‘মানসম্মত প্রাথমিক শিক্ষা ও বাংলাদেশ’

দিপস কুমার বড়ুয়া

39

শিক্ষা মানুষের আরচণগত দিকে কাঙিত পরিবর্তন ঘটিয়ে মনুষ্যত্বের বিকাশ ঘটায়। শিক্ষার পদ্ধতি তিন ধরনের আনুষ্ঠানিক, অনানুষ্ঠানিক এবং উপানুষ্ঠানিক। স্বাধীনতা অর্জনের পর পরই শিক্ষাক্ষেত্রে সংস্কারে এগিয়ে আসেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। এরই ধারাবাহিকতায় ১৯৭৩ সালে দেশের সকল প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলো জাতীয় করন করেন এবং গঠন করেন খুদরত-ই খুদা শিক্ষা কমিশন। এর ফলে শিক্ষা ব্যবস্থার আমূল পরিবর্তন হয়ে যায়। শিক্ষা পৌঁছে যায় মানুষের দোরগোড়ায় এবং প্রাথমিক শিক্ষকগণের আর্থিক দৈন্যদশার উন্নয়ন ঘটে। জাতির জনক বঙ্গবন্ধু আদর্শকে ধারণ ও লালন করে তাঁর সুযোগ্য কন্যা গণতন্ত্রের মানষ কন্যা জননেত্রী শেখ হাসিনা ২৬০০০ হাজার বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় জাতীয়করণ করেন। প্রাথমিক শিক্ষা বান্ধব প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা প্রাথমিক শিক্ষার উন্নতিকল্পে আরও অনেক যুগান্তকারী পদক্ষেপ নেন। তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য পদক্ষেপগুলো হলো সকল শিক্ষার্থীর জন্য উপবৃত্তি ব্যবস্থা, ২০০৯ সাল থেকে প্রাথমিক শিক্ষা সমাপনী পরীক্ষা চালু, মাল্টিমিডিয়ার মাধ্যমে পাঠদান, শতভাগ ভর্তি নিশ্চিতকরণ, ঝরে পড়ার হার শূন্যকোটায় নামানো, মিড-ডে মিল চালুর মাধ্যমে শতভাগ উপস্থিতি নিশ্চিতকরণ, প্রাক-প্রাথমিক শ্রেণি চালু, বাংলাদেশে প্রতিটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের অবকাঠামোর উন্নয়নে আকর্ষনীয় ভবন নির্মাণ, প্রধান শিক্ষক ও সহকারি শিক্ষকদের বেতন গ্রেড উন্নীতকরণ এবং বিগত ০৯/০৩/২০১৪ সাল হতে প্রধান শিক্ষকদের দ্বিতীয় শ্রেণি মর্যাদা প্রদান এ সকল যুগান্তকারী পদক্ষেপ নেয়ার মূল লক্ষ্য হলো মানসম্মত প্রাথমিক শিক্ষা নিশ্চিতকরণ। তাছাড়া বাংলাদেশে প্রতিটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় বিগত ২০১৩ সাল হতে পর্যায়ক্রমে সকল বিদ্যালয়ে “দপ্তরী কাম-প্রহরী” পদ সৃষ্টি করা হয়েছে। যা বিদ্যালয়ে সম্পদ সুরক্ষার জন্য পদটি অপরিহার্য ছিল। যে বিষয়ে বর্তমান সরকারের প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনা নি:সন্দেহে প্রশংসার দাবী রাখেন। যে বিষয়টি মূল্যায়িত করেছে সমগ্র প্রাথমিক শিক্ষাঙ্গনকে তাহলো প্রাথমিকে শিক্ষা পদক চালু, তার সাথে জেলা ও বিভাগীয় পর্যায়ে শ্রেষ্ঠ শিক্ষককের বিদেশে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা যা প্রাথমিক শিক্ষাকে আরো সুদৃঢ় করতে সক্ষম হয়েছে। পড়াশুনায় পাশাপাশি শিশুর শারীরিক, দৈহিক ও মানসিক দক্ষতা বৃদ্ধিতে বঙ্গবন্ধু ও বঙ্গমাতা ফুটবল টুর্নামেন্ট, আন্তঃ প্রাথমিক বিদ্যালয় ক্রীড়া ও সাংস্কৃতিক প্রতিযোগিতা চালু যা প্রাথমিক শিক্ষাকে এগিয়ে নিতে নি:সন্দেহে প্রশংসার দাবীদার। শিক্ষা একটি চালমান প্রক্রিয়া, শিক্ষার