আলীকদম ভ্রমণ

ভোরে মেঘের সমুদ্রে দিনে ঝরনায়

মো. জামী-আল-সাফী

5

ইট ধুলাবালি আর হট্টগোলের এই যান্ত্রিক শহরে অতিষ্ট হয়ে উঠেছি এমন সময় খবর পেলাম ‘বেড়াই বাংলাদেশ’ আলীকদম যাচ্ছে। আলীর গুহা, জোৎস্না রাতে মারায়ন পাহাড়ের চূড়ায় ক্যাম্পিং, দামতুয়া ঝরনায় ট্রিপ টা লোভনীয় বটে। সব কিছু গুছিয়ে ২০ সেপ্টেম্বর রাত ৮টায় বের হয়ে পড়লাম। ঢাকার বিভিন্ন জায়গা থেকে ভ্রমণ বন্ধুরা চলে এলো ফকিরাপুল বাসস্ট্যান্ডে। যথা সময়ে যাত্রাও শুরু হলো। রাতের জার্নি, তাই কিছুটা ঘুমিয়ে, ঝিমিয়ে, জেগে এক সময় পৌঁছে গেলাম পাহাড়ি এলাকায়। ঘুম ঘুম চোখে দেখলাম পুব আকাশের রঙের ছটা, রাস্তা ঘাটে জীবনের চাঞ্চল্য শুরু হলো আর আমরাও পৌঁছে গেলাম আলীকদম বাসস্ট্যান্ডে।
আলীরগুহা
লোহাগাড়া রেস্টুরেন্টে নাস্তা সেরে অটোতে করে সবাই চলে এলাম তোয়াইং খালের পাড়ে। কি সুন্দর গাছগাছালিতে ভরা চারিপাশ, দূরে পাহাড়, নীল আকাশে শরতের সাদা সাদা মেঘ, এঁকেবেঁকে চলে গেছে খালটা, কতদূর কে জানে। নৌকা দিয়ে সবাই পার হলাম। গুহায় যাওয়ার ট্রেকিং এর পথটা একটু অন্যরকম। দুটি পাথুরে পাহাড় খাড়া উপরে উঠে গেছে। উপরের দিকে চওড়া হলেও নিচের দিকে বেশ সরু। দুই পাহাড়ের নিচে ঝিরি পথ, এই ঝিরি পথে অল্প পানি কোনো অসুবিধা হয়নি হাটতে কিন্তু কিছুটা জায়গাতে পানির গভীরতা একটু বেশি হওয়াতে ওখানে দুই পাহাড়ের গায়ে হাত-পা লাগিয়ে বলা যায় চ্যাংদোলা হয়ে পার হলাম।
গুহার একদিক দিয়ে ঢুকে অন্যদিক দিয়ে বের হবার রাস্তা কিন্তু আমাদের কপাল মন্দ গুহাটার মাঝ বরাবর বন্ধ হয়ে গিয়েছে। যাই হোক গুহার ভিতরটা চওড়ায় চার-পাঁচ ফুট হবে উচ্চতায় হবে আট ফুটের মতো, আর আমরা ৫০-৬০ ফুটের মতো ভিতরে ঢুকতে পেরেছিলাম। ভিতরটা ঘুটঘুটে অন্ধকার, পাথুরে দেয়ালগুলো একটু সেঁতসেঁতে। আমার মনে হয়েছে মশালের আলোতে বেশি ভালো লাগবে যদিও আমরা টর্চ নিয়েছি। একই পথে আবার ফিরে এলাম। ঝিরি পথ থেকে বের হয়ে এক পিচ্চি ছাগল ছানার সঙ্গে বেশ খাতির হয়ে গেল, কোলে তুলে নিতেই সে মহা আনন্দে আমার গাল চেটে দিল। ওখান থেকে লোহাগড়া রেস্টুরেন্টেই আবার ফিরে এলাম। এরপর দুপুরের খাওয়া খেয়ে আবার অটোতে করেই রওনা হলাম, এবারের গন্তব্য “মারায়ন পাহাড়ের চূড়া”।
মারায়ন পাহাড়ের চূড়া
