্নেহ আরো বেশী। কারণ মানব জাতিতে সন্তানকে ভালোবাসার নেপথ্যে ভবিষ্যৎ প্রতিদান পাবার প্রত্যাশা থাকতে পারে। কিন্তু অন্য সকল জীবজন্তু কীটপতঙ্গ পশুপাখির, আগামীতে প্রতিদান পাবার আশা নেই, তবুও নিজের জীবন দিয়ে মা প্রাণি, বাচ্চা বা শাবককে ভালোবাসে। কথাটি এভাবে বলার কারণ হচ্ছে, সৃষ্টির সেরা জীব মানুষ, তা সত্ত্বেও ইদানিং বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যমে মাতৃকর্তৃক নিজ সন্তান হত্যার বহু খবর পেয়েছি ও পাচ্ছি।
প্রতিবছর মে মাসের ২য় রবিবার অনেক দেশে ‘বিশ্ব মা দিবস’ হিসাবে পালিত হয়। অনেক দেশ বলছি এই জন্যে, বেশকিছু দেশ অন্যান্য দিনেও এই দিবস পালন করে থাকে। এই দিবস পালনের অন্যতম উদ্দেশ্য হচ্ছে, ৩৬৫ দিন বছরে মধ্যে অন্তত একবার, যার যার জীবিত বা মৃত মাকে শ্রদ্ধা ও স্মরণ করা। যদিও জীবিত কোন সন্তান, প্রতিদিন প্রতিসেকেন্ড মাকে স্মরণ করলেও মায়ের ঋণ শোধ হবেনা।
একটি সন্তান জন্মের ক্ষেত্রের মা বাবার সমান ভূমিকা থাকলেও মা’র গুরুত্ব সর্বাধিক। যদিও বিজ্ঞান ভিত্তিতে সন্তান ছেলে হবে কি মেয়ে হবে সম্পূর্ণ পিতার ক্রোমোজমের উপর নির্ভরশীল। কিন্তু সামগ্রিক অবদানের ক্ষেত্রে মায়ের উপর পুরো বিষয় সম্পৃক্ত ও সম্পর্কযুক্ত। অধিকতর গুরুত্ব অনুধাবনের জন্যে বলা যায়, সদ্য ভূমিষ্ট হওয়া শিশুর ক্ষেত্রে সবাই অবগত থাকে প্রসূতিটাই তার মা, যা চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে হয়না। কিন্তু সদ্য ভূমিষ্ট হওয়া শিশুর ক্ষেত্রে সবাইকে অবহিত করতে হয় এটাই তার পিতা। চ্যালেঞ্জের মুখে পড়লে প্রয়োজনে ডিএনএ টেস্টের প্রয়োজন হয়! এই কথা এই ভাবে বলার কারণ হচ্ছে, পৃথিবীতে মা-ই সত্য যা তিনি শুধু স্নেহময়ী মমতাময়ী হিসাবে নয় অবিসংবাদিও বটে, এই বিষয়টি অনুধাবনের জন্যে এই কথা বলা। বলাবাহুল্য এবিষয়ে সিদ্ধান্তে উপনীত হতে, গবেষণা, পরীক্ষা নিরীক্ষা বা বিচার বিশ্লেষণের প্রয়োজন পড়েনা; পৃথিবীতে সর্বাধিক আপনজন হচ্ছে একমাত্র “মা”।
