যুগের প্রতীক

মওলানা মনিরুজ্জমান এছলামাবাদী

এমরান চৌধুরী

47

(পূর্ব প্রকাশের পর)
তের
মওলানা মনিরুজ্জমান এছলামাবাদী ছিলেন একজন কর্ম পাগল মানুষ। সমাজ উন্নত হোক, শ্রীবৃদ্ধি ঘটুক, সমৃদ্ধ হোক, পরিপূর্ণতা পাক এইটাই ছিল তাঁর জীবনের আরাধ্য। সারাজীবন দেশ ও সমাজের জন্য নিরন্তর নিবেদিত থাকার পরও স্বপ্ন দেখেছেন আরও কিছু করার। শৈশব কৈশোরের কয়েকটা বছর বাদ দিলে তারা পুরোটা জীবনই ছিল অবিরাম ছুটে চলার, দেশ ও সমাজের মঙ্গল কামনায়। আমরা পরম বিস্ময়ের সাথে লক্ষ্য করেছি দেশ ও সমাজের উন্নতির ভাবনার কাছে তাঁর পারিবারিক সুখ-দুঃখের ভাবনা তাঁর কাছে মোটেই গুরুত্ব পায়নি। এমন কি তাঁর পুত্রের মৃত্যুর সংবাদ ও তাঁকে তাঁর কাংক্ষিত গন্তব্যে এতটুকু বিচলিত করেনি। এ প্রসঙ্গে মওলানা মনিরুজ্জমান এছলামাবাদীর জীবনীকাল, প্রখ্যাত গবেষক শামসুজ্জামান খান উল্লেখ করেছেন : কয়েকদিন পূর্বে কলিকাতায় মওলানা ছাহেব তার যোগে সংবাদ পান যে, তাঁহার শেষ পুত্র মৃত্যু শয্যায় ছটফট করিতেছেন। কিন্তু “পুত্র সেবা অপেক্ষা দেশ ও ধর্মসেবা অধিকতর আবশ্যক বলিয়া তিনি আবু তোরাব সম্মিলনে যোগদান করিতে চলিয়া যান। সভার কার্য শেষ করিয়া পুত্র দর্শনের উদ্দেশ্যে মধ্য পথে চট্টগ্রাম শহরে উপনীত হইলে, তিনি জানিতে পারেন যে পুত্র কামরুজ্জমান তাঁহার পিতৃ¯েœহে অসন্তুষ্ট হইয়া পরম পিতার সন্ধানে চলিয়া গিয়াছেন। তৎক্ষণাৎ তিনি বাড়ি যাওয়ার সংকল্প পরিত্যাগপূর্বক চট্টগ্রাম মিউনিসিপ্যালটির প্রাথমিক শিক্ষার স্কিম ও অন্যান্য সামাজিক ব্যাপারে আলোচনায় প্রবৃত্ত হন।৩৪
এমনি কর্মনিষ্ঠ, দৃঢ়চেতা মানুষ ছিলেন মওলানা মনিরুজ্জমান এছলামাবাদী। তাঁর বুকের ভেতরের ধুকপুক যেনো তাঁকে নিয়ত তাড়া করতো সমাজ সেবার জন্য, সমাজ বিনির্মাণ এর জন্য জীবন। সায়াহ্নে এসে তাই তার পক্ষেই সম্ভব স্বপ্নময় পরিকল্পনা নেওয়া এবং দীপ্ত উচ্চারণ :
জীবনের শেষ দশা পোষি মনে বড় আশা
সে আশা পুরিব কিনা আল্লাহ ভরসা।
লোকে বলিবে ইহা কল্পনা মাত্র সার
পাগলের প্রলাপ বটে কিছু নহে আর।
আল্লাহর কুদরতে নাহি যাদের বিশ্বাস
কিরূপে তাদেরে আমি দিব যে আশ্বাস?
কি বলিবে লোকে, একথা যাহারা ভাবে
এ জগতে তাহারা কি কাজ করিবে !
নি¤œ কর্ম সম্পাদিব ইহাই বাসনা
শুনিয়া রাখ ভাই করিব বর্ণনা
আল্লা সকাশে করি বিনীত প্রার্থনা
পূরণ করহ মম মনের বাসনা।৩৫
উপর্যুক্ত কবিতায় মওলানা মনিরুজ্জমান এছলামাবাদী যে আশার কথা বলতে চেয়েছেন তা তাঁর আঁতুড় ঘর গ্রামকে ঘিরে। লাহোর সেন্ট্রাল জেলে বন্দী থাকাকালীন তাঁর চোখে ভেসে উঠেছিল অপরূপা গ্রামের কথা। যে গ্রামে তিনি কোন এক সুন্দর মুহূর্তে মায়ের কোল আলো করে ওয়া করে কেঁদে উঠে জানান দিয়েছিলেন পৃথিবীতে তার অস্তিত্বের কথা। সে নৈসর্গিক সৌন্দর্যের আধার আড়ালিয়ার জন্য তাঁর যে কিছুই করা হলো না বিষয়টি তাকে বেশ পীড়িত করে তাঁর হৃদয়জাত সে মর্মপীড়া থেকে নিজের আঁতুড় ঘরকে নিয়ে তিনি দেখেছিলেন নানান স্বপ্ন। তাঁর সে স্বপ্নের কথা, মনোবাসনার কথা, তিনি লিখে গেছেন ‘কর্মতালিকা’ শিরোনামে।
কারণের দীঘির পংক উদ্ধারিব
চারি পারে ঘাট চারি নির্মাণ করিব
দক্ষিণের ঘাট হবে বৃহৎ দ্বিতল
তাতে হবে পাঠাগার সংকল্প অটল
শীতল স্বাস্থ্যকর মিষ্ট পানীয় জল
দেশবাসী করিয়া পান হইবে সুস্থির।
ঈদগাহের পূর্ব দিকে সমস্ত জমির
খরিদ করিয়া কাজে লাগাইব আমি।
সেখানে গড়িব এক জামে মসজিদ
শত শত লোক তাতে পড়িবে জুমা ও ঈদ।
তার পাশে হবে এক এতিম পাঠাগার