কোন শেষ নেই, যদিও পদ্ধিতিগত ও কাঠমোবদ্ধ শিক্ষার সময় ও সিলেসবাস নির্ধারিত। পদ্ধতিগত প্রাথমিক শিক্ষা হলো উচ্চ ও উন্নত শিক্ষা ব্যবস্থার মূল ভিত্তি স্বরূপ, শিশুরা প্রাথমিক শিক্ষার কাঙ্খিত প্রান্তিক যোগ্যতা সমূহ শতভাগ অর্জন করে সুশিক্ষিত ও যোগ্য নাগরিক হিসেবে গড়ে উঠবে একই সাথে বাংলাদেশকে উন্নত বিশ্বের কাতারে নিয়ে যাওয়ার প্রয়াস পাবে এবং যোগ্য নাগরিক হিসেবে বাংলাদেশের আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারবে। যোগ্য মানবসম্পদ সৃষ্টির একমাত্র হাতিয়ার হলো উন্নত শিক্ষা ব্যবস্থা। শিশুদের সুপ্ত প্রতিভা বিকাশের জন্য উন্নত শিক্ষা ব্যবস্থার কোন বিকল্প নেই। প্রাথমিক শিক্ষা হলো উন্নত ও উচ্চ শিক্ষা ব্যবস্থার ভিত্তি স্বরূপ। একটি ক্ষুদ্র চারাগাছকে যেমন মাটিতে পুতে তাতে সময়মত পানি, বায়ু, আলো ইত্যাদি দিযে যতœ সহকারে বড় করে তুললে সেই গাছ থেকে ফল পাওয়া যায়, ঠিক তেমনি একটি শিশুকে তার প্রয়োজনীয় পড়ার পরিবেশ, বিদ্যালয়, খাতা, কলম, পেন্সিল ও বই দিয়ে পড়াতে হয়। তবেই সে বড় হয়ে ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, শিক্ষক, ব্যবসায়ী সহ আরো অনেক পেশায় নিজেকে নিয়োজিত করতে পারবে। কিন্তু একটি শিশুকে সম্পদে পরিণত করতে হলে প্রথমে তার মানসম্মত প্রাথমিক শিক্ষা নিশ্চিত করতে হবে। বিশাল পৃথিবীতে নিজেকে প্রতিযোগীতায় সফল করা, টিকে থাকা তারই প্রস্তুতি হল প্রাথমিক শিক্ষা। বর্তমান সরকার শিক্ষা বান্ধব সরকার, সেই লক্ষ্যে আমাদের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনা ও তার সরকার দৃঢ় প্রতিজ্ঞ এবং সেই লক্ষ্যে কাজ করে যাচ্ছে নিরন্তন। সেই সাথে প্রাথমিকের যে বিশাল জনবল কাঠামো কেন্দ্র করে তৃণমূল পর্যন্ত বিস্তৃত সবাই আন্তরিকতা নিয়ে করে যাচ্ছেন কাঙ্খিত লক্ষ্য অর্জনের জন্য।
প্রাথমিক শিক্ষার মান উন্নয়নে আমরা প্রাথমিক শিক্ষা পরিবার শত বাধার মুখেও সরকার কর্তৃক গৃহীত যেকোন সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে বদ্ধ পরিকর। প্রাথমিক স্তর যেহেতু শিশুর ভীত তৈরির স্তর কাজেই শিক্ষক শিক্ষার্থীর নিবিড় পরিচর্যা ও প্রয়োজন, কোন অবস্থাতেই এর ব্যত্যয় ঘটানো যাবে না। শত ভাগ শিশুকে বিদ্যালয়ে আওতায় আনার জন্য শিক্ষাবর্ষ শুরুর পূর্বেই শিশু জরিপ কার্যক্রম পরিচালিত হয়। শিশু জরিপের শতভাগ শিশুর ভর্তি কার্যক্রম সমার্পনের সাথে সাথে রয়েছে সরকারের বিনামূল্যে উন্নত মানের পাঠ্যপুস্তক বিতরণ কার্যক্রম। এই কার্যক্রমের ফলে বছরের প্রথমদিনে শিক্ষার্থীর হাতে পাঠ্যপুস্তকে পৌছানোর নিশ্চিত করা হয়। বছরের শুরু থেকেই বার্ষিক কর্ম-পরিকল্পনা ও বার্ষিক পাঠ পরিকল্পনা অনুযায়ী পাঠদান কার্যক্রম শুরু হয়।
