ক্যাবের বিবৃতি

মানহীন পণ্য নিয়ে ‘ম্যানেজড’ হয়েছে বিএসটিআই

11

‘পুনঃনিরীক্ষার নামে মানহীন নিষিদ্ধ ঘোষিত ৫২টি পণ্যকে পুনরায় মান উত্তীর্ণ বলে বৈধতা দেয়ার ঘটনাকে অনভিপ্রেত, অনাকাক্সিক্ষত ও বিএসটিআই এর মান পরীক্ষণ সম্পর্কে জনমনে সন্দেহ সৃষ্টির পাশাপাশি বিএসটিআইকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। পুনঃপরীক্ষণ হতে হলে তৃতীয় পক্ষের পরীক্ষাগারে হওয়া উচিত এবং সেখানে বিএসটিআই ও সংশ্লিষ্ট উৎপাদক প্রতিষ্ঠান ছাড়াও ভোক্তা প্রতিনিধি হিসাবে ক্যাব ও গণমাধ্যমের প্রতিনিধিদের উপস্থিতি দরকার ছিলো। অবিলম্বে মহামান্য হাইকোর্টের নির্দেশনা অনুসারে বাজার থেকে সব মানহীন ক্ষতিকর ও নিষিদ্ধঘোষিত পণ্য তুলে নেয়ার দাবি জানাচ্ছে ক্যাব।’
দেশের ক্রেতা-ভোক্তাদের স্বার্থ সংরক্ষণকারী জাতীয় প্রতিষ্ঠান কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব) চট্টগ্রাম বিভাগ ও মহানগর কমিটি এক বিবৃতিতে এই দাবি জানায়।
বিবৃতিতে বলা হয়, ‘বিএসটিআই কর্তৃক মানহীন ও ক্ষতিকর হিসেবে চিহ্নিত এবং আদালত কর্তৃক নিষিদ্ধঘোষিত ৫২টি পণ্যের উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলো হাইকোর্টে আইনি লড়াইয়ে হেরে গিয়ে বিএসটিআইকে ম্যানেজ করে পুনঃনিরীক্ষণের আবেদন করে। তার প্রেক্ষিতে নিষিদ্ধ ঘোষণার ১৭ দিনের মাথায় পবিত্র ঈদ উল ফিতরকে সামনে রেখে ওয়েলফুড ও মধুবনের লাচ্ছা সেমাই, এসিআইয়ের লবণ, নিউজিল্যান্ড ডেইরির ডুডলস নুডলসসহ বেশ কিছু পণ্যকে বিএসটিআই পুনঃনিরীক্ষণের নামে মান উত্তীর্ণ হিসেবে ঘোষণা করে কার্যত ভোক্তা অধিকারকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়েছে।’
বিবৃতিতে ক্যাব নেতৃবৃন্দ অভিযোগ করেন, উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলো হাইকোর্টে আইনী লড়াইয়ে কোনো সুরাহা না পেয়ে চিরাচরিত প্রথায় বিএসটিআইয়ের কতিপয় কর্তাদের ম্যানেজ করার প্রক্রিয়া অনুসরণ করে জাতিকে লজ্জিত করেছেন। কারণ বিএসটিআই এর মান সনদ প্রদানে অনিয়ম ও দুর্নীতি ও অব্যবস্থাপনা নিয়ে উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর সীমাহীন ভোগান্তি নিয়ে প্রতিনিয়তই সংবাদমাধ্যমগুলো সোচ্চার। কিন্তু দুর্নীতি ও অনিয়মে অকুন্ঠ নিমজ্জিত এ প্রতিষ্ঠানকে সেখান থেকে বের করা যাচ্ছে না। সেকারণে একই পণ্য একবার নিরীক্ষণে মানহীন প্রমাণিত হয়, আবার পুনঃনিরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়- বিষয়টি উক্ত প্রতিষ্ঠানের নিজের মান সম্পর্কেই সাধারণ জনগণের কাছে নেতিবাচক ধারণার জন্ম দিয়েছে।
অন্যদিকে মান পুনঃপরীক্ষায় নিয়োজিত পরিচালক (মান) ইঞ্জিনিয়ার ইসহাক আলীর সুদীর্ঘ ১২ বছর বিএসটিআই চট্টগ্রাম আঞ্চলিক কার্যালয়ে দায়িত্বপালনকালীন সময়ে খাদ্য ও ভোগ্য পণ্যের মান নিশ্চিতকরণে মান সনদ প্রদানে অনিয়ম, দুর্নীতি ও অব্যবস্থাপনা তদন্তে গঠিত শিল্প মন্ত্রণালয়ের উপ-সচিব মোহাম্মদ মশিউর রহমানের নেতৃত্বে গঠিত তদন্ত টিমকে ২০১৭ সালের ১৮ মে চট্টগ্রাম কার্যালয়ে সাক্ষ্য প্রমাণ উপস্থাপিত হয়েছিল। বিষয়টি দুর্নীতি দমন কমিশন থেকেও তদন্ত করা হয়। তদন্তে অনিয়মের তথ্য প্রমাণিত হলেও অদৃশ্য কারণে শাস্তির বদলে পদোন্নতি পেয়ে পরিচালক পদে বিএসটিআই কেন্দ্রিয় কার্যালয়ে বদলী হন ইসহাক আলী। একজন চিহ্নিত দুর্নীতি ও অনিয়মে অভিযুক্ত ব্যক্তির কাছ থেকে ভোক্তার অধিকার নিশ্চিত করার অঙ্গিকার বাস্তবায়নের আশা করা যায় না।