দ্বিতল বিশিষ্ট হর্ম অতি মনোহর
অদূরে হইবে ডাক্তার মুসাফের খানা
দূরদেশের লোক তাতে পারে খানাপিনা
দেশবাসী পাইবে ঔষধ মূল্যবিনা
সাধনায় সিদ্ধি দাও ইহাই প্রার্থনা।
বরকলের খ্যাত ফতে খাঁর জঙ্গলে
পূর্ব রেখায় পশ্চিমে কর্ণফুলি খাল
ষোল হাত পাশ মাইল অন্ত সলিল।
চাঁদখালী নদীতে পোল হবে নির্মিত
গাড়ি ঘোড়া লোকজন পার হতে কত
নহর এক মিশিবেক নির্মল সলিলে
রবি শস্যের তাতে হবে উপকার
কৃষকের হবে সুখ যাবে হাহাকার।৩৬
মওলানা মনিরুজ্জমান এছলামাবাদীর এ কর্মপরিকল্পনাকে লেখক, সাংবাদিক, সৈয়দ মোস্তফা জামাল অন্তিম বাসনা নামে অভিহিত করেছেন। তাঁর এ ‘অন্তিম বাসনা’য় উঠে এসেছে দীঘির ঘাট নির্মাণ, পাঠাগার প্রতিষ্ঠা, বিশুদ্ধ পানীয় জলের ব্যবস্থা, জামে মসজিদ নির্মাণ, এতিমদের জন্য পাঠাগার, বিনামূল্যে ওষুধ ও ডাক্তারের ব্যবস্থা, মুসাফের খানা প্রতিষ্ঠা, খাল খনন ও চাঁনখালিতে সেতু নির্মাণ। এখন থেকে বাহাত্তর (১৯৪৫) বছর আগে তিনি যে পরিকল্পনা কথা প্রকাশ করেছিলেন ঐ সময়ের নিরিখে তা ছিল অত্যন্ত প্রয়োজনীয়। তাঁর এ পরিকল্পনার মাঝে আমরা তখনকার গ্রাম বাংলার একটা বাস্তব চিত্র দেখতে পাই। এ চিত্র যে শুধু মওলানা মনিরুজ্জমান এছলামাবাদীর আঁতুড় ঘরের চিত্র তা নয়। পুরো বাংলাদেশটাই ছিল অনেকটা একই রকম। তখন গ্রাম বাংলায় না ছিল কোনো যোগাযোগ ব্যবস্থা, না ছিল বিশুদ্ধ পানীয় জলের উৎস। শিক্ষা, স্বাস্থ্যের ব্যবস্থা ভাবাই ছিল দুঃস্বপ্নের মতো।
ঐ সময় বিশুদ্ধ পানীয় জলের এক মাত্র উৎস ছিল সংরক্ষিত পুকুর আর দীঘির জল। “দক্ষিণ চট্টগ্রামের বেশির ভাগ থানা বিশেষত পটিয়া, আনোয়ারা ও বাঁশখালীর যোগাযোগের একমাত্র মাধ্যম ছিল জলপথ। জলপথে বাহন ছিল নৌকা, লঞ্চ, স্টিমার। এখানে গন্তব্যে পৌঁছাটা নির্ভর করতো জোয়ার ভাটার উপর। অনেক সময় বিশ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিতে সময় লেগে যেতো ছয় ঘণ্টারও বেশি।
গ্রাম বাংলার মানুষের জীবনযাত্রার মান উন্নয়ন, তাঁদের দৌরগোড়ায় শিক্ষার আলো পৌঁছে দেওয়া এবং স্বাস্থ্য সেবার জন্য মওলানা মনিরুজ্জমান এছলামাবাদী যেসব কর্ম পরিকল্পনা নিয়েছিলেন তা বর্তমান প্রজন্মের অনুস্মরণীয় হওয়া উচিত। মওলানা মনিরুজ্জমান এছলামাবাদী সত্তর বছর বয়সে সমাজ সেবার জন্য যে আকুলতা প্রকাশ করেছেন, তা যদি উপলব্ধি করে তাঁর অনুরাগীরা সমাজের উপকারে নিজেদের নিবেদিত করেন, তা-ই হবে মওলানার প্রতি সর্বোত্তম শ্রদ্ধা ও অনুরাগ।
চৌদ্দ :
মওলানা মনিরুজ্জমান এছলামাবাদী সরল ও অনাড়ম্বর জীবনযাপন করতেন। তাঁর খাওয়া দাওয়া পোশাক পরিচ্ছদ ছিল একজন সাধারণ মানুষের মতো। তিনি সবসময় পরিচ্ছন্ন থাকতে ভালবাসতেন। সাধারণ খাবার খেয়েই তিনি তৃপ্ত হতেন। তাঁর এ সাধারণ ও অনাড়ম্বর জীবন যাপনের উপর আলোকপাত করতে গিয়ে ড. সুনীতিভূষণ কানুনগো লিখেছেন : তাঁর এক রাজনৈতিক সতীর্থ কৃষক প্রজাদের নেতা নাকি প্রত্যহ পোলাও সহযোগে মুরগির রোস্ট ছাড়া আহারে তৃপ্তি পেতেন না। অপর পক্ষে প্রায়ই দেখা যেত মৌলানা ইসলামাবাদী তাঁর স্বেচ্ছাসেবক নিয়ে খিচুড়ি খেয়েই তৃপ্ত হতেন। কোনদিন তিনি ব্যয়বহুল পোশাক পরেননি তা সে সংসদেরই অভ্যন্তরেই হোক আর সভাপতির আসনেই হোক। সাধারণ লোকের মতো জীবনযাপন করেছিলেন বলে তিনি সাধারণ শ্রেণীর কাছের মানুষ হতে পেরেছিলেন।৩৭
