মহান শিক্ষা দিবসের চেতনা ও বর্তমান বাস্তবতা

প্রণব জ্যোতি পাল

20

শিক্ষার আবেদন মানবিক, শিক্ষা হবে সবার জন্য অবারিত, সবার জন্য উন্মুত্ত। শিক্ষা মানুষকে নিজের ও সমাজ সর্ম্পকে ধারণা দেয়। তাই যে জাতি যত শিক্ষীত সেই জাতি তত উন্নত। শিক্ষা ছাড়া মানুষ নিজের ও সমাজ সর্ম্পকে অন্ধকারে থাকে। তাই একটি জাতিকে ধ্বংস করতে হলে তার শিক্ষা নীতিকে দুর্বল করে দিলে হয়। যা ছিল পাকিস্তানের শিক্ষা সচিব এস. এম. শরীফের নেতৃত্বে গঠিত শরীফ কমিশনের রিপোর্টে শাসকগোষ্ঠীর শিক্ষা-পরিকল্পনা। কিন্তু লড়াকু ছাত্রসমাজ শরীফ কমিশনের শিক্ষা সংকোচন নীতি পরিকল্পনার সুপারিশ প্রত্যাখ্যান করে ঐক্যবদ্ধ আন্দোলন গড়ে তোলে। শহীদের রক্তের বিনিময়ে প্রতিষ্টা পায় ১৭ সেপ্টেম্বর “মহান শিক্ষা দিবস”।
১৯৬২ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী শিক্ষা সংকোচন নীতির বিরুদ্ধে আন্দোলন করতে গিয়ে পুলিশের গুলিতে প্রাণ দিয়েছিল মোস্তফা, ওয়াজিউল্লাহ, বাবুলসহ নাম না জানা অসংখ্য ছাত্র। বাংলাদেশের ছাত্রসমাজ প্রতি বছর এই দিনটিকে শিক্ষা দিবস হিসেবে পালন করে আসছে। ১৯৬২ সালের ২৬ আগস্ট পাকিস্তানের শিক্ষা সচিব এস. এম. শরীফের নেতৃত্বে গঠিত কমিটি তার রিপোর্টে শাসকগোষ্ঠীর শিক্ষা-পরিকল্পনা তুলে ধরে। আইয়ুবের সামরিক সরকার ঐ রিপোর্ট গ্রহণ করে বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেয়। কিন্তু এ ভূখন্ডের লড়াকু ছাত্রসমাজ শরীফ কমিশনের সুপারিশ প্রত্যাখ্যান করে ঐক্যবদ্ধ আন্দোলন গড়ে তোলে।
এক পর্যায়ে সর্বদলীয় ছাত্রসংগ্রাম পরিষদ আহুত সাধারণ ধর্মঘট পালন কালে আন্দোলনরত ছাত্রদের উপর পুলিশ ও সেনাবাহিনী গুলি চালায়। শহীদের রক্তস্নাত ১৭ সেপ্টেম্বর “মহান শিক্ষা দিবস” হিসেবে পালিত হয় সার্বজনীন শিক্ষার অধিকার প্রতিষ্ঠার চেতনাকে ধারণ করে। কিন্তু দুঃখের বিষয় স্বাধীন দেশে শিক্ষা ও ছাত্র আন্দোলনের তাৎপর্যপূর্ণ এই ইতিহাস পাঠ্যপুস্তকে অন্তর্ভুক্ত হয়নি, শিক্ষার্থীদের পড়ানো হয় না। ফলে অধিকাংশ শিক্ষার্থীই জানেনা ইতিহাসের এ গৌরবোজ্জ্বল অধ্যায়ের কথা, বঞ্চিত এর তাৎপর্য অনুধাবন থেকে।
১৭ সেপ্টেম্বর ১৯৬২, সর্বাত্মক হরতাল পালিত হয় দেশের সর্বত্র। সকাল ১০ টায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কলাভবনের মূল জমায়েত হয়। বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের হাজার হাজার শিক্ষার্থীর সাথে সর্বস্তরের জনতার ব্যাপক অংশগ্রহণ ঘটে এ কর্মসূচিতে। জগন্নাথ কলেজে ছাত্রদের উপর গুলি হওয়ার খবর শুনে মিছিল দ্রæত বের হয়ে নবাবপুরের দিকে ধাবিত হয়। হাইকোর্টের সামনে অবস্তান গ্রহণকারী পুলিশের সাথে সংঘাতে না গিয়ে মিছিল আব্দুলগনি রোড ধরে অগ্রসর হয়।
