মহান বিজয় দিবস ও জাতির অঙ্গীকার

মু. এনামুল হক মিঠু

129

আজ মহান বিজয় দিবস। একাত্তরের এই দিনে দখলদার পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর আত্মসমর্পণের মধ্য দিয়ে নয় মাসব্যাপী মুক্তিযুদ্ধের চূড়ান্ত বিজয় অর্জিত হয়েছিল। জাতিকে মেধাহীন ও নেতৃত্বহীন করতে গোলাম আযম, নিজামী, মুজাহিদের চক্রান্তে সৃষ্ট আলবদর-আলশামস বাহিনীর হাতে জীবন দিতে হয় জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তানদের। পৃথিবীর সব স্বাধীন দেশেরই স্বাধীনতা দিবস আছে। কিন্তু বিজয় দিবস নেই। আমরা একই সঙ্গে স্বাধীনতা ও বিজয় দিবসের উত্তরাধিকারী। যে অগণিত শহীদের আত্মত্যাগের বিনিময়ে এই বিজয় সম্ভব হয়েছিল, আমরা তাঁদের গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করছি। একই সঙ্গে স্মরণ করছি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানসহ মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্বদানকারী নেতাদের।
আলোচনার টেবিলে বাংলাদেশের স্বাধীনতা আসেনি, এসেছে রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের মধ্য দিয়ে। পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী এবং তাদের এ দেশীয় তাঁবেদার স্বাধীনতাবিরোধীদের পরিকল্পনা ছিল বাঙালি জাতিকে যেকোনো প্রকারে সুশিক্ষা ও সুযোগ্য নেতৃত্ব থেকে বঞ্চিত ও মেধাহীন পঙ্গু জাতিতে পরিণত করা। এ লক্ষ্যেই পাকিস্তানি স্বৈরশাসকদের এ দেশীয় দালালরা বাঙালি জাতি ও বাংলাদেশের বিজয় অবধারিত জেনে তাদের নীলনকশা বাস্তবায়নের উদ্দেশ্যে ধরে নিয়ে যায় দেশের সর্ববৃহৎ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক, চিকিৎসক, প্রকৌশলীসহ সাংবাদিক তথা মেধাবী ও মুক্তচিন্তার অধিকারী বুদ্ধিজীবীদের। তাই বিজয় দিবস আমাদের জন্য আরও বেশি অর্থবহ। বিজয় দিবস যেমন আমাদের আনন্দের দিন, তেমনি আত্মজিজ্ঞাসারও।
স্বাধীনতার যে ঘোষণাপত্রের মধ্য দিয়ে মহান মুক্তিযুদ্ধ পরিচালিত হয়েছিল কিংবা শহীদদের রক্তের অক্ষরে রচিত সংবিধানে যেসব মূলনীতি ও চেতনার কথা বিবৃত হয়েছিল, সেসব আমরা কতটা ধারণ করছি সেই প্রশ্নও আমাদের করতে হবে। মুক্তিযুদ্ধের মূলকথা ছিল ধর্ম-বর্ণ-জাতি ও নারী-পুরুষ নির্বিশেষে সবাই সম-অধিকার ভোগ করবে। কিন্তু সেই প্রত্যয় থেকে অনেক দূরে চলে এসেছি। তবে এ কথা সত্য যে গেল ৪৮ বছরে অর্থনৈতিক ও সামাজিক ক্ষেত্রে বাংলাদেশের অনেক অর্জন আছে। শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, যোগাযোগ, শিল্প, কৃষি, তথ্যপ্রযুক্তিসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে আমাদের সাফল্য আছে। মানবসম্পদ উন্নয়ন সূচকেও আমাদের অগ্রগতি অনেক উন্নয়নশীল দেশের চেয়ে বেশি। তা সত্তে¡ও স্বীকার করতে হবে যে প্রতিটি নাগরিকের খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থানের চাহিদা পূরণ করা সম্ভব হয়নি। এখনো দেশের উল্লেখযোগ্য সংখ্যক মানুষ শিক্ষার আলো থেকে বঞ্চিত। এখনো বহু মানুষ ক্ষুধা, দারিদ্র্য ও অপুষ্টির শিকার। এসব ক্ষেত্রে আমাদের আরও অনেক কিছু করণীয় আছে। একটি জাতি তার ইতিহাস থেকেই শিক্ষা লাভ করে এবং জাতির গৌরবদীপ্ত ইতিহাস সে জাতির অহঙ্কার। সেই বিজয়ের ইতিহাসের পথ ধরেই জাতি অগ্রসর হবে, অজানা-অচেনাকে জয় করবে। বিজয়ের অবিস্মরণীয় ইতিহাস থেকে শিক্ষা নিয়ে ন্যায়ের পথে অন্যায়-অত্যাচার-অনাচারের বিরুদ্ধে সোচ্চার হবে, প্রতিবাদী হতে শিক্ষা নিয়ে জাতি যথাযথ ভূমিকা রাখবে। নিপীড়িত মানুষের দুঃখ-দুর্দশা লাঘবে জাতি আত্মনিয়োগ করবে, সর্বোপরি চরম ক্রান্তিলগ্নে সর্বোচ্চ ত্যাগ স্বীকারে প্রস্তুত থাকবে।
সর্বোপরি যে ন্যায়ভিত্তিক, গণতান্ত্রিক, সহিষ্ণু ও সমতাভিত্তিক সমাজের স্বপ্ন শহীদেরা দেখেছিলেন, সেই লক্ষ্যে রাষ্ট্রীয় নীতি পরিচালিত হবে, এটাই প্রত্যাশিত। রাজনীতিতে পথ ও মতের পার্থক্য থাকবে, কিন্তু সেটি কখনোই সংঘাত সৃষ্টির কারণ হতে পারে না। দেশব্যাপী মুক্তিযুদ্ধের মহান বিজয়ের জয়গান হোক, ক্ষুধা-দারিদ্র্য-অনাচার-সন্ত্রাসমুক্ত-অসাম্প্রদায়িক-শোষণহীন জাতি হিসেবে বাঙালি বিশ্বসভায় মাথা উঁচু করে দাঁড়াক। বিজয়ের মাসের অঙ্গীকার হোক মুক্তিযুদ্ধবিরোধী একাত্তরের নরঘাতক, মানবতাবিরোধী যুদ্ধাপরাধীদের চলমান বিচার প্রক্রিয়া অব্যাহত রাখার দাবিতে জাতিকে ঐক্যবদ্ধ রাখার। মহান মুক্তিযুদ্ধে আত্মদানকারী শহীদের রক্তঋণ পরিশোধ এবং তাদের স্বপ্ন বাস্তবাযন তথা শোষণহীন সমাজ ও রাষ্ট্রব্যবস্থা বিনির্মাণে ইস্পাত কঠিন শপথ গ্রহণের।
প্রতিটি মানুষ নির্ভয়ে মতপ্রকাশ করতে পারবে; দেশের উন্নয়ন ও জনকল্যাণে যার যার অবস্থান থেকে ভূমিকা রাখবে এটাই হোক এবারের বিজয় দিবসে আমাদের দৃঢ় অঙ্গীকার ।
লেখক : প্রাবন্ধিক