মাতৃভাষা বাংলা চর্চায় মধ্যযুগীয় কবি আবদুল হাকিম সোহেল মো. ফখরুদ-দীন

58

মধ্যযুগের কবি আবদুল হাকিমের কন্ঠে ও কলমে যিনি আজ হতে পৌন চারশত বছর আগে মাতৃভাষা বাংলাকে সম্মান ও মর্যাদার আসনে পবিত্র ভাষা রূপে প্রতিষ্ঠার জন্য লিখেছিলেন, “যে সবে বঙ্গেত জন্মি হিংসে বঙ্গবাণী/ সে সব কাহার জন্ম নির্ণয় ন জানি।/ দেশি ভাষা বিদ্যা যার মনে না জুয়ায়/ নিজ দেশ ত্যাগী কেন বিদেশে ন যায়।” সেই মাতৃভাষা বাংলা আজ বিশ্ব দরবার মর্যাদার আসনে অধিষ্টিত। বাংলা আজ রাষ্ট্র ভাষার আঙ্গিনায় থেকে বিশ্ব ভাষা রূপে পরিণত হয়েছে। বাংলা ভাষা চর্চা আজ উন্নত বিশ্বের বিদ্যাপীঠে গবেষণা চলছে। বাংলা সাহিত্যের প্রাচীন নন্দিত ইতিহাস আজ বহু ভাষায় অনুবাদ হচ্ছে। এটি কবি আবদুল হাকিমের কলমী যুদ্ধের ভাষা রক্ষার আন্দোলনের সফলতা। কবি আবদুল হাকিমের কাব্যের বিশেষ দিক হচ্ছে তিনি বাংলা ভাষার প্রতি জোড় দিয়েছেন ও মাতৃভাষার দরদ প্রকাশ করেছেন। প্রাচীন কাল থেকে মুসলমানদের মধ্যে বাংলা ভাষার প্রতি অনীহা ছিল। হিন্দুরা মুসলমানদের বাংলা ভাষার প্রতি বিরাগকে গ্রাহ্য করতো না। মুসলমান অভিজাত শ্রেণী আরবি ও ফার্সিকে বিশেষ মূল্য দিতেন। বাংলা ভাষার প্রতি অবহেলা কবি আবদুল হাকিমকে মর্মাহত করে। তাই মাতৃভাষা বাংলার প্রতি অকৃত্রিম দরদ তাঁর কাব্যে ফুটে উঠেছে। এর আগে কোন কবির কাব্যে বাংলা ভাষার প্রতি এমন মমতার নজীর নেই। স¤প্রতি কবি আবদুল হাকিম স্মৃতি পরিষদের আন্দরকিল্লা কার্যালয়ে কবি আবদুল হাকিম স্মৃতি পরিষদের সভাপতি কবি ছড়াকার নজরুল ইসলাম চৌধুরীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত হয়। কবির জন্মভ‚মি খ্যাত চট্টগ্রাম জেলায় আয়োজিত এই সভায় প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন জাতীয় কবিতা মঞ্চের কেন্দ্রীয় সভাপতি শতাধিক গ্রন্থপ্রনেতা কবি মাহমুদুল হাসান নিজামী। প্রধান আলোচক হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বিশিষ্ট ইতিহাস গবেষক চট্টগ্রাম ইতিহাস চর্চা কেন্দ্রের সভাপতি সোহেল মুহাম্মদ ফখরুদ-দীন। আলোচনায় অংশগ্রহণ করেন, সাংবাদিক এ,কে,এম, আবু ইউসুফ, সাংবাদিক সোহেল তাজ, আনিসুল হক, মোঃ ছগির আহমদ চৌধুরী, জাওয়াদুল করিম, নজরুল ইসলাম চৌধুরী, অধ্যাপক হাবীবুল ইসলাম, মোঃ আবদুর রহিম, জান মোহাম্মদ।
