মাস্টার মুহম্মদ নূর-গ্রাম বাংলার বাতিঘর

মুহম্মদ আবু তৈয়ব

15

নুর স্যারের মৃত্যুতে আজ আমরা এলাকাবাসী ও পড়ুয়ারা বেদনার্থ ও শোকাহত। আর চোখ যতই ঝপসা হয়ে আসুক না কেন তাঁর মত দরদী শিক্ষক নিয়ে কিছু লিখতে হয়।
তিনি ছিলেন কর্মে উদ্যমী, স্বপ্নে উজ্জীবিত একজন প্রানবন্ত সমাজ সচেতন মানুষ। সন্তানের অভিভাবক হওয়া সহজ, কিন্তু সকল পড়ুয়ার, এলাকাবাসির অভিভাবক হওয়া কঠিন। সেই কঠিন বিষয়টি তিনি করতে পেরেছিলেন। এমন অভিভাবকটি চলে গেল সবাইকে চোখের জলে ভাসিয়ে, অতি নিরবে গত ১৮ এপ্রিল’১৯।
হৃদয়বান ও ভালবাসায় মানুষ মারা গেলে তাঁর বড় কর্মের কথাগুলো মনে আসে না। মনে আসে ছোট কাট হৃদয়স্পর্শি বিষয়গুলো। সেই আশির দশকের কথা। এলাকায় তখন অন্ধকারের বাসিন্দা দুর্জন মিস্টার হাইডসদের প্রতিপত্তি চলছিল। ডাক্তার সুশীল জ্যাকিলসরা সংখ্যায় নগন্য বলে নানা চাপে থাকত। অন্ধকারের প্রতাপ বেশি হওয়ায়, গ্রগতিশীল ও আলোকিত মানুষরা সংখ্যায় নগন্য হওয়ায় তিমির হনন করে তেমন এগুতে পারছিল না। তখন প্রগতিশীল মানুষদেরকে গ্রাম বাংলায় হাজারো প্রতিকূলতার মুখোমুখী হতে হয়। সেই সময়কার আলোকিত যে কয়েকজন পশ্চিম পটিয়ায় মানুষ ছিলেন তাদের মধ্যে বহুমাত্রিক গুনের অধিকারী আলহাজ্ব মাস্টার মোহাম্মদ নূর অন্যতম। তিনি তার অনুসারিদের আলোকাভিসারি করতে এবং রাখতে সচেতনভাবে সচেষ্টা থাকতেন।
যার জন্য তিনি হয়ে উঠেছিলেন এলাকার অভিভাবক। পড়ুয়াদের তিনি বেশি ভালবাসতেন ও পড়ায় বিঘিœত না হতে নানা উদ্যোগ নিতেন। এলাকায় প্রায় পড়ুয়ারা তাঁর স্নের্হাদ্র হৃদয়ের ভালবাসা পেতেন। যে প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থী হউক না কেন তাঁর ভালবাসা থেকে কোন শিক্ষার্থী বঞ্চিত হত না। ফলে তিনি তাঁর প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক হিসাবে পরিচিত হওয়ার চেয়ে এলাকার শিক্ষক হিসাবে বেশি খ্যাতি অর্জন করেন।
তিনি দূরবর্তী একটি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করতেন। আবার সামাজিক নানা বিষয়েও সক্রিয় থাকতেন। তিনি জানতেন শুধু পাঠদান করলে সার্থক শিক্ষক হওয়া যায় না। শিক্ষাদানে আন্তরিকতাও লাগে। শিক্ষার্থীকে গড়ে তোলার জন্য অর্থ ও শ্রেণি কক্ষের চেয়ে শিক্ষকের আন্তরিকতা বেশি প্রয়োজন। হৃদয়ের উঞ্চতা বেশি প্রয়োজন। এ সব তাঁর মধ্যে ছিল। তাই স্কুল ছুটির পর বসে থাকতে পারতেন না। এলাকায় পড়ুয়ার নানা সমস্যা সমাধানে ও সহায়তা করেত ব্যস্ত হয়ে পড়তেন।
