মানব পাচার রোধে কঠোর হোক সরকার

18

মানব পাচার এখন বৈশ্বিক সমস্যাগুলোর মধ্যে অন্যতম। বাংলাদেশে এ সমস্যা দীর্ঘদিনের। সম্প্রতি রোহিঙ্গা শিবির থেকে মানব পাচারের একাধিক ঘটনা ঘটেছে। এর বাইরে দেশের বেকার যুবকদের অনেকে একটি সুস্থ সুন্দর, সাবলীল ও স্বচ্ছ¡ল জীবনের স্বপ্নে বিভোর হয়ে অবৈধ পথে বিদেশে পাড়ি জমানোর মানসিকতা থেকে পাচারকারীর ফাঁদে পড়ে সর্বস্ব হারাচ্ছে। এতে তাদর স্বপ্ন শেষ পর্যন্ত স্বপ্ন হয়ে অধরাই থেকে যায় তাই না; বরং স্বপ্ন ধরতে গিয়ে বিশাল সমুদ্রের জলতরঙ্গে প্রান বিসর্জন দিতে হয় অনেককে। সম্প্রতি তিউনিসিয়ায় একটি নৌকাডুবির ঘটনায় মানব পাচারের মির্মমতা বিশ্ববাসীর দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। গণমাধ্যমে প্রকাশ গত ১০ মে শুক্রবার তিউনিসিয়ার উপকূলে যে নৌকাডুবির ঘটনা ঘটে তাতে যাত্রী ছিলেন কম করেও ৭৫ জন, যাদের মধ্যে ছিলেন বাংলাদেশ, মিসর, মরক্কো, সুদান ও আফ্রিকার নাগরিক। অন্তত ৫১ জন ছিলেন বাংলাদেশি। সবার স্বপ্নই ছিল এক ও অভিন্ন- নিতান্তই ভাগ্যান্বেষণে ইউরোপ-আমেরিকা-অস্ট্রেলিয়ার অথবা কানাডার কোন দেশে অবৈধ পথে পাড়ি দিয়ে লালিত স্বপ্নের বাস্তবায়ন। নৌকাডুবির ঘটনায় সেই স্বপ্ন মুহূর্তে পরিণত হয়েছে দুঃস্বপ্নে। অনেকের লাশ মিলেছে, অনেকের মেলেনি- সলিল সমাধি ঘটেছে সেসব হতভাগার। কেউ দৈবক্রমে বেঁচে গেছেন বটে; তবে এই বেঁচে থাকা অবর্ণনীয়, অসহনীয়। মৃত্যুর অধিক যন্ত্রণা এই বেঁচে থাকা। অনুরূপ কিছুদিন আগে আফ্রিকার দেশ ভানুয়াতুতে অবৈধভাবে গিয়ে কারাবন্দী জীবনযাপন করছেন অর্ধশতাধিক বাংলাদেশি। একেবারে নিঃস্ব, সহায়সম্বলহীন বাংলাদেশিদের কেউ আর দেশে ফিরে আসতে চাইছেন না। দেশে ফিরে করবেন কি? খাবেন কি? বেঁচে থাকবেন কিভাবে? প্রায় সবাই তো গড়ে ৮-১০ লাখ টাকা দিয়েছেন দালালদের, যাদের মধ্যে রয়েছে দেশি-বিদেশি দালাল।
ঢাকার একজন গবেষকের মতে, অবৈধ মানবপাচার চক্রের খপ্পরে পড়ে প্রতি বছর প্রায় ১৪ বিলিয়ন ডলার চলে যাচ্ছে দেশের বাইরে। সত্য বটে, বর্তমানে বিদেশে বৈধ পথে বিশেষ করে অদক্ষ ও আধা দক্ষদের জন্য কর্মসংস্থান কমে এসেছে অনেকাংশে। ইউরোপ-আমেরিকা দূরে থাক, মধ্যপ্রাচ্য-মালয়েশিয়ায় পর্যন্ত শ্রমিক প্রেরণ প্রায় বন্ধ। এর বিপরীতে বেড়েছে অবৈধ পথে মানবপাচার, যা থেকে নারী-শিশুও বাদ যাচ্ছে না। এক হিসাবে জানা যায়, প্রতি বছর প্রায় ১৬ হাজার বাংলাদেশী অবৈধ পথে ভাগ্যান্বেষণে পাড়ি জমাচ্ছেন ইউরোপ-আমেরিকা-অস্ট্রেলিয়ার উপকূলে। কখনও দুর্গম অরণ্যাঞ্চল, কখনও ভয়ঙ্কর তপ্ত মরুভূমি আবার কখনওবা উত্তাল-উন্মত্ত সাগর-মহাসাগর পাড়ি দিয়ে। ফলে অনিবার্য মৃত্যু ঘটছে অনেকের। যে বা যারা বেঁচে থাকেন তারাও প্রায় অর্ধমৃত। লক্ষাধিক বাংলাদেশি বিশ্বের বিভিন্ন দেশের কারাগারে মানবেতর জীবনযাপন করতে বাধ্য হচ্ছেন। নারী ও শিশুদের স্থান হয়ে থাকে নিষিদ্ধ পল্লীতে। অথচ দেশে থাকলে কিছু না কিছু করে বেঁচে থাকতে পারতেন এসব হতভাগা।
প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের হিসাব মতে বর্তমানে প্রায় ৯৬ লাখ বাংলাদেশি অভিবাসী হিসেবে বিশ্বের ১৬০টি দেশে কর্মরত আছেন। তবে বেসরকারি হিসাবে এই সংখ্যা আরও বেশি, এক কোটি ছাড়িয়ে যেতে পারে।
বিদেশে কর্মরত প্রবাসী বাংলাদেশিদের প্রেরিত অর্থে দেশের অর্থনীতিও সমৃদ্ধ হচ্ছে দিন দিন। এক হিসাবে হোম রেমিটেন্সের পরিমাণ ১৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার ছাড়িয়ে যেতে পারে। পোশাক রফতানির পরেই এর অবস্থান। তবে সত্যি বলতে কি, প্রবাসী অভিবাসী শ্রমিক-কর্মচারীদের সার্বিক নিরাপত্তা বিধানসহ সামাজিক সুরক্ষার জন্য তেমন নীতিমালা ও আইন নেই।
জানা যায়, অভিবাসী শ্রমিকদের সার্বিক নিরাপত্তা বিধানসহ যথাযোগ্য মর্যাদা দেয়ার জন্য প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় নিরাপদ অভিবাসন আইনের খসড়া চূড়ান্ত করেছে। এতে বিদেশে যেতে ইচ্ছুক কর্মীদের সঙ্গে প্রতারণা করলে ৫ বছরের জেল-জরিমানাসহ মানবপাচারের ক্ষেত্রে মৃত্যুদন্ডের বিধান রাখা হয়েছে। প্রতারক, দালালচক্রসহ ঘৃণ্য মানবপাচারের সঙ্গে জড়িতদের শাস্তির জন্য এরকম একটি আইনের প্রয়োজনীয়তা অনুভূত হচ্ছিল দীর্ঘদিন থেকেই। এর পাশাপাশি জাতিসংঘ প্রস্তাবিত প্রবাসীদের জন্য জীবনবীমা তাদের দিতে পারে বাড়তি নিরাপত্তা। আমরা আশা করি, দেশি-বিদেশি ঘৃণ্য মানবপাচারকারীদের বিরুদ্ধে আইনটির প্রয়োগ নিশ্চিত করা হবে।