বিবৃতিতে ক্যাব নেতৃবৃন্দ আরও বলেন, বিএসটিআই’র চট্টগ্রাম কার্যালয়ের সাবেক উপ-পরিচালক ইঞ্জিনিয়ার ইসহাক আলীর নেতৃত্বে বিগত ১২ বছরে চট্টগ্রাম কার্যালয় দুর্নীতি ও অনিয়মের আখড়ায় পরিণত হয়েছে। বিশেষ করে লাইসেন্স প্রাপ্তিতে বিপুল অনিয়ম, টাকা ছাড়া কোনো পণ্যের মান যাচাই সনদ না পাওয়া, ১০-১৫ হাজার টাকা ছাড়া লাইসেন্সের জন্য আবেদন না করতে পারা, লাইসেন্স প্রদানে গড়িমসি, অবৈধ কোম্পানীগুলোর সাথে মাসিক চুক্তিতে ব্যবসা করা নিয়মে পরিণত হয়েছে। প্রতিদিন ফেনী, কক্সবাজার, রাঙামাটি, খাগড়াছড়িসহ বিভিন্ন জেলা থেকে বিএসটিআই চট্টগ্রাম অফিসে উৎপাদনকারীরা দই, মিস্টি, পাউরুটি, সরিষার তেল নিয়ে আসেন। আর বিএসটিআই চট্টগ্রাম অফিসে বসে তা সিলগালা করে লেভেল লাগিয়ে ল্যাবে পাঠানো এবং এ সমস্ত কোম্পানীগুলোর সাথে মাসিক চুক্তি ভিত্তিতে সেই পণ্যগুলোকে মানসম্পন্ন হিসেবে চালিয়ে দেয়ার ব্যবসা করা হচ্ছে। ৮ হাজার টাকায় সরিষার তেল, ২০ হাজার টাকার বিনিময়ে বিস্কুট, পাউরুটি, কেক, দইকে মানসম্পন্ন পণ্যের সনদ দিয়ে ভোক্তাদের জীবনহানীকর কাজে যুক্ত হচ্ছে বিএসটিআই’র কতিপয় চিহ্নিত কর্তারা। এছাড়াও কোনো কারণে নমুনা পরীক্ষায় অকৃতার্য হলে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানকে জানানো হয় না। লাইসেন্স প্রদানের ক্ষেত্রে অনেকগুলো শর্ত যোগ করে মানহীন পণ্য উৎপাদনকারী কোম্পানীগুলোকে নিরাপদে ব্যবসা করার জন্য সুযোগ করে দেয়া হচ্ছে মোটা অংকের অর্থের বিনিময়ে। ২০১৫ সালে চট্টগ্রাম শহরে ১০০-১২০ টি মিনারেল ওয়াটার কোম্পানীর লাইসেন্স ছিল যা বর্তমানে ১৮-২০ টিতে নেমে এসেছে। তালিকার বাইরে চলে যাওয়া সেই পানি উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলো এখন বিএসটিআই’র কতিপয় কর্তাদের মাসিক আর্থিক চুক্তিতে ম্যানেজ করে ব্যবসা করে যাচ্ছে। চট্টগ্রামের অধিকাংশ বেকারীর লাইসেন্স নেই, নেই পণ্যের মান সনদ। তারপরেও কতিপয় কর্তাদের সাথে যোগসাজশ করে এসব অস্বাস্থ্যকর বেকারি পণ্য বিক্রি হচ্ছে। প্রতিবছর ঈদ ও রমজানের পূর্বে ৫০ হাজার থেকে ২ লক্ষ টাকায় লাচ্ছা সেমাই, নুডুলস, চুটকি, তেল ইত্যাদি মৌসুমী পণ্যের ব্যবসা করা হয়। চট্টগ্রামে ২৫ টিরও বেশী উৎপাদনকারী এবং ৫০ টির বেশী ব্রান্ডের তেল বাজারজাত হলেও বিএসটিআই অফিস থেকে লাইসেন্স না দিয়ে মাসিক চুক্তিতে এসব মানহীন অস্বাস্থ্যকর তেল কারখানা পরিচালনা করা হচ্ছে। চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে আমদানীকৃত খাদ্যদ্রব্য ও পানি প্রতিদিন বিকাল ৫ টার পর বিনা পরীক্ষায় অর্থের বিনিময়ে ছাড়পত্র প্রদান করা হচ্ছে। চট্টগ্রামে গুঁড়ো দুধ বা পাউডার দুধ আমদানিকারক এমএইচ, আবুল খায়ের, নিউজিল্যান্ড ডেইরী, সানোয়ারা হলেও বাজারে ২৯টি কোম্পানী স্থানীয়ভাবে অননুমোদিত পণ্য বাজারজাত করছে। সবগুলো পাউডার দুধ আমদানীকারকরা বিএসটিআই অফিসের সাথে মাসিক চুক্তিতে ব্যবসা করছে।
