ভালোবাসা ছাড়া আর আছে কী

তুষার দেব

30

গাছের ডালে নতুন পত্রপল্লব ও রং-বাহারি ফুলের রোশনাই আর ভোরের আলো না ফুটতেই কোকিলের কুহুতানকে সঙ্গী করেই প্রকৃতিতে হাজির হয়েছে ঋতুরাজ বসন্ত। বাংলা বর্ষপঞ্জি সংশোধন করায় এ বছর থেকে পয়লা ফাল্গুনে বসন্ত বরণ এবং বিশ্ব ভালোবাসা দিবস একইদিনে উদযাপিত হচ্ছে। বাসন্তী রংয়ে ভালোবাসার প্রকাশও তাই যুগপৎভাবে অনন্য ব্যঞ্জনায় ধরা দিয়েছে।
পৃথিবীর সবচেয়ে দুর্ভেদ্য, কোমল, কাক্সিক্ষত ও দূরন্ত এক মানবিক অনুভূতির নাম হচ্ছে ভালোবাসা। ভলোবাসা যে সৃষ্টিকর্তার সর্বসৃষ্টির প্রাথমিক ও সর্বোত্তম উপাদান সে কথা বলার অপেক্ষা রাখে না। বিশ্ব চরাচরের মহান প্রতিপালক অসীম ভালোবাসার বহিঃপ্রকাশ ঘটিয়েছেন তাঁর সৃষ্টিকূলে। এর মধ্যে তিনি সবচেয়ে বেশি ভালোবাসা ও দরদ দিয়ে গড়েছেন মানব জাতিকে। জনম জনম ধরে তাই ভালোবাসা নামের মানবিক অনুভূতি সবকিছুকে তুচ্ছ করে নিজের আসনকে স্ব-মহিমায় উদ্ভাসিত করেছে। ভালোবাসার ব্যাপ্তি এতই বিশাল যে সারা জীবন ব্যয় করেও এর সীমা-পরিসীমা নির্ধারণ করা মানুষের পক্ষে কঠিন। মানুষে-মানুষে কেবলমাত্র ভালোবাসার অসীম শক্তিই সমস্ত বিভেদকে পরাভূত কিংবা জয় করার ক্ষমতা সংরক্ষণ করে। তাই পৃথিবী নামের গ্রহে মানবসভ্যতার বিকাশ সৃষ্টিসেরা মর্যাদাকে সদম্ভে ঘোষণা করার জন্য সবার উপরে ভালোবাসা ছাড়া আর আছে কী?
বছর পরিক্রমায় বাঙালির চিরায়ত উৎসবের অন্যতম আগুন ঝরা প্রেমের ফাগুন কিংবা ঋতুরাজ বসন্ত এসেছে আজ। একইসাথে পাশ্চাত্য সংস্কৃতি থেকে আসা বিশ্ব ভালোবাসা দিবস বা ভ্যালেন্টাইন ডে যুগলবন্দী রচনা করেছে পয়লা ফাল্গুনে। প্রতিবছর ১৪ ফেব্রূয়ারি দেশে দেশে এই দিবসটি পালন করা হয়। পৃথিবীতে প্রতিটি মানুষের জন্ম হয়েছে একে অন্যকে ভালোবাসার জন্য। মানুষ হিসাবে সব ধরণের পশুবৃত্তি মানবসভ্যতার জন্য যেমন লজ্জাষ্কর, তেমনি তা অমানুষের পরিচয়ই বহন করে। তাই কোনও পশুবৃত্তি বা বেহায়াপনা নয়। বিশ্ব ভালোবাসা দিবস বা ভ্যালেন্টাইনস ডে মানে এটাও নয় যে, ব্যক্তির হৃদয়ের সমস্ত ভালোবাসা জমা করে ১৪ ফেব্রূয়ারি পালন করতে হবে। সৃষ্টির সেরা হিসেবে মানুষমাত্রই একে অন্যের প্রতি ভালোবাসার প্রকাশ ও পরিচয় দিতে হবে প্রতি ক্ষণে বা প্রতি মূহুর্তে, প্রতিদিনের প্রতিটি কাজে। তাহলেই ১৪ ফেব্রূয়ারি ভালোবাসার দিন হিসেবে পবিত্র সম্মানে সমুজ্জ্বল হয়ে থাকবে।
