মহান স্বাধীনতা দিবস আমাদের প্রেরণা জোগায়

ডা. বরুণ কুমার আচার্য

18

বাঙালি জাতির জীবনে অনন্য এক দিন ২৬ মার্চ। এই দিন মহান স্বাধীনতা ও জাতীয় দিবস। আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধের স্বপ্ন ছিল বিশাল। বাঙালি চেয়েছিল এমন একটি স্বাধীন রাষ্ট্র, যা প্রতিষ্ঠিত হবে কিছু আদর্শের ভিত্তির ওপর। সেসব আদর্শের দিকে ফিরে তাকানোর দাবি নিয়ে এসেছে স্বাধীনতা দিবস। ৪৯ বছর আগে এই দিনে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়ে দেশকে দখলদারমুক্ত করতে সংগ্রামে নামার আহ্বান জানান। বাঙালি জাতির ইতিহাসে সর্বশ্রেষ্ঠ অর্জন একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে স্বাধীন-সার্বভৌম ‘বাংলাদেশ’ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা। সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে দীর্ঘ আন্দোলন-সংগ্রামের স্ফুলিঙ্গে উজ্জীবিত সশস্ত্র জনযুদ্ধের মধ্য দিয়ে অর্জিত হয়েছে আমাদের মুক্তির ইতিহাস, স্বাধীনতার ইতিহাস। স্বাধীনতার ইতিহাস ৩০ লাখ শহীদের আত্মদান আর দুই লক্ষ মা-বোনের ত্যাগ-তিতিক্ষা এবং কোটি বাঙালির আত্মনিবেদন ও সংগ্রামের গৌরবগাথা গণবীরত্বের ইতিহাস। পলাশীর প্রান্তরে বাংলার স্বাধীনতার সূর্য অস্তমিত হওয়ার পর দীর্ঘ আন্দোলন-সংগ্রামের পথ বেয়ে উপমহাদেশের জনগণ পেয়েছিল পাকিস্তান ও ভারত নামক দুটি রাষ্ট্র। এরপর শুরু হয় পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী কর্তৃক বাঙালিদের নতুন করে শোষণ ও পরাধীনতার শৃঙ্খলে বেঁধে রাখার ষড়যন্ত্র। পাকিস্তানি হানাদারদের শোষণ-বঞ্চনার বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ায় বাঙালি জাতি। বাঙালি জাতিকে মুক্তির মহামন্ত্রে উজ্জীবিত করে ধাপে ধাপে স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধের পথে এগিয়ে নিয়ে যান ইতিহাসের মহানায়ক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে ’৪৮-এ বাংলা ভাষার দাবিতে গড়ে ওঠা আন্দোলনের পথ বেয়ে ’৫২-এর রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন, ’৫৪-এর যুক্তফ্রন্ট নির্বাচনে জয়লাভ, ’৫৬-এর সংবিধান প্রণয়নের আন্দোলন, ’৫৮-এর মার্শাল ’ল বিরোধী আন্দোলন, ’৬২-এর শিক্ষা কমিশনবিরোধী আন্দোলন, ’৬৬-এর বাঙালির মুক্তির সনদ ৬-দফার আন্দোলন, ৬৮-এর আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা, ’৬৯-এর রক্তঝরা গণঅভ্যুত্থান, ৬-দফা ভিত্তিক ’৭০-এর ঐতিহাসিক সাধারণ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন, ১৯৭১ সালের ৭ মার্চ বঙ্গবন্ধুর ‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম’খ্যাত কালজয়ী ঐতিহাসিক ভাষণ ও পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে সর্বাত্মক অসহযোগ আন্দোলন প্রভূত ঘটনা প্রবাহের মধ্য স্বাধীনতা অর্জনের চূড়ান্ত লক্ষ্যে ঐক্যবদ্ধ হয়ে ওঠে বাঙালি জাতি। সেদিন তমসাঘন অন্ধকার রাত্রি পেরিয়ে বাংলার আকাশে নতুন সূর্য। হাজারো বাঙালির খুনে রাঙা রক্তিম আভা ছড়ানো ভোরের সেই আলোয় হাজার বছরের দাসত্ব