অটো থেকে নামলাম আমরা শিল্পনীয়া পাড়াতে। এখান থেকেই শুরু হলো আমাদের ট্রেকিং, কাঁধে সাত-আট কেজি ওজনের ব্যাগ নিয়ে উঠতে হবে প্রায় এক হাজার ৬৬০ ফুট উপরে। উপরে পানি পাওয়া যাবে না। সুতরাং সঙ্গে নিয়ে নিলাম পর্যাপ্ত পরিমাণে পানি। যতই উপরে উঠি দিগন্ত সীমা ততোই বাড়তে থাকে, সঙ্গে চারিদিকের সৌন্দর্যও। উপরে উঠতে উঠতে ঘামে ভিজে ক্লান্ত হয়ে একটু সমতল জায়গা খুঁজে নেই একটু বিশ্রামের আশায়। একটু পানি খাওয়া, খেজুর খাওয়া, নয়নাভিরাম দৃশ্য আর একটু মৃদুমন্দ বাতাসের ছোয়ায় শরীর মন আবার চাঙ্গা হয়ে উঠে, আবার চলতে শুরু করি। পূর্ব দিকের আকাশে মেঘ জমতে শুরু করেছে, আমাদের জন্য খুবই চিন্তার বিষয়। পাহাড়ের চূড়ায় কোনো আশ্রয় স্থল নেই, বৃষ্টি হলে কাক ভেজা ভিজতে হবে।
পাহাড়ে বৃষ্টি আসার অনেক আগে থেকেই দেখা যায় যে বৃষ্টি আসছে যখন কাছে চলে আসে তখন বৃষ্টির পানি গাছের পাতায় পড়ার একটা শব্দের সুর শুনতে পাওয়া যায় তারপর বৃষ্টির পানি এসে গায়ে পড়ে। কিছুটা সময় একটু ভিজলাম বৃষ্টিতে। ঘর্মাক্ত শরীরে বৃষ্টির পানি পড়লে যে কি আরাম লাগে সেটা যার এই অভিজ্ঞতা হয়েছে সেই বুঝবে। উপরে উঠতে উঠতে অনেককেই দেখলাম ক্লান্ত হয়ে বসে পড়ছে। আর যে বন্ধুর উৎসাহে ট্রেকিং এ এসেছে তাকে গালিগালাজে উদ্ধার করছে কিন্তু আমি নিশ্চিত যে এই বন্ধুই যখন পাহাড়ের চূড়ায় রাত কাটিয়ে ভোরে সূর্য উদয় দেখে ফিরে আসবে তখন ওই বন্ধুকেই জড়িয়ে ধরে বলবে ‘তোর জন্যই এই সৃষ্টির অপরূপ সৌন্দর্য দেখতে পেলাম।’
যাই হোক হাটতে হাটতে বেশ উপরেই চলে এসেছি আমরা, এর মধ্যে বৃষ্টি থেমে গেছে। সামনেই দেখতে পেলাম ‘মর্ম পাড়া’, একটু বিশ্রামের সুযোগ। কুকুর, মুরগি, শূকর আর অল্প কিছু মানুষ আর অল্প কয়টা ঘর নিয়ে একেকটা পাড়া গড়ে উঠে। আবার যাত্রা শুরু হলো। আর একটু উপরেই ছিল আমাদের গন্তব্য। এই শেষ মুহূর্তে এসে কোথা থেকে যেন উৎসাহ, শক্তি দুটোই বেড়ে যায়। কিছুক্ষণের মধ্যেই আমরা পৌঁছে গেলাম পাহাড়ের চূড়ায়। অনুভব করলাম অনেক রকম শান্তি, প্রথমত আর উপরে উঠতে হবে না, যেদিকেই তাকাই বিস্তৃত দৃষ্টি সীমা, পশ্চিমে মহেষখালি ও তার পরে সমুদ্র পর্যন্ত দৃষ্টি সীমা বিস্তৃত, আকাশ ও সমুদ্র একাকার হয়ে আছে। পাহাড়গুলোর মধ্যেও রঙের পার্থক্য, কাছের পাহাড়গুলো সবুজ আর যতই দূরের পাহাড় ততই সেগুলো ধূসর। মুগ্ধতা কাটিয়ে উঠতেই আসে পাশে খেয়াল করলাম। অনে গুলো তাবু এর মধ্যেই লাগানো হয়ে গিয়েছে। সূর্যস্ত দেখতে হবে তাই আমিও আমার তাঁবুর জন্য জায়গা ঠিক করে লাগিয়ে ফেললাম। আমাদের ও অন্যদের তাবু মিলে প্রায় ৪৭টা তাবু লাগানো হয়েছে। পাহাড়ের উপরে বৌদ্ধ দেবের দুটো মূর্তি আছে অথচ অন্য কোনো স্থাপনা নেই, কোনো টয়লেটও নেই। প্রকৃতির ডাকে প্রকৃতিই একমাত্র সম্বল।