এই অনাড়ম্বর জীবন যাপনে অভ্যস্ত মানুষটি মেহমান ছাড়া ভাত খেতো না। খাবার খেতে বসলে খাবারের পাত থেকে প্রথমে কুকুর বেড়ালকে কিছু অংশ খেতে দিতেন। মহৎ প্রাণ মানুষেরা ঠিক এ রকমই হয়ে থাকে। সকল জীবের প্রতি তাঁরা সমান দয়া বা দায়িত্ব বোধের পরিচয় দিতে এতটুকু শৈথিল্য প্রদর্শন করতেন না। কৃষক প্রজার প্রতি মওলানা এছলামাবাদী দয়াশীল ছিলেন। এ প্রসংগে সাংবাদিক সৈয়দ মোস্তফা জামাল লিখেছেন :
তিনি পৈত্রিক সূত্রে বেশ জমির মালিক হয়েও সে জমির খাজনা নিতেন নাÑপ্রজাদের শোষণ করতেন না। বরং কৃষক প্রজার কল্যাণেই সারা জীবন কাজ করেছেন। অবশ্য শেষ জীবনে উক্ত জমির একটি হিসাব তিনি একটি খাতায় লিপিবদ্ধ করেন। যাতে সন্তান সন্ততিরা সে সম্পর্কে জানতে পারেন।৩৮
মওলানা মনিরুজ্জমান এছলামাবাদী ধূমপান করতেন না। কোন ধূমপায়ীকে তিনি পছন্দও করতেন না। ধূমপান যে ভালো কিছু নয় বিষয়টা তিনি শৈশবেই বুঝতে পেরেছিলেন। এ কারণে কাউকে ধূমপান করতে দেখলে তিনি বিরক্তিবোধ করতেন। এমন কি পরিবারের কোনো সদস্যও যদি ধূমপান করতো তিনি তা সহজভাবে মেনে নিতেন না। ধূমপানের প্রতি ঘৃণা পোষণ প্রসংগে মওলানা এছলামাবাদী লিখেছেন : আমি শিশু-জীবন হইতে স্বাভাবিক কারণে ধূমপানের প্রতি ঘৃণা পোষণ করিতাম। আমার পিতা বহির্বাটিতে লোকজন আসিলে আমাকে অন্দর বাটিতে তামাক আনাইবার জন্য পাঠাইতেন। আমি কিন্তু আর ফিরিয়া আসিতাম না। এইরূপ আবাধ্যতার জন্য পিতার নিকট অনেক সময় তিরস্কার লাভ করিতে হইত।৩৯
মওলানা এছলামাবাদীর সারাজীবনের নিত্য সঙ্গী ছিল অর্থাভাব। স্বাধীনভাবে জীবিকা অর্জনের জন্য তিনি বহু চেষ্টা করেছেন। তিনি হেকিমি শাস্ত্রেও উচ্চতর পাঠ গ্রহণ করেছিলেন। এছাড়া তিনি মোক্তাবী শিক্ষায় ও ব্রতী হয়েছিলেন তবে তিনি এ দুটোর কোনটিই কর্মজীবনের পেশা হিসেবে গ্রহণ করেন নি। কলকাতার তিনি যৌথ মূলধনে ‘ছাগল কোম্পানি’ নামে একটি ব্যবসা শুরু করেছিলেন। কিন্তু ঐ কোম্পানির ছাগল প্রায়ই খোয়া যেতো। পরবর্তীতে এক প্রলয়ংকরী প্রাকৃতিক দুর্যোগে অধিকাংশ ছাগল মারা গেলে ব্যবসাটি বন্ধ করে দেওয়া হয়। ১৯১১ সালে তিনি চট্টগ্রামের আন্দরকিল্লায় স্টেশনারী টুপিও আতর গোলাপের দোকান খোলেন। কিন্তু অর্থ সংকটের কারণে কিছু দিনের মধ্যে তাও বন্ধ হয়ে যায়। তিনি ‘শাহজাহান কোম্পানী’ নামে কলিকাতার মেছুয়া বাজারে একটি প্রতিষ্ঠানও খুলেছিলেন। এ প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে তিনি প্রায় দুই বছর অর্ডার সাপ্লাই এর কাজ করেন। ১৯২২ সালের দিকে চট্টগ্রামের বকশীরহাট বিটের বিপরীতে তিনি একটি লাইব্রেরী দিয়েছিলেন। ‘শাহজাহান লাইব্রেরী’ নামে এ প্রতিষ্ঠানটি ছিল তখনকার সংস্কৃতিমনা মুসলমানদের আড্ডা ও মুক্তমনা মুসলমান ছাত্র সমাজের প্রধান আকর্ষণ। মওলানা এছলামাবাদীর এসব কর্মকাÐ ছিল নিজের অর্থ সংকট মোচনের নিরন্তর প্রয়াস।
মওলানা এছলামাবাদী অর্থ সংকট দূর করার জন্য চেষ্টার কোনো ভ্রæটি করেন নি। রাতদিন কঠোর পরিশ্রম করেছেন। তবু অর্থসংকট ছিল তাঁর চির সহায়। তিনি নিজে কখন ও একপদ অংলকার তাঁর পরিবারে কাউকে গড়ে দিতে পারেন নি। তাঁর স্ত্রী দু’এক পদ গয়না বহু কষ্টে যা গড়েছিলেন তা প্রায়ই মহাজনের বাড়িতে বন্ধক থাকতো। তিনি তাও শেষ পর্যন্ত ছাড়িয়ে নিতে পারেন নি। এ রকম চরম অর্থ সংকটে ও মওলানা এছলামাবাদী কিন্তু এক মুহূর্তের জন্যও বিচলিত হন নি। কোনো লোভ লালসা ক্ষণিকের জন্যও তাঁকে আচ্ছন্ন করে নি। শত অভাবের মাঝেও তিনি ছিলেন বরাবরই উদার। বঙ্গীয় আইন সভার সদস্য হিসেবে তিনি যে ভাতা পাইতেন তা বিভিন্ন কবি সাহিত্যিকদের মধ্যে বন্টন করে দিতেন।
লেখক : শিশুসাহিত্যিক ও প্রাবন্ধিক

