মশক উপাখ্যান

মছিউদ্দৌলা জাহাঙ্গীর

75


যারা জুয়া খেলে এবং যারা মাদক সেবন করে তাদের টাকা নাকি ভূতে যোগায়, আমরা যারা লিখালিখি করি আমাদের খোরাক যোগায় সংবাদপত্র। লিখতে বসলাম কি আর লিখে ফেললাম কি, লিখতে বসেছি অন্য একটি বিষয় নিয়ে পত্রিকায় মশার কান্ড দেখে লেটেস্টের লোভ আর সামলাতে পারলাম না। যেহেতু ‘লেটেস্ট নিউজ’, বোল পাল্টে তাই চলে গেলাম মশাতে। কান্ড দেখুন, মশার কারণেই নাকি শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ফ্লাইট দুই ঘণ্টা দেরী করেছে, মাগো মশার কি ক্ষমতা! এই শাহজালাল বিমানবন্দরটিও দেখছি এক অদ্ভুত জায়গা কিছুদিন আগে সেখানে এক নারী অতিথিকে ইঁদুর কামড়াল, এখন আবার মশা বিমান আটকে দিল! সত্যি সেলুকাস কি বিচিত্র এই বিমানবন্দর, এখানে কখনো সোনার খনি মেলে, কখনো মাদক, কখনো ইঁদুর, এখন আবার মশা। যাক ভালোই হলো, কদিন ধরে শুধু ইতর প্রাণীদের নিয়েই লিখছি, শিয়াল, গাধা, মূষিক, মশক তারপর কাঁথা, বালিশ, তোশক মনে হয় কলি যুগের ‘ঈশপ’ হয়ে যাব। মাফ করবেন কেবল রসিকতা করলাম মাত্র, অতবড় ব্যক্তিত্ব আমি হতে পারবো না, কারণ অত বেশি যোগ্যতা আমার নাই। ঈশপ আমার অনেক প্রিয় ব্যক্তিত্ব, তিনি তো অনেক প্রাণী নিয়ে গল্প বলেছেন, বাঘ-ভাল্লুক-সিংহ, গাধা-ঘোড়া-শিয়াল, গরু-মহিষ-ভেড়া, সাপ-পাখি-পিঁপড়া, ইত্যাদি কতকিছু নিয়ে গল্প বানিয়েছেন। আচ্ছা, মশা নিয়ে কি কোন গল্প তিনি বানিয়েছেন ? না বানিয়ে থাকলে তিনি ঠিক করেন নাই, কারণ এত শক্তিশালী মশা যারা কিনা মালয়েশিয়ান এয়ারলাইন্সের এমএইচ ১৯৭ ফ্লাইটকে দুই ঘণ্টা বিমানবন্দরে আটকে রাখে, তাদের নিয়ে গল্প না বানানো মানে, মশাদের উপর চরম অবিচার করা। অবশ্য ঈশপকে দোষ দিয়ে লাভ নেই, কারণ তাঁর সময় বিমান তো দূরের কথা ভালো একটি ঘোড়ার গাড়ি ছিল কিনা সন্দেহ। ফলে মশারা যে বিমান থামিয়ে দিতে পারে এ কথা ঈশপ ভাববেন কোত্থেকে? তাছাড়া গ্রীসে তখন মশা ছিল কিনা তা নিয়েও তো সন্দেহ আছে, কারণ গ্রীস মনীষীদের মধ্যে কেউ কখনো ম্যালেরিয়ায় মারা গেছেন এমন কোন খবর কখনো শুনা যায়নি। আবার বলা হয় ম্যালেরিয়া নাকি ট্রপিক্যাল ডিজিস অর্থাৎ শীতপ্রধান দেশে মশার কাজ কম, গ্রীস যেহেতু শীতপ্রধান অঞ্চলের দেশ, তাই সেখানেও মশার কাজ কম। ফলে মশা কারো নজরে আসেনি, তাই ঈশপের কোন দোষ নাই। তবে এখানে একটি বিষয় লক্ষণীয় অনেক পশু-পাখি, কীট-পতঙ্গ নিয়ে অনেক গল্প আছে কিন্তু মশা নিয়ে মুখরোচক গল্প তেমন চোখে পড়ে না। এ থেকে প্রতীয়মান হয় ক’শতাব্দী প্রাচীন পৃথিবীতেও মশার উপদ্রব তেমন ছিল না, মনে হয় পৃথিবীতে আবর্জনা তখন কম ছিল, তাই মশা তেমন জন্মাতে পারত না।
ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষদিকে আমরা ডাক্তার রোনাল্ড রস সাহেবকে দেখলাম, মশা নিয়ে বেশ মাতামাতি করতে এবং তাতে তিনি সফলও হয়েছেন, ম্যালেরিয়ার কারণ বের করতে পেরেছেন। আবার আমাদের বিদ্যাসাগর মশায় দারুণ লিখেছেন; রাতে মশা দিনে মাছি এই নিয়ে কলকাতায় আছি। বুঝা যাচ্ছে কলকাতা শহর তখনই নোংরা-আবর্জনায় ভরা ছিল! বলা হয় ফেস ইজ দ্য ইন্ডেক্স অব মাইন্ড, তেমনি মশা-মাছি আর দ্য ইন্ডেক্স অব টাউন। সে সাথে পাতিকাকও একটি নমুনা, শহরে আবর্জনা যত বেশি পাতিকাকও তত বেশি। সকাল বেলায় আবর্জনা খেয়ে বিদ্যুতের তারে গিয়ে দুমদুম ফোটে, মনে হয় ওসব খেয়ে কাকগুলোর নেশা ধরে, তাই তারে বসে মাথা আর ঠিক থাকে না। ফলে দুদলে ঝগডা বা উৎসব করতে গিয়ে অতি মদিরতায় পরস্পর সংস্পর্শে এসে বিপরীত বিদ্যুৎ প্রবাহর কবলে পড়ে গুড়ুম। বলছিলাম মশার কথা, চলে গেলাম কাকের কথায়, আসলে উভয়ে ময়লার বাসিন্দা তো, চলুন আবার মশাতে ফিরে যাই। যা বলছিলাম বস্তুতঃপক্ষে মশা অনেক কিছুর নিদর্শন হলেও মশাকে নিয়ে কিন্তু তেমন কোন কিংবদন্তি নেই। এই যেমন ধরুন মাছিমারা কেরানি আছে কিন্তু মশামারা কেরানি নাই, থাকবেও কোত্থেকে দিনের বেলায় তো আর মশা থাকে না। কেরানিরা তো কাজ করে দিনের বেলায়, মাছিরাও দিনের বেলায় থাকে তাই তো মশারা কিংবদন্তি হতে পারেনি। আবার দেখুন মশাকে তুচ্ছ জ্ঞান করে বলা হয় ‘মশা মারতে কামান দাগা’- হলো কথা, মশারা কি এতই ফেলনা? আরে কামান নয় শুধু, বোমা মেরেও এখন আর কাজ হবে না, মিসাইল, ক্যামিকেল, জীবাণু, রাসায়নিক বোমা, ক্ষেপণাস্ত্র কিছুই কিছু করতে পারছে না। দেখুন গিয়ে পুরা ঢাকা এয়ারপোর্ট দখল করে ফেলেছে মশারা, বিমান উড়াই বন্ধ হয়ে গেছে। কর্তৃপক্ষ কি করবে ভেবে পাচ্ছে না, দফায় দফায় তারা শুধু সিটি কর্পোরেশনের সাথে বৈঠক করছে আর চা খাচ্ছে কাজ কিছুই হচ্ছে না। মেয়র, কাউন্সিলর, পাইক-পিয়াদা, কর্তৃপক্ষ সবাই মিলে কোটি কোটি টাকা খরচ করেও কোন ফায়দা হচ্ছে না। মশারা দেখছি এবার পাইছে সবাইকে, কিংবদন্তি নয় শুধু এবার পুরা সিরিয়েল বানিয়ে ছাড়বে মশারা। মশাকে নিয়ে মস্করা এবার হাড়ে হাড়ে টের পাবে বেটারা।
আসলে মশাকে নিয়ে কিংবদন্তি নাই বললে ভুল বলা হবে, প্রায় পাঁচ হাজার বছর আগে মহান নবী হযরত ইব্রাহিম (আঃ)’র সময় মশাকে নিয়ে সেই বিখ্যাত কিংবদন্তির শুরু। বহুল আলোচিত সেই নমরুদের ঘটনা; ‘মশা একটি নমরুদের নাকের ভিতর দিয়ে মগজে চলে গেল তাতেই শুরু হলো নমরুদের নাচানাচি। মাথায় যতক্ষণ আঘাত করে ততক্ষণ সে ভালো থাকে আঘাত করা বন্ধ করলেই শুরু হয় তার ধাপাধাপি, ফলে চাকর একজন নিয়োগ দেয়া হলো নমরুদকে মাথায় আঘাত করার জন্যে। একসময় চাকর বিরক্ত হয়ে এমন জোরে আঘাত করল, আঘাতের চোটে মাথা ফেটে নমরুদ গেল মরে আর মশা গেল উড়ে। মিশরের বিখ্যাত ফারাও সম্রাট তোতেন খামেন টীনেজ তথা ঊনিশ বছর বয়সে মারা গেলেন প্রায় ৩৩৪০ বছর আগে, সম্প্রতি জানা গেল তিনি ম্যালেরিয়ায় মারা গিয়েছেন। বুঝুন এবার কার কাজ, আচ্ছা সেই প্রাচীনকালে মশাদের বাস ছিল ট্রপিক্যাল অঞ্চলের ঘন জঙ্গলগুলোতে, যেমন ভারতীয় জঙ্গল। মিশরে তো জঙ্গল থাকার কথা না, তাহলে এ মশা সেখানে গেল কি করে এবং গেলই বা কোত্থেকে? সম্ভবত ভারত থেকে কারণ এখানেই তো ম্যালেরিয়ার কারণ আবিস্কৃত হয়েছে ফলে ভারতই ম্যালেরিয়ার আবাসস্থল। আচ্ছা মশারা মিশর কেন গেল, সম্ভবত পিরামিড দেখতে গিয়েছে কারণ তখনও ভারতে তাজমহল হয়নি। ফলে মিশরীয় সভ্যতা দেখতে তারা সোজা সেখানে চলে গেল, গিয়ে তোতেন খামেনকে কাম করে দিল। বাবারে বাবা বুঝুন এবার মশাদের ক্ষমতা, এখানে শেষ নয় কিংবদন্তি আরো আছে আগে শুনুন সেটি তখন না বুঝবেন মশারা কি চীজ। আলেক্সেন্ডার মেসিডোনিয়া টু ইন্ডিয়া বিশাল সাম্রাজ্যের অধিপতি। সে সময় ভারতে পৌরব তথা পুরু নামে এক শক্তিশালী রাজা ছিলেন আলেক্সেন্ডার তাঁকে পরাজিত করেছিলেন। আলেক্সন্ডার উত্তর ভারতের বিখ্যাত ইরাবতি,শতদ্রু, বিপাশা, চেনাব, ঝিলাম নদী পার হয়ে অনেক দুঃসাহসিক অভিযানের মাধ্যমে পৌরবরাজ্য বিজয় করেছিলেন। অনেক পাহাড়, নদী, বন-জঙ্গল অতিক্রম করে আলেক্সন্ডার ভারতবর্ষের এক বিশাল অঞ্চল দখল করেছিলেন ফলে তিনি আমার মনে এক বিশেষ উচ্চতায় অবস্থান করছেন। সম্প্রতি সৈয়দ মুজতবা আলী সাহেবের দেশে বিদেশে উপন্যাসটি পড়ে উত্তর ভারতের নদীগুলো নিয়ে মনে এক খটকা জন্ম নিল। আলী সাহেবের বর্ণনা মতে যা বুঝলাম তাতে আমাদের খালগুলোর কথা বাদই দিলাম, এমন কি আমাদের নালাগুলো দিয়েও উক্ত নদীগুলোর চাইতে বেশি পানি প্রবাহিত হয়! এমতাবস্থায় ওগুলোকে যদি নদী বলা হয় আমাদের পদ্মা, মেঘনা, যমুনাকে তাহলে সাগর বলতে হবে। অবশ্য যুক্তি বলে আলী সাহেবের কথা ঠিক কারণ ভৌগলিক অবস্থান বিচার করলে অত উঁচুতে জোয়ার-ভাটা থাকার কথা নয় আসলে ওগুলো নদী নয় ছড়া। তাই মনে হয় সম্রাট জাহাঙ্গীর বাংলার নদীগুলো দেখে ভয় পেয়েছিলেন কারণ তিনি তো জীবনে জোয়ার-ভাটা দেখেন নি।
সম্রাট জাহাঙ্গীর বাংলাদেশে এসে নদীগুলোর জোয়ার-ভাটা দেখে নাকি ভয়ে পালিয়েছিলেন। সুন্দরবন অঞ্চলে গিয়ে নাকি সম্রাট দেখলেন সব শুষ্ক ফকফকা কিন্তু জোয়ার যখন শুরু হলো পানিতে গোটা অঞ্চল ডুবে গেল। চারিদিকে যতদূর চোখ যায় শুধু অথৈ জল, জলের উপর রীতিমতো ঢেউ খেলা করছে দেখে সম্রাট দৌঁড়ে পালালেন, মনে হয় সম্রাটের নূহের (আঃ) মহাপ্লাবনের কথা মনে পড়ে গিয়েছিল। সে যাই হোক তাই বলে আলেক্সন্ডারের কৃতিত্বকে ছোট করে দেখার কোন অবকাশ নেই। তিনি অন্তত পাঁচ হাজার মাইল দূর থেকে এসে পাহাড়, নদী, জঙ্গল অতিক্রম করে রাজ্য জয় করেছেন, সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ দিগিজয়ী বীর আলেক্সন্ডার তিনি। তাঁর কৃতিত্ব অসামান্য, আজ হতে অন্তত ২৩৪০ বছর আগে বিশাল সৈন্যবাহিনী নিয়ে বিশাল দূরত্ব পাড়ি দিয়ে রাজ্য জয় করা কিন্তু চাট্টিখানি কথা না। তেমন একটি অসম্ভব কাজ তিনি সম্ভব করেছিলেন অতি অল্প বয়সে মাত্র ৩১ বছর বয়সে তিনি মেসিডোনিয়া থেকে ভারত পর্যন্ত বিশাল সাম্রাজ্যের অধিপতি হয়েছিলেন। ১৯ মাস ভারতে অবস্থানের পর তিনি স্বদেশ মেসিডোনিয়ার উদ্দেশে রওনা হলেন কিন্তু দুর্ভাগ্য ইরাকের ব্যাবিলনে এসে এক দুরারোগ্য ব্যাধিতে আক্রান্ত হয়ে মাত্র ৩৩ বছর বয়সে এই মহাবীর মারা গেলেন। এত হেকিম-কবিরাজ তাঁর, কেউ কোন কাজে আসল না, কেউ বুঝতেই পারেন নি আলেক্সন্ডারের অসুখটা আসলে কি ছিল? মাত্র গত শতাব্দীর শেষে এসে গবেষকরা আবিস্কার করলেন আলেক্সন্ডারের রোগটি ছিল আসলে ম্যালেরিয়া, তিনি ম্যালেরিয়ায় আক্রান্ত হয়ে মারা গিয়েছিলেন! হায় খোদা এখানেও ঐ তুচ্ছ মশা- আহা বন-জঙ্গলের ভেতর দিয়ে যাতায়াত করতে গিয়ে ভারতীয় মশারা তাঁর বারটা বাজিয়ে দিল। এবার তাহলে ভাবুন মশার ক্ষমতা, যে মশারা নমরুদ, ফেরাউন এমন কি আলেক্সেন্ডারের মতো মহাবীরকে কুপোকাৎ করে দেয় তাদের বংশধরদের জন্যে তো ঢাকা বিমানবন্দর দখল করা চুটকির খেল। ভবিষ্যতে এ মশারা আর কি কি দখল করে তা আল্লাহই মালুম। তবে কি আশ্চর্য যে মশারা এত বিশাল বিশাল ঘটনার জন্মদাতা তাদের নিয়ে কোন বীরত্বগাঁথা কেন লিখা হলো না? বীরত্বগাঁথা সাঁট মশাদের নিয়ে উল্টো আরো তাচ্ছিল্যভরা উক্তি করা হয়েছে হাতি ঘোড়া গেল তল মশা বলে কত জল, মশা মারতে কামান দাগা, মশা মেরে হাত নষ্ট করা, ইত্যাদি! প্রাচীনকালে আসলে মশাদের নিয়ে কোন গবেষণাই হয়নি, এরও অবশ্য যথেষ্ট যুক্তিসংগত কারণ আছে, আসলে প্রাচীন ভারতে আমরা মশাদের তেমন কোন উল্লেখযোগ্য অবস্থান লক্ষ্য করি না।
বস্তুতঃ প্রাচীন ভারতে বলতে গেলে মশা তেমন ছিলই না, মূলত দুয়েক স্থানে সামান্য কয়েকটি মশা ছাড়া সারা ভারতবর্ষই সম্ভবত তখন মশকহীন ছিল। এটি বুঝতে বড় কোন বিশেষজ্ঞ হওয়ার দরকার নেই, তখনকার পরিবেশ পরিস্থিতির দিকে দৃষ্টিপাত করলেই ব্যাপারটি বুঝা যায়। যেমন আমরা একটু গৌতমবুদ্ধের পানে দৃষ্টিপাত করি, তিনি অন্তত দশ বছর গয়ায় বোধিবৃক্ষের তলে ধ্যানমগ্ন ছিলেন। দিনরাত চক্ষু বন্ধ করে বসেছিলেন, গায়ে কোন কাপড় ছিল না, সম্পূর্ণ উদোম দেহ, পরনে ছিল শুধুমাত্র একটি ধুতি। একবার ভাবুন তো আপনি, আমি রাতের আঁধারে খালি গায়ে মাত্র দশ মিনিট ওভাবে বসে থাকতে পারবো, মশা খেয়ে শেষ করে দেবে না? তাহলে গৌতমবুদ্ধ কি করে পারলেন? আরো দেখুন তৎকালীন ভারতীয় মুনি-ঋষিদের ধ্যান দৃশ্য, সবাই হাঁটু অবধি একটি ন্যাংটি পরে খালি গায়ে ধ্যানমগ্ন। এখন যদি তাঁদের মশা কামড়াত, পারতেন কি তাঁরা রাতের আঁধারে অমন নিবিষ্ট চিত্তে ধ্যানমগ্ন থাকতে? নিশ্চয় পারতেন না, এতে বুঝা যাচ্ছে উনাদের কখনো মশা ডিস্টার্ব করেনি। তাহলে প্রশ্ন কেন মশা উনাদের ডিস্টার্ব করেনি? উত্তর, হয় তখন মশা তেমন ছিল না অথবা বোধিবৃক্ষের কোন প্রকার ঔষধি গুণ আছে যার ফলে সে মশা তাড়াতে সক্ষম ছিল। এখন দ্বিতীয় অনুমানটি যদি ঠিক হয় তাহলে আমাদের অতিসত্বর সারা দেশে বোধিবৃক্ষ লাগিয়ে ফেলতে হবে। বিশেষ করে চট্টগ্রামে চাক্তাই খালের পাড়ে, সত্তা খাল, হিজরা খাল, মহেশ খালের পাড়সহ সকল নোংরা জায়গায়, ঢাকায় বিমানবন্দরসহ সারা ঢাকা এবং সারা দেশ বোধিবৃক্ষ দিয়ে ঢেকে ফেলতে হবে। তবে প্রথম অনুমানটি যদি ঠিক হয় তাহলে তো খবর আছে, এত মশা মারব কেমনে? যেভাবে মশাদের জয় জয়কার চলছে, ইতোমধ্যে ঢাকা বিমানবন্দর দখলে নিয়েছে এরপর নৌবন্দর, স্থলবন্দর, সমুদ্রবন্দর, বঙ্গভবন, গণভবন, সেনাভবন সব দখলে নিলেও বিস্ময়ের কিছু থাকবে না। সারা দুনিয়ার সব বড় বড় মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানীগুলো কত কয়েল, ঔষধ, স্প্রে বানাচ্ছে, এই মশা নিধনের জন্যে অথচ মশাদের কিছুই করতে পারছে না। তা হলে আমরা কি করতে পারব? হ্যামিলন শহরে তো তা’ও বাঁশিওয়ালাকে পাওয়া গিয়েছিল ইঁদুরগুলো তাড়াতে, এখানে তো মনে হয় সেটিও হবে না। এখানে মশারা বাঁশিওয়ালাকে বোল্ড করে দেবে কারণ বাঁশি বাজাতে মশারা আরো বেশি ওস্তাদ। ফলে কি আর করা, মাছির থেকে নাকানি-চুবানি খেয়ে কিছু না পেরে সিংহ বলেছিল মাছির সাথে কি লড়ব? আঙ্গুর ফল খেতে না পেরে শিয়াল বলেছিল আঙ্গুর ফল টক। আমাদেরও তেমন বলতে হবে মশার সাথে কি লড়ব বা কামড় খেয়ে বলব মশার কামড় বড় মিষ্টি। এ ছাড়া মশা থেকে বাঁচতে আমরা কি করতে পারি? আচ্ছা ভালো কথা প্রাচীন কালে মানুষ নাকি শক্তির পূজা করত, যেমন সূর্য, আগুন, পানি, বাতাস, বৃহৎ কোন জীব-জন্তু যাতে তাদের দ্বারা কোন অনিষ্ট না হয়। আমরাও তেমন মশাদের পূজা করতে পারি যাতে তারা আমাদের প্রতি সন্তুষ্ট থাকে। আরেকটা কাজ করতে পারি মশাদের আমরা মামা ডাকতে পারি. বন-জঙ্গলে বাঘ, সিংহ, হাতিদের মামা বললে নাকি তারা আর আক্রমণ করেনা, সেরূপ মশারাও আমাদের আর আক্রমণ করবে না। আর যেটা পারি দুহাত তুলে খোদার কাছে মোনাজাত করা; নিরাশ আঁধারে খোদা তুমি আশার আলো।
অবশ্য অত নিরাশ হওয়ার কিছু নেই, প্রত্যেক ভালোর যেমন কিছু খারাপদিক আছে প্রত্যেক খারাপেরও তেমন কিছু ভালোদিক আছে। শত্রুতা উশুলের বেলায় মশা অতি সহায়ক চীজ, একদিন দেখলেন শত্রুর গালে মশা বসেছে ব্যস কষে চড় মেরে দিলেন। শত্রুতো স্বর্গ-মর্ত একসাথে দেখতে লাগল আর আপনি মশা মেরেছেন বলে পার পেয়ে গেলেন। দারুণ না ব্যাপারটা, তবে সাবধান শত্রুকে দিয়ে ভুলেও করাতে যাবেন না ওকাজ কোনদিন তাহলে খবর হয়ে যাবেÑ মশা মারাতে গিয়ে দন্ত খেসারত। আরো আছে এই যেমন ধরুন শূর, বীর, সাহসীদের আমরা বলি- বেটা বাঘের বাচ্চা বাঘ। অবস্থা যা দাঁড়িয়েছে এখন যদি তাদের বলি বাঘ উল্টা তারা আরো করবে রাগ। যদি বলি মশার বাচ্চা মশা বীরের হাসি দিয়ে বলবে উপমাটা হয়েছে খাসা। আসলে হাসি-তামাশা তো অনেক হলো, দেখুন না আমি হলাম আরেক বুদ্ধু, হাসাতে তো পারলাম না কাউকে এক ফোঁটা বলছি কিনা হাসি-তামাশা। তারচে বরং ভাঁড়ামো বলাটাই হবে উত্তম, তা ভাঁড়ামো অনেক তো হলো, তাতে যা বুঝলাম পরিচ্ছন্ন, নির্মল পরিবেশই হচ্ছে মশা নিবারণের উত্তম পন্থা। তাই আসুন, আমরা আমাদের পরিবেশকে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন ও দূষণমুক্ত রাখতে প্রত্যেকে নিজেকে নিয়োজিত করি। মনে রাখবেন, আবর্জনাতে যেমন বন্ধ হয় মানুষের দম, পরিচ্ছন্নতা তেমন হলো মশাদের যম।

লেখক : কলামিস্ট