বিশ্বজুড়ে ভ্যালেন্টাইন্স ডে বা ভালোবাসা দিবস পালন করা হচ্ছে তার পেছনে অনেক ইতিহাস রয়েছে। কিছু কিছু ক্ষেত্রে রয়েছে মতপার্থক্যও। নানা গ্রন্থ পাঠ ও ইন্টারনেট ঘেঁটে পাওয়া তথ্যে জানা যায়, প্রায় সাড়ে সতেরশো বছর আগের একজন রোমান ক্যাথলিক ধর্মযাজক সেন্ট ভ্যালেন্টাইনের কথা। ২৭০ খ্রিস্টাব্দে ইতালির রোম শাসন করতেন রাজা ক্লডিয়াস-২। তখন রাজ্যে চলছিলো সুশাসনের অভাব, আইনের অপশাসন, অপশিক্ষা, স্বজন-প্রীতি, দুর্নীতি এবং কর বৃদ্ধি। এতে সাধারন জনগণ ফুঁসছিল। রাজা তার শাসন অক্ষুন্ন রাখতে রাজ দরবারে তরুণ-যুবকদের নিয়োগ দিলেন। আর যুবকদেরকে দায়িত্বশীল ও সাহসী করে গড়ে তোলার লক্ষে তিনি রাজ্যে যুবকদের বিয়ে নিষিদ্ধ করলেন। কারণ, রাজা বিশ্বাস করতেন বিয়ে মানুষকে দূর্বল ও কাপুরুষ করে। বিয়ে নিষিদ্ধ করায় পুরো রাজ্যে অসন্তোষ সৃষ্টি হলো। এ সময় সেন্ট ভ্যালেন্টাইন নামক জনৈক যাজক গোপনে বিয়ের আনুষ্ঠানিকতা শুরু করলেন; তিনি পরিচিতি পেলেন ‘ভালোবাসার বন্ধু’ নামে। কিন্তু তাকে রাজার নির্দেশ অমান্য করার কারনে রাষ্ট্রদ্রোহিতার অভিযোগে আটক করা হয়। কারাগারে থাকাকালীন ভ্যালেন্টাইনের সাথে পরিচয় হয় জেলরক্ষক আস্ট্রেরিয়াসের সাথে। আস্ট্রেরিয়াস জানত ভ্যালেন্টাইনের আধ্যাত্মিক ক্ষমতা সম্পর্কে। তিনি তাকে অনুরোধ করেন তার অন্ধ মেয়ের দৃষ্টিশক্তি ফিরিয়ে দিতে। ভ্যালেন্টাইন পরবর্তীতে মেয়েটির দৃষ্টিশক্তি ফিরিয়ে দেন। এতে মেয়েটির সাথে সেন্ট ভ্যালেন্টাইনের অন্তরঙ্গ বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে উঠে। রাজা তার এই আধ্যাত্মিকতার সংবাদ শুনে তাকে রাজ দরবারে ডেকে পাঠান এবং রাজকার্যে সহযোগিতার জন্য বলেন। কিন্তু ভ্যালেন্টাইন বিয়ের উপর নিষেধাজ্ঞা না তোলায় সহযোগিতায় অস্বীকৃতি জানান। এতে রাজা ক্ষুব্ধ হয়ে তার মৃত্যুদন্ড ঘোষনা করেন। মৃত্যুদন্ডের ঠিক আগের মূহুর্তে ভ্যালেন্টাইন কারারক্ষীদের কাছে একটি কলম ও কাগজ চান। তিনি মেয়েটির কাছে একটি গোপন চিঠি লিখেন এবং শেষাংশে বিদায় সম্ভাষণে এমন একটি শব্দ লেখেন যা হৃদয়কে বিষাদগ্রস্থ করে। অতঃপর ২৭০ খ্রীষ্টাব্দের ১৪ ফেব্রæয়ারি ভ্যালেন্টাইনের মৃত্যুদন্ড কার্যকর করা হয়। সেই থেকে সারা বিশ্বে ‘বিশ্ব ভালোবাসা দিবস’ পালন করা হয়।
