ভয়াল ২৯ এপ্রিল ও পূর্ববর্তী ঘূর্ণিঝড়

এ, ওয়াই, এম, জাফর

54

ঋতু বৈচিত্রের এ দেশে তাপদাহের পারদ, ঝড়ের প্রকোপ, বৃষ্টির আগমন, শৈত্যপ্রবাহ নয় শীতের সময় কালে তীব্রতার অভাব, বসন্তের রঙিন উপস্থিতি, শরতের শ্যামলীমা সব যেন কেন অগোছালো এলোমেলো হয়ে পড়েছে প্রকৃতিতে। আবহাওয়া অধিদপ্তরের মতে বাংলাদেশের উষ্ণতম সময় মে মাস। সাম্প্রতিক বছরগুলোর দিকে ফিরে তাকালে আমরা দেখি প্রায়ই মে মাসে এ তাপদাহ শুরু হয় এবং তা পুরো মাস জুড়ে চলে প্রায়ই। ২০১৭ সালে দেশের সর্বত্র দিনের তাপমাত্রা ছিলো ৪০ সেলসিয়াস রাজশাহীতে তা ৪৪ সেলসিয়াসে উঠেছিল বলে অধিদপ্তরের হিসাবে দেখা যায় এবং তা ১৯ দিন চলে। বিপরীতে ২০১৮ সাল ছিলো বৃষ্টি মুখর-মার্চ এপ্রিল মে জুড়ে এবং বৃষ্টিপাত ছিল স্বাভাবিকের চাইতে বেশি। প্রকৃতির এ খেয়ালী আচরনে ২০১৫ সাল থেকে দেশে অতি বজ্রপাত, বজ্রপাত সহ বৃষ্টি, দীর্ঘ সময় ধরে বৃষ্টি ও অতি বৃষ্টিপাতের রেকর্ড করে আবহাওয়া অধিদপ্তর। ২০১৯ এর এপ্রিলে এসে গত কয়েকদিন ধরে দেশ জুড়ে তাপদাহ চলছে। কখনো পারদ উপরে উঠছে কখনো কোথাও সামান্য নামছে বিকেলে, রাত নামতে। এ অবস্থায় সৃষ্টি হয়েছে পশ্চিম সমুদ্রে লঘু চাপ যা ক্রমান্বয়ে নি¤œচাপে রূপ নিয়ে শক্তি সঞ্চয় করছে। উপকূল বাসী গোটা দেশকে যেন স্মরণকে করিয়ে দিচ্ছে ২৯ এপ্রিল ৯১’ এর কথা যা স্মরনে উপকূলবাসীর বুক মোচড় দিয়ে উঠে। যেন স্মরণ করিয়ে দেয় ভয়াবহ সেসব স্মৃতির কথা তারা যে রাতকে কেয়ামতের রাত ভেবেছিল।
সাগরের অপার দানে যেমন গড়ে উঠেছে চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, বরিশাল, ভোলা, মংলা, খুলনা, হাতিয়া, স›দ্বীপ, মহেষখালি, কুতুবদিয়া, আনোয়ারা, বাঁশখালী, চকরিয়া, চরফ্যাশন, চরলক্ষ্যা তেমিন আবার তারিই করাল গ্রাসে হারিয়েছে জীবন গবাদি পশু, ঘরবাড়ি, নিঃস্ব সর্বশান্ত হয়েছে এতদ অঞ্চলের উপকূলীয় মানুষ। ঘূর্ণিঝড়র জলোচ্ছ¡াস বার বার প্রতিবার আঘাত হেনেছে ভেঙে ছত্রখান করেছে তাদের সাজানো বাগান, ঘর গৃহস্থালী চৌদ্দ পুরুষের ভিটেবাড়ি জীবন।
ঠিক তেমনই ঘটেছিল এ অঞ্চলের ভাগ্যে অবারিত সুযোগ সম্পদ ও উপজীব্যে ভরপুর করে দেওয়া এ সাগর তার উপকূলবর্তী অঞ্চল দূরবর্তী দ্বীপ সমূহ বিশেষ করে বৃহত্তর চট্টগ্রামের বাঁশখালী আনোয়ারা চকরিয়া মহেষখালি কুতুবদিয়া হাতিয়া স›দ্বীপ ভোলা মংলা খুলনা চরফ্যাশন চরলক্ষ্যা বার বার তার রোষান্বিতে পড়ে লন্ডভন্ড হয়েছে জীবন মানুষ পশু——-
