ভিকারুন্নিসা স্কুল এবং অরিত্রী অধিকারী

লিটন দাশগুপ্ত

57

আজকের এই লেখাটি লেখার আগ্রহ সৃষ্টি হয়েছে, ফেসবুকের একটি স্ট্যাটাস দেখে। স্ট্যাটাসটি কে লিখেছেন, সেটি বলার আগে স্ট্যাটাসটিতে কি লিখেছেন, সেটি দেখা যাক-
“আমি শিক্ষক গর্ব সমাজের
দুহাত জোড়ে প্রণাম কদম চুম্বন, নিত্য পছন্দ;
নীতিবাক্য নিত্য শিক্ষা দীক্ষা হারহামেশা-
আরো কত কি দিয়েছি তোমাদের!
নতমস্তে আমারে পুজিবে বলে।
দেবতার আসনে আমি,
আর আমার জন্যে তোমার বলি!
স্বর্গ উদ্যানে বসে তুমি শুধু হাসবে পূজারী হয়ে,
আমি দগ্ধ হব নরকের প্রান্তর জুড়ে কাঁদব।
দেবতার পরিনাম——-
আহা দেবতার পরিনাম।’’
চমৎকার এই কাব্যিক অলংকার সমৃদ্ধ স্ট্যাটাসটি যিনি দিয়েছেন, তাঁকে নিয়েও ‘একজন আদর্শ শিক্ষকের গল্প’ শিরোনামে একাধিক দৈনিক পত্রিকায় লিখেছিলাম। আর তিনি হলেন পূর্ব বাকলিয়া সিটি কর্পোরেশন স্কুল এন্ড কলেজ এর সম্মানিত অধ্যক্ষ জনাব আবু তালেব বেলাল ভাই। সত্যিকারের আদর্শ শিক্ষক থেকে, ছাত্রছাত্রীর প্রতি এই রকম আবেগঘন লেখায় আসে। আবু তালেব বেলাল ভাই তিনিও শিক্ষক, অন্যদিকে ভিকারুন্নেছা স্কুল এন্ড কলেজের তথাকথিত নাজনিন ফেরদৌস (ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ), জিন্নাত আখতার (শাখা প্রধান), হাসনা হেনা (শ্রেণি শিক্ষক) তারাও শিক্ষক, যাদের নামে আতœহত্যা প্ররোচনার দায়ে মামলা হয়েছে।
সেই দিনের ঘটনা হচ্ছে, নবম শ্রেণির ছাত্রী অরিত্রী অধিকারী, পরীক্ষার সময় ব্যাগে করে মোবাইল এনেছে। ঐ স্কুলটাতে নাকি নিয়ম করা হয়েছে ক্যাম্পাসে মোবাইল আনা যাবে না, তাই মোবাইল আনায় তার অপরাধ। আর এ জন্যে স্কুল কর্তৃপক্ষ তার সামনে মা-বাবা দুজনকে ডেকে অপমান করা হয়। দোষ হোক বা না হোক, মেয়েটি পায়ে ধরে ক্ষমা প্রার্থনা করেও ক্ষমা পায়নি। হয়ত নিরপরাধি অরিত্রীর ভাবনায় ছিল, তার জন্যে মা বাবাকে কেন অপমান অপবাদ সইতে হবে, সেই কারণে এই কিশোরীর আত্মহত্যা।
১৯৫২ সালে পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নর ফিরোজ খান নূনের স্ত্রী ভিকারুন্নিসা নূনের নামে ঢাকায় প্রতিষ্ঠিত হয় শিক্ষা প্রতিষ্ঠানটি। বর্তমানে এই প্রতিষ্ঠানে ১৭ হাজারের বেশী শিক্ষার্থী অধ্যয়ন করছে। এমপিওভুক্ত এই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানটি নিয়ে অভিযোগ আছে, সরকারি নির্দেশ না মেনে বেতন, ভর্তিসহ অন্যান্যখাতে কয়েকগুণ বেশী টাকা আদায় করা হয় শিক্ষার্থী থেকে। একজন শিক্ষার্থীকে নাকি কোন রকমে বিদায় করতে পারলে, তার স্থলে নতুন শিক্ষার্থী ভর্তির জন্যে ৬ লাখ টাকা উৎকোচ গ্রহনের সুযোগ থাকে। অভিভাবকের অভিযোগ থেকে আরো জানা যায়, বিভিন্ন উন্নয়ন খাত দেখিয়ে প্রতি মাসের সরকার কর্তৃক নির্ধারণ ফি থেকে ১ থেকে দেড় হাজার টাকা করে বেশী নেয়া হয়। সেই হিসাবে প্রতি মাসে গড়ে প্রতি শিক্ষার্থী থেকে ১ হাজার টাকা করে নিলে, স্কুল বেতন ছাড়া অতিরিক্ত টাকা আদায় হয় ১ কোটি ৭০ লক্ষ টাকা। যদি তা-ই হয়ে থাকে, তাহলে এই থেকে কি বুঝা যায়, এই জাতীয় উত্তম প্রতিষ্ঠানের ব্যবসা বাণিজ্য নিয়ে আর কিছু বলার থাকে?
এখন আমার প্রশ্ন, ভালো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান কাকে বলে? কিংবা ভালো শিক্ষক মানে কি? সাধারণ ভাবে আমি যা বুঝি, ভালো শিক্ষক হচ্ছে সেই শিক্ষক, যে অপেক্ষাকৃত দুর্বল শিক্ষার্থীকে সবল শিক্ষার্থীতে পরিণত করতে পারে। কিন্তু ভিকারুন্নেসার মত স্কুল গুলোতে যাচাই বাছাই করে, সর্বোচ্চ উচ্চ মেধা ও অবস্থাসম্পন্ন পরিবারের ছেলে মেয়ে ভর্তি করিয়ে, এইভাবে ব্যবসা বাণিজ্য করে শতভাগ পাশ আর বিপুল সংখ্যক এ+ নিয়ে লোক দেখানো বিজ্ঞাপণ, লোক ঠকানো বিপনণ অন্ততপক্ষে আমি একজন শিক্ষক হিসাবে বিশ্বাস করিনা। আর বিশ্বাস করিনা বলেই এই পত্রিকায় গত ১৮ ডিসেম্বর ’১৪ সালে ‘সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে ভর্তি ও কিছু কথা’ এই শিরোনামে লিখেছিলাম। সেসময় ভর্তি বিষয়ে লিখেছিলাম-