পড়ুয়াদের টেবিলে বই দিয়ে আসতেন। আবার একজনের বই অন্যজনকে ধার করে দিতেন। আর্থিক সমস্যাও সমাধান করে দিতেন। নিজে না পারলে সুহৃদদের, ভিত্তবানদের সাহায্য নিতেন। যার জন্য এলাকায় পড়ুয়ারা তাঁকে অভিভাবক হিসাবে গ্রহন করে। এলাকার অভিভাবক হওয়া বড় কঠিন। সহজে কেউ তা হতে পারে না। তিনি সেই কঠিন কাজটি করতে পেরেছিলেন। তাঁর হাত হতে পুরস্কার স্বরূপ পেন্সিল, খাতা, স্কেল পাইনি এমন পড়ুয়া তার অজপাড়া গাঁয়ে তখন পাওয়া যেত না। আমরা নিজেদের মধ্যে কেউ বাকী নেই তাঁর হাত হতে পুরস্কার গ্রহন করেনি। তিনি দূরের মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করলেও আমাদের গ্রামের প্রাথমিক বিদ্যালয়েও মাঝে মাঝে আসতেন। ছড়া, কবিতা শুনতেন, শোনাতেন ও বলতেন। এই ছড়া, কবিতা শোনাতে গিয়ে ১৯৭২ সালে আমার প্রথম পুরস্কার লাভ। তখন তৃতীয় শ্রেণিতে পড়তাম। ‘অভিলাষ’ নামক ছড়াটি বলতে পারায় স্যার আমাকে একটি পেন্সিল ও তখনকার দিনের একটি কাঠের স্কেল পুরস্কার দিয়েছিলেন। আনতে গিয়ে হৃদপিন্ডের সেকি ধরপড়ানি, এখনকার ভাষায় ব্রেইন স্ট্রোম বলা চলে। প্রকৃতির মাঝে অপুর মত বেড়ে উঠা, র্দুগার ছোট ভাই হয়ে সেই পুরস্কার নেওয়ার কি রোমাঞ্চকর উত্তেজনায় ছিলাম ভাবতে গেলে ঘেমে উঠি। সংগঠন ও পেশাগত কারণে এখনকার প্রাপ্ত পুরস্কার ও স্মারকগুলো সেই পুরস্কারের স্মৃতির কাছে ম্লান। এসব পুরস্কার দামী হলেও সেই পেন্সিল-রুলারের মত মূল্যবান হতে পারার নয়।
একজন পড়ুয়ার বিকাশের তিনটি দিক থাকে। শারীরিক, মানসিক ও আবেগিক। আবেগিক বিষয়গুলো ইতিবাচকভাবে স্পর্শ করতে পারলে, উসকিয়ে দিতে পারলে পড়ুয়ার আপন হওয়া যায়, বন্ধু হওয়া যায়। কিন্তু অনেক অভিভাবক, শিক্ষক সে আবেগীক বিষয়টি গুরুত্ব দেন না। এজন্য অনেক অভিভাবক রাতদিন পরিশ্রম করে সন্তানকে ভাল ভাল খাবার যোগান দিয়েও, শিক্ষক বিদ্যার বহর শিখানোর পরও তাঁরা পড়ুয়ার বন্ধু হতে পারে না, আপন হতে পারে না। যে বন্ধু বা আপন হতে যে পারে না সে কেমন করে পড়ুয়ার হৃদয় জয় করবে, পড়ুয়াকে চলানোর জন্য, সঠিক ভাবে বিকশিত করতে তার মনের মাঝি হতে পারবে।
যা বলছিলাম। এলাকার প্রায় শিক্ষার্থীদের তিনি মন জয় করতে পেরেছিলেন, মনের মাঝি হতে পেরে ছিলেন। আর ভালবাসার মানুষটি একবার মনের মাঝি হিসাবে গ্রহন করা হলে শত ব্যস্ততায় ও চাপের মাঝেও সেই মন মাঝিকে পরিবর্তন করা যায় না। ভুলা যায় না।
সমাজে আমরা একা বাস করতে পারিনা। তাই আমি একা সুখী মানে সুখী না। অপরের সুখের জন্যও কাজ করতে হয়। সেই প্রকৃত সুখের জন্যও তিনি মৃত্যুর আগ পর্যন্ত কাজ করে গেছেন।