মধ্যযুগের কবি আবদুল হাকিমের জন্মভ‚মি চট্টগ্রাম জেলার সন্দ্বী্পে অবস্থিত। এই ইতিহাস নিয়ে দেশ-বিদেশের খ্যাতিমান গবেষকগণ গবেষণা করেছেন। উল্লেখ্যযোগ্য অনেক ইতিহাসবিদদের গবেষণায় প্রমাণিত হয়েছে মধ্যযুগের কবি আবদুল হাকিমের জন্মভ‚মি চট্টগ্রাম জেলার স›দ্বীপের সুধারামপুরে জন্মগ্রহণ করেন ১৬২০ খ্রিষ্টাব্দে। স্বদেশের ও স্বভাষার প্রতি তাঁর ছিল অটুট ও অপরিসীম প্রেম। তাঁর আটটি কাব্যের কথা জানা গেছে। নূরনামা তাঁর বিখ্যাত কাব্যগ্রন্থ। তাঁর অন্যান্য উল্লেখযোগ্য কাব্যগ্রন্থ হলঃ জোলেখা, লালমতি, সয়ফুলমুলুক, শিহাবুদ্দিননামা, নসীহতনামা, কারবালা ও শহরনামা। কবি আবদুল হাকিম ১৬৯০ খ্রিষ্টাব্দে মৃত্যুবরণ করেন। বাংলা ভাষা ছাড়াও তিনি আরবি, ফার্সি ও সংস্কৃত ভাষায় পারদর্শী ছিলেন। বাঙালি হিসেবে তাঁর গর্ববোধ ছিল। কবি আবদুল হাকিমের জন্মগত কারণে চট্টগ্রাম তথা স›দ্বীপবাসী আজও গর্বিত। আমাদের বাঙালি জাতির ও বাংলা সাহিত্যের শ্রেষ্ঠ সম্পদ কবি আবদুল হাকিম। কবি জন্ম পরবর্তী সময়ে একশ্রেণির লোকের বাংলা ভাষার প্রতি অবজ্ঞার জবাবে তিনি তাঁর নূরনামা কাব্যে লিখেছিলেন: “যে সব বঙ্গেত জন্মি হিংসে বঙ্গবাণী।/সে সব কাহার জন্ম নির্ণয় ন জানি।”
মূলত বায়ান্নের ভাষা আন্দোলন, এর পরবর্তীতে বাঙালি জাতির স্বাধিকার আন্দোলন মহান স্বাধীনতা-এসব কিছুতেই কবি আবদুল হাকিমের ‘বঙ্গবাণী’ কবিতা বিশাল ভ‚মিকা রাখে। মাতৃভাষা বাংলা আন্দোলনে প্রতিটি ভাষা সৈনিকদের রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনের গুরুত্বপূর্ণ সভা, সেমিনার, মিছিল, সিম্পোজিয়াম ও ভাষণে মধ্যযুগের কবি আবদুল হাকিমের এই অমর কবিতা দিয়ে শুরু এবং শেষ। বাঙালি জাতিকে ভাষা আন্দোলনে উদ্বুদ্ধ করতে কবি আবদুল হাকিমের “নূরনামা” কাব্যের ‘বঙ্গবাণী’ কবিতা প্রেরণা ও সাহস যুগিয়েছে। পৃথিবীতে বাঙালি একমাত্র জাতি, যাঁরা প্রিয় মায়ের ভাষা রক্ষার জন্য রাজপথে রক্ত দিয়ে ভাষাকে অক্ষুণ্ণ রেখেছেন। আমাদের সেই মধ্যযুগের বিখ্যাত কবি আবদুল হাকিম তাঁর কণ্ঠ ও কলমে যে আহবান ভাষা রক্ষার জন্য কাজ করেছিলেন সেই আহবানের সূত্র ধরে ভাষা আন্দোলন ও স্বাধীনতা। বাঙালি জাতির ইতিহাসে চট্টগ্রাম একটি বিপ্লবী নাম। বলা হয় চট্টগ্রামকে বিপ্লবতীর্থ ভ‚মি। কবি আবদুল হাকিম থেকে শুরু করে মহাকবি আলাওল, মহাকবি নবীনচন্দ্র সেন, মুন্সি আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদ, আবদুর রশিদ সিদ্দিকী, বিপ্লবী হাবিলদার রজব আলী, বিপ্লবী মাস্টারদা সূর্যসেন, বিপ্লবী