সরকার গৃহীত শতভাগ শিক্ষার্থীর জন্য উপবৃত্তি কার্যক্রম সাথে অভিভাবকদের বিনামূল্যে মোবাইল সিমের ব্যবস্থা, দারিদ্র পীড়িত এলাকায় স্কুল ফিডিং পর্যায়ক্রমে সকল প্রাথমিক বিদ্যালয়ে মিড-ডে মিল প্রকল্প, ২০২০ সাল হতে বাংলাদেশে প্রতিটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের পোশাক ও জুতার জন্য বছরের প্রথমে দিনে নগদ ২০০০/- টাকায় প্রদানের পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে সরকার, এবং একীভূত শিক্ষা ব্যবস্থার বিভিন্ন পদক্ষেপ সমাজের সকল স্তরের সকল শিশুর প্রাথমিক শিক্ষার অধিকার নিশ্চিত করেছে। এছাড়া জনগণকে বিদ্যালয়ের সাথে সম্পৃক্ত করণের জন্য রয়েছে শিক্ষা ও কর্মকর্তাদের হোম ভিজিট, অভিভাবক সমাবেশ, মা সমাবেশ, উঠান বৈঠক, পিটিএ সভা, মোবাইল মাসি নিয়োগ ও বিদ্যালয় ব্যবস্থাপনা কমিটির নিয়মিত সভা শিশুদের বিদ্যালয়ের প্রতি আকৃষ্ট করতে ও আকর্ষনীয় পাঠ দানের লক্ষ্য বিদ্যালয় ভবন ও শ্রেণিকক্ষগুলোকে সুসজ্জিত ও আকর্ষনীয় করা হয়েছে। বিদ্যালয়গুলোতে, লাইব্রেরী, শহীদ মিনার শিশু পার্ক স্থাপন সহ খেলাধুলা, বিনোদন ও সাংস্কৃতিক কর্মকান্ডের বিভিন্ন উপকরণের ব্যবস্থা করা হয়েছে। তাছাড়া বিদ্যালয়ের সততা স্টোর, মহানুভবতার দেয়াল স্থাপন করা হয়েছে। বিদ্যালয়গুলোর পরিবেশ নির্মল ও সুন্দর করতে প্রতিটি বিদ্যালয়ের ফুল, ফল ও সবজী বাগান গড়ে তোলা হয়েছে। তাছাড়া বর্তমানে ২০২০ সালে মুজিববর্ষকে সামনে রেখে (৩য় শ্রেণি হতে ৫ম শ্রেণি) পর্যন্ত প্রতিটি শিক্ষার্থীর বাংলা পঠন নিশ্চিত করার লক্ষ্যে কাজ করছে প্রাথমিক শিক্ষা পরিবারের সকল কর্মকর্তা ও কর্মচারীবৃন্দ। শিক্ষার্থীদের পাঠে মনোযোগী ও বিদ্যালয়মুখী করার জন্য মাননীয় সচিব মহোদয়ের ইনোভেশন ঝঃঁফবহঃ ড়ভ ঃযব ফধু/ডববশ/গড়হঃয/ণবধৎ নির্বাচতি করে প্রতিদিন নিয়মিত পুরস্কার করার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। তাছাড়া শিক্ষার্থীদের শব্দ ভান্ডার বৃদ্ধির জন্য ঙহব ফধু ড়হব ড়িৎফ কার্যক্রম শিক্ষার্থীদের ঠড়পধনঁষধৎু ংঃড়পশ দারুনভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে ও শিক্ষার্থীরা পূর্বের চেয়ে অধিক মনোযোগী হয়ে উঠেছে। শিক্ষক ও কর্মকর্তাদের বিভিন্ন ধরনের বিশেষায়িত প্রশিক্ষণ লদ্ধ জ্ঞান ও দক্ষতা শিশুর পাঠদান কার্যক্রমকে আনন্দদায়ক ও মেধাবিকাশে প্রক্রিয়া অধিক ফলপ্রসু ও ত্বরান্বিত হয়েছে। তাছাড়া বিদ্যালয়গুলোতে ক্ষুদে ডাক্তার কার্যক্রম, স্টুডেন্ট কাউন্সিল কার্যক্রম শিশুদের মাঝে নেতৃত্বদানের ক্ষমতা, গণতান্ত্রিক মনোভাব, সমাজ সচেতনতা, ভ্রাতৃত্ববোধ ও মানবিক মূল্যবোধ সৃষ্টি করেছে। আধুনিক শিক্ষা ব্যবস্থায় এ সকল সমন্বিত ও যুগান্তকারী পদক্ষেপ সমূহ প্রাথমিক শিক্ষা ব্যবস্থার সম্পৃক্ত হওয়ার ফলে প্রাথমিক শিক্ষায় প্রান্তিক যোগ্যত সমূহ অর্জন সহজতর হয়েছে। শিশুদের মন থেকে বিদ্যালয় ভীতি ও পরীক্ষার ভীতি দূর হচ্ছে, বিদ্যালয়ে শিশুদের উপস্থিতি বৃদ্ধি পাচ্ছে ঝরে পড়া শিক্ষার্থীর হার হ্রাস পাচ্ছে। শিশুশ্রম ও শিশু বিবাহ রোধ সম্ভব হচ্ছে। সাময়িক পরীক্ষা ও সমাপনী পরীক্ষার শিশুরা ঈর্ষনীয় ফলাফল অর্জন করছে। সর্বোপরি প্রাথমিক শিক্ষার লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য নিশ্চিত করন সম্ভব হচ্ছে।