মাদকাসক্ত হয়ে উঠার পেছনের কারণ এবং প্রতিকারের উদ্যোগ

সৈয়দ মুহম্মদ জুলকরনাইন

38

মদ হচ্ছে এমন একটি বস্তু যা মত্ততা সৃষ্টি করে। মত্ততা ইংরেজিতে গধফহবংং অর্থাৎ উন্মাদ। উন্মাদনা সৃষ্টিকারী সকল বস্তুই মাদক। আমাদের দেশে সাধারণত পাগল শব্দের রুচিশীল ব্যবহার হচ্ছে উন্মাদ। একজন মানুষ যতক্ষণ তার কথাবার্তা, আচার-আচরণ, লেনদেনের ক্ষেত্রে সঠিক থাকবে ততক্ষণ পর্যন্ত তাকে উন্মাদ বা পাগল বলা অন্যায়। কিন্তু যখন তার বিপরীত পরিলক্ষিত হয় অর্থাৎ কেউ যদি অমানবিক, অবিচার, অসত্য ও অশালীন আচরণ করে তখন তাকে উন্মাদ বা পাগল হিসেবে ধরে নেয়া হয়। পাগল হলে মানুষ তার ব্যক্তিত্ব, সামাজিক মর্যাদা ও পদ-পদবী হারায়। এখন বিবেচনার বিষয় হচ্ছে উন্মাদনা সৃষ্টিকারী যে সকল বস্তু বা দ্রব্য তা সেবন, পান বা সূচিপ্রয়োগের মাধ্যমে মানব সন্তানেরা তার শ্রেষ্ঠত্ব হারাতে চাইবে কেন। ইসলামী শরিয়ত বলছে মাদক মানুষের জ্ঞান-বুদ্ধির বিলুপ্তি ঘটায়। যখন মানুষের জ্ঞান-বুদ্ধি না থাকে তখন সে সমাজে অচল। মূল্যহীন হয়ে পড়ে তার জীবন। মাদকাসক্তদের এক পর্যায়ে স্বীয় অস্তিত্বের প্রতি ঔদাসীন্য চলে আসে। মনে বিরাজ করে বিশাল শূন্যতা। এমনি পরিস্থিতিতে তারা অত্যন্ত বেপরোয়া হয়ে উঠে। জীবনের প্রতি বেঁচে থাকার প্রতি কোন যত্ন থাকে না। মাদককে অবলম্বন করে তারা শুধু মানসিক অস্থিরতা থেকে মুক্তি পেতে চায়। এর ধারাবাহিকতায় যত বেশি দিন যাবে মাদকের পরিমাণও তত বাড়তে থাকবে। যার ফলশ্রæতিতে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যায়। কিড্নি হারিয়ে ফেলে কার্যকারিতা, যক্ষা, জন্ডিস, হেপাটাইটিস, ব্রংকাইটিস, নিউমোনিয়া, ক্যান্সার ইত্যাদি মারাত্মক রোগে আক্রান্ত হয়। এ মাদকের শেষ পরিণতি মৃত্যু। মৃত্যুমুখে ঠেলে দেয় এমন বস্তু মাদকের প্রতি মানুষের আসক্তি কেন ? এক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে মানুষের লিপ্সা যখন বেড়ে যায় বা অতিমাত্রায় ভোগ-বিলাসের প্রতি ঝুঁকে পড়ে তখন সে অত্যন্ত আত্মকেন্দ্রিক হয়ে উঠে। পরিবার, সমাজ, রাষ্ট্র সম্পর্কে তার দায়িত্ব ও কর্তব্য বেমালুম ভুলে গিয়ে যে কোনভাবে সে শুধু ঐ উপভোগ্য বস্তুটিই পেতে চায়। পাওয়ার অদম্য বাসনা বা অভিলাষ চিন্তা চেতনায় ধারণ করলে সে আসক্ত। বিভিন্ন জিনিসের প্রতি মানুষ আসক্ত হতে পারে। মাদকের প্রতি যাদের আসক্তি কাজ করে তারাই মাদকাসক্ত। মাদকাসক্ত