মারাত্মক স্বাস্থ্য ঝুঁকি নিয়ে খেলাধূলায় চট্টগ্রামের শিশুরা

সালাহ উদ্দিন শাহরিয়ার

7

স্বাস্থ্য সকল সুখের মূল। স্বাস্থ্যকে ভালো রাখার জন্য খেলাধূলার গুরুত্ব অপরিসীম, অপরিহার্য-বইয়ে রচনা থেকে শুরু করে মিডিয়া, সভা-সমিতি, সর্বস্তরে আমরা এই বুলি আওড়াচ্ছি। এমনিতেই বর্তমানে চট্টগ্রামের স্বনামধন্য স্কুলগুলো ছাড়া অনেক স্কুলের কোন মাঠ নেই। এমনকি নামী-দামী স্কুলগুলোর শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত ক্লাসরুম এবং ছাত্রদের পরিবহন এর জন্য গাড়ীও রয়েছে। হাজার হাজার টাকা টিউশন ফি নিচ্ছে কিন্তু খেলার জন্য কোন মাঠ নেই। অনেকে বিভিন্ন বিদ্যালয়ের মাঠ ভাড়া নিয়ে তারা তাদের বার্ষিক ক্রীড়ার আয়োজন করে। কিন্তু চট্টগ্রামে যে সমস্ত স্কুলের বা প্রতিষ্ঠানের মাঠ রয়েছে সেগুলো কি আসলে খেলার উপযোগী মাঠ? খেলার মাঠ থাকতে হবে ঝুঁকিমুক্ত ও স্বাস্থ্য সম্মত। কিন্তু চট্টগ্রামের যে সমস্ত মাঠগুলোতে ছেলে-মেয়েরা খেলাধূলা করছে, প্রশিক্ষণ নিচ্ছে তার অধিকাংশই খেলার উপযোগী নয়।
চট্টগ্রামের বর্তমানে যে খেলার এবং প্রশিক্ষনের মাঠগুলো রয়েছে তা দেখলে মনে হয় সমূদ্রতটের বালুকাময় বেলাভূমি, অথবা বীচ ভলিবল মাঠ। আর সেখানে দূর্ঘটনা এবং স্বাস্থ্য ঝুঁকি নিয়ে খেলাধুলা করছে শত শত শিশু আর খেলোয়াড়রা প্রশিক্ষন নিচ্ছে বিভিন্ন একাডেমীর মাধ্যমে। আমার শৈশবকালে দেখেছি অনিন্দ্য সুন্দর সবুজের গালিচা বিছানো চট্টগ্রামের মাঠগুলো। যার কয়েকটি হলো-রেলওয়ে ষ্টেডিয়াম (পলোগ্রাউন্ড মাঠ), জাম্বুরী মাঠ, চট্টগ্রাম আউটার ষ্টেডিয়াম, ষ্টেডিয়ামের সম্মুখের মাঠ, প্যারেড গ্রাউন্ড, কলেজিয়েট স্কুল মাঠ, নাসিরাবাদ স্কুল মাঠ। কিন্তু আজ যদি আমার ছেলে মেয়েদের ঐসব সময়ের এমন সুন্দর মাঠের কথা বলি, তারা নিশ্চয় বলবে-বাবা, এগুলো কি রূপকথা।
কিন্তু কিভাবে নষ্ট হলো এমন সুন্দর মাঠগুলো? যতদুর মনে হয়, যারা এই মাঠগুলো পরিচালনা এবং নিয়ন্ত্রণ করেন তারা স্বাস্থ্য সম্মত খেলার মাঠ রাখার চেয়ে বেশী চিন্তা করেন বানিজ্যিক বিষয়গুলো- কারণ এই মাঠগুলো নষ্ট হওয়ার পিছনে অন্যতম কারন হচ্ছে বিভিন্ন সময়ে বানিজ্যিক উদ্দেশ্যে মেলা, ষ্টল,কনসার্ট এর জন্য ভাড়া দেওয়া।
মেলার ষ্টল, কনসাটের্র ষ্টেজ এর জন্য বারংবার ঘাসের উপর বিছাতে হয়েছে ইট, বালুর আস্তরন, বারংবার করা হয়েছে গর্ত। হয়তো মাঠ ভাড়া দিয়ে কিছু আর্থিক লাভবান হচ্ছে প্রতিষ্ঠানগুলো, কিন্তু তাতে নষ্ট হচ্ছে মাঠগুলো। ফলে ভালোভাবে প্রশিক্ষণ বা খেলাধুলা করতে পারছে না ছেলে-মেয়েরা। দূর্ঘটনা এবং স্বাস্থ্য ঝুঁকি থাকায় খেলোয়াড়রা বা ছাত্ররা তাদের চুড়ান্ত মনোনিবেশ করতে পারেনা, প্রশিক্ষণে তাহলে কিভাবে তৈরী হবে একজন ভালো মানের খেলোয়াড়?