মওলানা মনিরুজ্জমান এছলামাবাদীর স’যোদ্ধা হাকিম আলতাফুর রহমান লিখেছেন :
আমি নিজে এ ধরণের বহু টাকা মনি-অর্ডার করার সৌভাগ্য অর্জন করিয়া ছিলাম।৪০
মওলানা মনিরুজ্জমান এছলামাবাদীর জীবনে অর্থাভাব ছিল। কিন্তু সে অর্থাভাব কখনো তাঁর মনকে লালসার দিকে ধাবিত করনি। লোভ, আমানত-খেয়ানত, ক্ষমতার অপব্যবহার এসব দোষ তাঁকে কখনো স্পর্শ করতে পারেনি। নীতি ও নৈতিকতার ব্যাপারে তিনি ছিলেন দৃঢ়চেতা, অটল। একবার বঙ্গীয় আইনসভায় একজন বিত্তবান সদস্য তাঁকে কিছু ‘এনাম’ দিতে চাইলে তিনি ঘৃণাভরে তা প্রত্যাখ্যান করেন এবং তৎক্ষণাৎ ঐ স্থান ত্যাগ করেন। ঘটনাটির বিবরণ দিতে গিয়ে হাকিম আলতাফুর রহমান লিখেছেন :
মওলানা সাহেব উল্লেখিত বিত্তশালী মুসলিম সদস্যের গৃহে আমন্ত্রিত মেহমান হিসেবে গৃহে গমন করিলে মেজবান একটি বাসনে ১ শত টাকার একটি বেশ বড় বান্ডেল মওলানার সামনে পেশ করেন। মওলানা ইসলামাবাদী তৎক্ষণাৎ আসন হইতে উঠিয়া বলেন, “এরূপ টাকা কখনও কোথাও আমি এ জীবনে গ্রহণ করি নাই। জীবনে বহু লক্ষ টাকা সংগ্রহ করিয়াছি। নিজে ব্যয় করিয়াছি, সমাজ ও কওমের খেদমত করিয়াছি কিন্তু ‘এনাম’ গ্রহণের কোন ঘৃণ্য মত্তকা হইতে আল্লাহ আমাকে দূরে সরাইয়া রাখিয়াছেন। আপনার চা আমার জন্য হারাম এই বলিয়া মওলানা স্থান ত্যাগ করেন।৪১
এমনই নির্লোভ, নিঃস্বার্থ ও সৎ উদ্যেমী ছিলেন মওলানা মনিরুজ্জমান এছলামাবাদী। দেশের, দশের সমাজের ও ধর্মের জন্য ভাবনা ব্যতীত দ্বিতীয় কোনো ভাবনা তাঁর মাথায় ছিল না। কাজের পেছনে নিরন্তর ছুটে চলা কর্মবীর এ মানুষটির কাছে পারিবারিক ভাবনা কখনও বড় হয়ে দেখা দেয়নি। দেশ, সমাজ ও ধর্মের প্রতি প্রবল অনুরাগ দায়িত্ববোধ ও অন্তহীন ভাবনার কাছে পারিবারিক চিন্তা ছিল বুদবুদের মতো। তাঁর সমস্ত সত্বায়, শয়নে, স্বপনে প্রতিটি মুহূর্তে ছিল দেশ ও সমাজের মঙ্গল চিন্তা। জীবনের সুন্দর সময়গুলো দেশ ও সমাজের জন্য ব্যয় করেছেন। তবু তাঁকে নিয়ত তাড়া করে ফিরতো অতৃপ্তি।
মওলানা মনিরুজ্জমান এছলামাবাদী দেশ ও সমাজ ভাবনা মাথায় নিয়ে উল্কার বেগে দেশের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে ঘুরি বেড়িয়েছেন। নিবেদিত চিত্তে কাজ করেছেন।
কাজের ভেতর প্রবৃত্ত থাকার কারণে তিনি পারিবারিক চিন্তাকে কখনো নিজের করে স্থান দিতে পারেন নি। একজন মানুষ কতো হলে বড় মাপের করে দিতে কতো মহোত্তম হলে দেশ ও সমাজের জন্য সবকিছু উজাড় পারেন তা, ভাবতেই বিস্মিত হতে হয়। মওলানা মনিরুজ্জমান এছলামাবাদী তাঁর পারিবারিক অবস্থার কথা বলতে গিয়ে ‘হতাশ জীবন’ গ্রন্থে লিখেছেন :
মানুষের পক্ষে এমন কি কোন কোন পশুপক্ষীরও নিজ ও সন্তানগণের আহার ও লালন পালনের চিন্তা, ভাবনা আছে দেখা যায়। কিন্তু আমি শত চেষ্টা করিয়াও দেখিলাম। অল্পও পারিবারিক চিন্তাকে স্থান দিতে পারিলাম না। এমন কি আমার অভাবে বা আমার এই শেষ জীবনে, বার্ধক্যেরজনিত অসামথ্যের সময় নিজেরও পরিবারিক দশা কি হইবে। এই চিন্তাও আমাকে স্পর্শ করিতে বা ব্যথিত করিতে পারে না। অথচ আমার সাংসারিক অবস্থা এই যে, এক সপ্তাহ কাল বা একদিন চলার মত সম্বল বা সঞ্চয় আমার পকেট বা বাক্স হইতে লাশ দাফনের পয়সা বাহির হইবে না ইহাই নিশ্চিত। কিন্তু সে কথা কখনও মনে উদয় হয় না। ভাবি কেবল সমাজের জন্য; দেশও দশের জন্য কিছুই করিয়া যাইতে পারিলাম না।৪২
মওলানা মনিরুজ্জমান এছলামাবাদী কর্ম জীবনে যেমন ছিলেন আপোসহীন স্বাধীনতা সংগ্রামী, আদর্শবান সাংবাদিক, প্রতিভাবান সাহিত্যিক, নিঃস্বার্থ সমাজকর্মী, তেমনি ব্যক্তি জীবনে ও ছিলেন প্রবল ব্যক্তির সম্পন্ন পুরুষ। অর্থের দীনতা তাঁকে বার বার কাবু করার চেষ্টা করলেও তাঁর ইস্পাত মনকে কোনো ঘাত প্রতিঘাত এতটুকু নরম করতে পারে নি।

