মালয়েশিয়া যেতে ক্যাম্প থেকে পালাচ্ছে রোহিঙ্গারা

পেকুয়া ও টেকনাফে একদিনেই উদ্ধার ৮৪ জন ৫ পাচারকারী গ্রেপ্তার

কক্সবাজার ও পেকুয়া প্রতিনিধি

19

কক্সবাজারে আবারও তৎপর হয়ে উঠেছেন মানব পাচারকারীরা। সাগরপথে মানবপাচারে তাদের প্রধান টার্গেট রোহিঙ্গারা। পাচারকারীদের দেখানো প্রলোভনে পড়ে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে মালয়েশিয়া যেতে উখিয়া-টেকনাফের ক্যা¤প ছাড়ছেন রোহিঙ্গারা। উখিয়া-টেকনাফের প্রায় ৩১টি ক্যাম্পের কোন না কোন ক্যা¤প থেকে প্রতিদিন রোহিঙ্গারা পালাচ্ছেন। ক্যাম্প থেকে বেরিয়ে আসা রোহিঙ্গাদের বিভিন্ন বাসা-বাড়ি ও আবাসিক হোটেলে রেখে সুযোগ ও সুবিধা মতো সময়ে নৌকায় তুলে দিচ্ছেন পাচারকারীরা।
আবার এক স্থান থেকে নৌকায় তুলে অন্য স্থানে রোহিঙ্গাদের নামিয়ে দিয়ে পাচারকারীরা সটকে পড়ছেন- এমন ঘটনাও ঘটছে। গত এক সপ্তাহে জেলার বিভিন্ন স্থান থেকে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী মালয়েশিয়াগামী দুই শতাধিক রোহিঙ্গাকে আটক করেছে বলে জানা গেছে।
গত শুক্রবার রাত ২ টায় সাগরপথে পাচারকালে পেকুয়ায় ৬৭ জন রোহিঙ্গাকে আটক করেছে পুলিশ। এদের মধ্যে ৩১ জন মহিলা, ১৫ জন শিশু ও ২১ জন পুরুষের অধিকাংশই তরুণ বয়সের। পাচারকারীদলের কোন সদস্য ও রোহিঙ্গাদের বহনকারী ফিশিং বোটটি আটক করতে পারেনি পুলিশ। পেকুয়ার উজানটিয়া ইউনিয়নের করিমদাদ মিয়ার ঘাট এলাকায় এ ঘটনা ঘটে।
স্থানীয় সাবেক ইউপি সদস্য এহছানুল হক চৌধুরী জানান, রাতে অর্ধশতাধিক লোকের অবস্থান দেখতে পাই। ওই লোকদের মালয়েশিয়া পাচারের বিষয়টি নিশ্চত হয়ে পুলিশকে খবর দিই। পরে পুলিশ ঘটনাস্থলে অভিযান পরিচালনা করে তাদের আটক করে।
পুলিশ জানায়, দুর্গম এলাকা হওয়ায় পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছার আগেই পাচারকারী দলের সদস্যরা বোট নিয়ে পালিয়ে যান। তবে পাচারকারী দলের সদস্যদের বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য মিলেছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।
এদিকে প্রত্যক্ষদর্শী সূত্র জানায়, টেকনাফের একটি পাচারকারী দল ও পেকুয়ার অপর একটি পাচারকারী দলের যোগাযোগের মাধ্যমে রাতের আঁধারে রোহিঙ্গাদের নিয়ে একটি ফিশিং বোট পশ্চিম উজানটিয়া করিমদাদ মিয়ার ঘাট এলাকায় নোঙর করে। এরপর রোহিঙ্গাদের নামিয়ে দেওয়ার সময় স্থানীয় লোকজন টের পেয়ে পুলিশে খবর দেন। পরে পেকুয়া থানার ওসি মো. জাকির হোসেন ভুঁইয়ার নেতৃত্বে পুলিশ অভিযান চালিয়ে রোহিঙ্গাদের আটক করে থানায় নিয়ে আসে।
এছাড়া সেন্টমার্টিনের দক্ষিণ বিচ এলাকায় শুক্রবার মধ্যরাতে অভিযান চালিয়ে পাঁচ মানব পাচারকারীকে আটক এবং ১৭ জন রোহিঙ্গা সদস্যকে উদ্ধার করা হয়। তাদের মধ্যে শিশুসহ ১০ জন পুরুষ ও সাতজন নারী বলে জানা গেছে।