১৭৯৫ সালের ৩ জুন সন্ধ্যা ৭টা থেকে শেষ রাত অবধি চলা ঘূর্ণিঝড়ে যোগাযোগের অভাবে ক্ষয় ক্ষতির হদিস তেমন পাওয়া না গেলেও চট্টগ্রাম শহরে কারেক্টরে কাচারী উড়ে যাওয়ার খবর পাওয়া যায় এবং চট্টগ্রাম শহরে শুধু ৫টি বাড়ি ছাড়া সবকিছু ধুলিসাৎ হয় বলে সরকারি তথ্যে দেখা যায়। সে হিসেবের নিরিখে উপকূলবর্তী এলাকা এবং দীপাঞ্চলের অবস্থা অনুমান করা সহজ হয়ে পড়ে।
৩১ অক্টোবর ১৮৭৬ সাল ১২৩৮ মঘী পূর্ণিমা রাতের ১০টা থেকে পরের দিন ০১ নভেম্বর ৩টা পর্যন্ত চলা ঘূর্ণিঝড় ও পূর্ণিমার টানে উত্তাল সাগরের ১০ ফুট ২৫ ফুট পর্যন্ত জ্বলোচ্ছাস স্থান ভেদে ৬ মাইল থেকে ১৫ মাইল পর্যন্ত ভিতরে চলে যায়। এ সময়ের বাংলার লেফট্যানেন্ট গভর্নর স্যার রিচার্ড টেম্পলের প্রতিবেদনে পাওয়া যায়- “দিনে প্রচন্ড গরম ছিলো রাত ১১টা থেকে প্রবল বেগে জলোচ্ছ্বাস শুরু হয়………….বাতাস ঠান্ডা হয়ে যায়- লোকজন ঘরের ছাদে উঠার আগেই পানিতে ভেসে যায়- জলোচ্ছ্বাসের তোড়ে মানুষ গাছের আগায় উঠে যায়, কেউ ডালে আটকে যায়, যারা আটকে যায় তারা বেঁচে যায়। শুধু চট্টগ্রাম জেলায় ১২ হাজার লোক মারা যায় আর ১৫ হাজার জ্বলোচ্ছাস পরবর্তী কলেরায়। লোনা পানিতে পাকা ফসল নষ্ট হয়। সাধারন্যে এটাকে ৩৮ মঘীর লোনা বলে।
এর পরের ভয়ানক সাইক্লোন হয় ১৮৯৭ সালের ২৪ অক্টোবর ১২৫৯ মঘীতে। এ সাইক্লোনকে বাঁশখালী অঞ্চলে ৫৯ মঘীর তুফান বলে। জনশ্রুতি আছে কালীপুর গ্রামের একটি কাঁটা মান্দার গাছে ঝড়ের তোড়ে একজন মহিলাকে উড়িয়ে আঁছড়ে ফেলে এবং তাঁর চুল আটকে গেলে কাটায় তাঁর সর্বশরীর রক্তাক্ত হয়। ভোরে তাকে উদ্ধার করা হয়। সন্ধ্যা ৬টা থেকে বাতাসের গতিবেগ ৮০ মাইল বেগে উঠে রাত ১০ টায় তা ভয়ংকর রূপ নেয়, সাথে বৃষ্টিপাত ঝড়ের তোরে জলোচ্ছ্বাস। কর্ণফুলী শংখ মাতামুহুরী নদী দিয়ে অভ্যন্তর ভাগে ঢুকে যায় জল। এমনকি রাঙামাটির মত বিপরীত স্রোতে উঁচু অঞ্চলে ও ঘরবাড়ি বিধ্বস্ত হয়। চট্টগ্রামে উত্তর দক্ষিণে ৭০ মাইল জুড়ে ২২৫ মাইল ব্যাপ্তিতে ধ্বংস যজ্ঞ চালায়। কুতুবদিয়া বাঁশখালী চকরিয়া আনোয়ারা ১১ শতাংশ লোক মৃত্যুবরণ করে এবং তার ছেয়ে অধিক লোক মারা যায় কলেরায়।