 

 

 

 

 

 

 

 

 

পনের

মওলানা মনিরুজ্জমান এছলামাবাদী অর্ধশতাব্দী ধরে আমাদের সাহিত্য, রাজনীতি, সাংবাদিকতা ও সমাজ সেবার ক্ষেত্রে এক অনন্য ভূমিকা পালন করে গেছেন। একটি সাধারণ পরিবার থেকে উঠে আসা এ মানুষটি তাঁর অসাধারণ ব্যক্তিত্বের রোশনাই দিয়ে তখনকার দিশাহারা মুসলমান সমাজকে যেভাবে জাগিয়ে তুলেছেন তা অভাবিত ও বিস্ময়কর। তাঁর জাগরণের বাণী শোনে, তাঁর শাণিত রচনা পাঠ করে তাঁর ওজস্বী বক্তৃতা শ্রবণ করে তখনকার মুসলমান সমাজ অন্ধকারে দেখেছিল আলোর দিশা। যে আলো মুসলমান সমাজের তাপিত প্রাণে দিয়েছিল প্রশান্তির ছোঁয়া, যুগিয়েছিল আঁধার রাতে কুড়াল হাতে সামনে এগিয়ে যাওয়ার প্রেরণা।
মওলানা মনিরুজ্জমান এছলামাবাদী ছিলেন তাঁর সময়কালে একজন খ্যাতনামা আলেম। আরবী, ফার্সি ও উর্দু ভাষায় তাঁর ঈর্ষণীয় দখল থাকার পরও তিনি সাহিত্য সাধনা করেছেন মাতৃভাষা বাংলায়। সবচে’ বিস্ময়কর বিষয় হলো বাংলা ভাষায় তিনি কোন প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাগ্রহণ করেন নি, করার মতো কোন সুযোগ ও ছিল না। তখনকার শিক্ষাব্যবস্থা ছিলো মাদ্রাসা ভিত্তিক আর মাদ্রাসা শিক্ষা ব্যবস্থার পাঠসূচিতে বাংলা বিষয় অন্তর্ভূক্ত ছিল না। তিনি বাংলা ভাষা আয়ত্ত¡ করেন সম্পূর্ণ নিজের চেষ্টায়। বাংলা ভাষায় স্বশিক্ষিত এ গুণী ব্যক্তিত্বের সৃজনশীলতা ছিল কিন্তু অসাধারণ। তিনি সাহিত্য চর্চা করেছেন উৎকৃষ্ট গদ্যে যাতে প্রতিফলিত হয়েছে আধুনিক চিন্তন ও অসম্প্রদায়িক মননশীলতা।
কোন সমাজকে জাগিয়ে তুলুতে, জাগরণের বাণী শোনাতে ঐ সমাজের হৃদয়জাত ভাষা ছাড়া অন্য কোন ভাষায় তা সম্ভব নয়। মওলানা মনিরুজ্জমান এছলামাবাদী শুরু থেকে অনুধাবন করেছিলেন বাংলাদেশে বাংলা ভাষার মাধ্যম ছাড়া কোনো প্রচেষ্টা সফল হতে পারে না। তাই একাধিক ভাষায় সুপÐিত হওয়া সত্বেও তিনি মাতৃভাষাকে সবার উপরে স্থান দিয়েছিলেন। এতে তাঁর মাতৃভাষার প্রতি প্রবল অনুরাগের পরিচয় পাওয়া যায়। বাংলা ভাষায় সাহিত্য সাধনার পাশাপাশি তিনি কোন সভা সমিতি বা সমাবেশে অন্য কোন ভাষায় বক্তব্য রেখেছেন বলে জানা যায় না। উর্দু ভাষায় তাঁর অসাধারণ দখল থাকলেও কোন বাঙালির সঙ্গে কখনো উর্দুতে কথাবার্তা হয়নি। অবাঙালিদের কোন অনুষ্ঠানে উর্দুতে বক্তব্য রাখার প্রয়োজন দেখা দিলে তিনি বক্তব্যের বাংলা অনুবাদ সভাস্থলে বা সংবাদ সাময়িকী সমূহে সরবরাহ করতেন। বঙ্গীয় আইন সভার সদস্য হিসেবে তিনিই প্রথম বাংলা ভাষায় বক্তব্য রাখেন এবং বির্তকে মাতৃভাষা ছাড়া অন্য কোন ভাষা ব্যবহার করেন নি।