মা শব্দটি শাশ্বত, চিরন্তন, সুন্দর; যা সন্তানের কেবল নিরাপদ আশ্রয়ের স্থান নয়, স্বস্তি প্রশান্তির ঠিকানাও বটে। এই শব্দটি স্মরণ করিয়ে দেয় অকৃত্রিম স্নেহ মমতার বাঁধন ও ভালোবাসার গভীরতার কথা। সৃষ্টির ঊষালগ্ন থেকে মা সকল মমতার আধার ও সকল ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দু। বিস্ময়ের বিষয় হচ্ছে, বিশ্বের বিভিন্ন দেশে, প্রায় সকল ভাষার মানুষের মধ্যে মা শব্দটিতে ‘ম’ ধ্বণি যুক্ত আছে। যেমন- মা, মাদার, মেরে, মুট্টার, মম, মায়ে, মেমে, মাদ্রে, মাটকা, মানা, মোর, মাইকা ইত্যাদি। ‘ম’ ধ্বণি যুক্ত থাকুক আর নাই থাকুক, পৃথিবীর সকল মায়ের প্রতি আজকের এই দিনে রইল আমার শ্রদ্ধা।
আজ মা দিবসে আমার মাকে স্মরণ করে কিছু কথা বলতে চাই। প্রত্যেক মা-ই সন্তানকে স্নেহ আদর ভালোবাসা দিয়ে আগলিয়ে রাখার চেষ্টা করে। আমার মাও এর ব্যতিক্রম নয়। তাই সন্তানের প্রতি ভালোবাসার বিষয় ছাড়াও আমার মায়ের মধ্যে অতিরিক্ত কিছু বৈশিষ্ট্য দেখতে পেয়েছি। তা আজ মা দিবসে উপস্থাপন করতে চাই। যদিও আমার মায়ের বৈশিষ্ট্য বা গুনাবলী অন্য কারো কিছু যাই আসে না, তবে এটাও ঠিক, সেকালের তাঁর কার্যক্রমসমূহ জেনে, একালের অনেক মা উপকৃত ও অনুপ্রাণিত হবে।
আমার মা’র নাম ছিল ‘অনুপ্রভা’ যার অর্থ পশ্চাতদীপ্তি। অর্থাৎ অনুপ্রভা হচ্ছে বিশেষ এক পদার্থ যা আলোর উৎস থেকে সরিয়ে নিলেও নিজেই আলোর বিচ্ছুরণ বা বিকিরণ ঘটিয়ে থাকে। যা আমার মায়ের নামের যৌক্তিকতা বাস্তব জীবনে প্রতিক্ষেত্রে প্রতিফলিত হয়েছে এবং সার্থকতা এনেছে। আমার মায়ের আদর্শ ও ব্যক্তিত্ব ছিল অনুকরণীয় ও অনুসরনীয়। চলাফেরায় ছিল সর্তকতা, স্বল্পভাষী আর কথাবার্তায় ছিল বিনয়ী ও গাম্ভির্য্যতা। ছোট বেলায় দেখতাম, পুরো পাড়ার সকলে তাঁকে শ্রদ্ধা করত ভালোবাসত, এবং সমীহ করত। প্রতিবেশী ও আত্মীয়স্বজনদের দেখতাম, যে কোন সমস্যার জন্যে, আমার মা’র কাছে পরামর্শ নেবার জন্যে চলে আসত। তাঁর একটা স্বভাব ছিল, কোথাও বা কারো বাড়িতে সহজে যেতেন না, বা কারো সাথে বসে অনর্থক কথা বা খোশগল্প করে বৃথা সময় নষ্ট করতেন না। মা’র ছিল পারিবারিক, সামাজিক, শিক্ষা, সাহিত্য, চিকিৎসা, আইন ইত্যাদি সম্পর্কিত অগাধ জ্ঞান। তিনি হোমিওপ্যাথি চিকিৎসা বিষয়ে অভীজ্ঞ ছিলেন। ঘরে বাক্সভর্তি থাকত ১৫/২০ রকমের হোমিওপ্যাথিক ঔষধ। প্রতিদিন গ্রামের বা পাড়ার ছোট খাটো অসুখ নিয়ে, কেউনা কেউ এসে বিনামূল্যে ঔষধ ও চিকিৎসা সেবা নিয়ে যেত। আবার দেখতাম, পাড়ার মহিলারা পারিবারিক ঝগড়া বিবাদ নিয়ে, মা’র কাছে বিচারের জন্যে এসে সুরাহার চেষ্টা করত। তিনি মনস্তাত্তি¡কভাবে সকল সমস্যা সমাধানের চেষ্টা করতেন। ছোটবেলায় সব সময় দেখতাম, কোন না কোন মহিলা মায়ের আশে পাশে লেগেই থাকত। অধিকাংশ ক্ষেত্রে বয়স্কা মহিলা ছিল, যাদেরকে টাকা পয়সা চাল ডাল সব্জি দিয়ে সাহায্য করতেন। সকল বয়সী সকল শ্রেণির মহিলা আমার মাকে ভালোবাসত আবার কেমন জানি ভয়ের সাথে সমীহ করত। তিনি হৈচৈ ও আড়ম্বরপূর্ণ জীবন পছন্দ করতেন না।
