ভারতের ধর্ম নিরপেক্ষ নীতি পরিবর্তন করা কি সম্ভব?

শাহাবুদ্দীন খালেদ চৌধুরী

27

দিনটা ছিল পশ্চিম গোলার্ধের বৃহত্তম গণতান্ত্রিক দেশের রাষ্ট্র এবং সরকার প্রধান যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের পূর্ব গোলার্ধের বৃহত্তম গণতান্ত্রিক দেশ ভারতের রাজধানী দিল্লি সফরের দিনটা। সেদিনই ঘটল দিল্লির “হত্যাযজ্ঞ”। উত্তর পূর্ব দিল্লিতে আগুন আর আগুন। অনেকদিন আগে থেকে ভারতের লোকসভা এবং রাজ্যসভা কর্তৃক অনুমোদিত সংশোধিত নাগরিত্ব আইন (সি.এ.এ) এর বিরুদ্ধে সারা ভারতের ন্যায় দিল্লিতেও আন্দোলন চলছিল। নাগরিত্ব সংশোধনী আইনের টার্গেট যদিও শুধু ভারতের সংখ্যালঘু মুসলমান, তবুও যেহেতু এই আইন প্রয়োগের ফলে ভারতের গণতান্ত্রিক ও ধর্ম – নিরপেক্ষতা কাঠামো ভেঙে পড়বে, সে জন্যে ধর্ম, বর্ণ নির্বিশেষে ভারতে ধর্মনিরপেক্ষ গণতান্ত্রিক শক্তি এর বিরুদ্ধে ভারতব্যাপী তুমুল আন্দোলন গড়ে তুলতে সক্ষম হয়েছে এবং যা দিনের পর দিন অপ্রতিরোধ্য হয়ে উঠছে। মাত্র অল্প দিন আগে দিল্লির রাজ্য নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে যাতে একই কারণে বি.জে.পির শোচনীয় পরাজয় হয়েছে। অথচ এর আগে অনুষ্ঠিত লোক সভার নির্বাচনে বি.জে.পি দিল্লির প্রায় সব কয়টি লোক-সভার আসনে বিপুল ভোটে জয়লাভ করেছিল। কাজেই বি.জে.পি. এবং ইহার গুরুদল আর.এস.এস. এই পরিস্থিতি মোকাবেলা করার জন্য বেপরোয়া হয়ে পড়েছে। ইতিমধ্যে দিল্লির দাঙ্গায় ৫০ জনের উপরে মুসলমান জিঘাংসার বলি হয়েছে। সারা বিশ^ অবাক বিস্ময়ে দেখেছে কেমন করে ভারতে এই অগণতান্ত্রিক পেশী শক্তি উত্তর – পূর্ব দিল্লিতে অনুষ্ঠিত শান্তিপূর্ণ মুসলমান প্রতিবাদকারীদের উপর কেমন নিষ্ঠুর, কসাইসুলভ বর্বর আক্রমন করতে পারে। ঠিক সেই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের সফররত প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সম্মানার্থে দেওয়া বিভিন্ন অনুষ্ঠান দিল্লিতে চলছিল। আমেরিকার প্রেসিডেন্টের সফরকে আকর্ষণীয় ও দৃষ্টি নন্দন করার জন্য ভারত সরকার ১৩০ কোটি রূপি বা ১৮ মিলিয়ন ডলার খরচ করেছে বলে ভারতীয় বিভিন্ন মিডিয়ার সূত্রে জানা যায়। কিন্তু আর.এস.এস. ও বিজেপির দাঙ্গাকারীদের মুসলমান নিধন অভিযান ভারত সরকারের আয়োজিত সমস্ত অনুষ্ঠান অর্থহীন করে দিয়েছে। এ দিকে বি.জে.