মহেন্দ্রলাল সরকার (১৮৩৩-১৯০৪)

6

মহেন্দ্রলাল সরকার ভারতের প্রথম জাতীয় বিজ্ঞান সমিতি ইন্ডিয়ান অ্যাসোসিয়েশন ফর দি কাল্টিভেশন অব সায়েন্স-এর প্রতিষ্ঠাতা। তিনি রাজা রামমোহন রায়ের মৃত্যুর বছর ১৮৩৩ খ্রিস্টাব্দে হাওড়া জেলায় জন্মগ্রহণ করেন। রাজা রামমোহন হলেন প্রথম ভারতীয় যিনি ১৮২৩ খ্রিস্টাব্দে লর্ড আমহার্স্ট-এর কাছে বিজ্ঞান শিক্ষার বিষয়ে একটি পত্রের মাধ্যমে আবেদন জানিয়েছিলেন। ভারতে বিজ্ঞান প্রসারের ক্ষেত্রে মহেন্দ্রলাল ছিলেন দিশারী। মেধাবী ছাত্র মহেন্দ্রলাল হেয়ার স্কুল ও হিন্দু কলেজে অধ্যয়ন করেন। বিজ্ঞান শিক্ষার জন্য তাঁর যে আগ্রহ তা হিন্দু কলেজের প্রাথমিক বিজ্ঞান শিক্ষা দ্বারা মেটে নি। তাই তিনি উচ্চতর বিজ্ঞান ও চিকিৎসাশাস্ত্র অধ্যয়নের জন্য কলকাতা মেডিক্যাল কলেজে ভর্তি হন। ১৮৬২ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে তিনি আই.এম.এস (ওগঝ) ও এম.ডি ডিগ্রি লাভ করেন। চন্দ্র কুমার দে’র পরে তিনিই হলেন কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে দ্বিতীয় এম.ডি। একজন সেরা এলোপ্যাথ হিসেবে তিনি চিকিৎসা শুরু করেন এবং ব্রিটিশ মেডিকেল এসোসিয়েশনের কলকাতা শাখার একজন সক্রিয় সদস্য হন। মরগান লিখিত ‘চযরষড়ংড়ঢ়যু ড়ভ ঐড়সবড়ঢ়ধঃযু’ অধ্যয়নের পর মহেন্দ্রলাল হোমিওপ্যাথি চর্চা শুরু করেন এবং সে সময়ের খ্যাতনামা হোমিওপ্যাথ রাজেন্দ্রলাল দত্তের ক্লিনিকে যোগ দেন।
পরবর্তী সময়ে ইবহমধষ গবফরপধষ অংংড়পরধঃরড়হ (ইগঅ) প্রদত্ত বক্তৃতায় তিনি চিকিৎসা পদ্ধতি হিসেবে হোমিওপ্যাথিকে এ্যালোপ্যাথির চেয়ে শ্রেয়তর বলে ঘোষণা করেন। এ কারণে কলকাতার ব্রিটিশ চিকিৎসকগণ তাকে অ্যাসোসিয়েশন থেকে বহিষ্কার করেন। কিছুকালের জন্য চিকিৎসা ক্ষেত্রে তাঁর পসার কমে যায়। কিন্তু ধীরে ধীরে তিনি হোমিওপ্যাথি চিকিৎসার জন্য রোগী সংগ্রহ করতে সক্ষম হন। পরবর্তী সময়ে তিনি দেশের সবচেয়ে বিখ্যাত হোমিওপ্যাথ চিকিৎসকে পরিণত হন। মহেন্দ্রলাল একটি জাতীয় বিজ্ঞান সমিতি প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে ১৮৬৭ খ্রিস্টাব্দ থেকে যে প্রচারণা শুরু করেন, তাতে তাঁর খ্যাতি চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে। তিনি ভারতীয়দের অর্থায়ন, নিয়ন্ত্রণ ও ব্যবস্থাপনায় পরিচালিত এবং গবেষণাসহ একটি স্বায়ত্তশাসিত সমিতি প্রতিষ্ঠার সুপারিশ করেন। তিনি বিশ্বাস করতেন যে এর মাধ্যমে একদল ভারতীয় বিজ্ঞানীর সৃষ্টি হবে, যাঁরা জাতীয় পুনর্গঠনে নিজেদের উৎসর্গ করবেন। এই প্রচেষ্টার প্রতি ব্রিটিশ সরকার নীরব থাকেন, এমনকি দেশের একটি মহল টেকনিক্যাল ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠার প্রস্তাব করে তাঁর মতের বিরোধিতা করেন। অন্যদিকে তাঁর প্রস্তাবের সপক্ষে দেশীয় বুদ্ধিজীবী ও বিত্তশালী অভিজাত শ্রেণির কাছ থেকে বিপুল সাড়া পাওয়া যায়।
১৮৭৬ খ্রিস্টাব্দে ইন্ডিয়ান অ্যাসোসিয়েশন ফর দি কাল্টিভেশন অব সায়েন্স প্রতিষ্ঠিত হয় এবং কলকাতার ২১০ বৌবাজার স্ট্রীটে এর দপ্তর স্থাপিত হয়। তিনি সাফল্যের সঙ্গে এই সংগঠনের সাথে বিশিষ্ট ভারতীয় বিজ্ঞানীদের সম্পৃক্ত করেন। তিনি নিজে বিদ্যুৎ, চুম্বকত্ব, চক্ষুবিদ্যা, জীবতত্ত¡ ইত্যাদি বিষয়ে বহু বক্তৃতা প্রদান করেন। জীবনের শেষ দিকে এই ভেবে তিনি দুঃখ প্রকাশ করেন যে, প্রয়োজনীয় আনুকূল্যের অভাবে এই অ্যাসোসিয়েশন রয়্যাল ইনস্টিটিউটের মর্যাদা পায়নি। কিন্তু তা সত্তে¡ও এটি বিশ শতকে ভারতের অন্যতম অগ্রবর্তী জাতীয় বিজ্ঞান ইনস্টিটিউটগুলির মর্যাদা লাভ করে। তাই মহেন্দ্রলাল ভারতে জাতীয় বিজ্ঞানের জনক হিসেবে অমর হয়ে আছেন। তাঁর মৃত্যু হয় ১৯০৪ সালে। সূত্র : বাংলাপিডিয়া