ভিন্ন মতে, প্রাচীন রোমে দেবতাদের রাণী জুনোর সম্মানে ১৪ ফেব্রæয়ারি ছুটি পালন করা হতো। রোমানরা বিশ্বাস করত যে, জুনোর ইশারা-ইঙ্গিত ছাড়া কোন বিয়ে সফল হয় না। ছুটির পরদিন ১৫ ফেব্রুয়ারি লুপারকালিয়া ভোজ উৎসবে হাজারও তরুণের মেলায় র‌্যাফেল ড্র’র মাধ্যমে সঙ্গী বাছাই প্রক্রিয়া চলত। এ উৎসবে উপস্থিত তরুণীরা তাদের নামাঙ্কিত কাগজের স্লিপ জনসম্মুখে রাখা একটি বড় পাত্রে ফেলত। সেখান থেকে যুবকের তোলা স্লিপের তরুণীকে কাছে ডেকে নিত। কখনও এ জুটি সারা বছরের জন্য স্থায়ী হত এবং ভালোবাসার সিঁড়ি বেয়ে বিয়েতে গড়াতো। ওই দিনের হাত ধরেই প্রচলন শুরু হয় আজকের এই ভ্যালেন্টাইন ডে’র।
অপরদিকে মনোবিদদের দৃষ্টিতে ভালোবাসা শুধুমাত্র ভাষায় পরিপূর্ণভাবে প্রকাশযোগ্য নয়, তার সঙ্গে অনুভূতির মিশে থাকে। এটি একটি মানবিক অনুভূতি ও আবেগকেন্দ্রিক অভিজ্ঞতা। এর রং-রূপ-গন্ধ কিছুই নেই, আছে শুধু অনুভূতি। বিশেষ কোনও মানুষের জন্য ভালোবাসা স্নেহের শক্তিশালী বহিঃপ্রকাশ। বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর হয়তো এমন মুহূর্তকেই স্মরণ করে লিখেছিলেন, ‘দোহাই তোদের, একটুকু চুপ কর/ ভালোবাসিবারে দে মোরে অবসর।’ জীবজগতের মধ্যে আন্তঃসম্পর্ক হল ভালোবাসা। যার শক্তিতে পৃথিবীর এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্ত জয় করা যায়। পৃথিবীর সবচেয়েবেশি উচ্চারিত শব্দগুলোর মধ্যে একটি হলো ‘ভালোবাসা’।
আমাদের দেশে বছরের অন্যান্য অসংখ্য দিবসের মত বিশ্ব ভালোবাসা দিবস বা ভ্যালেন্টাইন’স ডে পালন হচ্ছে বিগত আড়াই দশকেরও বেশি সময় ধরে। ইন্টারনেটের যুগে ভালোবাসার পোস্ট কার্ডের পরিবর্তে ই-কার্ড, এসএমএস /এমএমএস বা ই-মেইলের ব্যবহারই বেশি করা হয়। ভালোবাসা দিবসকে সামনে রেখে বিভিন্ন ওয়েবসাইট পরস্পরের সাথে শেয়ার করার মত নানা উপকরণে সমৃদ্ধ করে সাজানো হয়। এসব সাইট থেকে যেমন ই-কার্ড পাঠানো যায়, তেমনি ভালোবাসার এসএমএস, কবিতা ইত্যাদি সংগ্রহ করা যায় ১৪ ফেব্রুয়ারি সারা দিন মুঠোফোন, ফেসবুক ও টুইটারে শুভেচ্ছা বিনিময় চলে। নগরীর চারুকলা ইনস্টিটিউট, সিআরবি, পতেঙ্গা সমুদ্র সৈকতসহ বিভিন্ন স্থানে নানা আয়োজনে ভালোবাসার উচ্ছ¡াস ছড়িয়ে পড়তে দেখা যায়। এছাড়া, নগরীর ফ’য়সলেক, সী ওয়ার্ল্ড, বাটারফ্লাই পার্ক, পতেঙ্গা সমুদ্র সৈকত, নেভাল একাডেমি, আগ্রাবাদ শিশুপার্ক, স্বাধীনতা কমপ্লেক্সের পাশাপাশি র‌্যাডিসন বে ভিউ, হোটেল আগ্রাবাদ, দি পেনিনসুলা চিটাগাং ও ওয়েলপার্কসহ তারকাখচিত হোটেলগুলোতে কনসার্টসহ নানা আনন্দ-আয়োজনের পাশাপাশি রয়েছে বিশেষ প্যাকেজ।