মওলানা মনিরুজ্জমান এছলামাবাদীর সাহিত্য কর্ম ইসলামী রেনেসাঁ তথা মুসলমান সমাজের অতীত ঐতিহ্য ও সমাজ ভাবনায় উচ্চকিত। স্বাধীনতা ও সুবিধা বঞ্চিত, পশ্চাদপদ মুসলমান সমাজের শিরা উপশিরায় নতুন রক্ত সঞ্চালনে তিনি রচনা করেছেন বহুগ্রন্থ। এ জন্য দেখা যায় রূপগত ভাবে তাঁর গ্রন্থগুলোর অধিকাংশ ইসলাম ও ইসলামের ঐতিহ্য বিষযক। এছাড়া তিনি অর্থনীতি, ইতিহাস, ভূগোল, নভোমÐল, রাজনীতি বিষয় নিয়েও লিখেছেন। পাশাপাশি সমাজের বিদ্যমান নানা অসংগতি, অবক্ষয় আর কুসংস্কারের জবাব দিতে রচনা করেছেন বহু তথ্যমূলক শিক্ষা ও সমাজ ভাবনা বিষয়ক গ্রন্থ। তাঁর কোনো কোনো গ্রন্থ তথ্য সম্ভারে এমন সম্পূর্ণ ও সমৃদ্ধ যে তখনকার বিদ্বজন ও সাময়িকী কর্তৃক বিপুলভাবে প্রশংসিত হয়েছে। তাঁর ‘কোরআনে স্বাধীনতা বাণী’ অভিভাষণটি স্বাধীনতা বঞ্চিত ও স্বাধীনতা প্রিয় মানুষকে যুগে যুগে প্রেরণা যোগাবে অধীনতার শেকল ভাঙার।
রাজনৈতিক জীবনে মওলানা মনিরুজ্জমান এছলামাবাদী যে ভাবাদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে রাজনৈতিক কর্মকাÐে নিজেকে সম্পৃক্ত করেছিলেন জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত সে আদর্শে অবিচল ও অটল ছিলেন। আপাদমস্তক আলেম হয়েও তিনি লালন করেছেন অসম্পাদায়িক দৃষ্টিভঙ্গি ও সা¤্রাজ্যবাদ বিরোধী চেতনা। দ্বিজাতিতত্তে¡র ভিত্তিতে এক অদ্ভুত রাষ্ট্রের পরিকল্পনার তিনি শুরু থেকেই বিরোধী ছিলেন এবং তা ঠেকাতে সর্বোচ্চ শক্তি ও মেধার ব্যবহার করেছিলেন। পাকিস্তান আন্দোলনের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়ে তিনি যোগ দিয়েছিলেন নেতাজী সুভাষ চন্দ্র বসুর নেতৃত্বাধীন আজাদ হিন্দ ফৌজে।
মওলানা মনিরুজ্জমান এছলামাবাদী ছিলেন হিন্দু মুসলমানের মিলনকামী মহান জাতীয়তাবাদী। যে স্বাধীনতা দুটো সম্প্রদায়ের মধ্যে বিরাজমান সৌহার্দ্যরে অন্তরায় হয়ে দাঁড়াতে পারে সে ক্ষতিকর স্বাধীনতা তিনি কখনো কামনা করেন নি। তিনি তাঁর ক্ষুরধার যুক্তি ও ভূগোল ইতিহাসের জ্ঞান দিয়ে পাকিস্তান রাষ্ট্রের যে অস্তিত্ব সংকটের কথা বলেছিলেন তা তৎকালীন মুসলিম লীগ নেতারা তুড়ি মেরে উড়িয়ে দিলেও স্বাধীনতার এক বছরের মাথায় তা ঠিকই টের পেয়েছিলেন। পরবর্তীতে বায়ান্ন সালের ভাষা আন্দোলনই প্রথম চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছিলো পাকিস্তানের অসারতা আর ভারত বিভক্তির মাত্র চব্বিশ বছরের মাথায় স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশের অভ্যূদয় ছিল সে অসারতার চূড়ান্ত পরিণতি।
বঙ্গীয় আইন সভার বিধায়ক হিসেবে মওলানা মনিরুজ্জমান এছলামাবাদী সব সময় কৃষক প্রজার স্বার্থরক্ষক হিসেবে সোচ্চার ছিলেন। যেখানে যতটুকু তিনি সময় পেয়েছেন সেখানেই কৃষক ও শ্রমিকদের স্বার্থের কথা বলেছেন। ভোগ বিলাসের রাজনীতির প্রতি তাঁর ন্যুনতম মোহ ছিল না। তিনি ছিলেন মাঠের মানুষ। গ্রামে গ্রামে গিয়ে বিপন্ন মানুষেদের পাশে দাঁড়ানো, দুর্যোগ পীড়িতদের কষ্ট লাঘবের প্রয়াস, সর্বোপরি সমাজের অবহেলিত, বঞ্চিত ও শোষিত শ্রেণির স্বার্থরক্ষার জন্য তিনি আজীবন সংগ্রাম করে গেছেন।