ধীরে ধীরে রাত নেমে এলো কিন্তু রাতের অন্ধকার কোথায়? আকাশে তো এক বিশাল চাঁদ উঠে রয়েছে স্নিগ্ধ আলোয় মন ভরিয়ে দিতে জন্য। সন্ধ্যার সঙ্গে সঙ্গেই ইটের চুলা বানিয়ে রান্না শুরু হয়ে গিয়েছে- খিচুরি আর মুরগি কষানো সঙ্গে সালাদ। ৯টার মধ্যেই রান্না শেষ। খাওয়া-দাওয়াও শুরু হয়ে গেল। সবাই তো দামি হোটেলে গিয়ে শখ করে ক্যান্ডেল লাইট ডিনার করে, আমরা একেবারেই পাহাড়ি প্রকৃতির মধ্যে এসে মুন লাইট ডিনার করলাম। এক কথায় দারুণ। এতক্ষণ তো প্রকৃতির সঙ্গে যুদ্ধ করে এত দূর আসা আর এখন শুধুই প্রকৃতিকে উপভোগ করা। আকাশ চাঁদের আলোয় ভরা, আশপাশে সাদা সাদা মেঘ আর বিক্ষিপ্ত ভাবে তারা মিটমিট করছে। চাঁদের আলোয় এবার একটু ঘুরে দেখতে শুরু করলাম আশপাশে। একটু খালি জায়গা পেয়ে শুয়ে পড়লাম চিৎ হয়ে ঘাসের উপরে। দৃষ্টি চাঁদের আলোয় ভরা আকাশের দিকে। মিট মিট করছে কিছু তারা। কি অসীম, গভীর, অনন্তহীন এই আকাশ। রাত ১২টার দিকে তাঁবুতে ফিরে একটু ঘুমাতে চেষ্টা করলাম। ৩টার দিকে আবার তাবু থেকে বের হয়ে এলাম। চাঁদ তখন পশ্চিমের আকাশে ডুবু ডুবু করছে। দূরে এক তাঁবুর সামনে কিছু ছেলে মেয়েরা তখনো আড্ডা মারছে, কিছু তাঁবুতে কেউ কেউ গান শুনছে, বেশির ভাগ তাঁবুর বাসিন্দারাই ঘুম, একটা শান্ত, স্নিগ্ধ, আধো আলো আধো ছায়া, স্বপ্ন ময় পরিবেশ। আবার একটু ঘুরে এলাম এর মধ্যে চাঁদ পুরোই ডুবে গেছে, আকাশ এখন কালো কুচকুচে আর তার মধ্যে লক্ষ লক্ষ তারা মিট মিট করছে, কি যে অদ্ভুত এক দৃশ্য, সেই ছোট্ট বেলা সপ্তর্ষী মন্ডল কে ঠিক যে রকম দেখেছি এত বছর পরও ঠিক সেই রকমই আছে, হাজার বছর ধরে আছে যে যার জায়গাতে কি অদ্ভুত কি পরিকল্পিত এই সৃষ্টি। আমি এই পৃথিবীতে মারায়ণ পাহাড়ের চূড়ায়, হাজার কোটি মাইল দূরে ওই তারাগুলো তারও হাজার কোটি মাইল দূরে কালো আবহ, সব মিলিয়ে আমি একটা ত্রিমাত্রিক ব্যাপার উপলব্ধি করতে পারি যা আমাকে ভীষণ ভাবে নাড়া দেয়।
এ রকম নানাবিধ চিন্তা করতে করতেই পুব আকাশে তাকিয়ে দেখি দিগন্তের পাহাড় সারির ওপারে কমলা আলোর রেশ ফুটে উঠছে। কমলা রঙের উপরে একটু হালকা তারপরে নীল তারপরে কালো আকাশ। আধো অন্ধকারে ঠিক বুঝতে পারছিলাম না যে আমরা যেখানে দাঁড়িয়ে আছি তার থেকে নিচে কুয়াশা, নাকি মেঘ। পুব আকাশ আরো একটু আলোকিত হতেই পরিষ্কার বুঝা গেল সাদা সাদা তুলোর মতো মেঘ জমে আছে। মারায়ণ পাহাড়ের চূড়ায় আমরা দাঁড়িয়ে আছি, দিগন্তের পাহাড়ের ওপার থেকে সূর্য উঁকি দিতে শুরু করেছে আর এই দুই পাহাড়ের মাঝের পুরো জায়গাটাই সাদা মেঘে ঢেকে আছে, সঙ্গে মৃদুমন্দ হিমেল বাতাস, বাতাসে পাতার শব্দ, ঘুমু ঘুমু কিছু মানুষের অবাক উচ্ছ্বাস, গাছের পাতায়, পাহাড়ের চূড়ায় সোনালি রোদের পরশ- কী সাংঘাতিক সৌন্দর্য।
