মনোনয়ন চূড়ান্ত হলেই মাঠে নামবে বিএনপি

আজ-কালের মধ্যে প্রার্থী তালিকা ঘোষণা

এম এ হোসাইন

11

আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিয়ে নানান আলোচনা সমালোচনায় লিপ্ত বিএনপি। এরই মধ্যে নির্বাচনের যাবতীয় প্রস্তুতিও সেরে ফেলেছে দলটি। প্রায় প্রতিটি আসনে বিকল্প প্রার্থী রেখে দলীয় মনোনয়ন দিলেও আজ-কালের মধ্যে প্রার্থী তালিকা চূড়ান্ত করবে দলটি। এরপরেই একযোগে প্রার্থীরা মাঠে নামবেন। দলীয় নেতাকর্মী ও সমর্থকদের মধ্যে সেতুবন্ধন তৈরির জন্য নানান কার্যক্রম পরিচালনারও চিন্তা করছে দলটি।
দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন বর্জন করে রাজনৈতিভাবে বেকায়দায় থাকা বিএনপি আসন্ন নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পর থেকেই সরব হয়ে উঠে। নির্বাচন সামনে রেখে দলীয় মনোনয়ন ফরম বিতরণকে কেন্দ্র করে বিএনপি নেতাকর্মীদের মধ্যে ব্যাপক উৎসাহ উদ্দীপনার সৃষ্টি হয়। যার কারণে মনোনয়ন ফরম বিক্রিতেও রেকর্ড করে দলটি। নির্বাচনে অংশ নিতে বিএনপির রেকর্ডসংখ্যক প্রার্থী মনোনয়ন ফরম জমা দেন। কিন্তু ২ ডিসেম্বর যাচাই-বাছাইকালে খালেদা জিয়াসহ বিএনপির সিনিয়র অনেক নেতার মনোনয়নপত্র বাতিল হয়ে যায়। এ অবস্থায় বিএনপির নেতারা দাবি করেন, বিএনপিকে ছাড়া এক তরফা নির্বাচন করতে খালেদা জিয়াসহ হেভিওয়েট প্রার্থীদের মনোনয়ন বাতিল করা হয়েছে। তাছাড়া এরই মধ্যে নির্বাচন কমিশনে গিয়ে একাধিক অভিযোগ দিয়েছে বিএনপি। একের পর এক অভিযোগ ও এসব অভিযোগের কোনো সমাধান পাচ্ছে না বলে দাবি বিএনপির। তবে এরমধ্যেও নির্বাচনে অংশ নেওয়ার যাবতীয় প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছে দলটি। মনোনয়নপত্র বিক্রিতে যেমন ব্যাপক উৎসাহ উদ্দীপনার সৃষ্টি হয়েছিল, তেমনি নির্বাচনের মাঠে নেতাকর্মী-সমর্থকদের উদ্দীপনা সৃষ্টির জন্য একযোগে সকল প্রার্থীকে মাঠে নামানোরও প্রস্তুতি আছে দলটির।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে বিএনপির এক কেন্দ্রীয় নেতা বলেন, দলীয় মনোনয়নপত্র বিক্রিতে যেমন উৎসাহ-উদ্দীপনা ছিলো, তেমনি নির্বাচনী মাঠে প্রার্থীরা নামার সাথে সাথে যেনো একটা পরিবেশ সৃষ্টি হয় তার প্রতি জোর দেওয়া হচ্ছে। চূড়ান্ত মনোনয়নপত্র দেওয়া হলে প্রার্থীরা নিজ নিজ এলাকায় নেমে পড়বেন। বিএনপির নেতাকর্মী-সমর্থকরা সবাই ব্যাপক উৎসাহ নিয়ে নির্বাচনের দিকে তাকিয়ে আছে।
তিনি বলেন, দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন হওয়ায় কমিশন অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের ব্যবস্থা করতে পারবে কি-না সেটা বোঝা যাচ্ছে না। তবে নির্বাচন কমিশন মোটামুটি নিরপেক্ষ থাকলে আর সাংবিধানিক ক্ষমতা প্রয়োগ করে নির্বাচন করলে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি বিপুল ভোটে জিতবে। কিন্তু এখনও নির্বাচনের অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টির কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না।