আমার বাবার ছিল ছয় ভাই। সব মিলে বড় একটা যৌথ পরিবার। সেই সময় পুরো যৌথ পরিবারের রান্নবান্নাসহ সকল ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব এককভাবে পালন করতে হত মা’কে। তখনকার সময় এখনকার মত জীবনযাত্রার মান এত আধুনিক ও সহজসাধ্য ছিলনা। যেমন- তখন ঘরে ঘরে এখনকার মত নলকুপ ছিলনা। দুর থেকে মাটির কলসী করে, বিশুদ্ধ খাবার পানি আনতে হত। তখন মরিচ মসলার গুড়ো ছিলনা, কিছু জায়গায় থাকলেও অনেকে গুড়ো মরিচমসলা পছন্দ করতো না। তাই মাকে পাটায় মরিচ মসলা বেটে রান্নার ব্যবস্থা করতে হত। সে সময় গ্রামে গরু ছাগল, হাঁস মুরগী, কবুতর ও বিভিন্ন শস্য সব্জির চাষবাস না থাকলে, হত দরিদ্র পরিবার বলে চিহ্নিত হত। তাই এই সকল বিষয়গুলো মানুষের সাহায্যে রক্ষণাবেক্ষনের দায়িত্ব ছিল। তখনকার দিনে পাড়ার প্রতিবেশী ও আত্মীয় স্বজন আসা যাওয়া ছিল খুব বেশী। তাছাড়া আমাদের আত্মীয়স্বজন ছিল বেশী। প্রায় প্রতিদিন কোন না কোন আত্মীয় স্বজনের অতিরিক্ত খাওয়া দাওয়া আপ্যায়ন ব্যবস্থার দায়িত্ব পালন করতে হত। বিভিন্ন ধরনের ধর্মীয় বই বিশেষ করে মহাভারত, রামায়ণ, গীতা, পুঁথি ইত্যাদি পড়তেন, বয়স্ক মহিলারা শুনতেন এবং তাদেরকে কাহিনী বুঝিয়ে দিতেন। বছর শুরুতেই সবার আগে ডাইরেক্টরী পঞ্জিকা কিনে আনাতেন। পুরো বছরের তিথিনক্ষত্র শুভাশুভ ক্ষণ, পূজা পার্বণের তারিখ সময় মুখস্থ রাখতেন। প্রতিবেশীরা এসে কখন কি হবে তা তাৎক্ষণিক জেনে নিতে পারতেন।
পুরো ঘর ও আশপাশ সাজসজ্জা করে রাখার চেষ্টা করতেন। নিজে কাপড়, রুমাল, বেডশিট ইত্যাদিতে বিভিন্ন নক্সা করে রঙিন সুতা দিয়ে সেলাই করতেন। আবার পরিবারের সকলের জন্যে উল দিয়ে, চাদরসহ বিভিন্ন পরিধেয় বস্ত্র তৈরী করতেন। এছাড়া বিভিন্ন রঙবেরঙের কাগজ দিয়ে নানা ধরণের ফুল বানিয়ে, ঘর সাজিয়ে শোভা বর্ধন করতেন। শুধু তা নয়, বিভিন্ন ধরণের খাবার যা সাধারণত ঘরে তৈরী অনেকটা অসম্ভব বা দুরুহ, যেমন- রসগোল্লা, সিংহারা, চানাচুর, চটপটি, খেজুর গুড়, ঘি ইত্যাদি তৈরী করতেন। তখন যৌথ পরিবারে