বিকেল থেকে ভোর পর্যন্ত একই আকাশে যে কত রূপ দেখার সৌভাগ্য হলো, শুকরিয়া সৃষ্টিকর্তাকে। বিকেলে মেঘাছন্ন ধূসর আকাশ, সন্ধ্যায় গোধূলির রঙে আকাশ, প্রথম রাতে স্নিগ্ধ চাঁদের আলোয় ভেসে যাওয়া আকাশ, মাঝ রাতে লক্ষ তারায় খচিত আকাশ আর এই ভোরে সূর্য উদয়ের অসম্ভব সুন্দর আকাশ। মোহ কেটে উঠার পরেই শুরু হলো ফিরে আসার প্রস্তুতি। তাবু খুলে গোছানোর কাজ শুরু হয়ে গেল, সব শেষে শুরু হলো পরিষ্কার পরিছন্নতার কাজ। সব শেষ করে আমরা মারায়ণ পাহাড়ের চূড়া থেকে নেমে আসতে শুরু করলাম। এবারের গন্তব্য ‘দামতুয়া ঝরনায়’।
এখানকার পথ অনেক জায়গাতেই বেশ বিপজ্জনক। একদিকে খাড়া পাহাড় তারপর চলার জন্য দুই ফিটের মতো জায়গা তার পরই পাহাড় আবার নিচে নেমে গেছে ঝোপঝাড়ের জন্য সেটা ভালো করে লক্ষ না করলে বুঝাই যায় না।
‘দামতুয়া ঝরনায়’
পাহাড়ের নিচে এবার আমাদের জন্য অপেক্ষা করছে দুটো জিপ, সময় নষ্ট না করে সবাই নিচে নেমে আসার পরই যাত্রা শুরু হলো। থিংকুপাড়া হয়ে আমরা জিপ নিয়ে যাবো ‘সতেরো মাইল’। থিংকুপাড়াতে আর্মি ক্যাম্প এ নেমে সবার পরিচয়পত্রের ফটোকপি জমা দিতে হলো। অফিসার প্রত্যেকটা পরিচয়পত্রের সঙ্গে প্রত্যেককে মিলিয়ে দেখলেন। কোনো রকম সমস্যা হলে যেন ওনাদের জানানো হয়। বারবার করে বলে দিলেন ৫টার মধ্যে যেন ফিরে আসি। আবার যাত্রা শুরু হলো। ভয়ঙ্কর এক রাস্তা এই উপরে উঠছি তো আবার নিচে নামছি তো আবার উঠছি। পাহাড়ে উঠতে যে কী কষ্ট হয় তা আমার জানা আছে তাই গাড়ির গোঁ গোঁ শব্দেই বুঝতে কোনো অসুবিধা হচ্ছিল না যে এই উপরে উঠতে গাড়িটার কি পরিমাণ কষ্ট হচ্ছে।
এর মধ্যেই কিছু বন্ধু আবার গাড়ির ছাদে উঠে গেছে- সেটাও একটা খুবই রোমাঞ্চকর ব্যাপার, বিপজ্জনকও বটে। অবশেষে পৌঁছে গেলাম ‘সতেরো মাইল’। গাড়ি থেকে নেমে সবাই প্রস্তুত হয়ে নিলাম ট্রেকিংয়ের জন্য। যাওয়া-আসা মিলিয়ে পাঁচ ঘণ্টার মতো ট্রেকিং করতে হবে। এই ট্রেকিংয়ের বর্ণনা শুনে কয়েকজন যেতে রাজি হলো না, এখানেই তারা গাড়ির কাছে অপেক্ষা করবে। বাকিরা গাইডসহ রওনা হয়ে গেলাম। প্রথম আধাঘণ্টা ভালোই এগুনো গেল মোটামুটি সমতল মাটির রাস্তা। কিছুক্ষণ পরই রাস্তা কঠিন হতে শুরু করল। পাঁচ-ছয়টা