মওলানা আবুল হাছান (রহ.)

১৮০১-১৮৬৪

40

মওলানা আবুল হাছান বাল্যকালে চট্টগ্রামে পিতার নিকট প্রাথমিক শিক্ষাগ্রহণ করেন। কিন্তু সেকালে উচ্চ শিক্ষাগ্রহণের কোন প্রতিষ্ঠান চট্টগ্রামে ছিল না। ঢাকায় মোহসেনিয়া মাদ্রাসা ও কলকাতা আলিয়া মাদ্রাসা ছিল। মওলানা আবুল হাছান প্রথমে ঢাকার মোহসেনিয়া মাদ্রাসায় কিছুকাল অধ্যয়ন করেন। পরবর্তীতে পায়ে হেঁটে কলকাতায় যান ও সেখান থেকে উত্তর প্রদেশের মীরাটে যান। কিন্তু মীরাট মাদ্রাসায় তিনি সে বছর ভর্তি হতে পারেন নি। বংশ মর্যাদার চিহ্নস্বরূপ বংশ তালিকা প্রদর্শন করতে ব্যর্থ হলে তিনি সুদূর চট্টগ্রামে ফেরত আসেন। বংশ তালিকা সংগ্রহ করে পুনরায় মীরাটে গিয়ে উপস্থিত হন ও ভর্তি হন। মীরাট মাদ্রাসায় মওলানা আবুল হাছান দীর্ঘ আঠার বছর অধ্যয়ন করেন। জনশ্রুতি মতে, মওলানা আবুল হাছান বাইশটি শাস্ত্রে অধ্যয়ন করে গভীর পান্ডিত্য অর্জন করেন। ইসলামী সাহিত্য, ধর্ম-দর্শন, বিজ্ঞান, ভ‚গোল ও ইতিহাস প্রভৃতি শাস্ত্র তাঁর পাঠ্য তালিকায় অন্তর্ভুক্ত ছিল।
লেখাপড়া শেষ করে তিনি চট্টগ্রামে ফিরে আসেন ও পীর সাহেবের সাথে সাক্ষাৎ করেন। এ সময় কর্ম উপলক্ষে তাঁর কলকাতায় যাবার এবং কথিত আছে কলকাতা আলিয়া মাদ্রাসায় (প্রতিষ্ঠা ১৭৮০ সাল) তাঁর শিক্ষক পদে যোগদানের কথা ছিল। পীর সাহেব তাঁকে বলেন, ‘তুমি রাঙ্গুনীয়া হয়ে কলকাতায় যাবে’। মওলানা আবুল হাছান বাড়ি ফিরে আসেন। কিছুদিনের মধ্যে চট্টগ্রামের জনৈক সরকারি কর্মকর্তা তাঁকে চট্টগ্রামের রাঙ্গুনীয়ার মুন্সেফ পদে চাকরির নিয়োগপত্র হস্তান্তর করেন। মওলানা আবুল হাছান পীরের কথা স্মরণ করে রাঙ্গুনীয়ায় যান ও মুন্সেফ পদে যোগ দেন। কিছুদিন পর তিনি ফতেয়াবাদে মুন্সেফ কোর্টে যোগ দেন। হাটহাজারী থানার ফতেয়াবাদ হাইস্কুল সংলগ্ন দিঘির পশ্চিম পাড়ে সে সময় মুন্সেফ কোর্ট ছিল। তিনি ফতেয়াবাদ খাজাঞ্চী দিঘির পশ্চিম পাশে একটি মসজিদ নির্মাণ করেন। ফতেয়াবাদ থাকতেই তিনি সদরে আমীন বা সাব জজ পদে পদোন্নতি পান। মওলানা আবুল হাছান প্রবর্তিত মাদ্রাসার ধারণাকে ভিত্তি করে চট্টগ্রাম শহরে মোহসেনিয়া মাদ্রাসা (বুড়া মাদ্রাসা বলে পরিচিত, পরবর্তীতে হাজী মুহাম্মদ মহসিন কলেজ) প্রতিষ্ঠিত হয়। সেজন্যে মওলানা আবুল হাছান (র.) কে চট্টগ্রামের আরবি শিক্ষার অন্যতম পথিকৃৎ বলা হয়।
মওলানা আবুল হাছান (র.) কে জ্ঞানের গভীরতার জন্য ছফিনাতুল ইলম বা বিদ্যার জাহাজ বলা হতো। ১৮৫৭ সালে অনুষ্ঠিত সিপাহী বিদ্রোহের আগে পরে চট্টগ্রাম শহরে তিনি ছিলেন অন্যতম বুজুর্গ আলেম। (উল্লেখ্য যে, তাঁর পূর্বে চট্টগ্রামে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি আমলে আলেমকুলের শিরোমণি ছিলেন মৌলবি সৈয়দ গদা হোসেন খোন্দকার। তিনি ছিলেন মধ্যযুগের কবি সৈয়দ সুলতানের অধস্তন বংশধর। মওলানা আবুল হাছান (রহ.) শেষ বয়সে আধ্যাত্মিকতায় মনোনিবেশ করেন। তবে শিরক্ ও বেদ্আত কাজের তিনি বিরুদ্ধে ছিলেন। তাঁর কাছে বিভিন্ন প্রয়োজনে লোকজন দোয়া চাইতে আসতেন। সেজন্যে তিনি ধারণা করেন যে, তার মৃত্যুর পর মাজার বানিয়ে সেখানে অনৈসলামিক কাজ হতে পারে। তিনি মৃত্যুর পূর্বে সকলকে এ বিষয়ে সতর্ক থাকতে বলে যান। মৃত্যুর পর তাঁকে কদম মোবারক মসজিদ সংলগ্ন গোরস্থানে দাফন করা হয়। ১৮৬৪ সালে (মতান্তরে ১৮৫১) ৬৩ বছর বয়সে মওলানা আবুল হাছান (র.) ইন্তেকাল করেন। মির্জাখিলের প্রখ্যাত পীর ও আলেম মওলানা মোখলেছুর রহমান (রহ.) ও হালিশহরের হযরত আলী শাহ ফকির (উভয়ের ইন্তেকাল ১৮৮৫ সাল) মওলানা আবুল হাছান (রহ.)-র বন্ধু ছিলেন।
তথ্যসূত্র : চট্টল মনীষা (আহমদ মমতাজ, রাইহান নাসরিন)