মওলানা মনিরুজ্জমান এছলামাবাদী ছিলেন একজন আজন্ম আপোষহীন ব্যক্তিত্ব। লক্ষ্য অর্জনে কোন বাধাকেই তিনি কখনো বাধা হিসেবে মনে করেন নি। রাজনীতিতে আদর্শের প্রশ্নে তিনি ছিলেন দৃঢ় সংকল্পে অটল। মৌলানা আকরাম খাঁ সহ তাঁর সহযোদ্ধাদের অনেকের কৃষক প্রজা সমিতি ত্যাগ করে মুসলিম লীগে যোগ দিলে বিপর্যয়ের মুখোমুখি হয় কৃষক প্রজা সমিতি। বাংলার রাজনীতি তখন কুটিল অবস্থার মধ্য দিয়ে অগ্রসর হচ্ছিল। এরপর অবস্থায় ও তিনি এতটুকু বিচলিত হন নি, বরং নিঃশ্বাসে বিশ্বাসে আদর্শে ছিলেন অবিচল। লাহোর সেন্ট্রাল জেলে এ অশীতিপর স্বাধীনতা সংগ্রামীর উপর চালানো হয় অমানবিক নির্যাতন। এ নির্মম নির্যাতন সত্তে¡ও দেশ ও মাটির প্রশ্নে তিনি ছিলেন বরাবরই আপোষহীন।
মওলানা মনিরুজ্জমান এছলামাবাদীর সাংবাদিকতার জগতে প্রবেশের মূলে ছিল দেশ ও সমাজের পরিচর্যা বঙ্গীয় মুসলমান সমাজের অন্তরে ধরা জং সারিয়ে তাদের অন্তরকে পরিশোধিত শাণিত করে সামনে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার প্রেরণা সৃষ্টিই ছিল এর লক্ষ্য। এ লক্ষ্যে তিনি সাংবাদিকতার পাশাপাশি সংবাদপত্র প্রকাশ করেছেন মাসিক, সাপ্তাহিক। এখানেই তিনি ক্ষান্ত থাকেন নি। আজন্ম আপোষহীন, এক সহজাতিত দুঃসাহসের অধিকারী মওলানা মনিরুজ্জমান এছলামাবাদী তখনকার দৈনিক সংবাদপত্রের ভার বহনের উপযোগী হওয়ার আগেই দৈনিক প্রকাশের ঝুঁকি নিয়েছিলেন। বাঙালি মুসলমান সমাজের জাতীয় জাগরণের ইতিহাসে তাঁর এ স্ব-সমাজ প্রীতি আর দুঃসাহস একটি স্মরণীয় অধ্যায়ের সংযোজন করে থাকবে।
মওলানা মনিরুজ্জমান এছলামাবাদী ছিলেন একজন আদর্শবান সাংবাদিক। যিনি নানা সীমাবদ্ধতার মধ্য দিয়ে বেশ কয়েকটি পত্রিকায় কাজ করেছেন। সম্পাদনা করেছেন দৈনিক ‘ছোলতান’ ও ‘আল এছলাম’র মতো সমসাময়িক কালের উল্লেখযোগ্য সংবাদপত্র। ঐ সময় সংবাদপত্রের মত প্রকাশের কোন স্বাধীনতা ছিল না। মাথার উপর ছিল ব্রিটিশ সরকার কর্তৃক জারিকৃত ভার্ণাকুলার প্রেস এ্যাক্ট, সিডিশাস রাইটিংস এ্যাক্ট প্রভৃতি কালাকানুন। একদিকে সংবাদপত্রের হৃৎপÐ বিজ্ঞাপন সংকট, অন্যদিকে কালাকানুন ভীতির কারণে প্রকাশনা ও সাংবাদিকতা কোনটাই সহজ ছিল না। এরপরও আন্তরিক বিশ্বাসে উদ্দীপ্ত মওলানা মনিরুজ্জমান এছলামাবাদী অসংকোচে সত্য প্রকাশের দুরন্ত সাহস নিয়ে সামনের দিকে এগিয়ে গেছেন। এভাবে তিনি নানা পর্যায় ও বাধা পেরিয়ে তাঁর সাংবাদিক জীবনকে উন্নীত করেছেন ঈর্ষনীয় ধাপে। শুধু তাই নয় যে বয়সে মানুষ স্থবিরতা ও চিন্তা চেতনায় রক্ষণশীল হয়ে ওঠে সে সময়ে সাংবাদিকতায় তাঁর কলম ছিল ধারালো অস্ত্রের মতো ঝকঝকে।