পাহাড় ডিঙিয়ে ঝরনাতে পৌঁছাতে হবে। প্রথম পাহাড় পেরিয়েই বুঝতে পারলাম ব্যাপারটা বেশ কঠিন হবে। পথিমধ্যে দুজনকে পেলাম যারা মাঝ পথ থেকে ফিরে আসছে। একটু ভয়ই পেলাম। যাই হোক, এত তাড়াতাড়ি তো হাল ছেড়ে দেওয়া যায় না, সুতরাং এগুতে থাকলাম। আবার মাথায় এটাও থাকতে হবে যে যেখানে গিয়ে হাল ছাড়ব সেখান থেকে আবার ফিরেও আসতে হবে সেই শক্তিটা যেন দেহে থাকে। একটা সমতল জায়গাতে চলে আসছি, মাটির রাস্তা দুই দিকেই লতা জাতীয় আগাছায় ভর্তি। আরামেই হাঁটছিলাম, হঠাৎ করেই একটু থমকে দাঁড়াতে হলো। তিন-চার ফুট দূরে একজন আমাকে দেখে রাস্তার মাঝেই থমকে দাঁড়াল। দুজনের মধ্যে একটু চোখা-চোখিও হলো। মুহূর্তের জন্য। তার পরই সে রাস্তা পার হয়ে জঙ্গলের মধ্যে ঢুকে পড়ল। আমি আস্তে করে পিছনের বন্ধুকে বললাম ‘সাপ’। উত্তর এলো ছবি তুলেন, ছবি তুলেন, কেমন করে তুলব বলেন? ব্যাপারটা তো ঘটল চার থেকে পাঁচ সেকেন্ডের মধ্যে। সাপটার গায়ের রং অদ্ভুত সুন্দর একটা সবুজ, বেশিরভাগ সাপের গায়ের রং একটু চকচকে ভিজা ভিজা ধরনের হয় কিন্তু এটার রংটা একদম মেট কালার, চোখ দুটো লাল, পিঠের দিকটা একটু গাঢ় সবুজ, লম্বায় চার থেকে পাঁচ ফুট। একটু সাবধানে চলতে শুরু করলাম। মারায়ন পাহাড়ের ট্রেকিংয়ের পথটা ছিল বেশ চওড়া, কিন্তু এখানকার পথ অনেক জায়গাতেই বেশ বিপজ্জনক। একদিকে খাড়া পাহাড় তারপর চলার জন্য দুই ফিটের মতো জায়গা তার পরই আবার পাহাড় নিচে নেমে গেছে।
একটু ভয়ই লাগে তবে একটা সুবিধা হলো, পাহাড় যে নিচে নেমে গেছে ঝোপ-ঝাড়ের জন্য সেটা ভালো করে লক্ষ না করলে বুঝাই যায় না। ঠা ঠা রোদ, ঘেমে ভিজে একাকার অবস্থা, একটু বড় গাছ আর একটু খোলামেলা জায়গা পেলেই একটু বিশ্রাম নিয়ে নেওয়া। পথে অনেক জায়গায়ই ঝিরিপথ ছিল, যা কি না খুবই উপভোগ্য ও আরামদায়ক। অবশেষে ঝরনার শব্দ কানে আসতে শুরু করল, কাছাকাছি দুটো ঝরনা। প্রথমেই পেলাম ব্যাং ঝরনায়, একটু অন্য ধরনের, পরের ঝরনাটাই দামতুয়া। উৎসাহে হাঁটার গতিও একটু বাড়াতে চাইলাম কিন্তু পারা গেল না। এই শেষ মুহূর্তের পথটুকু মনে হলো একটু বেশিই রকমের বিপজ্জনক, বেশ খাড়া নামতে হচ্ছে সঙ্গে ভেজা মাটি, পিছলে পড়ার সমূহ সম্ভাবনা। অত্যন্ত ধৈর্যের সঙ্গে আমরা নেমে এলাম একেবারেই ঝরনার নিচে- ধৈর্য শেষ। ঝরনার পানিতে ভিজার জন্য অস্থির হয়ে উঠল মন। সময় তখন বেলা ৩টা। আধাঘণ্টায় দুই দফা ভিজলাম। এই ঝরনার পানির এক অসম্ভব ক্ষমতা, আধাঘণ্টায়ই দেহের সব ক্লান্তি দূর হয়ে গেল, শরীর মন আবার পরবর্তী আড়াই ঘণ্টা ট্র্যাকিংয়ের জন্য প্রস্তুত।
