মনস্বী আনিসুজ্জামান : কালের খেয়া

তৌফিকুল ইসলাম চৌধুরী

20

বাংলাদেশের এক শ্রুতকীর্তি মানুষ, সময়ের একজন পূর্ণ আধুনিক মানুষ জাতীয় অধ্যাপক ডক্টর আনিসুজ্জামান অন্তিম যাত্রা করলেন “ করোনা“ আক্রান্ত হয়ে। পরিণত বয়সে হলেও বিষয়টি বড়ই মর্মান্তিক। মেধা ও মনন জগতের সর্বাগ্রসর ব্যক্তিত্ব, মনস্বী এ পন্ডিতে বাঙালি নিত্য অভ্যস্থ হয়ে গিয়েছিল। শিক্ষা, সামাজিক, রাষ্ট্রীয়- সর্ব ক্ষেত্রেই তাঁর উপস্থিতি ছিল হীরক জ্যোতির মতো দৃশ্যমান। বড়োই স্নিগ্ধ, সুকোমল অথচ প্রখর তাঁর ব্যক্তিত্বের আভা, অনেক দূর পর্যন্ত পৌঁছায় সেই আভা। সময়ের শুভ ও কল্যানকর জায়গাকে ধারণ করে হৃদয়- সংবেদী এ মানুষটি হয়ে উঠেছিল জাতির অভিভাবক, কালের দলিল। তিনি আজ নেই। জাতির জন্য এঠা অপূরণীয় ক্ষতি।
ডক্টর আনিসুজ্জামান পেশায় সাহিত্যের একজন অধ্যাপক ছিলেন বিধায় সাহিত্য তার চিন্তার একটা বড় অংশ জুড়ে ছিল। কিন্তু এর বাইরেও জাতিসত্বার দ্বিধা-দ্বন্দ্ব, ইতিহাসের কার্য-কারণ, সমাজ- সংস্কৃতি-রাজনীতির নানা টানা-পোড়ন বহুরৈখিক বর্ণিলতায় উপস্থাপিত হয় তাঁর চিন্তনে। ১৯৬৪ সালে ঢাকার লেখক সংঘ প্রকাশনী থেকে প্রকাশিত প্রথম গ্রন্থ “ মুসলিম মানস ও বাংলা সাহিত্য ” গবেষণা গ্রন্থে তার যে দার্শনিকতা ও অনুসন্ধিৎসার আভাস মেলে তা থেকে ভবিষ্যৎ আনিসুজ্জামান সম্পর্কে অনেকটা আঁচ করা যায়। ড. আহমদ শরীফ ২২/২৩ বছর বয়সী একজন তরুণের এ বই সম্পর্কে বলেন, “এ এমন একটি বই, যা একবার পড়ে ফেলে রাখবার মতো নয়, বারবার পড়ার প্রয়োজন এবং প্রতিবারেই নতুন নতুন তথ্য ও তত্তে¡র উদ্ভাস ঘটে এবং চিন্তার উদ্দীপন হয়”। এরপরে তিনি একে একে আরও অনেক বই লিখেছেন। প্রতিটি বইয়ে তাঁর অতুলনীয় বিশ্লেষণ ক্ষমতা ও মৌলিক চিন্তার সমন্বয় অনন্য উচ্চতায় বাঙময় হয়ে উঠে। তাঁর প্রবন্ধ ও গবেষণা গ্রন্থের সংখ্যাও কম নয়। এর মধ্যে ‘’মুসলিম মানস ও বাংলা সাহিত্য (১৯৬৪) ছাড়াও এ ধারার বই আছে “ মধ্যযুগের বাংলা সাহিত্য ঃ সমাজের কিছু চিত্র “(১৯৬৬), “মুসলিম বাংলার সাময়িক পত্র ১৮৩১- ১৯৩০” (১৯৬৯), “ চর্যাগীতির সমাজচিত্র “((১৯৭৪), “ বাঙালি মুসলমানের ভাবজগত ১৮৭০- ১৯২০” ( ১৯৭৫), “স্বরুপের সন্ধানে ”(১৯৭৬), “ আঠারো শতকের বাংলা চিঠি ” ১৯৮২), “ পুরানো বাংলা গদ্য ” (১৯৮৪), “বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসঃ প্রাসঙ্গিক জিজ্ঞাসা“ (১৯৮৫), “ বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস ”(১৯৮৭), “ উনিশ শতকের বাঙালির দৃষ্টিতে নারী“(১৯৯২), ” পুরানো বাংলা সাহিত্যে নারী সম্পর্কে ধারণা“(১৯৯২), ” বাঙালি সংস্কৃতি প্রসঙ্গ ”( ১৯৯৯),
“ মুক্তিযুদ্ধ এবং তারপর “ ( ১৯৯৯), “ আমার চোখে”(১৯৯৯), “ পূর্বগামী”(২০০০), “ বাঙালি নারীঃ সাহিত্যে ও সমাজে “ ( ২০০০) ইত্যাদি। কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বলেছেন, ” লেখকের কাল লেখকের গোচরে ও অগোচরে কাজ করে ”। এক্ষেত্রে মনে হয়, আনিস স্যার সচেতনভাবে এসব বইয়ের মাধ্যমে কালের খেয়া হয়ে বাঙালির মূলধারার অতীতের সাথে বর্তমানের একটা যোগসূত্র তৈরি করতে সচেষ্ট ছিলেন, যা জাতিয় বিনির্মানে অনুঘটকের ভূমিকা পালন করতে পারে।
তাঁর আত্মজৈবনিক রচনা ৩টি “ আমার একাত্তর”(১৯৯৭), “ কাল নিরবধি”(২০০৩), এবং “ বিপুলা পৃথিবী “(২০১৫) — এগুলোকে বলা যায় ‘ কালের সাক্ষী’, ‘ সময়ের দলিল’। তাঁর “ আমার একাত্তর” যেন এক মহাকাব্য। মুক্তিযুদ্ধের কথাচিত্র এতে অনুপম উচ্চতায় উচ্চারিত হয়েছে। এযেন মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস আকর। কথায় কথায় ছ’শত লোকের প্রসঙ্গ উঠেএসেছে এতে।প্রায় পাঁচশত পৃষ্ঠার “ কাল নিরবধি“র পাতায় পাতায় আছে সমাজ ইতিহাসের উপকরণ, ‘উইট’ ও ‘ হিউমার’ ঐশ্বর্য। এতে তিনি তার কাল বা সময়কে তুলে এনেছেন নিপুণ পারঙ্গমতায়। আত্মচরিতকারের অহমকে ছাপিয়ে তিনি কাল( সময়)কে নায়কের আসনে নিয়ে আসেন, নিজে বনে যান নিছক কথক। আর পাঁচ শতাধিক পৃষ্ঠার “ বিপুলা পৃথিবী ” যেন ক্রমপ্রসারমান বিশ্বের এক নিরেট কাহিনি, যদিও এতে ১৯৭২- ২০০০ সাল পর্যন্ত তিন দশকে লেখকের চলমান জীবনের ঘটনা-অনুষঙ্গ উঠে এসেছে। তিনি অস্কার ওয়াইল্ডের ‘অ্যান আইডিয়াল হাজব্যাÐ ও আলেক্সেই অরবুঝবের’ স্তারোমোদোনাইয়া কোমেদিয়া ‘ নাটকের অনুবাদ করেন যথাক্রমে “ আদর্শ স্বামী ”(১৯৮২) ও “ পুরানো পালা ”(১৯৮৮) নামে। “ শহীদ মুনীর চৌধুরী” (১৯৭৫), “মোতাহের হোসেন চৌধুরী”(১৯৮৮) নামে জীবনী গ্রন্থ ২টি এবং ২টি শিশুতোষ গ্রন্থ “জ্ঞানতাপস ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্ “(১৯৮২) ও “কতকাল ধরে” (২০০০) তিনি রচনা করেন।তার সম্পাদিত গ্রন্থের সংখ্যা ৩৭ টিরও বেশি। এছাড়া তিনি আরও অনেক গুরত্বপূর্ণ বইয়ের সাথে নানাভাবে যুক্ত ছিলেন। ৫০-৬০ এর দশকে তিনি কিছু গল্পও লিখেছিলেন ; যদি এগুলো বিস্মৃতির অতলে হারিয়ে গেছে।
