মাস্টার্স শেষ করেই ব্যাংকের বড় কর্মকর্তা হবেন জাহিদ

ওয়াসিম আহমেদ

50

সময়টা ২৯ জানুয়ারি বিকাল বেলা। পশ্চিম আকাশের সোনালি সূর্যটা স্কুলের মাঠজুড়ে স্বর্ণালি আভাস ছড়াচ্ছে। মাঠের একপাশে মঞ্চে বসে আছেন অতিথিরা। বগ্মার-বাগ্মীতা ছড়িয়ে পড়েছে নিশ্চুপ শুভ্রপরীদের মাঝে। সবকিছুৃ থেকে একটু দূরে মাঠের একপাশে হুইল চেয়ারে বসে আছে জাহিদ। তাদের আজ বিদায় অনুষ্ঠান। সবাই এবারের এসএসসি পরীক্ষার্থী। জাহিদও। সবার সাথে জাহিদের একটায় পার্থক্য। ১১বছর বয়স থেকে জাহিদের দু’পা অবস। সে হাটতে পারে না, চলতে পারে না। তবে থেমে থাকেনি। এভাবে হুইল চেয়ার আর মা উপর ভর করে সে এবারে এসএসসি পরীক্ষা দিচ্ছে। তেমনভাবে পাশ করে এসেছে জেএসসি ও পিএসসি পরীক্ষা। এবারের পরীক্ষায় ভালো রেজাল্ট করে মাস্টার্স পাশ করার স্বপ্ন তার। এরপর ব্যাংকের বড় কর্মকর্তা হয়ে পঙ্গুদের জন্য কাজ করে নিজের জীবনকে ধন্য করতে চাই সে।
পুরো নাম জাহিদ উদ্দিন। তার বাড়ি পটিয়ার বড়লিয়া ইউনিয়নের মেলঘর গ্রামে। সিএনজি চালক কামাল উদ্দিন তালুকদার ও রাজ বেগমের সংসারের বড় ছেলে সে। তাদের আরেকটি সন্তান ছোট মেয়েটি তৃতীয় শ্রেণিতে পড়ে। অভাবেব সংসারের একমাত্র ছেলের এমন পরিণতিতে চারপাশ অন্ধকার হয়ে আছে রাজ বেগমের। তারপর জাহিদের মনোবল আর নিজের প্রতি অটুট বিশ্বাস থেকে রাজ বেগম প্রতিদিন হুইল চেয়ারে করে ছেলেকে স্কুলে নিয়ে আসেন। এভাবে একদিন বা দুদিন নয়, টানা পাঁচবছর। হয়তো এভাবে চলবে আরো অনেকদিন। তারপরও থামবার নয় রাজ বেগম ও জাহিদ উদ্দিনের।
জাহিদ মেলঘর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে প্রাথমিক স্কুল সার্টিফিকেট পরীক্ষায় ৩.৭৫ পেয়েছিলো। পঙ্গু অবস্থায় জেএসসি পরীক্ষায় পেয়েছিলো ৩.৫৫। জন্মের পর সেও প্রাণভরে হেঁটেছিলো, খেলোছিলো। যখন ১১বছর বয়স, সে তখন ক্লাস সিক্সে। হঠাৎ এক অদ্ভুত রোগ বাসা বাঁধে জাহীদের শরীরে। তার দু’পা সম্পূর্ণরূপে অবস হয়ে যায়। তার হাটা আর মাঠ জুড়ে দূরন্তপনা সব সাবেক হয়ে যায়। রাজ বেগম তখন ডাক্তার দেখিয়েছিলেন। নিজের সর্বস্ব দিয়ে সবধরনের চেষ্ঠা করার পরও জাহিদ হাটতে পারে না। নিজের সামর্থ্য আর সীমাবদ্ধতার কাছে মেনেই নিলেন ছেলের পঙ্গুত্ব। একটা ভালো হুইল চেয়ারেরও ব্যবস্থা করতে পারেনি রাজ বেগম।
পটিয়ার জঙ্গলখাইন স্কুলের এসএসসি পরীক্ষার্থীদের বিদায় অনুষ্ঠানে গিয়ে দেখা হয় জাহিদের সাথে। পঙ্গু হওয়ার পর থেকে সে সারাবছর ক্লাস করে না। পরীক্ষার আগে করে ক্লাস করে সে। সারাবছর বাসায় নিজে নিজে পড়ে এখনো কোনো পরীক্ষায় ফেল করেনি। আবার কখনো প্রাইভেট বা কোচিংয়ের সাহায্যও নেননি। এভাবে একা একা চলতে চায় সে। কারণ তার বাস্তব অভিজ্ঞতা বড় করুণ। তার ভাষায়, সবচেয়ে বেশি কষ্ঠ লাগে তখন। যখন আমাকে নিয়ে আমার মাকে কটু কথা শোনতে হয়। যখন কোনো কিছু নিয়ে গ্রামের বাড়িতে ঝগড়া হয় তখন তার মায়ের একমাত্র দুর্বলতা হলাম আমি। তার সবধরনের প্রাকৃতিক কাজ ও চলাফেরার একমাত্র সঙ্গী তার মা। তার কি রোগ জানতে চাইলে সে বলে , আমার রোগের লক্ষণ বিজ্ঞান বইয়ের মাসকুলার ডিসট্রপির সাথে হুবহু মিলে যায়।
জাহিদের জীবনের ইচ্ছার কথা জানতে চাইলে চোখগুলো পানিতে চলচল করছিলো। চোখে হাত দিয়ে বিড়বিড় করে বলছিলো, আমার খুব হাটতে ইচ্ছে করে। ইচ্ছে করে সবার সাথে খেলাধুলা করতে। পড়ালেখা কতটুকু করতে চাই জানতে চাইলে আত্মবিশ্বাসী কন্ঠে দৃঢ়ভাবে বলছিলো সে, আমি মাস্টার্স পর্যন্ত পড়বো। তারপর সরকারি ব্যাংকে বড় কর্মকর্তা হবো। আমার মায়ের দুঃখ লাঘব করবো। আর আমার মতো পঙ্গুদের জন্য কিছু করবো। তারপরই আমার জীবন ধন্য হবে।
তার পাশেই দাঁড়ানো জাহিদের মায়ের সাথে কথা হয়। তিনিও বলেন তার প্রতিদিনের সংগ্রামের কথা। তার এই ছেলের জন্য সরকারিভাবে কোনো ধরনের সহায়তা তিনি পাননি। নিজে নিজে অভাবের সংসারের সাথে জাহিদের স্বপ্ন পূরণের গল্প রচনা করে যাচ্ছেন। কেউ সাহায্য করুক বা না করুন তিনি তার একমাত্র ছেলে জাহিদের স্বপ্ন পূরণের স্বপ্নের কথায় বলে জান।