সন্ধ্যার আগেই গাড়ির কাছে পৌঁছানোর তাগিদে পাঁচ-ছয়জন ফিরতি পথে যাত্রা শুরু করলাম অনিচ্ছা সত্তে¡ও। পথিমধ্যে দুই দফা বৃষ্টিতে ভিজলাম। ট্রেকিংয়ের সময় রাস্তা যদি খুব বেশি পিচ্ছিল না হয় তবে বৃষ্টি আশীর্বাদের মতো, দারুণ লাগে আমার। কষ্ট অনেক কমে যায় বরং ভালো লাগে বেশি। ফিরতি পথে মাত্র তিনটি জোঁকের কামড় খেয়েছি। সন্ধ্যা ৬টার দিকে আমরা গাড়ির কাছে পৌঁছে গেলাম। ধীরে ধীরে অন্য বন্ধুরাও চলে এলো। খবর পেলাম এক বন্ধু বেশ অসুস্থ হয়ে পড়ায় দুজন পাহাড়ির সাহায্যে তাকে নিয়ে অ্যাডমিন সাত্তার ভাই ধীরে ধীরে আসছেন।
আর্মিদের বেঁধে দেওয়া সময় পার হয়ে গেছে আগেই। অন্যদিকে আমাদের ঢাকার বাস ছাড়ার টাইম সাড়ে ৭টা। রাত ৮টার দিকে সাত্তার ভাই পৌঁছালেন অসুস্থ বন্ধুকে নিয়ে। আমরা বিন্দুমাত্র সময় নষ্ট না করে রওনা হয়ে গেলাম আর্মি ক্যাম্পের উদ্দেশে। আর্মি ক্যাম্পে পৌঁছার পর আমাদের দুটো গাড়িই আটকে দিল, সব গ্রুপ লিডারদের ডেকে নিলেন একটু বকাঝকা তো হলোই। ঠিক এই সময়ই সৈনিক ভর্তি এক জিপ এসে হাজির। অফিসার ওই গাড়ি দেখিয়ে বললেন দেখেন আপনারা আর ১০ মিনিট দেরি করলেই ওই গাড়ি আপনাদের খুঁজতে বের হয়ে যেত। যাইহোক পরবর্তী সময়ে যেন এমনটি না করা হয় সেগুলো বুঝিয়ে শেষে ছেড়ে দেওয়া হলো। আবার যাত্রা শুরু, সোজা বাসস্ট্যান্ডে, রাত তখন ৯টা । কিন্তু বাস তো চলে গেছে। গ্রুপ অ্যাডমিনরা অন্য বাসের ব্যবস্থা করলেন। আর কোনো বিঘ্ন ছাড়াই সকাল ৯টায় বাসায় এসে ঢুকলাম একরাশ মনোমুগ্ধকর স্মৃতি, নতুন কিছু বন্ধুর ভালোবাসা আর সতেজ একটা মন ও দেহ নিয়ে।
প্রয়োজনীয় তথ্য :
১) আলীরগুহা আলীকদম বাসস্ট্যান্ড থেকে অটো এবং ট্রেকিংসহ দুই ঘণ্টার মধ্যে ভালোভাবে ঘুরে আসতে পারবেন। খুব সহজ এবং নিরাপদ ট্রেকিং
২) মারায়ন পাহাড়ের চূড়া- আলীকদম বাস স্ট্যান্ড থেকে ১৫ মিনিট অটোতে গিয়ে দুই ঘণ্টার মতো পাহাড়ে উঠতে হবে, সমতল জায়গা খুব কম, বৃষ্টি হলে পথ বেশ পিচ্ছিল। দুপুর ৩টার মধ্যেই রওনা হওয়া উচিত, তা না হলে সূর্যাস্ত মিস হয়ে যাবে। পূর্ণিমার রাতে বেশি ভালো লাগবে।
৩) দামতুয়া ঝরনা- আলীকদম বাসস্ট্যান্ড থেকে সকাল ৮টার মধ্যে রওনা হওয়া উচিত। তাহলে বিকেল ৫টার মধ্যে ফিরে আসা যাবে। এখানে পরিচয়পত্রের ফটো কপি লাগবে। পর্যাপ্ত পরিমাণ পানি সঙ্গে রাখবেন। অনেক পাহাড় পেরুতে হবে ট্রেকিংটা বেশ কঠিন। সুস্থতা, সাবধানতা ও ধৈর্য খুবই প্রয়োজন।