আনিস স্যার তাঁর বইয়ের মাধ্যমে ইতিহাসের খন্ড খন্ড রুপগুলোকে একত্রিত করে সমগ্রতার চিত্র নির্মাণ করে বাঙালি মুসলিম তথা সমগ্র বাঙালি মানস উপলব্ধির প্রচেষ্ঠা চালিয়েছেন। বাংলার মুসলিম মানস, মুসলিম মধ্যবৃত্ত সমাজ, বাংলা সাহিত্য- সংস্কৃতিকে বুঝতে হলে আমাদেরকে আনিসুজ্জামান পাঠ করতে হবে। তাঁর লেখনীর এটা অন্যতম বৈশিষ্ট্য ছিল যে, তিনি বিষয়ের গভীরে যেতে পছন্দ করতেন, যা তার লেখাকে অনেক গুরুত্বপূর্ণ করে তোলে।
ডক্টর আনিসুজ্জামান তাঁর সমসাময়িক প্রায় সকলকেই নানাভাবে ছাড়িয়ে যেতে পেরেছিলেন। এবং পেরেছিলেন বলেই জাতীয় পরিসরে তিনি যে মান্যতা, সম্মান ও স্বীকৃতি পেয়েছেন, তা অনন্য দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে। এর পেছনে কাজ করেছে তাঁর ছয় দশকেরও বেশি সময়কালের শিক্ষকতা, গবেষণা ও বুদ্ধিবৃত্তিক সক্রিয় মনস্বী তৎপরতা। তাঁর শিক্ষকতাকর্ম ক্লাসরুমের বাইরে গণ মানুষের দোর গোড়া পর্যন্ত বিস্তৃত ছিলো। তাঁকে বলা যায় জাতির শিক্ষক।তাঁর সবচেয়ে বড় অর্জন হলো, তিনি বাঙালির স্মৃতি, সত্ত¡া ও চেতনার অনুষঙ্গ ভাষা আন্দোলন ও মহান মুক্তিযুদ্ধ – এই দুই সময় প্রবাহকে প্রত্যক্ষভাবে ছুঁতে পেরেছিলেন । দুই সময়েই তিনি সক্রিয় থেকে সময়ের মানুষ হয়েছেন। শুদ্ধাচারী এই মানুষটির মুক্তচিন্তা, ইতিহাস- ঐতিহ্যের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ, সংস্কৃতির বহুত্ববাদে বিশ্বাস, অসা¤প্রদায়িক চেতনা, সমাজ বিচারের বিপুল পারঙ্গমতা তাঁকে সর্বজন শ্রদ্ধেয় একজন মানুষে পরিণত করে। তিনি সেই বিরল ব্যক্তিত্বের একজন, যিনি তাঁর চিন্তা ও কর্মকে একসূত্রে গেঁথেছেন। তিনি সর্বদা এক আটপৌরে সহজ মানুষ। তাঁর চিন্তার বিশালতা, গভীর পান্ডিত্য, সুনাম, খ্যাতি, দেশ-বিদেশে প্রতিষ্ঠা তাঁর ব্যবহারে বোঝার উপায় নেই। তিনি নিজেকে এতই সংযত রাখতেন যে, বুঝাই যেত না তিনি কত বড় মাপের বিদ্ধান ও চিন্তাশীল মানুষ। তার বিনয়, সারল্য তাঁর লেখনীর মতো তাঁর জীবনচর্চাই বৈশিষ্ট।