ভারত থেকে বিতাড়িত ৭ রোহিঙ্গাকে হত্যার আশঙ্কা অন্যদের মনেও বিতাড়নের আতঙ্ক

23

ভারত থেকে স¤প্রতি সাত জনকে মিয়ানমারে ফেরত পাঠানোর পর অন্য রোহিঙ্গা শরণার্থীদের মনেও বিতাড়িত হওয়ার আতঙ্ক জোরালো হয়েছে। ভারতীয় শরণার্থী শিবিরে থাকা রোহিঙ্গাদের আশঙ্কা, সম্প্রতি যারা রাখাইনে ফিরতে বাধ্য হয়েছেন, সেই ৭ জনকে ‘শিগগিরই হত্যা করা’ হতে পারে। মিয়ানমারে শান্তি পুনঃপ্রতিষ্ঠা না হওয়া পর্যন্ত তাদেরকে ক্যাম্পে থাকতে দেওয়ার জন্য ভারত সরকারের প্রতি আকুল আবেদন জানিয়েছে রোহিঙ্গারা। স¤প্রতি ভারতের সুপ্রিম কোর্ট রোহিঙ্গাদের বিতাড়নে নরেন্দ্র মোদির কেন্দ্রীয় সরকারের নেওয়া সিদ্ধান্তে হস্তক্ষেপ করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে। সর্বোচ্চ আদালতের এমন অবস্থানের পরপরই প্রথম ধাপে ৭ রোহিঙ্গাকে মিয়ানমারে ফেরত পাঠায় ভারত।
মিয়ানমারে সহিংসতা নিপীড়নের শিকার হয়ে বিভিন্ন সময়ে পালিয়ে ভারতে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গার সংখ্যা প্রায় ৪০ হাজার। এদের বেশিরভাগই বসবাস করছে আশ্রয় শিবিরে। আবার অবৈধভাবে প্রবেশের অভিযোগে অনেককে রাখা হয়েছে অভিবাসী আটক কেন্দ্রে। ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির হিন্দু জাতীয়তাবাদী সরকার রোহিঙ্গাদের অবৈধ অভিবাসী উল্লেখ করে তাদের ভারতের নিরাপত্তার জন্য হুমকি হিসেবে আখ্যায়িত করে আসছে। ২০১২ সাল থেকে অনুপ্রবেশের দায়ে ভারতে কারাভোগ করা সাত রোহিঙ্গাকে বৃহস্পতিবার (৪ অক্টোবর) মিয়ানমারে ফেরত পাঠানো হয়। পরদিন শুক্রবার (৫ অক্টোবর) এসব রোহিঙ্গার নিরাপত্তা ও সুরক্ষা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থা ইউএনএইচসিআর। ফেরত পাঠানো এসব রোহিঙ্গা মিয়ানমার কর্তৃপক্ষের হাতে নির্যাতনের শিকার হতে পারে বলেও আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়। তবে ভারত সরকার বলছে, এ পদক্ষেপ তাদের নিয়মিত প্রক্রিয়ারই অংশ এবং আইনে অবৈধ অভিবাসীদেরকে দেশে ফেরত পাঠানোর কথা বলা আছে।
২০১২ সাল থেকে ভারতের কালিন্দি কুঞ্জ ক্যাম্পে বসবাস করছেন মোহাম্মদ ফারুক নামের এক রোহিঙ্গা শরণার্থী। শনিবার (৬ অক্টোবর) ভারতীয় সংবাদমাধ্যম এএনআই-কে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ফারুক বলেন, ‘২০১২ সাল থেকে এখানে আছি। আমি সরকারের কাছে শুধু অনুরোধ করছি যে আমাদেরকে যেন এখানে থাকতে দেওয়া হয়। দেশে আমাদেরকে অনেক কষ্টের মুখোমুখি হতে হয়। কোনও কিছুর জন্য প্রলোভিত হয়ে আমরা আমাদের দেশ ছাড়িনি। সত্যিকার অর্থে নিজের দেশ কেউই ছাড়তে চায় না।’ মোহাম্মদ ফারুক আরও আশঙ্কা প্রকাশ করেন, স¤প্রতি যে রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারে ফেরত পাঠানো হয়েছে, তাদেরকে শিগগিরই মেরে ফেলা হতে পারে।
হারুন নামে আরেক রোহিঙ্গা এএনআই-কে বলেন, ২০০৫ সাল থেকে তারা ওই আশ্রয় শিবিরে আছেন কিন্তু দীর্ঘ মেয়াদি ভিসা ছাড়া ভারত সরকার তাদেরকে অন্য কোনও সহায়তা দেয়নি। ২০১৭ সাল থেকে ভিসা নবায়নও বন্ধ করে দিয়েছে ভারত সরকার।
স¤প্রতি জম্মু ও দিল্লিতে অবস্থিত দুই আশ্রয় শিবিরের বেশ কয়েকজন রোহিঙ্গার সাক্ষাৎকার নিয়েছে ব্রিটিশ বার্তা সংস্থা রয়টার্স। ওইসব সাক্ষাৎকারেও উঠে আসে বিতাড়ন আতঙ্কের কথা। জম্মু-কাশ্মির অঞ্চলের বিভিন্ন আশ্রয় শিবিরে প্রায় ৭ হাজার রোহিঙ্গার বসবাস। জম্মু-কাশ্মির অঞ্চলের শিবিরে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গা শহিদুল্লাহ বলেন, ‘আমরা ভারতে এসেছিলাম কারণ আমরা শুনেছি এখানকার পরিস্থিতি ভালো। এখানে অনেক কাজ আছে। এখানে স্বাধীনভাবে চলাফেরা করা যায়, যেটা আমাদের দেশে সম্ভব নয়। এগুলো সবই ঠিক কথা। আমাদেরকে এখানে থাকতে দেওয়ায় ভারতীয় কর্তৃপক্ষকে কৃতজ্ঞতা জানাই। তবে আমাদের বিরুদ্ধে বিদ্বেষ ক্রমাগত বাড়ছে।’
মোহাম্মদ আরাফাত নামে ২৪ বছর বয়সী এক রোহিঙ্গা নেতা দাবি করেন, স্থানীয়রা প্রায়ই তাদের বিরুদ্ধে প্রমাণ ছাড়া কথাবার্তা বলে। অভিযোগ করে, জঙ্গিদের সঙ্গে তাদের সম্পৃক্ততা রয়েছে। আরাফাত বলেন, ‘তারা চায় আমরা এখান থেকে চলে যাই আর এটাই আমাদের পরিবারগুলোকে উদ্বেগে ফেলেছে। এখানকার সবাই বিতাড়িত হওয়া নিয়ে শঙ্কিত ও উদ্বিগ্ন।’
জম্মু থেকে প্রায় ৬০০ কিলোমিটার দক্ষিণে দিল্লির শাহীন বাগ শরণার্থী শিবিরে বসবাসরত রোহিঙ্গারাও আছেন বিতাড়িত হওয়ার আতঙ্কে। মোহাম্মদ হারুন নামে ৪৭ বছর বয়সী এক রোহিঙ্গা রয়টার্সকে বলেন, ‘আমরা ভারত থেকে যেতে চাই না। কোথায় যাব আমরা? ভারতে অন্য দেশ থেকে আসা শরণার্থীরাও রয়েছে। আমাদেরকেই কেন লক্ষ্যস্তু করা হচ্ছে? কেন তারা আমাদেরকে জেলে পাঠাচ্ছে? শুধু আমরা মুসলিম বলেই এমন করা হচ্ছে? অন্য শরণার্থীদের সঙ্গে তারা এমন করে না।’