আর ২৪ বছরের পাকিস্তানি শোষণমুক্তির আবাহনগীতি। পরাধীনতার শেকল ভেঙে অমূল্য ঐশ্বর্য, অনন্য সম্মান স্বাধীনতার সূর্যকে ছিনিয়ে আনতে তিরিশ লাখ মুক্তিকামীর রক্তে রঞ্জিত হয়েছিল বাংলার সবুজ ঘাস। সুরমা, কুশিয়ারা, পদ্মা, মেঘনা, যমুনা পেরিয়ে রক্তের ধারা মিশে গিয়েছিল বঙ্গোপসাগরে। ভয়াল কালরাত্রির পোড়া মাটি, লাশ আর জননীর কান্না নিয়ে রক্তে রাঙা নতুন সূর্য উঠেছিল এদিন। ১৯৭১ সালের এ দিনে পাকিস্তানের শোষণ ও দুঃশাসনের নাগপাশ ছিন্ন করে স্বাধীন হয় প্রিয় মাতৃভূমি বাংলাদেশ। জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ২৫ মার্চ দিবাগত মধ্যরাতের প্রথম প্রহরেই বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণার পর শুরু হয় সর্বাত্মক মুক্তিযুদ্ধ। ৯ মাসের সশস্ত্র সংগ্রামের মাধ্যমে এক সাগর রক্তের বিনিময়ে ১৬ ডিসেম্বর অর্জিত হয় মহান বিজয়। প্রতিষ্ঠিত হয় স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ। স্বাধীনতার স্বাদ পায় বাংলার মানুষ। বাঙালির চিরকালের গৌরব আর অযুত অহঙ্কারের এক অবিনশ্বর দিন তাই আজ। দীর্ঘকালের পরাধীনতার গ্লানি আর বিজাতীয় শাসন-শোষণের যাঁতাকল থেকে বেরিয়ে বাঙালির আত্মমর্যাদা প্রতিষ্ঠার ভিত্তি তৈরি হয়েছিল ১৯৭১ সালের এই দিনটিতে। ১৯৭১-এর ২৫ মার্চ কালো রাত্রিতে পাকিস্তানি হানাদারবাহিনী নিরস্ত্র বাঙালির উপর নির্বিচারে গণহত্যা শুরু করলে ২৬ মার্চ প্রথম প্রহরে বাঙালির অবিসংবাদিত নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণা করেন।
বঙ্গবন্ধুর আহ্বানে সাড়া দিয়ে বাংলার মুসলিম, হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টানসহ সর্বস্তরের জনগণ জাতি, ধর্ম, বর্ণ নির্বিশেষে ঐক্যবদ্ধভাবে মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ে। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে ও আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন সরকারের অধিনে পরিচালিত দীর্ঘ ৯ মাসের সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধে ৩০ লাখ শহীদের আত্মত্যাগ ও দুই লক্ষ মা বোনের সম্ভ্রমহানির বিনিময়ে অর্জিত হয় বাংলাদেশের স্বাধীনতা। বিশ্বমানচিত্রে অভ্যুদয় ঘটে স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশ রাষ্ট্রের। বাঙালি জাতির অধিকার আদায়ের এই ধারাবাহিক সংগ্রামে জীবনের ৪ হাজার ৬৭৫ দিন জেলে কাটিয়েছেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। কয়েকবার ফাঁসির কাষ্ঠের মুখোমুখি হয়েছেন, অসংখ্য মিথ্যা মামলায় অসংখ্যবার কারাবরণ করার পরও স্বাধীনতা অর্জনের প্রশ্নে আপোস করেননি। তিনি বাংলার মানুষকে দিয়েছেন একটি স্বাধীন ভূখন্ড, একটি পতাকা, একটি মানচিত্র, জাতীয় সংগীত, সংবিধান, বিশ্বের বুকে গর্বিত পরিচয়। বাংলা, বাঙালি ও বঙ্গবন্ধু একই বৃন্তে তিনটি চেতনার ফুল। বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্জনের মাধ্যমে গরিব-দুঃখী-মেহনতী মানুষের মুখে হাসি ফোটানোই ছিল বঙ্গবন্ধুর সারা জীবনের একমাত্র লক্ষ্য। তিনি জেল-জুলুম-হুলিয়া, শত