মধ্যযুগের পুঁথি সাহিত্যে ব্যবহৃত সনসমূহের আলোকে বঙ্গাব্দের অবস্থান

এ বি এম ফয়েজ উল্যাহ

9

ড. শামসুজ্জামান খান তাঁর ‘বাঙলা সনের উৎস-সন্ধানে’ প্রবন্ধে উল্লেখ করেন, ‘বাংলা সন নিয়ে বিগত একযুগ ধরে আমি কিছু অনুসন্ধান ও লেখালেখি করেছি। বিষয়টি আমার খুব প্রিয় : কিন্তু বেশ কিছু খোঁজ খবর করেও এমন কিছু মৌলিক তথ্য পাইনি-যা কোনো উন্মোচনকারী চিন্তার ভিত্তি হতে পারে।বরং আমাদের খ্যাতকীর্তি ঐতিহাসিকদের বাংলা সন সম্পর্কে এক ধরনের কৌতুহলহীনতা ও রহস্যময় নীরবতা আমাকে ব্যথিত করেছে। তরুণ কোন গবেষক এ বিষয় নিয়ে কেনো তথ্য নির্ভর ও যুক্তিনিষ্ঠ কাজ করছেন, এমনও শুনিনি। বাংলা সনের বিস্তৃত, অনুপঙ্খ ও প্রামান্য ইতিহাস লেখার নির্ভরযোগ্য উপাদান কি কোনো উৎস থেকেই উদ্ধার করা সম্ভব না? এও কি বাঙালির প্রাচীন ইতিহাসের মতই ঝাপসা,অস্পষ্ট ও কিছু শূন্যতার সমষ্টি হয়ে থাকবে?”
এতদিন বাংলাসনের প্রবর্তক হিসেবে মুগল স¤্রাট আকবর (১৫৫৬Ñ১৬০৫ খ্রীঃ), সুলতান হোসেন শাহ (১৪৯৩Ñ১৫১৯ খ্রীঃ) এবং রাজা শশাঙ্ক’র (৫৯৩-৬৩০) নাম শুনা গিয়েছিলো।স্বীকৃত ঐতিহাসিকদের মধ্যে ডক্টর মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ, পশ্চিম বাংলায় অধ্যাপক সুখময় মুখোপাধ্যায়,বাংলাদেশের মধ্যযুগের বাংলা ও বাঙালি বিষয়ে বিশেষজ্ঞ ড. আহমদ শরীফ,বাংলা সাহিত্যের বিখ্যাত লেখক কাজী ইমদাদুল হক, শ্রী আনন্দ নাথ রায় ‘বাংলা সন’ নিয়ে জ্ঞানগর্ভ আলোচনা করেছেন। যদিও কেউ ‘বঙ্গাব্দ’ শব্দ উল্লেখ করেননি।তবে বাংলা সনের ইতিহাস নিয়ে যাঁরা এতোদিন কাজ করে আসছেন,তাঁদের প্রায় সবাই সম্রাট আকবরকে ‘বাংলা সন’র প্রবর্তক বলে দাবি করে আসছেন।
কাজী ইমদাদুল হক তাঁর ‘ঐতিহাসিক পাঠ’ গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন, ‘সম্রাট আকবরের রাজত্বের পূর্বে হিজরী সনের প্রচলন ছিল।কিন্তু আকবর হিজরী বৎসরকে সৌর বৎসরে পরিণত করিয়া নূতন গণনা আরম্ভ করেন। আকবরের এই সৌর বৎসরে পরিণত হিজরী সালই আমাদের বাংলা সাল”।
সেন বংশীয় রাজা লক্ষণ সেনের ১১১৯ খীষ্ট্রাব্দে সিংহাসনারোহনে কাল থেকে ‘ লক্ষণ সন বা লক্ষণ সম্বত’ গগনা করা হয়।লক্ষণ সম্বৎসরের অশীতি বৎসর অতীত হইলে অর্থাৎ একাশি(৮১) ল²ণ সম্বৎসরে বখতিয়ার খিলজী উদ্দন্ডপুর অধীকার করেছিলেন।তখন ১১৯৯ খ্রিস্টাব্দ এবং ৫৯৫ হিজরী। আর ৫৯৬ হিজরী তথা ৮১ ল²ণ সম্বৎসর তথা ১২০০ খ্রিস্টাব্দে গৌড় অধীকার করেন।
‘বঙ্গাব্দ’ শব্দটি কে বা কাদের দ্বারা এ’দেশে প্রচলিত হয়েছে, সে ইতিহাস আজো অজানা। তবে বাংলাসন যে সম্রাট আকবরের ‘এলাহি সন তথা’ ফসলীসনের বাংলা সংস্করণ তা শতভাগ সত্যি। কারণ, এলাহিসন নির্ণয় আর বাংলাসন নির্ণয়ের সূত্র একই। যেমন- খ্রিস্টাব্দ থেকে ৫৯৩ বিয়োগে এলাহি বা ফসলি সন। তেমনি খ্রিস্টাব্দ থেকে ৫৯৩ বিয়োগে ‘বাংলাসন’। (৫৯৩ সংখ্যাটি সম্রাট আকবরের সিংহাসনারোহন কাল ১৫৫৬ খ্রিস্টাব্দ এবং তখনকার ৯৬৩ হিজরীর আরম্ভকাল। (১৫৫৬-৯৬৩= ৫৯৩)।আর এই সনটি একই সময়ে খাজনা উসুলের জন্য ভারতবর্ষে ১৫৮৪/৮৫ খ্রিস্টাব্দে প্রচলিত হয়েছে আকবরের ‘দীন-ই- এলাহি’ ধর্মের সাথে সমতা রেখে ‘এলাহি সন’ নামেই প্রবর্তিত হয়েছে। ‘বাংলাসন’ নামে নয়।