শহিদুল্লাহ জানান, ২০১০ সালে সহিংসতা ও নিপীড়নের শিকার হয়ে মিয়ানমার থেকে বাংলাদেশ হয়ে ভারতে আশ্রয় তিনি। জানান, দুই বছর পর তার কয়েকজন আত্মীয়-স্বজন বাংলাদেশ হয়ে ভারতে প্রবেশের সময় বন্দি হয়। ওই আত্মীয়দেরকে আসামের আটক কেন্দ্রে রাখা হয়েছে। আটককেন্দ্রে থাকা ভাতিজা সাইদুর স¤প্রতি ফোন করে তাকে বিতাড়িত হওয়ার আতঙ্ক প্রকাশ করে বলে জানান শহিদুল। সাইদুর তাকে ফোন করে বলে, ‘চাচা, আমাদেরকে এখান থেকে নিয়ে যান। তারা আমাদেরকেও দেশে ফেরত পাঠাবে।’
রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়, চীনকে ঠেকাতে মিয়ানমারের সঙ্গে অর্থনৈতিক সম্পর্ক জোরালো করার চেষ্টা করছে ভারত। রোহিঙ্গা প্রশ্নে মিয়ানমারের সুরে সুর মেলাতে দেখা যায় দেশটিকে। গত বছরের শেষ দিকে ভারত বলেছিল, রোহিঙ্গাদের ব্যাপারে মিয়ানমারের মধ্যে যে নিরাপত্তা উদ্বেগ রয়েছে তা ভারতের মধ্যেও আছে।
ভারতের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সেদেশের সুপ্রিম কোর্টকে বলেছিল, কিছুসংখ্যক অ-অনুমোদিত রোহিঙ্গার সঙ্গে পাকিস্তানভিত্তিক জঙ্গি সংগঠনগুলোর সম্পর্ক রয়েছে বলে তাদের কাছে গোয়েন্দা তথ্য আছে। বিজেপির বিধায়ক ও জম্মু কাশ্মিরের সাবেক উপ মুখ্যমন্ত্রী কাবিন্দার গুপ্ত বলেন, ‘রাষ্ট্রের নিরাপত্তা পরিস্থিতির কথা মাথায় রেখে তাদেরকে বের করে দেওয়ার সিদ্ধান্ত আমরা নিয়েছি।’ নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক জম্মুর জ্যেষ্ঠ পুলিশ কর্মকর্তাদের উদ্ধৃত করে রয়টার্স জানায় ওই এলাকায় বসবাসরত সব রোহিঙ্গাকে শনাক্ত করা হয়েছে এবং তাদের বিতাড়িত করার প্রস্তুতি চলছে। তারা আরও জানিয়েছে, জঙ্গিদের সঙ্গে রোহিঙ্গাদের যোগসাজশ তারা পায়নি। বিডিনিউজ