ব্যক্তি মাদক ব্যবহারে অভ্যস্ত হয়ে উঠলে তা নিয়মিত পাওয়ার জন্যে ব্যাকুল ও অশান্ত হয়ে উঠে। ধৈর্যচ্যুতি এমন পর্যায়ে পৌঁছে মাদকের জন্যে বা মাদকের বিনিময়ে সে সবধরনের দুষ্কর্ম করতে পারে। মাদকের অর্থ সংকুলানের জন্যে যা খুশি তাই করা শুরু করে। জঘন্য অপরাধ যেমন- চুরি, ডাকাতি, ছিনতাই, খুন, গুম ও পতিতাবৃত্তির মাধ্যমে ভয়ঙ্কর হয়ে উঠে। বিঘিœত হয় জন নিরাপত্তা। পুরা সমাজের জন্যে সমস্যার সৃষ্টি হয়। এ কারণেই সমাজের কোন একজন সদস্য বিপথগামী হলে সামাজিকভাবে তাকে শোধরানোর চেষ্টা করা উচিৎ। সাথে এটাও ভেবে দেখা উচিৎ, বর্তমানে সামাজিক রীতি-নীতি, আচার-ব্যবহার বা প্রথা পদ্ধতিতে এমন কোন উপাদান বিদ্যমান কিনা যার কারণে মানুষ সততা, সৎসঙ্গ, সৎপথ হারিয়ে বিপথগামী হয়ে উঠছে?
মাদকাসক্ত হয়ে উঠার পেছনে কৌতুহল একটি বিষয়। এ পর্যায়ে মাদকের প্রতি যাতে কারো কৌতুহল না জাগে সে ধরনের পরিবেশ নিশ্চিত করতে ধর্মীয় মূল্যবোধের বিকল্প নেই। আমাদের আচার-আচরণ, কথা-বার্তা, বিশ্বাস বৈশিষ্ঠ্যে পরিবর্তন আনতে পারলে এবং ন্যায়সঙ্গত, যৌক্তিক, হিতকর ও শুদ্ধ-শুভ্র উপাদান থাকলে মাদকের প্রতি কৌতুহল কমে আসবে। একটি মাদকমুক্ত সমাজ বর্তমানে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় দাবি। কিন্তু যতদিন ন্যায়-বিচারের অভাবে, সমতার অভাবে, মানবিকতার অভাবে সমাজে হতাশা ও অস্থিরতা থাকবে ততদিন মরণনেশা মাদক একটি অবলম্বন হিসেবে ধরা দেবে একশ্রেণীর মানুষের কাছে। এটি অবশ্যই অজ্ঞতার কারণে, ব্যক্তিত্বহীন মানুষের জন্যে। কিন্তু তার চেয়েও উল্লেখযোগ্য হচ্ছে বাংলাদেশে মাদকদ্রব্যের সহজলভ্যতা, ভৌগলিক সুবিধের ফলে ফেনসিডিল, গাঁজা, ইয়াবা, হাশিশ, হিরোইন, কোকেন ইত্যাদির অনুপ্রবেশ, পারিবারিক শিথিলতার কারণে মাদকাসক্ত বন্ধু-বান্ধবের সঙ্গ, নিয়ন্ত্রণহীন স্যাটেলাইট সংস্কৃতির প্রভাব। এছাড়া অবাঞ্ছিত রাজনৈতিক বিশৃঙ্খলা, যথাযথ কর্তৃপক্ষের সঠিক তদারকি এবং বেকারত্বও অনেকাংশে দায়ী। সরকার আছে রাজনীতি নিয়ে। হতাশা দূর করার জন্যে, বেকারত্বের অবসান ঘটাতে কর্মসংস্থান সৃষ্টির নিরবচ্ছিন্ন চেষ্টা সরকার করেছে বলে মনে হয়নি। বিদেশি বিনিয়োগ আকৃষ্ট করতে রাস্তা-ঘাট উন্নয়ন, ট্রাফিক জ্যাম নিয়ন্ত্রণ, বিদ্যুৎ ও গ্যাসের চাহিদা মেটানো সর্বোপরি আমলাতান্ত্রিক জটিলতার কারণে আশানুরূপ বিনিয়োগ হয়নি। একইভাবে দেশি উদ্যোক্তারাও ভরসা পাচ্ছে