বিএনপি নেতাদের মতে, জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তারিখ ঘোষণার অনেক আগে থেকেই তারা নিরপেক্ষ সরকার ও খালেদা জিয়াকে মুক্তি দেয়ার বিষয়ে শর্ত দিয়ে আসছিল। ৮ ফেব্রæয়ারি বিএনপি চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট মামলায় সাজা নিয়ে কারাগারে যান। নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার আগে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে বিএনপির সমাবেশ থেকে দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ৭ দফা দাবি পেশ করেন। পরে বিএনপি সরকারবিরোধী বৃহত্তর রাজনৈতিক জোট গঠনের তোড়জোড় শুরু করে। একপর্যায়ে ড. কামাল হোসেনের জাতীয় ঐক্য প্রক্রিয়া ও অধ্যাপক ডা. বদরুদ্দোজা চৌধুরীর যুক্তফ্রন্টের সঙ্গে মিলে জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট গঠনের পথে এগিয়ে যায়। কিন্তু এ জন্য বিএনপিকে প্রকাশ্যে জামায়াতের সঙ্গ ত্যাগের দাবি জানান অধ্যাপক ডা. বদরুদ্দোজা চৌধুরী। বিএনপি জামায়াতের সঙ্গ ত্যাগ না করায় যুক্তফ্রন্ট বৃহত্তর রাজনৈতিক জোট গঠন থেকে দূরে সরে গিয়ে আলাদা নির্বাচনী জোট গঠন করে। এদিকে বিএনপি ড. কামাল হোসেনের নেতৃত্বাধীন গণফোরাম, আ স ম আবদুর রবের নেতৃত্বাধীন জাসদ ও মাহমুদুর রহমান মান্নার নেতৃত্বাধীন নাগরিক ঐক্যের সঙ্গে মিলে জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট গঠন করে। পরে অবশ্য কাদের সিদ্দিকীর নেতৃত্বাধীন কৃষক শ্রমিক জনতা লীগও এ জোটে যোগ দেয়। জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট গঠনের পর প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সংলাপে অংশ নেন বিএনপিসহ জোটের সিনিয়র নেতরা। সংলাপেও সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য ৭ দফা দাবি জানানো হয়। এসব দাবির মধ্যে ছিলো, নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে নির্বাচন, নির্বাচনকালে ম্যাজিস্ট্রেসি ক্ষমতা দিয়ে সেনাবাহিনী মোতায়েন, নির্বাচন কমিশনকে সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ থেকে দায়িত্ব পালন করা, সবার জন্য সমান সুযোগ অর্থাৎ লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড তৈরি করা, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও প্রশাসনকে নিরপেক্ষ রাখা, দেশি-বিদেশি পর্যবেক্ষকদের জন্য ভোটকেন্দ্র পরিদর্শনের অবাধ সুযোগ রাখা, ইভিএম পদ্ধতিতে ভোট গ্রহণ না করা ও রাজনৈতিক দলের নেতাদের মামলার নামে হয়রানি না করা। সংলাপে প্রধানমন্ত্রী রাজনৈতিক মামলার তালিকা দিতে বললে দ্বিতীয় দফা সংলাপকালে বিএনপি সহস্রাধিক মামলার একটি তালিকা দেয় এবং পরে আরও সহস্রাধিক মামলার আরেকটি তালিকা প্রধানমন্ত্রী কার্যালয়ে জমা দেয়। তবে বিএনপির অভিযোগ এখনো নেতাকর্মীদের রাজনৈতিক মামলায় হয়রানিমূলকভাবে আটক করছে পুলিশ।
এদিকে অভিজ্ঞ মহলের মতে, নির্বাচনকে কেন্দ্র করে দফায় দফায় বিএনপির অভিযোগ একটি রাজনৈতিক কৌশল। এসব কর্মকান্ডের মাধ্যমে তৃণমূল নেতাকর্মীদের মাঝে সক্রিয় ভূমিকা রাখছে দলটি। প্রায় প্রতিটি আসনে একাধিক প্রার্থীকে দলীয় মনোনয়ন দেওয়া, নির্বাচন ও আন্দোলন একসাথে করার ঘোষণা এসব বিএনপির কর্মী-সমর্থকদের মধ্যে উদ্দীপনা সুষ্টি করছে। দলীয় কোন্দল মিটিয়ে যদি প্রার্থীদের একসাথে নির্বাচনের মাঠে আনতে পারে তাহলে বিরাট সুযোগ আসবে দলটির সামনে।