যারা দাবি করেন, সম্রাট আকবর ‘বাংলাসন’ প্রচলন করেছেন, তাঁরা ভুল বলেন। কারণ, সারা ভারতকে প্রতারিত করে যুদ্ধে লিপ্ত অখ্যাত, ক্ষুদ্র বঙ্গ অঞ্চলের নামে ‘বঙ্গাব্দ’ নামক সর্বভারতীয় সন কেন প্রবর্তন করবেন? যুক্তি কি? সম্রাট আকবর ও জাহাঙ্গীরের কোন কোন মুদ্রায় ‘এলাহি সন’র নামাঙ্কিত ছিলনা।
আর ‘এলাহি সন’র যে বঙ্গীয় এলাকায় ‘বাংলাসন’ নামে প্রচলন হয়েছিল, তাও যে ১৬১৬/১৭ খ্রিস্টাব্দের পূর্ব নয়, তার প্রমাণ অ্যাপক ড. আহমদ শরীফও দিয়েছেন। আর অধ্যাপক শামসুজ্জামান বলেছেন, নবাব মুর্শিদ কুলি খার আমলে (১৭১৭Ñ১৭২৭ খ্রি.) বঙ্গ এলাকায় বাংলাসন বা বঙ্গাব্দ প্রচলিত হয়েছে।
ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহর নেতৃত্বে গঠিত বাংলা একাডেমীর পঞ্জিকা সংস্কার কমিঠির সদস্যরা তাঁদের সুপারিশে (১৯৬৬)আকবরকেই ‘বঙ্গাব্দের’ প্রবর্তক বলে উল্লেখ করেন। (সুপারিশ নং-৪)। বিশিষ্ট পন্ডিত জনাব গোলাম সামদানী কর্তৃক প্রস্তুতকৃত বাংলা একাডেমী পত্রিকায় প্রকাশিত বঙ্গাব্দের ইতিহাস প্রবন্ধেও একাডেমীর সাবেক পরিচালক ড. কাজী দীন মুহাম্মদও ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহর মতে মত প্রকাশ করেন।
ড. আহমদ শরীফ লিখেছেন, ‘আকবর রণক্ষেত্রে বঙ্গ বিজয করেন ১৫৭৫ সনের এপ্রিল মাসে। কিন্তু স্থানীয় ভূঁইয়ারা তাঁর আনুগত্য সহজে স্বীকার করেননি। ফলে ১৫৭৫ থেকে ১৬১৬ সন অবধি ভূঁইয়াদের সঙ্গে লড়াই চলে বিভিন্ন অঞ্চলে।… কাজেই সঙ্গত কারণেই ১৬১৭ সনের আগে এই তথাকথিত মুঘলাই ফসলী সন বাঙলায় চালু হতে পারেনি।আর হলেও তা ‘আকবরী সন’ না হয়ে.‘আকবরাব্দ’ না হয়ে ‘বঙ্গাব্দ’ হবার কারণ কি, যখন ‘বঙ্গ’ একটা অঞ্চলের নাম মাত্র?…… সে কালে ‘বঙ্গ’ নামের প্রাধান্য ছিল না,এ অঞ্চল তুর্কি বিজয়কাল থেকে অন্ততঃ ‘গৌড়’ ও ‘গৌড়রাজ্য’ নামে পরিচিত ও প্রসিদ্ধ।… কাজেই আকবরের নামে না হলে, তা হয় ‘গৌড়াব্দ’; বঙ্গাব্দ হওয়ার কোন সঙ্গত কারণ নেই।আজো বঙ্গ ও সমতট অঞ্চল সুনির্দিষ্ট সীমায় চিহ্নিত তোলা ঐতিহাসিকদের পক্ষে সম্ভব হয়নি।কাজেই ‘বঙ্গাব্দ’র উৎস নিরুপণ সহজ নয়। অতএব সর্বজন গ্রাহ্য তত্ব তথ্য ও সত্য বলে প্রচলন হলেও বঙ্গাব্দের উদ্ভব আকবরের ফসলী সন থেকে ৯৬৩ হিজরী সনের রূপান্তরে,এর প্রমাণ সম্ভব ও প্রমাণিত কোন তথ্য কারো আয়ত্বে নেই।… তাই এ সিদ্ধান্ত সঙ্গত নয়।”
অধ্যাপক জনাব শামসুজ্জামান তাঁর প্রবন্ধে উল্লেখ করেণ, ‘ড. আহমদ শরীফের এই ঐতিহাসিক মতের সাথে আমিও শতভাগ সহমত পোষণ করছি। কিন্তু তিনি ‘বঙ্গাব্দ’ প্রচলনের যে সূত্রটি উত্থাপন করলেন,তা একেবারেই অসিদ্ধ, অবৈজ্ঞানিক। অধ্যাপক আহমদ শরীফ মত প্রকাশ করেছিলেন, “প্রাত্যহিক জীবনের বাস্তব প্রয়োজনে সামন্তরা মিলে পরগণাতি সনের মত (১২০২ খ্রিস্টাব্দে), ত্রিপুরাব্দের (৫৯৫ খ্রিস্টাব্দে) মতো, আরাকানের বা রোসাঙ্গের মঘী (৬৩৮ খ্রিস্টাব্দে) সনের মতো ৫৯৩ খৃস্টাব্দ প্রশাসনিক প্রয়োজনে ৫৯৩ সনে ‘বঙ্গাব্দ’ প্রবর্তন করেছিলেন আন্তঃআঞ্চলিক লেনদেনের প্রয়োজনে। (দৈনিক আজকের কাগজ, ১লা বৈশাখ ১৪০২)