অবিভক্ত বিশাল বাড়ির আনাচে কানাচে মজুরের মাধ্যমে বিভিন্ন ধরণের সব্জীক্ষেত করাতেন, আঙিনায় ছিল ফুলের বাগান। এই বাগানে পানি দিতেন ও যতœ নিতেন। এতসব কাজের মধ্যেও আমরা দুই ভাইকে সময়মত লেখাপড়া করাতেন। গ্রামের মধ্যে সেই সময়ে মাদকের আখড়া ও অস্ত্রের ঝনঝনানির মধ্যে, ছোট ভাই মেডিক্যাল ও ইঞ্জিনিয়ারিং চান্স পেয়েছিল এবং ইঞ্জিনিয়ার হতে পেরেছে। আমি দুটি বিষয়ে মাস্টার্স ডিগ্রী ছাড়াও শিক্ষা ও আইন বিষয়ে ডিগ্রী অর্জন করতে পেরেছি আমার মা’র নির্দেশনা ও আদর্শে।
তিনি আবার ক্রিকেট ফুটবল সহ খেলা দেখতেন এবং বুঝতেন। এছাড়া রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক জাতীয় ও আন্তর্জাতিক বিভিন্ন খবর রাখতেন এবং এই সকল বিষয়ে কৌতুহল হয়ে জানতে চাইতেন। আমার বাবা রেলওয়ে ‘নোট পরীক্ষক’ ছিলেন, বর্তমানে অবসরে আছেন। তখন তিনি সাপ্তাহিক ছুটিতে শহর থেকে বাড়িতে আসতেন। তাই আমার মা’কে সবকিছু নিয়ন্ত্রণ ও পরিচালনা করতে হত। বাড়ির পাশে প্রাইমারি স্কুল ছিল, সেখানে শিক্ষকতা করার বেশ শখ ছিল। চেষ্টাও করেছিলেন। কিন্তু আমার রক্ষনশীল পিতামহ বলেছিলেন, ঘরে বৌ এনেছি ঘরের কাজ করতে, বাইরে গিয়ে চাকুরী করতে নই। আমার মা ছিলেন খুবই দূরদর্শী বা ভবিষ্যৎ দ্রষ্টা এক মহিয়সী নারী। পরিবার, পাড়ায় বা রাজনৈতিক অঙ্গনে কি ঘটবে, আগে থেকেই বলে দিতে পারতেন। তিনি যা অনুমান করতেন, অধিকাংশক্ষেত্রে তা সঠিক হত। এখনকার সময়ে এসে, সেই সময়ের আমার মায়ের আদর্শ ব্যক্তিত্ব বিচক্ষণতা, বু্িদ্ধ জ্ঞান দক্ষতা, সময়ানুবর্তিতা, নিয়মানুবর্তিতা ইত্যাদি অনুভব করে অবাক হয়ে ভাবতে বাধ্য হচ্ছি। তিনি আইন বিষয়ে লেখাপড়া করেননি, কিন্তু আইনবিষয়ে আমি পড়তে গিয়ে দেখলাম ‘টর্ট আইন’র বিভিন্ন যুক্তি তাঁর কথার সাথে মিলে গেছে। তাঁর শিক্ষা বিষয়ে কোন প্রকার প্রশিক্ষণ ছিলনা, কিন্তু আমি শিক্ষায় উচ্চতর ডিগ্রী নিতে গিয়ে দেখতে পায়, তিনি আমাদের শেখাতে গিয়ে ব্যবহৃত শিক্ষা সংক্রান্ত অনেক নীতি তথ্যের সাথে মিল রয়েছে। আমার মা’র বহুমুখী প্রতিভা চিন্তা চেতনার কথা ভাবতে গিয়ে বিস্মিত হতে হয়, সেই সময়ে গ্রামের একজন নারীর পক্ষে এতসব কি করে সম্ভব? এই রকম তাঁর বিভিন্ন কথা, বলে শেষ হবেনা। এককথায় বলতে পারি, ‘সংসার সুখের হয় রমণীর গুণে, সেই কথা সত্যি হয়েছিল আমার মায়ের জীবনে…’।