মানব অস্তিত্বের জন্য পরিবেশ

মো. আবদুর রহিম

19


মানব অস্তিত্বের জন্য দূষণমুক্ত ভারসাম্যপূর্ণ পরিবেশ সুরক্ষায় রাষ্ট্রের পাশাপাশি প্রতিটি মানুষের দায়িত্ব রয়েছে। সাধারণ মানুষের পরিবেশ রক্ষায় সচেতন না হলে সুষম পরিবেশের মধ্যে আমাদের বসবাস সম্ভব হয়। ক্রমবর্ধমান প্রাকৃতিক বিপর্যয় নিয়ে সারা বিশ্বের সকল সচেতন মানুষই শংকিত। বাংলাদেশসহ সমগ্র বিশ্বে যেভাবে ঘন ঘন প্রাকৃতিক বিপর্যয় সংঘটিত হচ্ছে তাতে বিজ্ঞানীরা আশংকা করছেন এই পৃথিবী মনুষ্যবাসের অনুপযোগী হতে বেশি সময় নেবে না। সেরা বিজ্ঞানী স্টিফিন হকিং তো প্রায়ই নিশ্চিত করেই বলে দিয়েছেন পরিবেশ ধ্বংসের কারণ এই পৃথিবী ধ্বংসের কাছাকাছি পৌঁছে গেছে। বিভিন্ন্ গবেষণা বলছে বিগত ২৩ বছরে আবহাওয়ার বৈরীতাজনিত প্রাকৃতিক বিপর্যয় বেড়েছে ৪ গুণেরও বেশি। এ হার ক্রমশ বেড়েই যাবে। বৈশ্বিক উষ্ণতারোধ ও প্রাকৃতিক বিপর্যয় মোকাবিলায় মানুষকে এখনই নিতে হবে সুচিন্তিত পদক্ষেপ। না হয় মানব অস্তিত্ব এই পৃথিবী থেকে এক সময় বিলীন হয়ে যাবে।
আবহাওয়া পরিবর্তনজনিত বিভিন্ন গবেষণা শব্দ তথ্যে জানা যায় প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের হাত বেড়ে যাওয়ার জন্য দায়ী বিশ্ব উষ্ণায়ণ। গবেষণায় বলা হচ্ছে আগামী ৫০ বছরে আবহাওয়ার বিপুল পরিবর্তন ঘটে যাবে। বদলে যাবে বর্তমান চেনাজানা পৃথিবী। এ পরিবর্তনের ফলে পৃথিবীর অর্ধেকটা জায়গা পরিণত হবে মরুভূমিতে। এসব দেশে তীব্র খাদ্য ও পানীর জলের সংকট দেখা দেবে। গাছপালা লতা-গুল্ম, মাছ ও জীবজন্তু বহু প্রজাতি ধ্বংস হয়ে যাবে অন্যদিকে উষ্ণতা বৃদ্ধির কারণে সমুদ্রের উচ্চতা কয়েক ফুট বেড়ে যাবে, দেখা দেবে সুনামি এবং ভূমিকম্পে সহ বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগ। পৃথিবী রক্ষায় সম্মিলিত পদক্ষেপ না মিলে খুব অস্তিত্বের সংকটে পড়বে এই পৃথিবীর মানুষ। আবহাওয়া বিজ্ঞানীদের মতে পানীয় জলের অভাব খাদ্য সংকট এবং নানা বিচিত্র রোগ ব্যাধিতে দরিদ্র বিশ্বের প্রায় ১২০ কোটি মানুষ প্রাণ হারাতে পারে ২০৫০ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে।
আবহাওয়ার পরিবর্তনজনিত কারণে বাংলাদেশসহ বিষুবরেখায় প্রান্তবর্তী দেশ কিংবা দরিদ্র দুনিয়ার লোকেরাই বেশি ক্ষয়ক্ষতির শিকার হবে। তবে ধনী এবং শীতপ্রধান দেশগুলো তেমন সুবিধা জনক অবস্থানে থাকবে না। ইতিমধ্যে সে লক্ষণও দেখা দিয়েছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ফ্রান্সের মত কয়েকটি রাষ্ট্রে বন্যায় ভেসে যাওযার চিত্র বিশ্বকে শংকিত করছে। বিশ্বের বহুদেশে সাইক্লোন, খরা, দাবানল, জলোচ্ছাস, ভূমিকম্প ব্যাপক হারে বেড়ে যাচ্ছে। এতসব দুঃখজনক ঘটনা সত্ত্বেও ধনী বিশ্ব বৈশ্বিক উষ্ণতা রোধে কার্যকর উদ্যোগ আশাব্যঞ্জক নয়। তাদেরও মনে রাখতে হবে প্রলয়ংকরী টর্নেডো, সুনামি এবং ভূমিকম্পের মতো ভয়ংকর প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবেলা করা সহজ নয়। জানা যায় যুক্তরাষ্ট্রের পরিবেশ রক্ষা সংস্থা (ই পি এ) ২০৩০ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে দেশটির বিদ্যুৎ প্রকল্পগুলো থেকে কার্বন ডাই-অক্সাইড নির্গমন হার ৩০ শতাংশে কমিয়ে আনার একদিকে চেষ্টা করছে। এদিকে বিশ্বের সবচেয়ে বেশি গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমনকারী দেশ চীন কার্বননির্গমন পুরোপুরি রুদ্ধ করার পরিকল্পনা গ্রহণ করছে। চীন বর্তমান দশকে কার্বননির্গমনে ‘অ্যাবসুলেট ক্যাপ’ আরোপে তৎপর আছে। যদি যুক্তরাষ্ট্র ও চীনসহ শিল্পোন্নত রাষ্ট্রগুলো কার্বন ডাই অক্সাইড নিঃসরণের মাত্রা কমিয়ে না আনে তাহলে বিপর্যয় থেকে বাঁচা যাবে না। বিশ্বের সব দেশই এ ব্যাপারে দায়িত্বশীল হলে পরিবেশ সুরক্ষা সহজ হবে তবে কার্বন নির্গমনের মাত্রা কমিয়ে আনার পাশাপাশি সবুজায়ন কর্মসূচি জোরালো করতে হবে। আমাদের ভুলে গেলে চলবে না বা প্রকৃতি খুবই সহনশীল ও অহিংস। গাছপালা, পাহারটিলা, পর্বত কেটে বায়ুমন্ডলে নিত্য বিশাল ভল্যুমের কার্বন নিক্ষেপ করে, প্রতিনিয়ত শিল্পবর্জ্যে নদী ও সমুদ্রের পানি দূষিত করে জীব জন্তু ও অক্সিজেন ধ্বংস করে। প্রকৃতির ওপর মানুষ অত্যাচার ও ধ্বংসের মাত্রা বাড়িতে থাকায় প্রকৃতি তার নমনীয় ও অহিংস চরিত্রে স্থির থাকতে পারে না। ফলে সে চঞ্চল, নিষ্ঠুর ও প্রতিশোধপরায়ন হয়। তবে মানুষ চাইলে এখনো প্রকৃতিকে শান্ত ও স্বাভাবিক চরিত্রে ফিরিয়ে আনতে পারে।
প্রকৃতিকে শান্ত রাখতে নদীর ধার, পাহাড়ের ঢাল, উপকূল রেল বা সড়কের পাশে অধিক হারে গাছ লাগাতে হবে। বনভূমি থেকে কাঠ সংগ্রহের জন্য গাছ কাটা বন্ধ রাখা এবং নতুন গাছ লাগাতে হবে। জ্বালানি হিসেবে কাঠের ব্যবহার পরিহার করে সৌরশক্তিকে ব্যবহার করতে হবে। বাণিজ্যিক বনভূমি সৃষ্টিতে জনসাধারণকে উদ্বুদ্ধ করতে হবে। বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে অন্যতম প্রধান ক্ষতিগ্রস্ত দেশ বাংলাদেশ। বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধির জন্য বাংলাদেশের ভূমিকা অত্যন্ত নগন্য হলে ও ভৌগলিক অবস্থানের কারণে সর্বোচ্চ ক্ষতির শিকার বাংলাদেশ। বাংলাদেশে ৫৮০ কি মি দীর্ঘ সমুদ্র উপকূল ও ছোট বড় অসংখ্য দ্বীপ। এ সকল দ্বীপের জনসংখ্যা বিশ্বের কোন কোন ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র দ্বীপ রাষ্ট্রের জনসংখ্যার চাইতে বেশি। জলবায়ু পরিবতনের প্রভাবে বাংলাদেশের উপকূলের লাখ লাখ মানুষের জীবন জীবিকা হুমকির সম্মুখীন।
সামর্থ্য ও সম্পদের সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও বাংলাদেশ সরকার জলবায়ু পরিবর্তনজনিত ঝুঁকি মোকাবেলায় অত্যন্ত আন্তরিক ও সচেষ্ট রয়েছে। দ্রত শিল্পায়ন ও নগরায়নের কারণে পরিবেশ দূষণের ঝুঁকিতে আমাদের এ দেশ। আসুন, পরিবেশের স্বার্থে খাল, বিল, নদী, নালা, জল ভূমি, পাহাড়, বন ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণের উপর জোর দিই। আসুন, আমরা আমাদের প্রাকৃতিক পরিবেশ সংরক্ষণে এবং একে দূষণমুক্ত রাখতে আরো তৎপর হই। আসুন, ২০২১ সালের মধ্যে একটি সমৃদ্ধ ও উন্নত বাংলাদেশ গড়ার প্রত্যয়ে আত্মনিবেদন করি।

]লেখক : স্বাস্থ্য শিক্ষা কর্মকর্তা
চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন