মনোরোগ : কার কাছে যাই?

ডা. রজত শংকর রায় বিশ্বাস

26

 


সাইকিয়াট্রিক ডিসঅর্ডার বা মানসিক ব্যাধিকে শারীরিক রোগ হিসেবে ধরা হয় না, মনোরোগ হিসেবেই নেয়া হয়। কারণ এই রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিরা আবেগ, অনুভূতি, চিন্তা আর স্মৃতির সমস্যায় ভোগে। আগে এই রোগের কোন পরিষ্কার জৈবিক ব্যাখ্যা ছিল না। কিন্তু বর্তমানে এই রোগসমূহের প্রাণ রাসায়নিক আর আকার-আকৃতিগত (এনাটমিকাল) ব্যাখ্যা দেয়া হচ্ছে। তাই এই রোগগুলি যে শুধু মানসিক তা বিজ্ঞানীরা এখন মানতে নারাজ।
কেইস স্টাডি এক : বিকাশ, বয়স ১৮। কলেজে পড়ে। শান্ত, ভদ্র আর নম্র হিসেবে সবাই জানত। কিছুদিন ধরে তার ব্যবহারের পরিবর্তন হতে লাগল। ক্লাসে মনোযোহীন, অকারণে রেগে যাওয়া, নিজে বিড় বিড় করে কথা বলে, রাতে ঘুম হচ্ছে না, ধর্মের প্রতি অতিরিক্ত মনোযোগ। তার মা তাকে নিয়ে মঘা বৈদ্যের বাড়িতে নিয়ে গেলেন। বৈদ্য তাকে ঝাড়-ফুঁক দিল, আর কিছু পানি খেতে দিল। এভাবে মাস চলে গেলেও কোন উন্নতি নেই। আরেক বৈদ্য তার মা থেকে চিকিৎসা বাবদ কয়েক হাজার টাকা নেয়ার পর বলল, তার ছেলেকে জ্বিনে পেয়েছে। তাই তাকে জ্বিনের বাদশার কছে নিতে হবে। বলাই বাহুল্য সেই জ্বিনের বাদশা হল আমাদের হাসপাতালের মনোরোগ চিকিৎসক। তার কাছে আসার পর রোগীকে ওষুধ দেয়া হল। এখন বিকাশ সম্পূর্ণ সুস্থ্য আর ওষুধ চলছে। এখানে দেখা যাচ্ছে বৈদ্যরাও বুঝে গেছে ডাক্তারি ওষুধই হচ্ছে এই রোগের প্রধান চিকিৎসা।
কেইস স্টাডি দুই : মিসেস নিশু, বয়স ৪৫। স্বামীর অভিযোগ- তার স্ত্রীর মারাত্মক শুচিবায়। খাবার হাড়ি-পাতিল, থালা-বাসন দিনে অনেকবার করে ধুয়, কেউ গ্লাসে পানি খেলে সেটা কম করে হলেও ১০ বার ধুতে হবে। বললেও কোন কাজ হয় না। তিনি বলেন, না ধুলে তার অস্থির লাগে আর বার বার ধোবার পর তার অস্থিরতা কিছুটা কমে। অনেক ডাক্তার-কবিরাজ-বৈদ্য দেখানো হলেও অভ্যাসের কোন পরিবর্তন হয় না। তার স্বামী এই লেখকের কাহে এসেছেন তাকে কার কাছে নিয়ে গেলে লাভ হবে তা জানার জন্য।
আলোচনা : মনোরোগ দৈহিক রোগসমূহের মধ্যে একটি অন্যতম প্রধান রোগমালা। তাই ডাক্তারদের এ রোগসমূহের চিকিৎসা ব্যবস্থা জানা থাকা জরুরি। বলা হয়ে থাকে মোট জনসংখ্যার ১০-১২% কোন না কোন মনোরোগে আক্রান্ত। মনোরোগসমূহের মধ্যে কিছু রোগী আছে যারা নিজের রোগ কি তা বুঝতে পারে আর নিজ সমস্যা ডাক্তারকে নিজে বলতে পারে। আর কছু রোগী আছে যারা নিজ সমস্যা নিজে বুঝে না। এরা নিজেকে কখনোই রোগী মনে করে না। এদেরকে চিকিৎসা করা একটু কঠিন বৈকি।
সিজোফ্রেনিয়া আর ম্যানিয়া এ দুটি অন্যতম প্রধান মনোরোগ যেখানে রোগীর হিতাহীত বুদ্ধিলোপ হয়। এসব রোগীরা নিজেকে সমাজচ্যুত করে। প্রথম রোগের ক্ষেত্রে রোগীর চিন্তার বিকার দেখা দেয়, কানে গায়েবী শব্দ শুনে, কখনো কখনো অতিরিক্ত ধর্মপরায়ন হয়, অপরিষ্কার-অপরিচ্ছন্ন হয়ে থাকে। দ্বিতীয় রোগের ক্ষেত্রে, রোগী নিজকে অনেক বড় মনে করে, নিজেকে ধর্ম গুরু, দেশের প্রেসিডেন্ট ইত্যাদি বলে, অনর্গল কথা বলে, বাস্তবতার ভুল ব্যাখ্যা দেয় (ডিলিউশান), অনেক টাকা খরচ করে। এসব রোগী কিছু দিনের জন্য একধম চুপচাপ থাকতে পারে তারপর আবার আগের অবস্থায় ফিরে যায় (বাইপোলার)। অন্যান্য মনোরোগের মধ্যে হতাশা (ডিপ্রেসান), বুলিমিয়া, অবসেশান, সোমাটোফর্ম ডিসঅর্ডার, মাদকাশক্তি ইত্যাদি অন্যতম।
মনোরোগের চিকিৎসা সাধারণত অনেকদিন ধরে চালাতে হয়। আমাদের দেশের রোগীরা কিছুদিন ওষুধ খেয়ে একটু ভাল লাগলে ওষুধ বন্ধ করে দেয়। এটা কখনো করা যাবে না। ডাক্তার ওষুধ বন্ধ করতে বললে তখনই ওষুধ বন্ধ করতে হবে। অসময়ে ওষুধ বন্ধ করলে রোগ পুনরায় দেখা দিতে পারে। আর তখন পুরানো ওষুধ কাজ না করতে পারে অথবা ওষুধ বেশি পরিমানে লাগতে পারে। মনোরোগ চিকিৎসায় পরিবার আর সমাজের মানুষের দৃষ্টিভঙ্গীর ভূমিকা অপরিসীম। মনোরোগীকে উত্যক্ত না করা, ভুক্তভোগী পরিবারের সদস্যদের প্রয়োজনে সহানুভূতি প্রদর্শন রোগ নিরাময়ে সহায়ক।
ডাক্তার যখন রোগীর রোগ নির্ণয় নিয়ে কাজ করেন তখন তার রোগের ইতিহাস (হিস্ট্রি), দৈহিক পরীক্ষা (এক্সামিনেশান) আর ল্যাবটেস্ট (ইনভেস্টিগেশান) এই তিনটা পদ্ধতি ব্যবহার করেন। মনোরোগের রোগনির্ণয়ে রোগের ইতিহাস অধিক গুরুত্বপূর্ণ এখানে দৈহিক পরীক্ষা আর ল্যাবটেস্ট গৌণ। প্রতিটা মনোরোগীর রোগ নির্ণয়ের জন্য আদ্যোপান্ত ইতিহাস দরকার যার জন্য মনোরোগের চিকিৎসকগণ ঘন্টার পর ঘন্টা ব্যয় করেন। দুর্ভাগ্য আমাদের দেশে খুব কম সংখ্যক মনোচিকিৎসক আছেন যাদের দিয়ে দেশের সব মনোরোগীদের চিকিৎসা করা সম্ভব নয়। তাই এ রোগের দিকে আমাদের সকলকে দৃষ্টি দেয়া অতিব জরুরি। তবে যেসব মনোরোগ চিকিৎসক দেশে আছেন তাঁরা খুবই দক্ষ আর সফলতার সাথে সীমিত সযোগের মধ্যে চিকিৎসাসেবা দিয়ে যাচ্ছেন।
ফিরে দেখা : প্রথম রোগীর সিজোফ্রেনীয়া। নিয়মিত ওষুধ সেবনে এরোগ সম্পূর্ণ নিরাময় যোগ্য। প্রথাগত বৈদ্য- কবিরাজ-ফকিরের চিকিৎসার কোন বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই। দ্বিতীয় রোগীর অবসেসিভ কম্পালসিভ ডিসঅর্ডার (ওসিডি) হয়েছে। এসএসআরআই ওষুধ আর কগনিটিভ বেহেভিয়ার থেরাপী (সিবিটি) এর মাধ্যমে এ রোগ ধীরে ধীরে নিরাময়যোগ্য।
মনোরোগীদের কখনোই ‘পাগল’ বলা উচিত নয়। তারা অন্যান্য রোগাক্রান্ত রোগীর মতই একজন। সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গীর পরিবর্তন, পর্যাপ্ত দক্ষ মনোরোগ চিকিৎসক তৈরি, বড়বড় জেলা শহরে উন্নত মনোরোগ চিকিৎসালয় তৈরি এখন সময়ের দাবী।

লেখক : সহকারী অধ্যাপক, চট্টগ্রাম মা ও শিশু হাসপাতাল মেডিকেল কলেজ