এই ধূলিময় মাঠে খেলাধুলা করলে শিশুদের কি কি সমস্যা হতে পারে, এমন প্রশ্নে একজন চিকিৎসক জানান-এর ফলে ঐ শিশু শ্বাস কষ্ট জনিত বিভিন্ন রোগে ভুগতে পারে, ময়লা ধূলিময় পরিবেশ এবং অপরিস্কার স্থানে কেউ খাদ্য গ্রহণ করলে তার ফলে সে পেটের বিভিন্ন পিড়ায় আক্রান্ত হতে পারে, প্রতিনিয়ত এমন স্থানে খেলাধূলা করার ফলে সে দীর্ঘমেয়াদী বিভিন্ন এলার্জি জনিত রোগেও ভুগতে পারে।
তবে তার মানে এই নয়-“মাথা ব্যথার জন্য আমি মাথা কেটে ফেলে দিবো-স্বাস্থ্য সম্মত মাঠের অভাবে খেলাধূলা বন্ধ করে দিবো।” তবে তার প্রতিকার এবং এই সমস্যা থেকে উত্তরনের জন্য সংশ্লিষ্ট সকলকে সচেতন এবং ব্যবস্থা গ্রহণে উদ্যোগী হতে হবে- নেতিবাচক বানিজ্যিক মনোভাব থেকে বেরিয়ে এসে স্বাস্থ্য সম্মত খেলার উপযোগী মাঠ তৈরী করার জন্য ইতিবাচক মনোভাব গ্রহন করতে হবে।
স্বাস্থ্যকর ও পরিবেশ সম্মত খেলার মাঠ তৈরীতে আমাদের করনীয় ও প্রস্তাবনা ঃ
১. কোন অবস্থাতেই বিদ্যালয় এবং খেলার মাঠসমূহ মেলা অথবা মাঠের ক্ষতিকারক এমন অনুষ্ঠানের জন্য ভাড়া না দেওয়া।
২. খেলার উপযোগী করার জন্য মাঠকে পরিচর্যা করা। প্রয়োজনে সরকারের কৃষি বিভাগের সহায়তায় মাঠ উপযোগী ঘাস রোপন করা।
৩. প্রত্যেক বছর মাঠ পরিচর্যা সংশ্লিষ্ট বিদ্যালয় বা প্রতিষ্ঠানের আলাদা অর্থ বরাদ্দ রাখা। উক্ত খাতে অর্থ রাখা বা তৈরী করার ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়, জেলা প্রশাসক, মেয়র, সংসদ সদস্যসহ সকলের সহযোগিতা কামনা করা।
৪. প্রয়োজনীয় সরকারী অর্থ বরাদ্দ না পেলে ক্রীড়ানুরাগী ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের নিকট সহযোগিতা কামনা করা। প্রয়োজনে তার জন্য তাদের বিজ্ঞাপন প্রচার করা।
৫. যে সমস্ত একাডেমী বা প্রশিক্ষন কেন্দ্র উক্ত মাঠ ব্যবহার করছে, মাঠ পরিচর্যার জন্য তাদের নিকট থেকে বাৎসরিক একটি ফি আদায় করা এবং মাঠকে সুন্দর রাখার জন্য তাদেরকে নীতিমালার আওতায় আনা।
৬. খেলার মাঠ সুন্দর রাখার জন্য বিদ্যালয়গুলো ছাত্রদের নিকট থেকে বাৎসরিক যে ক্রীড়া উন্নয়ন ফি আদায় করে তা মাঠ পরিচর্যার খাতে ব্যয় নিশ্চিত করা।
৭. মাঠগুলো খেলার উপযোগী আছে কিনা, মাঠ পরিচর্যার কাজ ঠিকমত চলছে কি না তা যাচাই করার জন্য সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন বিভাগের ব্যক্তিবর্গের মাধ্যমে একটি পরিদর্শক টিম গঠন করা।
৮. ছাত্র-ছাত্রী বা খেলোয়াড়দের মাধ্যমে বৎসরে অন্তত একবার স্বেচ্ছাশ্রমে মাঠ উন্নয়নের কাজ করা।
-লেখক : ডেপুটি রেজিস্টার, বিজিসি ট্রাস্ট ইউনিভার্সিটি