মহিউদ্দিন যুগ শেষ নওফেল যুগ শুরু

নিজস্ব সংবাদদাতা

64

জন্ম ১৯৪৪ সালের ১ ডিসেম্বর। রাজনীতির শুরুটা ১৯৬৫ সালে সিটি কলেজে। এইচএসসিতে পড়াকালীন সময়ের রাজনীতির পাঠ নিয়েছিলেন। একঝাঁক উদ্যমী তরুণের সমন্বয়ে সে সময় সিটি কলেজ প্রগতিশীল রাজনীতির ধারায় উদ্ভাসিত হয়েছিল। এর মধ্যে সামনের সারির একজন ছিলেন মহিউদ্দিন চৌধুরী। ১৯৬৭ সালে গ্র্যাজুয়েশন শেষ করে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগের স্নাতকোত্তর শ্রেণিতে ভর্তি হন। ছাত্র রাজনীতির প্রতি নেশার কারণে তিনি মুজিববাদী ছাত্রলীগের হয়ে চাকসু নির্বাচনে ভিপি প্রার্থী হন। সফলতা ধরা না দিলেও হাল ছাড়েননি সে সময়ের টগবগে তরুণ মহিউদ্দিন।
ছাত্র রাজনীতিতে থিতু হওয়ার সময়েই নগর ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক হয়ে ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের ১১ দফা বিকশিত করেন। নগরের চট্টগ্রাম কলেজ, সিটি কলেজ, কমার্স কলেজ, মেডিক্যাল কলেজ, আইন কলেজ, পলিটেকনিক্যাল ইনস্টিটিউট ও এমইএস কলেজের ছাত্র সংসদ নির্বাচনে ব্যাপক ভূমিকা রেখে আলোচনায় আসেন। নিজের অবস্থান ছিল সিটি কলেজে। প্রতি রবিবার সিটি কলেজে ছাত্র রাজনীতি নিয়ে প্রশিক্ষণ ক্লাস চালু করে রাজনীতিতে নিজের অবস্থান দৃঢ় করেন। যুগ যুগ ধরে এভাবে চালিয়ে আসছিলেন রাজনীতি। ধীরে ধীরে আওয়ামী লীগের রাজনীতির সাথে নিজের সম্পর্ক গাঢ় করেন।
মুক্তিযুদ্ধে অসামান্য অবদান রাখেন তিনি। সমবয়সী নেতাদের সমন্বয়ে চট্টলায় গড়ে তুলেন মুক্তিকামী জনতার দুর্বার ঘাঁটি। বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের পর প্রতিবাদকারীদের মধ্যে সামনের একজন ছিলেন মহিউদ্দিন। স্বৈরাচার শাসক এরশাদের বিরুদ্ধেও চট্টগ্রাম থেকে হুঙ্কার ছাড়েন। নব্বইয়ের দশকে বিএনপি সরকারের বিরুদ্ধে কট্টর অবস্থান নেয়া চট্টগ্রাম আওয়ামী লীগের প্রাণোচ্ছল নেতাদের একজন ছিলেন মহিউদ্দিন। ১৯৯৪ সালে প্রথমবার চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের মেয়র নির্বাচিত হন। বিএনপির তৎসময়ের বাঘা নেতাদের পরাজিত করে দীর্ঘ ১৭ বছর চসিকের চেয়ারে আসীন ছিলেন। এরমধ্যে চট্টগ্রামের যেকোন দুঃসময়ে আমজনতার পাশে দাঁড়ান মহিউদ্দিন।
একজন দক্ষ প্রশাসক হিসেবে চট্টগ্রামের উন্নয়নে এগিয়ে আসেন তিনি। এছাড়া কখনো ফুটপাত হকার, পরিবহন শ্রমিক, রিক্সা-বেবিটেক্সি, হোটেল শ্রমিক, লবণ শ্রমিক, ডক শ্রমিক, বন্দর ইস্যুতে সামনের সারিতে নেতৃত্বে দিয়ে বারবার আলোচনায় আসেন। একদিকে দক্ষ প্রশাসক অন্যদিকে শ্রমিকদের পরম বন্ধু হিসেবে খ্যাতি পান। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত শ্রমিকদের পাশে ছিলেন তিনি। আওয়ামী লীগ নেতা এম.এ মান্নানের মৃত্যুর পর চট্টগ্রাম নগর আওয়ামী লীগের দায়িত্ব নেন মহিউদ্দিন চৌধুরী। একজন বিশ্বস্ত কর্মী হিসেবে এ নেতার উপরই আস্থা রাখেন শেখ হাসিনা। জোট সরকারের আমলে চট্টগ্রামে আওয়ামী লীগের রাজনীতিকে আন্দোলন সংগ্রাম থেকে মোটেই বিচ্যুতি হতে দেননি। এমনকি ওয়ান ইলেভেনের কঠিন দুঃসময়েও নানান বাধা-বিপত্তি টলাতে পারেনি মহিউদ্দিন চৌধুরীকে। কারান্তরীণ হয়েছিলেন। অনেক সুযোগ-সুবিধার প্রস্তাব পেয়েও আপোষ করেননি। এমনকি নিজের প্রাণপ্রিয় ছোট কন্যা টুম্পাকেও জীবিত অবস্থায় দেখতে পাননি। সেদিন মৃত টুম্পাকে দেখেছিলেন।
সর্বশেষ গঠিত নগর আওয়ামী লীগের কমিটিতেও সভাপতির দায়িত্ব পান। আওয়ামী লীগ মানেই মহিউদ্দিন। এ নিয়ে কোন দ্বিধা ছিল না চট্টলায়। কখনো চট্টলশার্দুল, চট্টলবীর, স্বপ্নের ফেরিওয়ালা হিসেবেই সাধারণ মানুষের কাতারে ছিলেন। মুজিব আদর্শের অকুতোভয় সৈনিক হিসেবে সারাজীবন প্রগতিশীল রাজনীতির ফেরি করেছিলেন এ নেতা।
বয়স ফুরিয়ে আসলেও মনের জোরেই টিকেছিলেন এতদিন। নয়তো ১৯৯৫ সালে বাইপাস ও বিগত পাঁচ বছর আগেই কিডনি নষ্ট হলেও রাজপথ ছাড়েননি। এমনকি অসুস্থ হওয়ার দিনও ষ পৃষ্ঠা ১৩, কলাম ১
ষ ৩ পৃষ্ঠার পর
লালদিঘি মাঠে যুবলীগের সমাবেশে বক্তব্য ও বিজয় মেলার কার্যক্রমের উদ্বোধন করেন তিনি। গত ১১ নভেম্বরের আগ পর্যন্ত বিবৃতি, হুঙ্কার, কখনো স্বশরীরে উপস্থিত হয়ে আওয়ামী লীগকে সুসংগঠিত করে রেখেছিলেন। মাঠে ছিলেন, আমজনতার পাশে ছিলেন।
মহিউদ্দিনকে বার্ধক্য টেনে ধরেছিল। এ নিয়ে মহিউদ্দিন শিবিরে যখন ধীরে ধীরে হতাশা ঘিরে ধরছিল তখনই বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনা দিলেন চমক। ২০১৬ সালের ১০ জুলাই আওয়ামী লীগের সর্বশেষ কাউন্সিলে মহিউদ্দিন পুত্র ব্যারিস্টার মুহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেলকে সাংগঠনিক সম্পাদক মনোনীত করেন। আবারো প্রাণোচ্ছ্বল হয় মহিউদ্দিন শিবির। রাজনীতির মাঠ আবারো উজ্জীবিত হয়। দায়িত্ব পান ঢাকা বিভাগের। কেন্দ্রীয় কিংবা ঢাকার নেতা হয়েও পিতার মতো চট্টগ্রামে প্রচুর সময় দিতে থাকেন। কোতোয়ালী আসন থেকে আসন্ন জাতীয় নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ার ইচ্ছা পোষণ করে আলোচনায় আসেন নওফেল। অনেকের মতে, পিতার যোগ্য উত্তরসূরি হিসেবেই তাঁকে প্রতিষ্ঠিত করছেন প্রধানমন্ত্রী। ছাত্রলীগের অগণিত নেতাকর্মীর প্রাণের জায়গাটি ইতিমধ্যে দখল করে নিয়েছেন নওফেল। পিতা মহিউদ্দিনের মৃত্যুতে কি তবে নওফেল যুগের শুরু হলো। ঘুরেফিরে তাই এখন আলোচনায় ‘মহিউদ্দিন যুগের শেষে নওফেল যুগের শুরু।’