ভাষা আন্দোলনে নারীশক্তি

কামাল আহমেদ

19

অনেক সাহস,ত্যাগ আর পুর্বপুরুষদের বুকের তাজা রক্তে দেশের সবুজ ঘাস রাঙিয়ে পেয়েছি মাতৃভাষায় কথা বলার অধিকার। সে অধিকার আদায়ের আন্দোলনে পুরুষের পাশাপাশি নারীশক্তিরও সমান তৎপরতা ছিল কিন্তু তা সেভাবে প্রকাশ হয়নি। প্রতিবছর ফেব্রুয়ারি মাস এলে আমরা একটু স্বদেশী, স্বভাষী চেতনায় নিজেকে একজন যথেষ্ট সচেতন হিসেবে প্রমাণ করার চেষ্টাও করি। নানা আয়োজনে, বইমেলায় মাসব্যাপী নানান কর্মসূচিতে নিজেকে মাতিয়ে রাখি। তা সত্ত্বেও বায়ান্নর ভাষা-সৈনিক নারীদের অবদানের কথা আড়ালেই থেকে যায়।
পঞ্চাশের দশকে রক্ষণশীল সমাজ ব্যবস্থায় নারীদের মিছিল,মিটিং এর জন্যে ঘরের বাইরে যাওয়া দুরূহ ছিল। কেবল বাংলামায়ের হাজার বছরের লালিত ভাষাকে রক্ষার জন্যেই তাঁরা রক্ষণশীলতার ব্যুহভেদ করে।
১৯৪৮ সালে করাচীতে পাকিস্তান গণপরিষদের বৈঠকে উর্দু ইংরেজির পাশাপাশি বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবী উত্থাপন হলে তা নাকচ হয়ে যায়। একই সালের ২রা মার্চ ফজলুল হক মিলনায়তনে এর প্রতিবাদে এক বৈঠক হয়। বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন দুজন নারী-আনোয়ারা খাতুন ও লিলি খান।
১৯৫১ সালে ভাষা আন্দোলনের প্রস্তুতি হিসেবে বর্তমান রোকেয়া হলে ক্যাম্পেইনিং হতো। এতে হালিমা, রোকেয়া ও সুফিয়া খান থাকতেন। হালিমা খাতুন কেবল আন্দোলনের জন্যই ১৯৫১ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন এবং মেয়েদেরকে আন্দোলনে সম্পৃক্ত করার কাজ করেন।
১৯৫২ সালে এ আন্দোলন রুদ্র রূপ ধারণ করে। ২১ ফেব্রুয়ারি আন্দোলনের দিনক্ষণ নির্ধারণ হলে ২০ তারিখেই পাকিস্তান সরকার ১৪৪ ধারা জারি করে সভা,সমাবেশ, মিছিল নিষিদ্ধ করে। ঐ দিন প্রথম যে দল ১৪৪ ধারা ভেঙে মিছিল বের করে-তার নেতৃত্ব দেন ড.শাফিয়া খাতুন। সঙ্গে ছিলেন ড. সুফিয়া, মাহফিল আরা, খোরশেদী খানম, ড. হালিমা, সুরাইয়া, সারা তৈফুর। অন্য এক যায়গায় জুলেখা, নূরী ও সেতারার নাম পাওয়া যায়। পুলিশের ব্যরিকেড ভাঙ্গা আরো দুজন সাহসী নারী-রওশনারা বাচ্চু, শামসুন্নাহার প্রমুখের নাম পাওয়া যায়। সেদিন পুলিশের লাটি ও টিয়ারশেলের আঘাতে অনেকেই আহত হয়েছিলেন,গ্রেফতার হয়েছিলেন। পুলিশের গুলিতে মানুষের মাথার খুলি উড়ে যাবার দৃশ্যের একটি গুরুত্ববহ ছবি ছিল। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে হালিমা ও রাবেয়া রাতের আঁধারে বুকের ভেতর করে পুলিশের সামন দিয়েই ছবিটি নিয়ে আসেন।
নারায়ণগঞ্জের মর্গান হাই স্কুলের প্রধান শিক্ষিকা মমতাজ বেগম নারায়ণগঞ্জে আন্দোলনের পটভূমি তৈরি করেছিলেন। তাই সরকারি পুলিশবাহিনী ২৯ ফেব্রæয়ারী তারিখে তাঁকে স্কুল তহবিল তছরুপের মিথ্যে মামলায় গ্রেফতার করে। মুক্তির শর্ত হিসেবে তাঁকে বন্ডসই করতে বলায় তিনি রাজি হননি, সেজন্যে তাঁকে স্বামীর তালাক নিতে হলো। তবু তিনি পিছু হটেননি ভাষার মর্যাদা রক্ষায়।
ইলা বকশী, বেনুধর ও নাদেরা বেগম ভাষার জন্যে কারাভোগ করেন।
সিলেটে যোবেদা খাতুন চৌধুরীর নেতৃত্বে ও তৎপরতায় ভাষা আন্দোলন সংগঠিত হয়। শাহেরাবানু, লুৎফুন্নেছা, নজিবুন্নেছা প্রমুখ আন্দোলনে সম্পৃক্ত ছিলেন।
স্কুল ছাত্রী সালেহাকে স্কুলে কালোপতাকা উত্তোলনের দায়ে তিন বছরের জন্যে বহিষ্কার করা হলে তাঁর ভাগ্যে আর পড়াশোনা জুটেনি।
এমনি আরো কতো নাম না জানা নারীগণ সেদিন আপন জাতিসত্ত্বার ও মায়ের মুখে শুনা প্রথম বুলির অধিকার রক্ষায় ব্যক্তিগত,পারিবারিক ও সামাজিক জীবনকে জলাঞ্জলি দিয়েছিলেন। সে যুগে নারীদের বাইরে যাওয়া, সমাবেশে যোগদেয়া, পুরুষের সাথে কথা বলা, সামাজিক ও পারিবারিক ভাবে একরকম নিষিদ্ধই ছিল, বলতে হয়। মেয়েদের লেখাপড়ার ক্ষেত্রটাও সীমিত ছিল, বিশেষত মুসলিম পরিবারে; রক্ষণশীল মুসলিম পরিবারেতো কথাই নেই। কিছু ক্ষেত্রে রক্ষণশীল হিন্দু পরিবারেও নারীদের গতিবিধিতে সীমাবদ্ধতা ছিল। এমন কালে নারীগণ একটি রাষ্ট্রযন্ত্রের নিষেধাজ্ঞার কঠিন বিধি, রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে রীতিমতো রাজপথে মিছিল-মিটিং করা, প্রতিবাদী জ্বালাময়ী বক্তব্য প্রদান, হায়েনারূপী পুলিশের বন্দুকের নলের মুখে বুক পেতে দিয়ে সাহসী ভূমিকায় অবতীর্ণ হওয়া- ভাবতেই পারা যায়না।
সে অভাবনীয় বিষয়টিকেও সংঘটিত করেছিলেন তৎকালীন উল্লেখিত নারীগণ। এঁদের এই ত্যাগ কেবল মাতৃভাষা ও মাতৃভূমির প্রতি নি:শর্ত ভালোবাসার টানেই সম্ভব হয়েছিলো। তাদের এই অবদান যে কেবল সেদিন মাতৃভাষা দাবীই প্রতিষ্ঠিত করেছিল, তা-ই নয়; আজকের নারীজাগরণের পথও প্রশস্থ করেছিল। সেদিনের এই মহিয়সীদের নাম আজ আমরা ক’জন জানি?
বিনম্র শ্রদ্ধায় সেইসব মহিয়সী নারীকে স্মরণ করছি।