না। উপরন্তু আর্থিক খাতে ব্যাপক অনিয়ম ও দুর্নীতি জাতিকে আরো হতাশায় নিমজ্জিত করেছে। হতাশা ভর করেছে বিশাল যুব সমাজের উপর। ইয়াবার ভয়ঙ্কর পরিণতির লিড নিউজ করেছে স্থানীয় দৈনিক পূর্বদেশের ৭ জুন ২০১৮ সংখ্যায়। দেশের ৭০ থেকে ৮০ লাখ মানুষ ক্রেজি মেডিসিন ‘ইয়াবা’য় আসক্ত হলেও তন্মধ্যে ৬০ শতাংশ তরুণ। ঔড়ঁৎহধষ ড়ভ ঐড়ংঢ়রপব ধহফ চধষষরধঃরাব ঘঁৎংরহম তথ্য দিয়েছে যে, মাদক সেবনকারীদের ৫৬.১ শতাংশ বেকার বা ছাত্র। বন্ধু-বান্ধবের প্ররোচনাতে মাদকসেবি হয়ে উঠছে ৮৫.৭ শতাংশ, যার মধ্যে রয়েছে ২০.৬ শতাংশ নারী। আমাদের পার্শ্ববর্তী দেশ মায়ানমার হতে জঘন্য (ঝযড়পশরহম) বা উবারষরংয মাদক ‘ইয়াবা’ আশা শুরু করে ২০০০ সালে। কক্সবাজার জেলার সীমান্তবর্তী উপজেলা টেকনাফ দিয়ে আসা ইয়াবা বাণিজ্যে জড়িত রয়েছে ৬০ জন গড্ফাদারসহ ১২শত ব্যবসায়ী। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে তালিকা রয়েছে কিন্তু অপরাধীরা কারাগারে নেই। বাংলাদেশ সরকার মায়ানমারকে অনুরোধ করেছে ইয়াবা চালান বন্ধে পদক্ষেপ নিতে অথচ চালানতো বন্ধ হয়েইনি বরং মাদক ব্যবসায়ীরা অভিনব পন্থায় প্রতিনিয়ত বাংলাদেশের অভ্যন্তরে নিয়ে আসছে ইয়াবা। কখনো নারিকেল, মোটর সাইকেলের তেলের ট্যাংক কিংবা বেগুনের ভেতর এমনকি সাপুড়ের বাক্সে করেও চালান আসছে।
এ দেশের তরুণ সমাজ জাতির অহংকার। কিন্তু বেকারত্বের অভিশাপ, সামাজিক অস্থিরতা সর্বোপরি রাজনৈতিক বিশৃঙ্খলার কারণে দেশের তরুণ সমাজসহ সমগ্র জাতি আজ এক অনিশ্চিত ও অন্ধকার ভবিষ্যতের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। সুশাসন, সুব্যবস্থাপনা ও সুবিন্যস্ত শিক্ষাকার্যক্রম গ্রহণ করার মাধ্যমে সুনাগরিক তৈরি করতে না পারলে বহু ত্যাগ ও সংগ্রামের বিনিময়ে যে টুকু অর্জন তাও ভেস্তে যাবে। সুতরাং সরকার মাদক নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে ক্রসফায়ারকে সমাধান মনে করলে লক্ষ্য অর্জিত হবে না। ক্রসফায়ারের যৌক্তিকতা জনগণ দাবী করতেই পারে। এমতাবস্থায় সরকারের উচিৎ হবে রাজনৈতিকভাবে ঐক্যমতের ভিত্তিতে মাদকের সমস্যার সমাধানের পথ বের করা। বেকারত্ব কমিয়ে এনে সামাজিক অস্থিরতা দূর করা এবং ধর্মীয় মূল্যবোধের প্রচার প্রসার ঘটিয়ে অনতিবিলম্বে অপসংস্কৃতির কবল থেকে জাতিকে রক্ষা করার দৃঢ় পদক্ষেপ নেয়া। তবেই জনমনে স্বস্থি আসবে। জাতি হবে নিরাপদ।

লেখক : প্রাবন্ধিক