প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার, কাজেম আলী মাস্টার, মাওলানা মনিরুজ্জামান ইসলামাবাদী, ডিপুটি শাহ মুহাম্মদ বদিউল আলম, মাওলানা আবদুল হামিদ ফখরে বাংলা, বিপ্লবী মহেশ চন্দ্র বড়–য়া, মহিম চন্দ্র দাশ, কবিয়াল রমেশ শীল প্রমুখ উদ্ভাসিত ব্যক্তিবর্গ এই চট্টগ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁদের সমাজকর্ম, রাজনীতি, শিক্ষা-দীক্ষা, সাহিত্য ও জীবনকর্মের মাধ্যমে এই চট্টগ্রামকে তাঁরা সমগ্র উপমহাদেশে প্রচার প্রসার করে চট্টগ্রামকে নন্দিত করেছেন। এই ক্ষণজন্মা মহাপুরুষদের কারণে চট্টগ্রামের মানুষ আজও গর্ব করে বলতে পারে, আমরা চট্টগ্রাম তথা বাংলাদেশের গর্বিত মানুষের উত্তরাধিকার। দুর্ভাগ্য হলেও সত্য যে মধ্যযুগ ও তার পরবর্তী সময়ের আলোকিত এই ক্ষণজন্মা মানুষগুলোর ইতিহাস এই প্রজন্মের অনেকের কাছে অজানা। আমাদের প্রত্যেকের উচিত যাঁরা দেশ, জাতি ও মানুষের কল্যাণে কাজ করে উদ্ভাসিত হয়েছেন তাঁদের জীবনকর্মগুলো বর্তমান প্রজন্মের কাছে তুলে ধরা। চট্টগ্রামের ইতিহাস ইতিহ্যের এই নন্দিত মানুষগুলো ইতিহাস আমাদের প্রজন্মের ছেলেমেয়েরা জানলে সমাজে আলোকিত মানুষ জন্মাবে। মধ্যযুগের কবি আবদুল হাকিমের সেই “নূরনামা” কাব্যের ‘বঙ্গবাণী’ কবিতা যেমন মাতৃভাষা বাংলা রক্ষা আন্দোলনের সূচনা হয় আর ১৯৫২ সালে সেই মাতৃভাষা আন্দোলনের সফল সুচারুভাবে সম্পন্ন করেন ভাষা আন্দোলনের স্থপতি খ্যাত এদেশে প্রথম মিরপুর বাংলা কলেজের প্রতিষ্ঠাতা, ভাষা আন্দোলনের একমাত্র মুখপাত্র সাপ্তাহিক সৈনিক পত্রিকার সম্পাদক অধ্যক্ষ আবুল কাশেম এর মাধ্যমে। সে অধ্যক্ষ আবুল কাশেমের জন্মভ‚মিও চট্টগ্রাম জেলার চন্দনাইশে। মূলত মাতৃভাষা বাংলা আন্দোলনের সূচনা ও পাকিস্তানের হারিয়ে সফলভাবে মাতৃভাষার মর্যাদা দান ও সাংবিধানিক দাবি আদায়ের সূচনা এই চট্টগ্রাম থেকে। চট্টগ্রামবাসী সেই মধ্যযুগের কবি আবদুল হাকিমের মৃত্যুবার্ষিকী পালনের মাধ্যমে অতীতের সোনালী ইতিহাস বর্তমান প্রজন্মের কাছে সুন্দরভাবে তুলে ধরেছেন। কবি আবদুল হামিককে স্মরণ করে বন্ধুবর বিশিষ্ট সাংবাদিক অধ্যক্ষ মোক্তাদের আজাদ খান ২৮ ফেব্রæয়ারি ২০২০ শুক্রবার বিকেলে চট্টগ্রাম প্রেসক্লাব মিলনায়তনে একটি গুরুত্বপূর্ণ সেমিনারের আয়োজন করেছে। এই আয়োজনে কবিকে মর্যাদাদান সহ নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরার এই প্রয়াসকে সাধুবাদ জানাই।