অধ্যাপক সুখময় মুখোপাধ্যায় নানা তথ্য হাতড়ে নির্ভরযোগ্যতার অভাবে অতঃপর সিদ্ধান্ত দিলেন, ‘বঙ্গাব্দের প্রবর্তক কে- তা যখন জানা যাচ্ছেনা,তখন তাকে বাংলার প্রবল প্রতাপশালি রাজা শশাঙ্কের নামে চিহ্নিত করলে ক্ষতি কি’? কিন্তু রাজা শশাঙ্কের নামে বা তাঁর সময়ে বঙ্গাব্দ নামে কোন সন প্রচলনের তথ্য ইতিহাসে নেই। সর্বোপরি ড. আহমদ শরীফ যুক্তি দিয়ে প্রমাণ করেছেন যে, শশাঙ্ক বাংলাসন বা বঙ্গাব্দ প্রচলন করতে পারেন না। কারণ, শশাঙ্ক গৌড়ের শাসনকর্তা ছিলেন, বঙ্গের নয়। ফলে তিনি কোন ‘সন’ প্রচলন করলে তা হওয়া উচিত ‘গৌড়াব্দ’। বা ‘ল²ণ সন’র মত ‘শশাঙ্ক সন’ বা ‘শশাঙ্ক সম্বৎ’।
যাক,আমরা হাজার হাজার পুঁথির মধ্য থেকে চট্টগ্রাম ও বঙ্গ অঞ্চলের কিছু পুঁথির সন,তারিখ উল্লেখ করে প্রমাণের চেষ্টা করেছি যে,সতেরশো খ্রিস্টাব্দের মাঝামাঝি সময়ের পূর্বে বর্তমানের বাংলাদেশ অঞ্চলে ‘বাংলাসন’ বা ‘বঙ্গাব্দ’র প্রচলিত ছিলোনা।১৬৬৬ খ্রিস্টাব্দের পূর্বে চট্টগ্রামে তো নয়ই।মধ্য যুগের পুঁথি তথা বাংলাসাহিত্যে মঘী,হিজরী,শকাব্দ সন ব্যববহারের প্রচলন ছিল। পুঁথিকারদের অনেকেই ভনিতায় তথা হেঁয়ালিতে সে সব সন তারিখ উল্লেখ করেছেন।
(১) শ্রীকৃষ্ণ বিজয় : মালাধর বসু (গুনরাজ খান)। সুলতান রুকুন-উদ-দীন বারবক শাহ’র আমলে এই কাব্য রচনা করেন।
কায়স্থ কুলেতে জন্ম কুলীন গ্রাম বাস।
স্বপ্নে আদেশ দিলেন প্রভু ব্যাস \
বাপ ভগিরথ মোর মা ইন্দুমতী।
যার পুণ্য হইতে মোর নারায়নে মতি \
তেরশ পচানই শকে গ্রন্থ আরম্ভণ।
চতুর্দশ দুই শকে হৈল সমাপন \
অর্থাৎ ১৩৯৫ শকাব্দে ( ১৪৭৩ ডখ্র.)পুঁথির লেখা শুরু
এবং ১৪০২ শকাব্দে (১৪৮০ ডখ্র.)শেষ।
(২) মনসা বিজয়। কাব্যকার:-বিপ্রদাস পিপলাই।বাড়ি – চব্বিশ পরগণা জেলার বসির হাট।
সুলতান আলাউদ্দিন হোসেন শাহের আমলে রচিত।
কবিগুরু ধীর জনে করি পরিহার।
রচিলা পদ্মার গীত শাস্ত্র -অনুসার।।
‘সিন্ধু ইন্দু বেদ মহী শক পরিমান’।
নৃপতি হোসেন শাহা গোড়ের প্রধান।।
সেই হিসেবে রচনার তারিখ : ১৪১৭ শকাব্দ (১৪৯৯ খ্রি.)
(৩) মনসা মঙ্গল। কবি বিজয় গুপ্ত। তাঁর বাড়ি বরিশাল। ভনিতা-
‘ছায়াশূন্য বেদ শশী পরিমিত শক।
সনাতন হোসেন শাহ নৃপতি তিলক \’
রচনাকাল : ১৪১৬ শকাব্দ (১৪৯৮ খ্রি.)। সুলতান আলাউদ্দিন হোসেন শাহ’র আমল।
(৪) ‘গৌরী মঙ্গল’। কবিচন্দ্র শঙ্করকিঙ্কর মিশ্র। ত্রিবেণীর নিকটবর্তী বালাÐা গ্রাম। রচনার তারিখের ভনিতা- নব শশী সুর ইন্দ শক পরিমিত, কবিচন্দ্র মিশ্র বলে চÐীর চরিত’। ১৪১৯ শকাব্দ (১৪৯৭ খ্রি.)।
(৫) ‘চৈতন্য মঙ্গল’। রচয়িতা- গোপিনাথ দাস।এতে ভনিতায় সুলতান হোসেন শাহ’ জন্ম বিবরণ লিপিবদ্ধ আছে।
‘বেদ সিন্ধু নেত্র ইন্দু শক পরিমিতে,
জন্ম সুনতান গৃহে শুক্লা দশমিতে,
বিধিমত হৈক নাম সৈঅদ হুসন’। ১৩৭৪ শকাব্দ (১৪৫২ খ্রি.)।
(৬) ‘ধর্ম মঙ্গল’। রচয়িতা- খেলারাম ভট্টাচার্য। ভনিতা-
‘ভুবন শকে বায়ু মাস শরের বাহন,
খেলারাম করিলেন গ্রন্থ আরম্ভন। এই হিসেবে ১৪৪৯ শকাব্দ (১৫২৭ খ্রি.)। কিন্তু বসন্ত কুমার চট্টোপাধ্যায়ের মতে এটি ১৬১৪ শকাব্দ (১৬৯২ খ্রি.)।
(৭) ‘রায়মঙ্গল’। কবি কৃষ্ণ রাম দাস। দক্ষিণ বংগের লোক বলে অনুমিত হয়। ভনিতা- ‘কৃষ্ণরাম বিরচিল রায়ের মঙ্গল, বসু শূন্য ঋতু চন্দ্র শকের বৎসর। অর্থাৎ ১৬০৮ শকাব্দ, (১৬৮৬-৮৭ খ্রি.)।
(৮) পরাগলি মহাভারত/ কবিন্দ্র মহাভারত। কবিন্দ্র পরমেশ্বর। স্থান- চট্টগ্রাম জেলার মীরসরাই’র পরাগলপুর। (তৎকালীন চট্টগ্রামের রাজধানী)। ১৫১৫-১৫১৯ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে রচিত হলেও এর কোন ভনিতা বা মঘী,শকাব্দ বা হিজরী সন উল্লেখিত রচনার তারিখ পাওয়া যায়নি। তবে কল্পনা ভৌমিক দুই খন্ডে যে কবিন্দ্র মহাভারতের সম্পাদনা করেছেন,তাতে অনেক লিপিকারের লিপির সন উল্লেখ আছে।যেমন-১৫৬২/১৬১০/১১ শকাব্দ এবং ১২০৪/১২০৭/১২০৮ বঙ্গাব্দ। অথচ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে গ্রন্থাগারের পরাগলী মহাভারতে (পুঁথি নং- ৪৬৯৩) শ্রী কালি শঙ্কর সিংহ,সাকিম- উত্তর সাহাবাক পুর,তারিখ -১৮ মাঘ, শকাব্দা ১২৬৪ (১৩৪২ খ্রি.)উল্লেখ আছে। তবে এ’ সনটি শকাব্দ নয়।ভুলে বঙ্গাব্দের স্থলে শকাব্দ লেখা হয়েছে।কারণ,কবিন্দ্র মহাভারতের লেখার সময়কাল হোসেন শাহের রাজত্বে ১৫১৫-১৫১৯ খ্রীষ্টাব্দের মধ্যে।
(৯) ‘নবী বংশ’। (মহাকাব্য।পৃষ্ঠা সংখ্যায় রামায়ন,মহাভারত থেকেও বড়)। রচয়িতা:- কবি সৈয়দ সুলতান।পরাগলপুরের বাসিন্দা।তিনি একাধারে সুফিসাধক,পদাবলি- গায়ক এবং পীর ছিলেন
১ লস্করের পুরখানি আলিম বসতি।
মুঞ মূর্খ আছি এক সৈয়দ সন্ততি’ \
‘নবী বংশ রচনার সঠিক তারিখ পাওয়া না গেলেও তাঁর শেষ রচনা’ শবে মেয়েরাজ’এ দুটি ভণিতা পাওয়া যায়। ‘গ্রহ শত রস যুগে অব্দ গোঞাইল।
দেশী ভাষে এহি কথা কেহ না কহিল’।।
এই হিসাবে ডক্টর এনামুল হক গ্রন্থ রচনার তারিখ নির্ণয় করেছেন ৯০৬ হিজরী (১৫০০ খ্রি.)।
দ্বিতীয়তঃ,
‘দশ শত রস যুগে অব্দ গোঞাইল’।
এই হিসেবে ১০৬৪ হিজরী (১৬৫৪—৫৫ খ্রি.)।
(১০) মনসা মঙ্গল’। কবি দ্বিজ বংশী দাস, ময়মনসিংহ। রচনার তারিখ -১৪৯৭ শকাব্দ। (১৫৭৫ খ্রি)।
(১১) নসিয়ত নামা। পুঁথিকার : আফজল আলী।চট্টগ্রামের সাতকানিয়ার মিলুয়া গ্রামের অধিবাসী।
‘চাটিগ্রাম মধ্যে ক্ষুদ্র এক গ্রাম।
মিলুয়া করিয়া আছে সেই গ্রামের নাম।
আলাউদ্দিন হোসেন শাহের পৌত্র সুলতান ফিরোজ শাহের আমলে (১৫৩২-৩৩ খ্রি.) রচিত।এই পুঁথিটির অনুলিখনের দুটি তারিখ পাওয়া গেছে: – ১১২৪ মঘীসন (১৬৬২খ্রি.) এবং ১২২৪ মঘীসন (১৭৬২খ্রি.)
(১৩) ‘মুক্তুল হোসেন বা হোসেন বধ। এটি জঙ্গনামা’ নামেও সুবিখ্যাত। রচয়িতা : কবি মোহাম্মদ খান।চট্টগ্রামের কবি।দশ সর্গে বিভক্ত মহাকাব্য। প্রায় আড়াই শ’ বছর পরে এরই অনুকরণে মহাকবি মধুসুদন দত্ত ‘মেঘনাদ বধ’ কাব্য রচনা করেন।রচনার তারিখের তিনটি ভণিতায় পাওয়া গেছে।
“মুসলমানি তেরিখের দশ শত ভেল।
শতের অর্ধেক পাছে ঋতু বহি গেল।।
হিন্দুয়ানি তেরিখের শুন বিবরণ,
বাণ বহো সম অর্ধ আর বাণ শত
বিংশ তিন দুন করি চাহ দিয়া দধি,
পাঞ্চালিকা পূর্ণ হৈল সে অব্দ অবধি’।
এখানে কবি হিজরী এবং শকাব্দে ভণিতা দেয়া সত্তেও এটির সঠিক অনুবাদ হয়নি। তবে পন্ডিত সুকুমার সেন এটিকে ১৫৫৭ শকাব্দ বলেছেন। (১৬৩৫ খ্রি.)।
কবির ‘সত্যকলি বিবাদ সংবাদ’। তারিখ-১০৩৬ হিজরী, ১৫৬৭ শকাব্দ। (১৬৪৬ খ্রি.)।

(১৪) ‘শরীয়তনামা’। কবি নসরুল্লাহ খোন্দকার। ভনিতায় কবি লেখেন-
‘চন্দ্র ঋতু সিন্ধু পাশে গগনের বাস,
সমুদ্র দিবস আদি হইল ছয় মাস’। আবার তিনি লেখেন-
‘শরীয়তনামা বাণী লেখা সাঙ্গ ভেল,
সন তারিখ লেখিবারে শ্রদ্ধা বাড়ি গেল।
চতুর্বিংশ আঘ্রানের জোহর সময় \
আছিল ঈদের দিন রোজ সমবার,
সেদিন হইল লেখা সমাপ্ত সুসার’।
এই হিসেবে গ্রন্থ রচনার তারিখ= ১৬৭১ পাওয়া যায়। ডা. আবদুল করিম গবেষণা করে মত দিয়েছেন, ১৬৭১ সন কোন মতেই হিজরী, মঘী বা বাংলাসন হওয়া সম্ভব নয়। করণ, ঐ সন সমুহ তখনো ১৬০০ বছরে পৌঁছেনি। তাই এটি ১৬৭১ শকাব্দ অর্থাৎ ১৭৪৯ খ্রি.।
(১৫)সায়াৎনামা বা নীতিশাস্ত্র বার্তা। রচয়িতা : কবি মুজম্মিল। চট্টগ্রামের অধিবাসী।
‘নীতিশাস্ত্র বার্তা জান পাসাণের রেক।
এ সব জানিলে লোকের জ্ঞান বাড়িবেক’\
রচনাকাল: ১৬৭৯ শকাব্দ ( ১৭৫৭ খ্রি.) । তখনো কিন্তু ‘বঙ্গাব্দ’ ব্যবহৃত হয়নি।
(১৬) ‘মধুমালতি’। রচয়িতা : মোহাম্মদ কবির। বাংলাদেশের প্রাচীন কবিদের অন্যতম। ভণিতায় তারিখ পাওয়া যায়।
‘অঙ্গ সঙ্গে রহে রস বিন্দু তার কাছ,
পঞ্চালী ভনিতে গেল হিজরীর পাঁচ’।
ডক্টর এনামুল হকের মতে ৮৯১ হিজরী (১৪৮৫ খ্রি.) বাংলায় তখন সুলতান জালাল উদ্দিন ফতেহ শাহ। মধুমালতি পুঁথির অনুলিখিত পান্ডুলিপিও পাওয়া গেছে।
এই অনুলিখনের তারিখ আবার ১১০১মঘী সন (১৭৩৯ ডখ্র.)। এতেও ‘বঙ্গাব্দ’ ব্যবহৃত হয়নি।
(১৭) ‘কিফায়তুল মুসল্লিন’। রচয়িতা : শেখ মোত্তালিব। চট্টগ্রামের সীতাকুন্ডের বাড়ি।
বাংলা, আরবী উভয় হরফে এই পুঁথি পাওয়া গেছে। মুসলমানদের অজু নামাজ রোজা হজ্ব জাকাত আরাকাম আহকাম ইত্যাদি বিষয় নিয়ে রচিত এই পুঁথি বহুল প্রচারিত ছিল।
‘কিফায়তুল মুসল্লিন শুন দিয়া মন
বঙ্গ ভাষে কহে শেখ পরাণ নন্দন।
সীতাকুন্ড গ্রাম শেখ পরাণ সুজন
তাহার নন্দন হীন মোত্তালিব জান’।
রচনার তারিখ : ১০৪৯ হিজরী (১৬৩৯ খ্রি.)।
(১৮) ‘সরসালের নীতি’। ফার্সি ভাষা থেকে অনুদিত।
‘এই যে নোচকা জান ফারছি আছিল,
সবে বুঝিবারে হীনে পাঞ্চালী রচিল।
নোচকা বলয়ে যারে ফারছি ভাষায়,
তার্তিব কিতাব বলি কহে বঙ্গভাষায়’ \
রচয়িতা : কমর আলী পন্ডিত। জন্মস্থান- চট্টগ্রামের ‘করলডেংগা’। রচনার তারিখ- ১০৮৬ হিজরী (১৬৭৫ খ্রি.)।
(১৯) ‘আমির হামজা’। আশি পর্বে বিভক্ত বিশাল মহাকাব্য। ফার্সি কাব্যের অনুবাদ। কবি নিজেই তাঁর কাব্য সম্বন্ধে মন্তব্য করেছেন
‘থাকুক লেখক কেহ পড়তে লাগে ডর’।
রচয়িতা : আবদুন নবী। চট্টগ্রামে সীতাকুÐের অধিবাসী।
‘আমির হামজা জিম্মা ফারসী কিতাব,
ন বুঝিয়া লোকের মনেত পাই তাব (তাপ)।
বঙ্গেতে ফারসি ন জানএ সব লোকে… ’।
রচনার তারিখ – ১০৯৬ হিজরী (১৬৮৪ খ্রি.)।
(২০) ‘মৃগলুব্দ’ পুঁথি। রচয়িতা- রতি দেব।
চট্টগ্রামের চক্রশালার অন্তর্গত সুচক্রদন্ডী গ্রামের অধিবাসী। এই পুঁথিতে কবি শিবমাহাত্ম বর্ণনা করেছেন।
‘শিবরাত্রি চতুর্দশী ব্রত উপবাস,
যেন মত অবনীতে হইল প্রকাশ’।
পুঁথিতে ভনিতা রয়েছে।
‘রস অংক বায়ু শশী শাকের সময়’।
এই হিসেবে রচনার তারিখ -১৫৯৬ শকাব্দ (১৬৭৪ খ্রি.)।
(২১) ‘রসুল বিজয়’। কবি শেখ চান্দ।ত্রিপুরার অধিবাসি। ভনিতায় পুঁথির রচনার তারিখ আছে।
‘ফাতে মোহাম্মদ সুত সএক চান্দ নাম।
মুর্শিদের আজ্ঞায় পাচালী রচিলাম \
মরিস্বীদের আগ্যা পাহিয়া কহে হিন্য চান্দে।
এগার সহ বাইস সন রচিল প্রববন্দে \
অর্থাৎ ১১২২ বাংলা (১৭১৫ খ্রি.)।
(২২) ‘অভয়া মঙ্গল’। কবি দ্বিজ রাম দেব। এই গ্রন্থে কবির আত্মপরিচয় নেই।
অনেক পন্ডিত ব্যক্তির মতে তিনি চট্টগ্রামের অধিবাসী।তাঁর ভনিতায় রচনার তারিখ পাওয়া যায়।
‘ইন্দু বাণ ঋষি বাণ শক নিয়োজিত,
রচিলেক রামদেব সারদা চরিত’।
অর্থাৎ ১৫৭৫ শকাব্দ (১৬৫৩ খ্রি.)।
(২৩) ‘সিরনামা’। রচয়িতা- শেখ মনসুর।অষ্টাদশ শতকের কবি। রামুর অধিবাসী। এটি ফারসি ‘আসরারুল মসা’ বা ‘বীর্য রহস্য’ নামক গ্রন্থের কাব্যানুবাদ। ভনিতায় রচনার তারিখ পাওয়া যায়।
‘আছারল মসা এক কিতাব উপাম,
ছিরনামা রাখিলাম পুস্তকের নাম।
যত হৈল মঘী সন লও পরিমানি,
এর পরে শূন্য ছ’ও পাঁচ দিয়া গোনি’।
অর্থাৎ ১০৬৫ মঘী সন (১৭০৩ খ্রি.)।
(২৪) ‘গুল-ই- বকাউলি’ এবং ‘ফায়দুল মুকতদী’। কবি মুহম্মদ মুকিম। চট্টগ্রামের নোয়াপাড়ার অধিবাসী। কাব্যে ইংরেজ প্রশস্তি আছে।
‘চিরদিন ইংরাজ এথা মহীপাল,
ভালে ভাল মন্দে মন্দ তস্করের কাল’।
তবে তাঁর কাব্যে ইংরেজি বা বঙ্গাব্দ’র উল্লেখ নেই।তাঁর ‘ফায়দুল মুকতদী’ কাব্যের ভনিতায় রচনার তারিখ উল্লেখ আছে। ‘ঋতু বেদ চন্দ্র শত আশী আর নয়’- অর্থাৎ ১১৩৫ মঘী সন। (১৭৭৩ খ্রি.)।
(২৫) ‘মনসা মঙ্গল’ ও ‘আদিত্য চরিত’। কবি রামজীবন বিদ্যাভূষণ। অষ্টাদশ শতকের প্রথম ভাগের কবি। জন্মস্থান- চট্টগ্রামের বাঁশখালী থানার সাধনপুর গ্রাম। কবির ভনিতা-
‘সরকার ঋতু বিধু শক নিজোজিত,
মনসা মঙ্গল রাম জীবন চরিত’। অর্থাৎ
১৬২৫ শকাব্দ। (১৭০৩ খ্রি.)। এবং ‘আদিত্য চরিত’- এর ভনিতা,
‘ইন্দু রাম,ঋতু বিধু শকাব্দ’- ১৬৩১ শকাব্দ। (১৭০৯ খ্রি.)।
(২৬) ‘চন্ডী মঙ্গল গীত’। কবি ভবানী শঙ্কর দাস। চট্টগ্রামের চক্রশালার বাসিন্দা। ভনিতা-
‘দাতা বিন্দু সাগরেন্দু শকাদিত্য সনে,
ভবানী শংকর দাসে পঞ্চালিকা ভণে’।
এই হিসেবে পুঁথির তারিখ ১৭১১ শকাব্দ। (১৭৮৯ খ্রি.)।
(২৭) ‘বুরহানুল আরেফিন’। তাসাউফ মূলক গ্রন্থ। রচয়িতা- সৈয়দ নুরুদ্দিন।
কবির কাব্যে রচনার তারিখ উল্লেখ আছে।
‘বার শ তিন সনে পুস্তক লেখা যায়,
পড়িলেক শুনিলে জ্ঞান জর্মিব সবায়’।
১২০৩ বাংলাসন ( ১৭৯৬ খ্রি.)। কবি এটিকে ‘ বঙ্গাব্দ’ বলেন নি।
(২৮) ‘রায়মঙ্গল’। কবি রূপরাম। ভনিতায় কবি লেখেন-
‘রাজমহলের অঙ্কে যবে ছিল শুজা।,
পরম কল্যাণে যত আছিল প্রজা।।
সেই হইতে গীত গাই আসর ভীতর।
দ্বিজ রূপনাম গান শ্রীরামপুরে ঘর।।
…..
শাকে সিমে জড় হইলে যত শক হয়।
তিন বাণ চারি যুগ বেদে যত রয়।।
এই হেঁয়ালির ব্যাখ্যা নানান পন্ডিত নানান ভাবে করেছেন। আচার্য যোগেশ চন্দ্র রায়-১৫৮৬ শকাব্দ (১৬৬৪ খ্রি.), ড. নলিনী কান্ত ভট্টশালী ১৫১২ শকাব্দ (১৫৯০ খ্রি.),
বসন্ত কুমার চট্টোপাধ্যায় ১৬৬১ শকাব্দ (১৭১৯ খ্রি.) এবং ডঃ সুকুমার সেন ১৫৭২ শকাব্দ (১৬৫০ খ্রি.)।

(২৯) ‘গোরক্ষ বিজয়’Ñ রচয়িতা- কবি শেখ ফয়জুল্লা। ভনিতায় লিখেছেন-
‘তুমি ব্রহ্মা তুমি বিষ্ণু তুমি নারায়ণ,
শুন গাজী আপনি আসরে দেহ মন।
বলে ফয়জুল্লা কবি পাচনায় বসতি…
এবে কহি সত্যপীর অপূর্ব কথন।
ধন বাড়ে শুনিলে পাতক খন্ডন।।
মুনি রস বেদ শশি শাকে কহি মন।
শেখ ফয়জুল্লা ভনে ভাবি দেখ মন’।।
ড. সুকুমার সেন ভনিতার শুদ্ধ পাঠ ‘মুনি বেদ রস শশি শক’ করে একে ১৬৪৭ শকাব্দ বলেছেন। (১৭২৫ খ্রি.)।
(৩০) ‘কালিকা মঙ্গল’। লেখক- নিধিরাম আচার্য। চট্টগ্রাম জেলার পটিয়ার চক্রশালা গ্রামে কবির জন্ম। তাঁর ভনিতায় রচনার তারিখ রয়েছে।
‘শকাব্দা ষোড়শ শত জরনিধি বসু,
দৈব বিধ বিরচিত নিধিরাম শিশু’। অর্থাৎ ১৬৭৮ শকাব্দ। (১৭৫৬ খ্রি.)।
(৩১) ‘সারদা মঙ্গল’। কবি মুক্তারাম সেন। বাড়ি- চট্টগ্রামের আনোয়ারার দেবগ্রাম বা দেয়াং। চট্টগ্রামের শাসনকর্তা হোসেন কুলি খাঁর আমল।
‘পিতা মোর মধুরাম তাহান সন্ততি,
তিন পুত্রে লৈয়া কৈল দেয়াঙ্গে বসতি’।
তাঁর ভনিতা- ‘গ্রহ ঋতু কাল শশী’- ১৬৬৯
শকাব্দ। (১৭৪৭ খ্রি.)।
(৩২) ‘রামতত্ব’। রচয়িতা- রামানন্দ যতী। ভনিতায় লেখেন-
‘যতী বলে মহীতে অনেক রামায়ন,
রস ছাড়া কথা আমি না করি রচন।…
বেদ বসু ঋতু চক্র শকে রামায়ন,
রামতত্ব রামানন্দ করিল রচন’। অর্থাৎ ১৬৮৪ শকাব্দ, (১৭৬২ খ্রি.)।
(৩৩) ‘তমিম গোলাল চতুন্য সিল্লাল’। সংগ্রহকারী- সুলতান আহমদ ভূঁইয়া। তারিখ- ২৭শে জ্যৈষ্ঠ, ১২৫০ সাল। (১৮৪৩ খ্রি.)।
(৩৪) ‘মসলা- মসায়েলের বয়ান’। লিপিকর- মোহাম্মদ ইয়াসিন। এই পুঁথির ভনিতা পাওয়া যায়।
‘বারশত বাওন্য হিজরী হিন্দি তেতাল্লিশ।
তেরো য়াসুড়ার চাঁদ বৈকর উনিশ’।
অর্থাৎ ১৩ মহররম,১২৫২ হিজরী।
(৩৫) ‘গুলজার-ই-শাহাদত’। রচয়িতা- খান বাহাদুর হামিদুল্লাহ খান। রচনার তারিখ- ১২৮০ হিজরী, ১৭ই রমজান। এবং ১২৭০ সাল, ১৫ই ফাল্গুন। (১৮৬৩ খ্রি.)। তাঁর ‘ত্রাণপথ’ ও ‘ক্লীবত্ব মোচন’, গ্রন্থ দুটির মুদ্রণ তারিখ ১২৭৭ সাল, ১৮৭০ খ্রি.)।
(৩৬) ‘ কমরুজ্জামান ছফুরা খাতুন বা রসমঞ্জরী’। পুঁথিকার-কবি মোশারফ আলী। বাড়ি- চট্টগ্রাম জিলার সীতাকুন্ড থানার মুরাদপুর।এটি একটি হিন্দি গ্রন্থের অনুবাদ।
রচনাকাল- ১২৩২ মঘী,(১৮৭০ খ্রি.)।
(৩৭) ‘এলমাজ বাদশার পুঁথি’। রচয়িতা- হায়দর আকবর। চট্টগ্রাম জিলার বাসিন্দা।
‘ফারছির ভাসে সবে না বুঝে কারণ,
বাঙ্গালার ভাসে রচিলুম তেকারণ।
……..
মৌজে মুরাদপুর আর জিলে চাটিগ্রাম,
শহর কাতালগঞ্জ সাকিন মোকাম’।
রচনার তারিখ- ১২০৪ মঘী, (১৮৪২ খ্রি.)।
(৩৮) ‘অবকাশ রঞ্জিনী’। কবি নবীন চন্দ্র সেন। চট্টগ্রাম জেলার নোয়াপাড়া গ্রামে জন্ম। রচনার তারিখ -১২৮৪ সন (১৮৭৭ খ্রি.)। ‘অমিতাভ’। ১৩০২ সন (১৮৯৫ খ্রি.)।
‘অমৃতাভ’। শ্রী চৈতন্যের নবদ্বীপ লীলার কাহিনী। তারিখ -১৩০৪ সন, (১৮৯৭ খ্রি.)। ‘খ্রিস্ট’। হজরত ঈসা (আঃ) জীবনী। তারিখ- ১২৯৭ বাংলা। (১৮৯০ খ্রি.)।
(৩৯) ‘রঘুবংশ’। কবি নবীন চন্দ্র দাস। চট্টগ্রামে জন্ম।রচনার তারিখ- ১২৯৮ বাঙলা, (১৮৯১ খ্রি.)। ‘আকাশ কুসুম’। রচনার তারিখ- ১২৯০ বাঙলা, (১৮৮৩ খ্রি.)।
(৪০) ‘সাবিত্রী’। কবি শশাঙ্ক মোহন সেন। জন্মস্থান- চট্টগ্রাম। রচনার তারিখ- ১৩১৬ (১৯০৯ খ্রি.)।
‘স্বর্গে ও মর্ত্ত্যে’। তারিখ- ১৩১৯ (১৯১২ খ্রি.)।