পূর্বের সবকটি ঘূর্ণিজড়ের তীব্রতা ও ধ্বংসযজ্ঞ ছাড়িয়ে যায় ১৯৬০ সালের ঘূর্ণিঝড় যা ১০ অক্টোবর ও ৩১ অক্টোবর চট্টগ্রাম ও তার পার্শ্ববর্তী এলাকায় উপকূলীয় অঞ্চল ও দূরবর্তী দ্বীপ অঞ্চলে প্রবলভাবে আঘাত হানে। ১০ অক্টোবর ঘূর্ণিঝড় শুরু সন্ধ্যা ৬টা থেকে শুরু হয়ে রাত ১১টা পর্যন্ত প্রবল ভাবে আঘাত হানে। সাথে জলোচ্ছ¡াসে চট্ট্রগাম নোয়াখালী উপকূলীয় এলাকা দূরবর্তী দ্বীপাঞ্চল প্লাবিত হয়ে মানুষ গবাদি পশু সহ কয়েক হাজার প্রাণী পানির তোরে ভেসে প্রান হারায় । কিন্তু এই ঘূর্ণিঝড় যেন ৩১ অক্টোবরের আগাম, বার্তা- সন্ধ্যার ঘণ্টা খানেক পূর্ব থেকে সারা আকাশ মেঘে ছেয়ে যায়। বায়ুমÐল রক্তিম বর্ণ ধারণ করে। ঘুমোট গরম হাওয়া ছুটে, এক ভয়ানকত ভীতিকর অবস্থার সৃষ্টি হয়। মানুষ দিকবিদিক জ্ঞানশূন্য হয়ে পারে। যেন আকাশ থেকে আগুন বৃষ্টি ঝড়ছে। এই তীব্র ঝড় ঘরবাড়ি ধুলিষাৎ করে গাছগাছালী উপরে ফেলে। ৩০ ফুট জলোচ্ছ¡াসে মহেষখালী কুতুবদিয়া বাঁশখালী আনোয়ারা হাতিয়া স›দ্বীপ ভাসিয়ে হাজার হাজার মানুষ গবাদি পশুর মৃত্যু হয়। কাছা, আধা পাকা ঘরবাড়ি, বড় গাছ উপরিয়ে ভাসিয়ে নিয়ে যায়। এমনকি বাঁশখালীতে একটি পাকা শান বাঁধানো ঘাটের কিছু অংশ অনেক দূরে নিয়ে ফেলে পানির তোরে। প্রায় গাছগাছালি আগুনে পোড়ার মত হয়। খবর পাওয়া যায় বাঁশখালী সরল গ্রামের এক মহিলা ভাসতে ভাসতে বড় রাস্তার চেচুরিয়া এসে পৌঁছলে তাকে উদ্ধার করতে আসা লোকজন তার ঝুটিতে আশ্রয় নেওয়া সাপ দেখে তাঁকে বলতে তিনি অজ্ঞান হয়ে যান। এই সাইক্লোন প্রায় ১০ হাজারের মত মানুষ ৭০ হাজারের উপর গবাদি পশু, সাড়ে ছয় লক্ষের মত ঘরবাড়ি ভেঙে যায়। প্রায় ৭ লক্ষ একর জমির ফসল বিনষ্ট হয়।
আবার ১০ বছর পর ১১ অক্টোর ১৯৭০ সালে ১৮৫ কি. মি. বেগে এক ঘূর্ণিঝড় সারাদেশে উপকূলীয় অঞ্চলে আঘাত হানে। বিশেষ করে বৃহত্তর বরিশালের ভোলা অঞ্চলের তজুমদ্দিন সবচাইতে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হলেও বাঁশখালী আনোয়ারা চকরিয়াসহ অন্যান্য উপকূলীয় অঞ্চল কম ক্ষতিগ্রস্ত হয়নি। প্রায় ৩ লক্ষ লোক এতে প্রাণ হারায়। গবাদি পশু ফসল হানি ও বাড়ি ঘর বিধ্বস্ত হয় বে সুমার । সে রকম সেই দুর্বিষহ অবস্থায় ও পশ্চিম পাকিস্তান থেকে কেহ না আসায় এবং যথাসময়ে ত্রাণ বা উদ্ধারকারী দল না আসায় তৎকালীন জননেতা মৌলানা ভাসানী লালদিঘী মাঠে দ্বার্থহীন কণ্টে ঘোষণা করেন “আমাদের এইরকম দুর্যোগে তোমাদের যখন ঘুম ভাঙেনা, আমাদের অবস্থা দেখতেও আসনা, প্রাণের কথা দূরে থাক, তোমাদের সাথে আমাদের আর হবে না হবার নয়”- আসসালামু আলাইকুম।