সমাজ সেবার ক্ষেত্রে মওলানা মনিরুজ্জমান এছলামাবাদী যে দৃষ্টান্ত রেখে গেছেন তা যুগ যুগ ধরে অনুকরণীয় ও অনুসরণীয় হয়ে থাকবে। সমাজের সেবা করার জন্য বিত্তের চেয়ে চিত্তের গুরুত্ব যে সর্বাধিক তা তিনি বাস্তবে করে দেখিয়ে গেছেন। আসলে যে কোন মহৎ কাজের জন্য প্রয়োজন আন্তরিক উদ্যোগ। সে সঙ্গে অভিষ্ট লক্ষ্য অর্জনে আল্লাহর উপর ভরসা রাখা ও উদ্যোগ বাস্তবায়নের দৃঢ় সংকল্প বদ্ধ হওয়া। কদম মোবারক মুসলিম এতিমখানা প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন দেখা থেকে শুরু করে প্রতিষ্ঠা পর্যন্ত তাঁর হাত শূণ্য অবস্থায়ই ছিল। ঐ শূণ্য হাতে শুরু করা এতিমখানা আজ বিশাল মহীরহ হয়ে দাঁড়িয়ে আছে চট্টগ্রামের প্রাণকেন্দ্রে। শুধু তাই নয় সম্পূর্ণ বেসরকারী উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত এ এতিমখানার মতো দ্বিতীয় কোনো প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশের স্বাধীনতার আট চল্লিশ বছর এবং মওলানা মনিরুজ্জমান এছলামাবাদীর মৃত্যুর বাহাত্তার বছর পার হলেও অদ্যাবধি প্রতিষ্ঠিত হয় নি।
আমাদের সমাজে কিন্তু সমাজসেবক বা সমাজকর্মীর মোটেই অভাব নেই। এসব সমাজকর্মী বিভিন্ন সভা সমাবেশে উপস্থিত হয়ে হাজার পাঁচ হাজার টাকা অনুদানের ঘোষণা দিয়ে সস্তা হাততালি পাওয়ার জন্য উদগ্রীব থাকেন। কিন্তু প্রকৃত সমাজ কর্মে এদের আগ্রহ খুব বেশি দেখা যায় না। আজকের সমাজকর্মীরা সস্তা জনপ্রিয়তার জন্য সস্তা কাজের প্রতি মনোযোগি হন। হুজুগে ও সমাজকর্মীরা তাই খুব সহজেই শ্যাওলার মতো ভেসে যান।
মওলানা মনিরুজ্জমান এছলামাবাদীর প্রস্তাবিত আরবী বিশ্ববিদ্যালয় ও সমাজ সেবার ইতিহাসে এক বিরল নজির হয়ে থাকবে। একজন ক্ষীণকায় মানুষের হৃদয় কতো বিপুল হলে এ বিশাল পরিকল্পনা হাতে নিতে পারে তা ভাবতেই বিস্মিত হতে হয়। তাঁর জীবনকালে এ পরিকল্পনা বাস্তবায়িত না হলেও তা আর কখনো হবে না এমন কথা বলা যায় না। কারণ ব্যক্তিগত স্বপ্ন ব্যক্তির মৃত্যুর পর স্বপ্নে মিলিয়ে যায়। কিন্তু যে কোনো মহৎ উদ্যোগের স্বপ্ন অমর। আর সে স্বপ্ন একদিন না একদিন মওলানা মনিরুজ্জমান এছলামাবাদীর মতো মহাজ্ঞানী মহাজনের হাত ধরে আবার জেগে উঠবে। একথা নিশ্চিত করে বলা যায়।
মওলানা মনিরুজ্জমান এছলামাবাদী ছিলেন তাই এক একটা যুগের প্রতীক। তাঁর রাজনৈতিক ভূমিকা যেমন অবিস্মরণীয়, তেমনি তাঁর সামাজিক, অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক, ধর্মীয় ও সর্বাত্মক সংগ্রামের কথা অনস্বীকার্য তাঁর সার্বক্ষণিক সাংবাদিকতা, লেখনি পরিচালনা, সাংগঠনিক তৎপরতা ভারতবর্ষের স্বাধীনতাহীন মানুষকে উজ্জীবিত করেছে। আর সমাজ সেবার ক্ষেত্রে তিনি নিজেকে উন্নীত করেছেন এক অনন্য উচ্চতায়। এভাবে মওলানা মনিরুজ্জমান এছলামাবাদী সমাজের নানা ক্ষেত্রে কাজ করে বিনির্মাণ করেছেন ইতিহাসের একটি নতুন অধ্যায়।