কোস্ট গার্ডের টেকনাফ স্টেশনের কমান্ডার লেফটেন্যান্ট কমান্ডার এম ফয়জুল ইসলাম মন্ডল বলেন, একটি মানবপাচারকারী চক্র অবৈধভাবে মালয়েশিয়ায় কিছু লোক পাচার করছে, এমন গোপন সংবাদের ভিত্তিতে সেন্টমার্টিনের দক্ষিণ বিচ এলাকায় অভিযান চালিয়ে পাঁচ মানব পাচারকারীকে আটক এবং ১৭ জন রোহিঙ্গা সদস্যকে উদ্ধার করা হয়।
টেকনাফ থানার ওসি প্রদীপ কুমার দাস বলেন, পাচারকারীদের বিরুদ্ধে মামলা হবে। রোহিঙ্গা সদস্যদেরকে আদালতে উপস্থিত করে তাদের নিজ নিজ ক্যাম্পে পাঠানোর ব্যবস্থা করা হবে।
গত বৃহ¯পতিবার কক্সবাজার শহরের আবাসিক এক হোটেল থেকে মালয়েশিয়াগামী ১২ জন রোহিঙ্গাকে উদ্ধার ও ২ দালালকে আটক করে র‌্যাব। সাগরপথে মালয়েশিয়া পাচারের জন্য এসব রোহিঙ্গাদের হোটেলে জড়ো করা হয়। এদিন সকাল ১০ টার দিকে কক্সবাজার শহরের বাজারঘাটায় হোটেল রাজমনিতে অভিযান চালিয়ে এসব রোহিঙ্গাকে উদ্ধার করা হয়। এছাড়া আটক দালালরা হল চট্টগ্রামের লোহাগড়া উপজেলার চুনতির নুরুল ইসলাম (২২) ও মিয়ানমারের রোহিঙ্গা নাগরিক মোহাম্মদ জাহিদ (২৭)। উদ্ধার রোহিঙ্গাদের মধ্যে ৪ জন নারী ও ৮ জন পুরুষ রয়েছে।
এর আগে গত মঙ্গলবার রাত ১১টার দিকে স্থানীয় গ্রামবাসীর খবরের ভিত্তিতে উখিয়া থানা পুলিশ জালিয়াপালং ইউনিয়নের মানব পাচারের টার্নিং পয়েন্ট ও লম্বরী পাড়াস্থ মানব পাচারকারী চক্রের গডফাদার তাবাইয়ার বাড়িতে অভিযান চালিয়ে ২৪জন রোহিঙ্গা নারী, পুরুষ, শিশুকে উদ্ধার করেছে।
পরদিন বুধবার সকালে উখিয়া থানায় গিয়ে দেখা যায়, উদ্ধার করা রোহিঙ্গা নারী-পুরুষ গেস্ট রুমে বসে আছেন। তাদের আত্মীয় পরিচয়দানকারী কুতুপালং ক্যা¤েপ এক রোহিঙ্গা যুবক মিজানুর রহমান (২৫) জানান, ৫ দিন আগে টেকনাফের হ্নীলা জাদিমোরা ঘাট দিয়ে এপারে এসেছে। তাদের বাড়ি মিয়ানমারের বুচিডং পুইমালি গ্রামে। ১০ মে রাতে হ্নীলা জাদিমোরা ঘাট দিয়ে এপারে আসলে তাবাইয়া নামের এক ব্যক্তি তাদের মালয়েশিয়া পাঠানোর কথা বলে লম্বরীপাড়াস্থ তার বাড়িতে ৫দিন রাখে।
একই রাতে কক্সবাজার শহরতলি থেকে সাগরপথে মালয়েশিয়া পাচারকালে নারী ও শিশুসহ ২৮ রোহিঙ্গাকে আটক করে পুলিশ। রাত সাড়ে ১০টার দিকে শুকনাছড়ি ও দরিয়ানগর সমুদ্রঘাট থেকে ওই রোহিঙ্গাদের আটক করা হয়। আটককৃতদের মধ্যে ১৩ নারী, ছয় শিশু ও নয়জন পুরুষ রয়েছে।
এলাকাবাসী জানান, রাতে মালয়েশিয়ায় মানব পাচারকারী একটি চক্র দরিয়ানগর ও শুকনাছড়ি ঘাটে অর্ধশতাধিক নারী-পুরুষ ও শিশুকে জড়ো করে। বিষয়টি টের পেয়ে এলাকার শতাধিক মানুষ রাত সাড়ে ৯টার দিকে জড়ো হয়ে পাচারকারীদের একটি বাড়ি ঘেরাও করে মোট ২৮ জনকে আটকে রাখেন। পরে খবর দেওয়া হলে রাত সাড়ে ১০টার দিকে সদর থানা পুলিশের একটি দল ঘটনাস্থলে গিয়ে ওই ২৮ জনকে আটক করে থানায় নিয়ে যায়।