বিএসটিআই’র ওয়েবসাইট ও তাদের অফিসেও ১৬৬টি পণ্যের লাইসেন্সপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠানের হালনাগাদ তালিকা নেই। যার কারণে জনগণ ও ভোক্তারা জানতে পারছে না কোন কোন প্রতিষ্ঠান লাইসেন্স প্রাপ্ত আর কোনগুলো লাইসেন্সবিহীন। ফলে ভোক্তারা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। অপর দিকে উদ্যোক্তাদের তাৎক্ষণিক সেবা প্রদানের জন্য ওয়ানস্টপ সার্ভিস নামে একটি সেবা বিএসটিআই অফিসে চালু করা হলেও দরখাস্ত জমা দিতে গেলেও কোনো কর্মকর্তার রেফারেন্স ছাড়া আবেদনপত্র ও চিঠিও গ্রহণ করা হয়না। বিএসটিআই অধ্যাদেশ অনুযায়ী বিএসটিআই থেকে লাইসেন্স প্রদানের পর ৬ মাস অন্তর অন্তর মার্কেট সার্ভিলেন্স করে ঐ পণ্যের গুণগত মান পরীক্ষা করে দেখার কথা। কোনো ত্রæটি পেলে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলো ও ভোক্তাদেরকে অবহিত করার কথা থাকলেও আজও এ কাজটি একেবারেই করা হচ্ছে না।
চট্টগ্রাম আঞ্চলিক অফিসের আওতায় খাদ্য, পানি, বৈদ্যুতিক পণ্য, বেকারী পণ্যের লাইসেন্সপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠানের কোনো তালিকা নেই। এমনকি চট্টগ্রামে কতজন আন্তর্জাতিক বাজার থেকে সয়াবিন, পানি, দুধ পাউডার, বেকারী, বৈদ্যুতিক পণ্য এনে বিক্রি করেন তার কোনো তালিকা নেই। লাইসেন্সবিহীন প্রতিষ্ঠানেরও কোনো তথ্য নেই তাদের অফিসে। বিদেশ থেকে আমদানীকৃত জুস, এনার্জি ড্রিংকস, কোমলপানীয় আমদানির পর বিএসটিআই চট্টগ্রাম অফিস হতে দ্রুত ছাড়পত্র গ্রহণ করে বন্দর থেকে ডেলিভারী হলেও বিএসটিআই চট্টগ্রাম ল্যাবে তা পরীক্ষার কোনো ব্যবস্থা নেই। পুরো চট্টগ্রাম জুড়ে চীনসহ বিভিন্ন দেশ থেকে আমদানী করা বৈদ্যুতিক সরঞ্জামে ভরপুর।
লাইসেন্সবিহীন প্রতিষ্ঠানগুলো বিএসটিআই’র কতিপয় কর্তাদের সাথে চুক্তি করে প্রতিষ্ঠানটির লোগো অবৈধভাবে ব্যবহার করছে জানিয়ে ক্যাব নেতৃবৃন্দ বলেন, অনেক প্রতিষ্ঠান তাদের পণ্যের প্যাকেটে বিএসটিআই’র ভুয়া লোগো ছাপিয়ে অবাধে মানহীন ও অস্বাস্থ্যকর পণ্য বিক্রি করছে। বাজারে সকল ডিজিটাল স্কেল কেলিব্রেশন না করা এবং বাজারে দুধ, তেল, সেমাই, চা পাতা, নুডুলস ইত্যাদি ওজনে কম দিলেও নেই কোনো তদারকি। ক্রেতাদের কাছে ভেজাল ও নি¤œমাণের ঘি বিক্রি করতে বাবুর্চিদের প্রতি কৌটায় ২০০-৩০০ টাকা কমিশন প্রদান করছে বিভিন্ন কোম্পানী। বাবুর্চিরা মাসিক চুক্তি ও কমিশনের ভিত্তিতে এগুলো বিয়ে, বৌভাত, আকিকা, মেহেদী অনুষ্ঠান, অন্নপ্রসাদ, বিভিন্ন পার্টিতে এ সমস্ত ঘি ব্যবহার করছে।
এসব অপকর্মের হোতাদের শাস্তির আওতায় এনে দ্রæততার সাথে ভোক্তাদের স্বাস্থ্যহানিকর পণ্য বন্ধে কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণের দাবি জানিয়ে বিবৃতি দেন ক্যাব কেন্দ্রিয় কমিটির ভাইস প্রেসিডেন্ট এস এম নাজের হোসাইন, সাধারণ সম্পাদক কাজী ইকবাল বাহার ছাবেরী, মহানগর সভাপতি জেসমিন সুলতানা পারু, সাধারণ সম্পাদক অজয় মিত্র শংকু, যুগ্ম সম্পাদক তৌহিদুল ইসলাম, দক্ষিণ জেলা সভাপতি আবদুল মান্নান প্রমুখ।