‘বিমানিকা’। তারিখ- ১৩৩১(১৯২৪ খ্রি.)।
আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদ ও তাঁর সংগৃহীত কতিপয় পুঁথির সন তারিখ।
সাহিত্যবিশারদের জন্ম ২৫ আশ্বিন ১২৭৮ বাংলা (১৮৭১ খ্রি.)।
তবে তাঁর ভ্রাতুষ্পুত্র অধ্যাপক আহমদ শরীফের কাছে সাহিত্যবিশারদের জন্ম- পত্রিকা রক্ষিত আছে। এই কোষ্ঠীতে তাঁর জন্ম সন ১২৩৩ মঘী তথা ১৭৯৩ শকাব্দ ২৫ শে আশ্বিন।
(৪১) ‘পদ্মাবতী’। মহাকবি আলাওল।
একটি পান্ডুলিপিতে ভনিতা পাওয়া গেছে।
‘যুগ ভুগ তার রস সব্দ নিত্য দসা,
যেজন তাহাতে রত পুরিবেক আসা।।ভারতীয় লিপিবিদ্যাবিশারদ পন্ডিত হরিদাস পালিত মহাশয়ের মতে ‘যুগ ভুগ তার রস’ একটি তারিখ এবং ‘সব্দ নিত্য দসা’ আর একটি তারিখ। তাঁর মতে ‘শব্দ নিত্য দসা’র সংখ্যা ১০১৩। ডা. হক এবং সাহিত্যবিশারদের মতে ১০১৩ মঘীসন। (১৬৫১ খ্রি.)। কিন্তু সুলতান আহমদ ভূঁইয়ার হিসেবে এই সংখ্যা ১০৬২ এবং তা হিজরী সন। (১৬৫১ খ্রি.)।
এছাড়া সাহিত্যবিশারদ কর্তৃক সংগ্রহীত দুটি লিপিকৃত পুঁথির তারিখ পাওয়া গেছে।
(ক) চক্রশালার শ্রী ডোমন মহোরীর কাছ থেকে। ইপতিদা লাগায়ত সন ১৩৫৬ মং ইতি সন ১৩৫৮ মং (মঘী)তারিখ ১৬ আগ্রান। অর্থাৎ ১৭৯৪/১৭৯৬ খ্রি.)।
(খ) ‘পদ্মাবতী’ সম্পূর্ণ পুঁথি। কাপড়ের মলাট। লিপিকাল- ১২১৯ মঘী। (১৮৫৭ খ্রি.)।
(৪২) ‘তোহফা’। মহাকবি আলাওল মূল ফার্সি কবি ইউসুফ গদা। ভনিতায় কাব্যের আরম্ভ ও শেষের তারিখ পাওয়া যায়।
‘সিন্ধু শত গ্রহ দশ সন বাণাধিক।
রচিলা ইউসুফ গদা তোহফা মানিক।।
দুই শত অষ্টোত্তর সত্তর রহিল।
আলীমে পাইল মর্ম আসে না পাইল।।
পুস্তক সমাপ্ত সংখ্যা সন মুছলমানি।
রসসিদ্ধ রামারির লও পরিমানি’।।
সুলতান আহামদ ভূঁইয়া এটিকে ‘রস সিন্ধু রামারির মুন্ড’ নির্দিষ্ট করে ১০৭৬ হিজরী বলেছেন। (১৬৬৪ খ্রি.)।
(৪৩) ‘দুল্লা মজলিস’। আবদুল করিম খোন্দকার। আরাকান। রচনার তারিখ ভনিতায় উল্লেখ আছে-
‘এবে শুন মুছলমানি সঙ্কের কথন!
এক সহগ্র দুই শত আর গ্রহ সন।।
সহগ্রেক শতেক সাইত অব্দ আর।
মঘি সনএ লিখন শুন পূনর্বার’।।
অর্থাৎ কাব্যখানি ১২০৯ হিজরী তথা ১১৬৩ মঘী সনে রচিত হয়েছে। (১৭৯৮ খ্রি.)।
(৪৪) ‘লাইলী মজনু’। কবি দৌলত-উজির বাহরাম খাঁ। আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদ কর্তৃক ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে প্রদত্ত দুটি কাব্যে অনুলিপির সন তারিখ পাওয়া গেছে।
(ক) লিপিকার- কালিদাস নন্দী। ২০ শে আগ্রান, শুক্রবার, ১১৯১ মঘী।
(খ) লিপিকার- জিন্নত আলি। মঘী সন ১২২৬।
(৪৫) একটি ক্ষুদ্র কলমি পুঁথি (লালন শাহের আত্মচরিত)। লালন শিশ্য দুদ্দু শাহ। কালবেড় হরিশপুর। জিনাইদহ। এতে লালন শাহের জন্ম, মৃত্যুর উল্লেখে বাংলাসন ব্যবহৃত হয়েছে।
‘এগারো শো উনআশি কার্তিকের পহেলা,
হরিষপুর গ্রামে সাঁইর আগমন হৈলা।….
বারশত সাতানব্বই বাংগালা সনেতে,
পহেলা কার্তিক শুক্রবার দিবা অন্তে।
সবারে কাঁদায়ে মোর প্রাণের দয়াল।
ওফৎ পাইল মোদের করিয়া পাগল।।’
অর্থাৎ বাংলা ১১৭৯= ১৭৭২ খ্রি.,জন্ম।
১২৯৭ বাংলা = ১৮৯০ খ্রি., মৃত্যু।।
(৪৬) ‘প্রেমরতœ’। কবি জামাল উদ্দিন। দিনাজপুর। ভনিতা-
‘বার সও সাইট সালে পোনর শ্রাবণে।
জুম্মার নামাজ বাদ নিজ নিকেতনে।।
বন্দেগি থানায় বাসে ( ঘিরলাই গ্রামে।
প্রেমরতœ কেচ্ছা সার নিলৈক্ষার নামে।।
অর্থাৎ ১২৬০ বাংলা= ১৮৫৩ খ্রিস্টাব্দ।
সুতরাং নিঃসন্দেহে এই সব তথ্য উপাত্তে প্রমাণিত হয়েছে যে, ‘বাংলাসন’ বা ‘বঙ্গাব্দ’ নামক সনটি বাঙালির নিজস্ব কোন সন নয়। এটিও মঘী, হিজরী, শকাব্দ, গুপ্তাব্দ, খ্রিস্টাব্দ’র মত বহিরাগত সন।।