যন্ত্রণা, দুঃখ-কষ্ট-বেদনাকে সহ্য করে বাংলার কৃষক-শ্রমিক জনতার মুখে হাসি ফোটাতে নিরবচ্ছিন্ন সংগ্রাম চালিয়ে গেছেন। বিশ্বের মুক্তিকামী মানুষের মাঝে বঙ্গবন্ধু চিরদিন অ¤øান থাকবেন এবং বাংলার জনতার হৃদয়ে চিরভাস্বর হয়ে থাকবেন। আজকে স্বাধীনতার ৪৯ বছরে এক নতুন উচ্চতায় বাংলাদেশ। অর্থনৈতিক মুক্তির মাধ্যমে বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সুখী-সুন্দর বাংলাদেশ গড়ে তোলার লক্ষ্যে কাজ করছে তাঁরই সুযোগ্যকন্যা বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তিনি তাঁর সুযোগ্য নেতৃত্বে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন দেশকে এক অনন্য উচ্চতায়। একদিকে ক্ষুধা ও দারিদ্র্যের বিরুদ্ধে যুদ্ধ আর অন্যদিকে সন্ত্রাস-জঙ্গিবাদ নির্মূল করে অসা¤প্রদায়িক দেশ গড়াই বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। তবে জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে আইনশৃঙ্খল বাহিনীসহ সরকারের জিরো টলারেন্স। সাম্প্রতিক সময়ে জঙ্গিবাদের মাথাচাড়া জনমনে আতঙ্ক তৈরি করলেও সরকারের অব্যাহত অভিযান ও শীর্ষ সন্ত্রাসীদের আইনের আওতায় আনার বিষয়টি বহির্বিশ্বসহ প্রশংসিত হচ্ছে সর্বমহলে। আজকের এই বাংলাদেশ বিশ্বে উন্নয়নের রোলমডেল। কিসিঞ্জারের তলাবিহীন ঝুড়ির বদনাম ঘুচিয়ে বাংলাদেশ আজ ‘উন্নয়নশীল দেশ’। জাতিসংঘের অর্থনৈতিক ও সামাজিক পরিষদের উন্নয়ননীতি বিষয়ক কমিটির (সিডিপি) বাংলাদেশকে স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উন্নয়নশীল দেশের কাতারে ওঠার যোগ্যতা অর্জনের স্বীকৃতি দেয় এবং জাতিসংঘ এক স্বীকৃতিপত্রে তা আনুষ্ঠানিকভাবে বাংলাদেশকে জানায়। এর আগে বাংলাদেশ স্বীকৃতি পেয়েছে নিম্ন মধ্যম আয়ের দেশ হিসেবে। ২০২১ সালের মধ্যে বাংলাদেশ মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত হওয়ার স্বপ্ন দেখছে। লক্ষ্য ২০৩০ সালের মধ্যে বিশ্বে দারিদ্র্যমুক্ত দেশগুলোর মধ্যে অন্যতম হওয়া। সেই পথ ধরে ২০৪১ সালে উন্নত দেশে পরিণত হওয়ার স্বপ্নও দেখছে। এই চ্যালেঞ্জ অর্জন করতে বিশাল কর্মযজ্ঞ ইতোমধ্যে শুরু হয়েছে। সেই লক্ষ্যে ১০০টি অর্থনৈতিক অঞ্চল গড়ে তোলার কাজও এগিয়ে চলছে। এবারের স্বাধীনতা দিবস পালিত হচ্ছে মুজিববর্ষের মোক্ষম সময়ে। মহান স্বাধীনতা দিবসের এই দিনে পুরো জাতি সকল বিতর্কের অবসান ঘটিয়ে আজ উৎসবের পাশাপাশি শ্রদ্ধা আর বেদনায় স্মরণ করছে মহান মুক্তিযুদ্ধে নিহত সকল শহীদের। এবং আমার ব্যক্তিগত পক্ষ থেকে মহান মুক্তিযুদ্ধে নিহত সকল শহীদের আত্মার প্রতি গভীর শ্রদ্ধা-সম্মান পোষণ করছি। শ্রদ্ধা নিবেদন করছি মুক্তিযুদ্ধে আত্মোৎর্সগ করা লাখো শহীদ-যোদ্ধাকে। সেই সাথে শ্রদ্ধা জানাচ্ছি স্বাধীন বাংলাদেশের স্থপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, তাজউদ্দীন আহমেদসহ মুক্তিযুদ্ধ পরিচালনাকারী তাঁদের সহকর্মী জাতীয় নেতাদের। মহান মুক্তিযুদ্ধের আদর্শে উজ্জীবিত হোক দেশ, জাতি এবং এই স্বাধীনতা দিবস আমাদের এগিয়ে চলার প্রত্যয় হোক।
লেখক: প্রাবন্ধিক, কলামিস্ট ও মরমী গবেষক