সম্প্রতিক সময়ে সবচাইতে আলোচিত ভয়ংকর ভয়বহ ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাস এপ্রিল মাস ঢুকলেই বিশেষ করে উপকূলীয় ও দ্বীপাঞ্চলের মানুষকে ভয় বিহবল অবস্থায় ফেলে ভয়ানক সব স্মৃতি, আপনজন হারানোর গুমরে উঠা ব্যথায় তা ২৯ এপ্রিল ১৯৯১ সালের সেই প্রচন্ড সাইক্লোন। সেদিন ঘূর্ণিজড়ের গতি ছিল ২০০ থেকে ২২৫ কি.মি. সাথে গভীর রাতের ২০-৩০ ফুট উঁচু জলোচ্ছ্বাস। স্মরণকালের ভয়াবহতম এ ঘূর্ণিঝড় বাঁশখালী, আনোয়ারা, চকরিয়া, মহেষখালি, কুতবদিয়া হাতিয়া স›দ্বীপের উপকূলবর্তী জনবসতি, জনগণ সহায় সম্বলহীন, গৃহহীন হয়ে পড়ে। ১ লক্ষ ৪০ হাজার মানুষ প্রান হারায়। শুধু বাঁশখালীতেই অনেকের মতে ৩০ হাজারের মতো মানুষ মৃত্যুবরণ করে। ৫০ হাজারের মতো গৃহপালিত পশু এবং প্রায় ১৫ হাজার একর জমির ফসল ক্ষেত খামার নষ্ট হয়। শতাদিক সরকারি বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ধ্বংস আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত হয়। বন্দরের শক্তিমান ক্রেনের আঘাতে কর্ণফুলি সেতুর স্প্যান বিধ্বস্ত, টিএন্ডটির মাইক্রোয়েবে টাওয়ার ধ্বংস হওয়ায় বহিবিশ্বের সাথে যোগাযোগ সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। সংখ্যাতীত জাহাজ ও নৌকা ডুবে উপকূলীয় এলাকা নৌচলাচলের অযোগ্য হয়ে পড়ে। তার উপর মৃত ভাসমান মানুস জীবজন্তুপশু পাখির ফুলে উঠা গলিত লাশ ঠেলে এগুনো দুঃসাধ্য হয়ে পড়ে। শুনেছি বাঁশখালীর খানখানাবাদের এক পরিবারে ২১ জনের মৃত্যুর খবর। জেনেছি পানির তোড়ে স্ত্রীর হাত স্বামীর হাত থেকে ছুটে বিচ্ছিন্ন হওয়ার কথা। পিতার হাতে শিশু পুত্র, পিঠে আপন কন্যা, ভাইকে পাশ দিয়ে ভেসে যেতে দেখে রক্ষা করতে হাত বাড়ালে পিঠ থেকে কন্যার পানিতে পড়ে ভেসে যাওয়া। দেখেছি মা মেয়ের একের হাত অপরের হাতে বাধা উপোড় হয়ে থাকা গলিত লাশ। দেখেছি বেঁচে যাওয়া কুকুরের মৃত মানুষ খাওয়ার করুণ দৃশ্য। কাদার গর্তে পচা লাশ পুঁতে ফেলা। সে এক ভয়ংকর দুর্বিষহ সময়- করুণ আর্তনাদ। লোনা খোলা জলভাসি সাগর পোষা নিঃস্ব মানুষের ।
বিধাতা রুষ্ট হলে নূহের প্লাবন নামে
জমিন চৌচরি হয় তলিয়ে যায় লুদের সময়
শুনেছি ধর্মের ব্যাখ্যায় অমোখ কোরানে
বিরান হয় লোকালয় পড়ে থাকে শূন্য ভিটা
উনুন মাচা সাধের ঘর গৃহস্থালী
পাঁচ ফোলা মানুষ পশুর তীব্র গন্ধে
ভারী হয় চৌদিক

শুধুই হাঁটু বুক কাদার গর্তে এক সাথে লম্বমান
হিন্দু মুসলমান বৌদ্ধ খ্রীষ্টান
কখনো পুরুষে নারীতে
কখনো মানুষে পশুতে
একাকার
লেখক : শিক্ষাবিদ, গবেষক