তখনই পুলিশ পিছন দিক থেকে মিছিলে হামলা চালায়। এখানে কাঁদুনে গ্যাস ছোড়া হয়, লাঠিচার্জ ও গুলিবর্ষণ করে। মিছিলকারীদের সাথে পুলিশ-সেনাবাহিনীর দ্বিতীয় দফা সংঘর্ষ ঘটে ঢাকা কোর্টের সামনে। এখানে পুলিশ ও ইপিআর গুলিবর্ষণ করে। তারপর সেনাবাহিনী মুল মুল বিক্ষোভস্থলে বিক্ষোভ দমনে আক্রমন চালায়।
সরকারী প্রেসনোটে ঐদিন ১ জন নিহত, ৭৩ জন আহত ও ৫৯ জনকে গ্রেফতারের কথা স্বীকার করা হয়। কিন্তু বাস্তব চিত্র ছিলো আরও ভয়াবহ।
ঢাকায় শহীদ হন বাবুল (ছাত্র), গোলাম মোস্তফা (বাস কন্ডাক্টর) ও ওয়াজিউল্লাহ (গৃহভৃত্য)। দেশের অন্যত্রও ছাত্র-জনতার বিক্ষোভ রক্তাক্ত রুপ ধারণ করেছিল। ঢাকা ও চট্টগ্রামের মিছিলে শ্রমিকদের অংশগ্রহণ ছিল ব্যাপকমাত্রায়। টঙ্গিতে শ্রমিক মিছিলে গুলিবর্ষণ করা হলে সুন্দর আলী নামে এক শ্রমিক নিহত হন। শ্রমিক-ছাত্রের ঐক্যবদ্ধ আন্দোলন এ দেশের আন্দোলনে নতুন মাত্রা যুক্ত করেছিল। পরবর্তী তিন দিন শোক পালন করা হয় এ নারকীয় হত্যাকান্ডের প্রতিবাদে। কালোব্যাজ ধারণ করা হয়।
২৪ সেপ্টেম্বর ১৯৬২, পল্টন ময়দানের ছাত্র সমাবেশ থেকে শরীফ কমিশনের শিক্ষানীতি বাতিল, হত্যার বিচার সহ ছাত্র সমাজের দাবিনামা মেনে নেয়ার জন্য চরমপত্র জারি করা হয়। সরকার ছাত্র-জনতার অভ্যূত্থানের মুখে শিক্ষানীতির বাস্তবায়ন স্তগিত করতে বাধ্য হয়।
যা ছিল শরীফ কমিশনের প্রস্তাবনায় :
“সস্তায় শিক্ষা লাভ করা যায় বলিয়া তাহাদের (জনগণের) যে ভুল ধারণা রহিয়াছে, তাহা শীঘ্রই ত্যাগ করিতে হইবে। যেমন দাম তেমন জিনিস-এই অর্থনৈতিক সত্যকে অন্যান্য ব্যাপারে যেমন, শিক্ষার ব্যাপারেও তেমনি এড়ানো দুষ্কর।” “শিক্ষা সস্তায় পাওয়া সম্বব নয়। বিশেষতঃ বিজ্ঞান, ইঞ্জিনিয়ারিং, কৃষি এবং কারিগরি বিদ্যা ব্যয়বহুল।” “শিক্ষার জন্য জনসাধারণের নিকট হইতে খুব সামান্যই অর্থ সাহায্য পাওয়া গিয়েছে এবং আরও স্কুলের জন্য জনসাধারণ যতটা দাবি জানাইয়া থাকে উহার অনুপাতে ব্যয় বহনের অভিপ্রায় তাদের কখনই দেখা যায় নাই। অবৈতনিক প্রাথমিক স্কুল এবং নামমাত্র বেতনের মাধ্যমিক স্কুল স্থাপনের জন্য সরকারের উপর নির্ভর করাই জনসাধারণের রীতি।
তাহাদিগকে উপলব্ধি করিতে হইবে যে, ‘অবৈতনিক শিক্ষার ধারণা, বস্তুত: অবাস্তব কল্পনা মাত্র। ছেলে-মেয়েদের বিনা বেতনে স্কুলে পড়িলেও শিক্ষকগণকে বেতন দিতে হইবে, উপকরণ ও সরঞ্জাম কিনিতে হইবে এবং স্কুল গৃহ নির্মাণ করিতে হইবে।… অতিরিক্তি অর্থেও ব্যবস্থার জন্য সকল লোককেই আরও বেশী পরিমাণে আর্থিক ত্যাগ স্বীকার করিতে হইবে। প্রাথামিক স্তর সম্পর্কে আমরা প্রস্তাব করিয়াছি যে,স্কুলগৃহের ব্যবস্থা করিবে স্থানীয় অধিবাসীগণ। “…মাধ্যমিক শিক্ষা সম্পর্কে আমরা সুপারিশ করিয়াছি যে, উহার ব্যয়ের শতকরা ৬০ ভাগ বেতন হইতে আদায় করা হউক এবং মাধ্যমিক স্কুলসমুহের পরিচালকগণ ও সরকার প্রত্যেকে শতকরা ২০ ভাগ করিয়া বহন করুক।