“…..এখানে একটু কঠিন কথা হলে ও বাস্তব অভিজ্ঞতা উল্লেখ করা প্রয়োজন। ভর্তির জন্যে কোচিং বা ২/৩ জন বিশেষজ্ঞ শিক্ষক দিয়ে ভর্তি হতে পারবে এই রকম কোন নিশ্চয়তা নেই, আবার একই ভাবে কোচিং ও ২/৩ জন অভিজ্ঞ শিক্ষক না দিয়েও ভালো শিক্ষার্থী এমনিতে চান্স পাবার সম্ভাবনা আছে, এতে কোন সন্দেহ নেই।
আবার, সা¤প্রতিক বছর গুলো হতে, প্রাপ্ত অভিজ্ঞতার আলোকে বলা যায়, কলেজিয়েট বা খাস্তগীরে ভর্তি করিয়ে ৫/৬ বছর ঐ প্রতিষ্ঠানে লেখাপড়া করে অনেক ছাত্রছাত্রী কাঙ্খিত লক্ষ্যে (ভালো কলেজে এইচএসসি‘তে ভর্তি কিংবা এইচএসসি’র পর মেডিক্যাল/ইঞ্জিনীয়ারিং/…) পৌঁছাতে ব্যর্থ হয়েছে। আবার স্বাভাবিক প্রতিষ্ঠান গুলোতে লেখাপড়া করে অনেক ছাত্রছাত্রী কাক্সিক্ষত লক্ষ্যে পৌঁছাতে সক্ষম হয়েছে।
সাধারণত যাঁরা শিক্ষিত ও সচেতন ব্যক্তি এবং যাঁদের সন্তানকে অপেক্ষাকৃত ভালো পরিবেশের মাধ্যমে মেধাবী ছাত্র-ছাত্রী হিসাবে গড়ে তুলতে সক্ষম হয়েছেন, তাঁরা ভালো শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গুলোতে, ভর্তি পরীক্ষা দিয়ে ভর্তি করানোর চেষ্টা করে থাকেন। এই ভালো ছাত্রছাত্রীদের মধ্যে থেকে যারা সার্বিক ভাবে আরো বেশী ভালো, তাদের থেকে যাচাই বাছাই করে সেই উত্তম প্রকৃতির শিক্ষার্থীরা মেধা তালিকায় স্থান পায়, এবং উল্লেখযোগ্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ভর্তি হয়। এই উত্তম প্রকৃতির ছাত্রছাত্রীরা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ভর্তি হয়ে, প্রতিষ্ঠানকে উত্তম করে গড়ে তোলে; প্রতিষ্ঠান ছাত্রছাত্রীকে উত্তম করে গড়ে তোলার বিষয় কিন্তু নয়। অর্থাৎ এখানে মেধাবী ছাত্রছাত্রীরা ভর্তি হয়ে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে আলোকিত করছে, প্রতিষ্ঠান ছাত্রছাত্রীকে আলোকিত করছেনা।” এই হচ্ছে আমার সেই দিনের লেখার অবিকল নকল।
আজকের এইদিনে এইলেখার মাধ্যমে, যারা কোন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে ভালো প্রতিষ্ঠান বলে দাবী করেন, তাদের প্রতি আমার চ্যালেঞ্জ! অপেক্ষাকৃত পিছিয়ে থাকা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সব শিক্ষককে, ঐ সকল স্বীকৃত পরিচিত ভালো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষকের সাথে মিউচুয়েল ট্রান্সফার (পারস্পরিক বদলী) মাধ্যমে পরীক্ষা নিরীক্ষা বা প্রমাণ করা হোক, কোন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ১ম সারিতে কোন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান শেষ সারিতে! বাস্তব ক্ষেত্রে দেখা যায়, ভালো হিসাবে পরিচিত সামনে থাকা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর চেয়ে, অপেক্ষাকৃত পিছিয়ে থাকা দুর্বল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষকেরা শ্রম, মেধা, সময় বেশী দিয়ে থাকেন। যাই হোক, আমি আর বেশী কিছু বলবনা।
শেষ দিকে বলতে চাই, একীভূত সুষম শিক্ষা বাস্তবায়নের জন্যে সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে বিভিন্ন ধরণের (উচ্চ-মধ্য-নি¤œ) মেধাসম্পন্ন শিক্ষার্থী ভর্তির নীতিমালা করা হোক। আর এই নীতিমালা কঠোরভাবে প্রয়োগের ব্যবস্থা করা হোক। একই সাথে ভিকারুন্নিসার এই দুঃখজনক ঘটনায় যারা জড়িত, তাদেরকে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করা হোক, যাতে করে আগামীতে আর কোন অরিত্রীকে, শিক্ষকের কারণে ধরিত্রী থেকে বিদায় নিতে না হয়।