স্থানীয় কয়েকজন যুবক জানান, মালয়েশিয়ায় আদম পাচারকারী একটি চক্রের সদস্যরা দরিয়ানগর ও শুকনাছড়ি ঘাটকে আবারও রুট হিসেবে ব্যবহার শুরু করছে, এমন খবর পেয়ে রাতে এলাকাবাসী একত্র হয়ে একটি বাড়িতে ২৪ জন ও সমুদ্রসৈকত থেকে আরও চারজনকে ধরে এনে আটকে রাখেন। এ সময় মালয়েশিয়ায় অভিবাসনপ্রত্যাশী আরও কিছু লোক ও কয়েকজন দালাল সটকে পড়েন।
গত বুধবার ভোররাতে কক্সবাজারের টেকনাফের নোয়াখালী পাড়া থেকে নারীসহ ৩১ মালয়েশিয়াগামী রোহিঙ্গাকে আটক করে পুলিশ। তারা সবাই সাগরপথে মালয়েশিয়া যাচ্ছিলেন। টেকনাফ মডেল থানার ওসি (তদন্ত) এবিএমএস দোহা জানান, টেকনাফের নোয়াখালী পাড়া এলাকা দিয়ে সমুদ্রপথে একদল রোহিঙ্গা মালয়েশিয়া যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন- এমন খবরে পুলিশ অভিযান চালিয়ে ৩১ রোহিঙ্গাকে আটক করে। তারা সবাই বিভিন্ন রোহিঙ্গা শিবির থেকে ওই স্থানে জড়ো হয়।
গত সোমবার ১৩ মে ভোর রাত ৩টা দিকে ইনানী পুলিশ চরপাড়া ব্রিজের নিচে নৌকায় উঠতে অপেক্ষমান ১৭ জন নারী, ৪ জন শিশু ও ২ জন রোহিঙ্গা নাগরিককে আটক করেছে। আটককৃতদের মধ্যে বালুখালী ১নং ক্যা¤প ১৬ নং বøকের বাসিন্দা সাবেকুন নাহার (১৬) বলেন, তারা মালেশিয়া যাওয়ার জন্য দালালের সহযোগিতায় এখান পর্যন্ত এসেছেন। তবে ঐ রোহিঙ্গা মহিলা দালালের নাম বলতে পারেননি। বালুখালী জামতলী বøক-১ এর বাসিন্দা হামিদুর রহমান (২০) জানায়, তাদের আত্মীয়-স্বজন মালেশিয়ার রয়েছে দীর্ঘ দিন রয়েছে। তাদের পরামর্শ অনুযায়ী মালেশিয়া পারি জমাতে দালালের কথামত চড়পাড়া ব্রিজ এলাকায় অপেক্ষা করছিলেন।
টেকনাফ ও মহেশখালী থেকে নৌপথে মালয়েশিয়া যাবার জন্য জড়ো হওয়া ২০ রোহিঙ্গা নারী-পুরুষকে রবিবার রাতে আটক করে পুলিশ। তাদের মধ্যে ১১ নারী, সাত পুরুষ ও দুই শিশু রয়েছে।
কক্সবাজারের পুলিশ সুপার এবিএম মাসুদ হোসেন বলেন, মানব পাচারকারীদের ব্যাপারে সতর্ক দৃষ্টি রয়েছে। তাদের প্রতিহত করতে কাজ করছে সব থানার পুলিশ। স্থানীয় জনগণকেও এতে সামিল হতে অনুরোধ জানান তিনি।
কক্সবাজার শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার মো. আবুল কালাম বলেন, তালিকাভুক্ত প্রতিটা রোহিঙ্গা পরিবারে পর্যাপ্ত পরিমাণে জীবনধারণের পণ্য সরবরাহ করা হচ্ছে। এমনও দেখা গেছে, রোহিঙ্গাদের দেয়া অনেক পণ্য তারা বাজারে বিক্রি করে দিচ্ছে। ফলে তাদের প্রয়োজন অনুপাতে ভোগ্যপণ্য না পাওয়ার অভিযোগ সত্য নয়। আগে যেসব রোহিঙ্গা বাংলাদেশি সেজে প্রবাসে গেছেন, তাদের মতো সুযোগ পাওয়া নিয়ে দালালদের আশ্বস্ত করার পর হয়তো তারা ক্যা¤প ছাড়ছেন।