… এ ক্ষেত্রে পিতামাতাদের ত্যাগ স্বীকারের পরিমাণ অনেক বৃদ্ধি পাইবে।উচ্চতর শিক্ষার ক্ষেত্রে আশা করা যায় যে আমাদের সুপারিশ অনুযায়ী ছাত্র বেতন বর্ধিত করা হইবে এবং জনসাধারণকেও সেই অনুপাতে ত্যাগ স্বীকার করিতে হইবে। … আমরা দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি যে জনসাধারণ এইসব ত্যাগ স্বীকারে সম্মত হইবে।”
“… আমদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলিকে সর্বোৎকৃষ্ট শ্রেণীর আলেম সৃষ্টির কাজ করিতে হইবে…।”
“… এবং প্রাথমিক স্কুলই আমাদের বেশীর ভাগ ছেলে-মেয়ের শিক্ষা জীবনের শেষ সোপান হইবে।”
“বিশ্ববিদ্যালয়সমূহের গঠনতন্ত্রসমূহের বিধানসমূহ আমরা বিবেচনা করিয়াছি। বিশ্ববিদ্যালয়সমূহের নিয়ন্ত্রণ এবং পরিচালনা ব্যবস্থার উন্নতিকল্পে এই সমস্ত বিধান সংশোধিত হওয়া উচিত বলিয়া আমরা মনে করি…”
সংক্ষেপে বলতে গেলে শরীফ কমিশনের বক্তব্য ছিল শিক্ষা ব্যবস্থা হবে সাম্প্রদায়িক, পরিচালিত হবে বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে, যাদের টাকা আছে তারাই পড়তে পারবে, সবাই শিক্ষার অধিকার পাবে না, উচ্চশিক্ষার দ্বার সবার জন্য উন্মুক্ত হবে না, যারা নিশ্চিতভাবে ঝরে পড়বে তাদের জন্য কারিগরি প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হবে, বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বায়ত্তশাসন থাকবেনা ইত্যাদি।
শিক্ষা দিবসের ৫২ বছর পরেও ছাত্রসমাজের সার্বজনীন শিক্ষার আকাঙ্খা পুর্ণ হয়নি। সারাদেশেই প্রাথমিক, মাধ্যমিক,উচ্চশিক্ষা সর্বস্থরেই চরম নৈরাজ্য চলছে। ঢাক শহরে ৩৪২ টি সরকারী প্রাথমিক স্কুলগুলোর মধ্যে ২৮ টি স্কুল বেদখল হয়ে গেছে। মিরপুর,বেইলী রোডে দুইটি প্রাথমিক স্কুলের ক্লাসরুম ভেঙ্গে জমি দখল করছে ভূমিদস্যুরা। ৩৬০০০ গ্রামে কোন সরকারী প্রাথমিক স্কুল নেই।একই অবস্থা সরকারী মাধ্যমিক স্কুল ও কলেজের। কিন্তু হু হু করে বাড়ছে বেসরকারী কিন্ডারগার্টেন স্কুল-কলেজ, যেখানে পড়তে প্রয়োজন প্রচুর অর্থ।
যেখানে দেশের অধিকাংশ মানুষের সন্তানদেও পড়ানো অসম্ভব। অর্থাৎ গরীব মানুষের সন্তানদের পড়ানোর প্রয়োজন নেই। যার টাকা আছে, শিক্ষা কেনার সামর্থ্য আছে সেই পড়তে পারবে। শিক্ষা আলু পটলের মত একটি পণ্যে পরিণত করা হয়েছে। এ যেন শরীফ কমিশনের, আইয়ুবের শিক্ষানীতির প্রতিধ্বনি! জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অবস্থা সবচাইতে নাজুক। শিক্ষক-ক্লাসরুম সংকট, সেশন জট ইত্যাদির কবলে পড়ে প্রায় ১৫ লক্ষাধিক শিক্ষার্থীর শিক্ষাজীবন বিপর্যস্ত। ৪ বছরের অনার্স কোর্স করতে লাগে ৭-৮ বছর। ৩ বছরের ডিগ্রী কোর্স করতে লাগে ৫-৬ বছর। তাই দেশকে এগিয়ে নিতে হলে সবার আগে প্রয়োজন সার্বজনীন মতামতের ভিত্তিতে একটি শিক্ষা নীতি প্রণয়ন করা যাতে শিক্ষা হবে সবার জন্য অবারিত। শিক্ষা কোন সুযোগ নয়, শিক্ষা হলো সবার অধিকার। এটি মহান শিক্ষা দিবসের প্রত্যাশা।