কারাবন্দিদের জন্য বালিশ

মানবিক দিকগুলো আরো সম্প্রসারণ করতে হবে

5

শুক্রবার দৈনিক পূর্বদেশের অন্য খবরে প্রকাশিত হয়, ‘দেশে প্রথমবারের মতো কারাবন্দিদের জন্য বালিশ দেওয়া হয়েছে’। খবরটি ছোট্ট হলেও দৃষ্টি এড়ানোর বিষয় নয়। নির্বাচনের ডামাডোলে এমনটি খবর পাঠকের কাছে তেমন গুরুত্ব না পেলেও মানবিক দিক থেকে বিবেচনা করলে এ সংবাদটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অন্ধকারে আলোর ঝলকের মত। কারণ কারাগার যদিও অপরাধের পরিণামভোগীদের আবাসস্থল প্রকৃতপক্ষে এটি অপরাধীদের সংশোধনাগার। দেশের সংবিধানও তাই বলে। কিন্তু আমাদের মত উন্নয়নশীল দেশে কারাগার মানে অপরাধীদের জন্য আরেকটি অন্ধকার জগৎ, যেখানে দীর্ঘদিন ধরে বন্দি থাকার পর অপরাধীরা বরং আরো ভয়ঙ্কর হয়ে বের হয়। তারা একটি সংশোধিত জীবন গঠনের পরিবর্তে বরং আরো বেশি উৎসাহ উদ্দীপনায় অপরাধে জড়িয়ে পড়ে। মূলত ব্রিটিশ আমলে প্রণিত আইন অনুযায়ী এখনও কারাগারগুলো পরিচালিত হয়। ফলে সরকারেরও তেমন কিছু করার থাকে না। সম্প্রতি জাতীয় মানবাধিকার কমিশনসহ বিভিন্ন মহল থেকে কারাগারের পুরনো বিধান সংশোধন ও কারাবাসীদের মানবিক দিকগুলো আরো সম্প্রসারণের অনুরোধ জানিয়ে আসছিল। এরপর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বিষয়টি গভীর উপলব্দি করেন এবং কারাগারের অধিবাসীদের জন্য বেশকিছু মানবিক কর্মসূচি গ্রহণের জন্য সংশ্লিষ্ট দপ্তরকে নির্দেশ দেন। সূত্র জানায়, প্রধানমন্ত্রীর একান্ত ইচ্ছায় কারা নীতিমালা ও আইন সংশোধনের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে নেয়া উদ্যোগ এখন পূর্ণতার পথে। আইজি প্রিজন স্বীকার করেছেন, কারাগারগুলোকে সংশোধনাগার হিসেবে পরিচালিত করতে আরও কিছু বিষয় অন্তর্ভুক্ত করা হবে এবং এজন্য নীতিমালা ও আইনের কিছু পরিবর্তন করা প্রয়োজন । তাঁর ভাষায় ‘ইতিমধ্যে খসড়া নীতিমালা ও আইন লেখা হয়ে গেছে। সেটা পার্লামেন্ট থেকে অনুমোদন পেলে আমরা তা বাস্তবায়ন করতে পারব।’
আমরা জানি, সরকার বেশ কয়েক বছর ধরে কারাবন্দিদের জন্য জাতীয় দিবসসহ নানা উৎসবের দিন বিভিন্ন সাংস্কৃতিক কর্মসূচি আয়োজনের উদ্যোগ নিয়েছে। মহিলাদের কঠোর শাস্তির বদলে সৃজনশীল কর্মকান্ডসহ পণ্য উৎপাদনের কাজের সুযোগ সৃষ্টি করেছে। এখন থেকে তারা আরামে ঘুমানোর জন্য বালিশও পেয়ে থাকবেন। এটি সরকারের মহৎ উদ্যোগ বলা যায়। আমরা মনে করি, এ ধরনের উদ্যোগগুলো অব্যাহত রাখতে হবে। আরো যেসব অমানবিক শাস্তি কারা অভ্যন্তরে বন্দিদের দেয়া হয়, তার বদলে মানবিক দিকগুলো আরো সম্প্রসারণ করতে হবে। এতে অপরাধের সাথে জড়িয়ে আমাদের যেসব মানব সম্পদ ধ্বংস হতে যাচ্ছে, তারা সংশোধনের সুযোগ পাবে। দেশ ও জাতির কল্যাণে কাজ করার অনুপ্রেরণা পাবে। দৈনিক পূর্বদেশের সংবাদে উল্লেখ করা হয়, গত বৃহস্পতিবার আইজি প্রিজন ব্রিগেডিয়ার জেনারেল সৈয়দ ইফতেখার উদ্দীনের উপস্থিতিতে কাশিমপুর কারাগারে বালিশ বিতরণ করা হয়। এসময় তিনি কাশিমপুরের চারটি, নেত্রকোণা জেলা কারাগার এবং ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে এ বালিশ বিতরণ কর্মসূচির উদ্বোধন করেন। এসব কারাগারে প্রাথমিকভাবে মোট ১৬ হাজার চারশ বালিশ বিতরণ করা হয়। প্রতিটি কভারযুক্ত বালিশের মূল্য পড়েছে ৪৮৬ টাকা। পর্যায়ক্রমে দেশের ৬৮টি কারাগারে বন্দিকে বালিশ দেওয়া হবে বলে সংবাদে উল্লেখ করা হয়।
উল্লেখ্য যে, ইতিপূর্বে প্রত্যেক বন্দি তিনটি কম্বল পেত, যার একটি বালিশ হিসেবে ব্যবহার হতো। এ কর্মসূচির পর কারাবন্দিদের আর কম্বল মাথায় দিয়ে ঘুমোতে হবে না। অনুষ্ঠানে আইজি প্রিজন অল্প সময়ের মধ্যে বন্দিদের খাবারের মান উন্নয়ন হবে বলেও আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন। তাঁর ভাষায় শিগগিই কারাগারের বন্দিদের সকালের নাস্তা পরিবর্তন করা হচ্ছে। আগের রুটির সঙ্গে শুকনা গুড়ের টুকরা দেওয়ার পরিবর্তে সবজি, হালুয়া এবং খিচুরীসহ সপ্তাহের একেকদিন একেক আইটেম নাস্তা সরবরাহের ব্যবস্থা করা হবে। স্বজনদের সঙ্গে ১৫ দিন অন্তর কারাবন্দিরা টেলিফোনে কথা বলার সুযোগ পাবেন। ইতিমধ্যে এ বিষয়ে সরকারিভাবে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়েছে। প্রকল্পও হাতে নেওয়া হয়েছে। দেশে ৬৮টি কারাগারে বুথ স্থাপনের কাজ শেষ হলেই কারাবন্দিরা সে সুযোগ পাবেন। এছাড়া কারাবন্দিদের তৈরি করা পণ্য ও দ্রব্য বিক্রি করে যে লভ্যাংশ পাওয়া যায়, তার অর্ধেক অর্থও পারিশ্রমিক হিসেবে বন্দিদের দেওয়া হবে। সরকারের এসব মানবিক উদ্যোগ সফল হোক-এমনটি প্রত্যাশা আমাদের।