রাস্তা, মসজিদ, ফোরকানিয়া, স্কুল সংস্কার বা নিমার্ণে ব্যস্ত থাকতেন। আবার অসহায়, নির্যাতিত মানুষের বিপদ আপদে সাড়া দিতেন। গরীব ও নিষ্পেষিত নারী ও পরিবারের উপর অভাব অনটনের হিং¯্র ঢেউ যখন আছড়ে পড়ত তখন তাঁরা নুর স্যারের স্মরনাপন্ন হতেন। নূর স্যারও তাঁদের পাশে ছুটে যেতেন, সাহায্য করতেন। আর্থিক সংকটগ্রস্থ পরিবারের মেয়ের বিয়েতে অর্থ দিয়ে, পরামর্শ দিয়ে তাদের পাশে থাকতেন। প্রয়োজনে ভিত্তবান সুহৃদদের দিকে হাত পাততে কসুর করতেন না। এছাড়া প্রান্তিক পরিবারের অসহায় জনগোষ্ঠিকে প্রয়োজনীয় মানসিক বল ও পরামর্শ দিতেন। এক কথায় বসে থাকতেন না। সময় নষ্ট করতেন না এই মাটির মানুষটি।
আমাদের সমাজে শ্রেণি বৈষম্য এখনও আছে। তখনও আরও প্রকট ছিল। আর যেখানে শ্রেণি বৈষম্য সেখানে অন্যায়, অবিচার, জুলুম শোষণ ইত্যাদি চলে। এমন সমাজে তিনি ভিত্তিবানদের সাথে থাকলেও গ্রাম্য শালিশি বৈঠকে নিযার্তিত ও অসহায়দের পক্ষ নিতেন। যার জন্য তাঁকে নানা হেস্তন্যাস্ত হতে হত, নানা প্রতিকূলতা মোকাবিলা করতে হত। তবে তিনি সহজে দমে যেতেন না। দমবে বা কেন, তিনি তো কাজ করেন সমাজের জন্য, মানুষের জন্য। এসব তো প্রেরণা যোগায় আনন্দ দেয়। আর প্রেরণা দায়ক ও আনন্দময় কাজে তো ক্লান্তি থাকে না, ক্লান্তি থাকতে পারে না।
যারা এমন কাজ করে যায় তাদের ভিত্ত সীমিত হলেও চিত্ত অনেক সমৃদ্ধশালী ও অপার। যার জন্য এমন হৃদয়বান মানুষটিকে সবাই ভালবাসতেন, তাকে নিয়ে সামাজিক কর্মকান্ড করতে মানুষ চাইতেন।
জীবনের কাজ কর্মের জগত সমুদ্রের মত। আর এই সমুদ্রে সাতাঁর কাটা শিখতে হয়, সাতাঁর কাটতে হয়। সবাই নিজেদের জন্য, নিজেদের সফলতার জন্য তা করে। কিন্তু নুর স্যার নিজের জন্য সাতাঁর কাটতেন না, ডুবন্ত মারা যাওয়া কাউকে বাচাঁনোর জন্য সাতাঁর কাটতেন বা সাতাঁর কাটা শিখাতেন। তাই তিনি হয়ে উঠেন পূর্ণ মানবিক মানুষ ও আদর্শ শিক্ষক। এই যে অপরের জন্য কাজ করা, সাতাঁর কাটা তাতেই আনন্দ থাকে। সেই আনন্দই তিনি পেতেন। তাই তিনি ছিলেন সুখী মানুষ।
কাজে ছিল তার নিষ্ঠতা, উঞ্চতা, আর ব্যবহারে ছিল সরলতা। তার এসব গুন মানুষকে মুগ্ধ করত। তিনিও ক্লান্তিহীনভাবে কাজ করে যেতেন, সমাজের জন্য, না হয় পড়–য়ার জন্য। যার জন্য তাঁর জীবন বিকাশের প্রতিটি ধাপে, কৈশোরে, যৌবনে পেশায়, অবসরে, প্রৌঢ়ত্বে তিনি সক্রিয় ও আন্তরিক থাকতে পেরেছিলেন। উল্লেখ করা যায় পাঠদানে যেমন আন্তরিক, প্রাতিষ্ঠানিক ও সামাজিক নানা কাজে তেমন দায়িত্বশীল। ফলে তিনি জীবনের প্রতিটি ধাপে বাচাঁর মত বাঁচতে পেরে ছিলেন, আত্মতৃপ্তি সহকারে। কারণ তিনি জানতেন সময় নষ্টকারী মানে আত্ম হত্যাকারী। একদিন সময় নষ্ট করা মানে ঐ দিনের জন্য নিজেকে হত্যা করা।
জীবনের শেষ ধাপ প্রৌঢ়ত্বে এসেও তিনি সজীব ও সক্রিয় ছিলেন। এতটুকু সময়ের জন্য হলেও নিজেকে হত্যা করেননি। তাইতো তিনি শেষ বয়সে এসেও চমৎকার বুড়ো বা অভিজ্ঞ মানুষ হিসাবে থাকতে পারার সম্মান অর্জন করে ছিলেন। কারও উপর নির্ভরতা পছন্দ করতেন না। সব কিছু নিজে করার চেষ্টা করতেন। নিজেই সবকিছু ঘুছিয়ে রাখতেন। সেই ঘুছানো কাজ মৃত্যুর আগ পর্যন্ত করা সম্ভব হয়েছিল। তিনি আশা করতেন কাউকে কষ্ট না দিয়ে হুট করে চলে যাওয়া ভাল। তিনি তাঁর আশা মত দুুনিয়া থেকে বিদায় নিতে পেরেছেন। এমন প্রৌঢ়ত্ব নিয়ে তো গর্ব করা যায়। এই চমৎকার বুড়োর বয়স (৮০) তাঁর মনের তারুন্য ও উদ্দীপনাকে হরণ করতে পারেনি।
তিনি সামাজিক সম্পদ হয়ে উঠেছিলেন। কারণ সেইতো সম্পদ যাকে আত্তিকরণ করা যায়, নিজেদের করা যায়। নিজেদের মধ্যে ধারণ করা যায়। আমরা তাঁকে আপন করে নিতে পেরে ছিলাম।
তিনি ধার্মিক ছিলেন, পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়তেন, নিয়মিত রোজাও রেখেছেন। কিন্তু কখনও ধর্মান্ধ ও উগ্রমৌলবাদীদের পছন্দ করতেন না। আশ্রয় প্রশ্রয় দিতেন না। মাস্টার মোহাম্মদ নূর বুঝতেন, শিক্ষাই পারে জৈবিক ব্যক্তিকে নৈতিক ব্যক্তিতে রূপান্তর করতে। শিক্ষাই মানুষের চেতনায় সত্যনিষ্ঠা, সৌন্দর্যবোধ ও মানবিক কল্যানবোধ জাগিয়ে তোলে। এই সব জাগানোর ও ধারণ করার মধ্য দিয়ে মানুষ পরিপূর্ণতার পথে এগিয়ে চলে। পড়ুয়ারা, এলাকাবাসীরা যাতে সেই মানবিক হওয়ার পথে হাটে সেই জন্যই এত ছুটাছুটি, এই স্নের্হাদ্র ও হৃদয়বান মানুষটি।
এই সামান্য নিবন্ধন লিখার সময় মনে হচ্ছে তিনি এখনও হেঁটে চলেছেন, ছুটে চলেছেন পাড়া গায়েঁর ভিতর দিয়ে। হয়তো কোন পড়ুয়াকে বই দিয়ে আসতে, নতুবা অসহায় বুড়ি বিধবার ঘরভিটার সীমানার খুঁটি বসিয়ে দিতে। অথবা হতদরিদ্র মানুষটির মেয়ের বিয়ের অর্থ সংগ্রহে। আমরা মুগ্ধ হয়ে তাঁর দিকে চেয়ে আছি। আর তিনি বলছেন- ‘আমি আছি, আমি থাকব, তোমাদের মাঝে’।
নগর সভ্যতার এই সময়ে মাষ্টার মোহাম্মদ নুর এর মত একজন আর্দশবান শিক্ষক প্রত্যন্ত গ্রাম অঞ্চলে নিস্বার্থে কাজ করে যাওয়ার বিষয়টি আমাদের শিক্ষক সমাজকে আরোও দায়িত্বশীল হতে পথ দেখায়ে যাবে বাতিঘরের মত।