পি নেতা কপিল শর্মা চলমান নাগরিকত্ব আইন বিরোধী বা জমায়েত বন্ধ করার জন্য তাঁর কর্মী বাহিনী এবং পুলিশ নিয়ে জমায়েতের উপর জোর চালাতে শুরু করেন। এভাবেই দাঙ্গা শুরু হয়ে যায়। নিরীহ প্রতিবাদকারীদের উপর নির্মম অত্যাচার শুরু হয়, মসজিদ জ¦ালিয়ে দেওয়া হয়, নির্বিচারে লুঠ, দৈহিক হামলা শুরু হয়ে যায়। সাথে সাথে বাসায়, দোকান ও মসজিদে আগুন দিয়ে জ্বালিয়ে দেওয়া হয়। এসব বর্বব হামলা চলার সময় অনবরত “জয়-রাম” স্লোগানও চলতে থাকে। পরিতাপের বিষয় হলো এই তান্ডব পুলিশ বাহিনীর উপস্থিততেই চলেছে, তখন এরা নীরবতা পালন করেছিল। আবার অনেক সংবাদপত্র এবং টিভি চ্যানেল এমনও প্রচার করেছে যে কিছু কিছু পুলিশ বাহিনীর সদস্য এসব হামলাকারীদের মদদ দিয়েছে। সশস্ত্র গুন্ডারা তিনদিন ধরে উত্তর – পূর্ব দিল্লির বিভিন্ন রাস্তায় প্রকাশ্যে অস্ত্র হাতে নিয়ে ঘুরেছে বলে বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যম রিপোর্ট করেছে। এই পর্যন্ত এই দাঙ্গায় ১ পুলিশসহ ৫২ জনের মত মারা গেছে বলে জানা গেছে এবং ১০০০ হাজারের ঊর্ধ্বে বিভিন্নভাবে আঘাতপ্রাপ্ত হয়েছে। ভারতীয় মিডিয়া এই ব্যাপারে যে ভ‚মিকা রেখে চলছে তা প্রশংসনীয়। ইংরেজি দৈনিক টেলিগ্রাপের শিরোনামটি ছিল “যখন গুজরাটের মডেল দিল্লি পৌঁছেছে তখন নিরো ডাইনিং – এ ” “যখন রোম পুড়ছিল আর নিরো বাঁশি বাজাচ্ছিল” কে অনুকরণ করে “টেলিগ্রাফ” উক্ত শিরোনাম দিয়েছে। দাঙ্গার সময়েই দিল্লিতে চলছিল মোদী ট্রাম্পের নৈশ ভোজ। “ইন্ডিয়া এক্সপ্রেস” শিরোনাম দিয়েছে, “ দিল্লির গণনৃশংসতার টার্গেট মুসলমানেরা”। ভারতের সংবাদ মিডিয়ার ভূমিকা দেখে বিশ্বের সমস্ত গণতন্ত্র এবং ধর্ম-নিরপেক্ষতাবাদীরা বড় আশান্বিত হয়েছে এবং এই সিদ্ধান্তে তাঁরা স্বাভাবিকভাবে উপনীত হয়েছেন যে কোটি কোটি ভারতবাসীর ত্যাগ, তিতিক্ষার বিনিময়ে ভারতে যে গণতান্ত্রিক এবং ধর্ম – নিরপেক্ষতার বুনিয়াদ রচিত হয়েছে তা এত সহজেই ধ্বংস করা সম্ভব হবে না।
যে বিষয়টি সবচাইতে উদ্বেগজনক তা হলো দিল্লি হাইকোর্টের জজ এস. মুরালী ধর যিনি দিল্লি পুলিশের ভূমিকার তীব্র সমালোচনা করেছিলেন এবং কপিল শর্মার বিরুদ্ধে এফ.আই.আর করার জন্য নির্দেশ দিয়েছিলেন। তাঁকে সে রাত্রেই ১১ টার সময় উপরের নির্দেশে পাঞ্জাব হাইকোর্টে বদলী করে দেওয়া হয়। ইহাতে সরকারের উদ্দেশ্য স্পষ্ট হয়ে যায়। তাঁর বিদায় সম্বর্ধনায় দিল্লি কোর্টের সমস্ত আইনজীবীরা উপস্থিত হয়ে সবাই তাঁকে প্রাণঢালা বিদায় জানান। সে সভাই মুরালি ধর বলেন, ‘‘সে দিন এজলাসের মধ্যেই যেভাবে অনেকে কান্নায় ভেঙে পড়েছিলেন, তখনই বুঝেছিলাম কিছু অপরিবর্তনীয় ঘটনা ঘটেছে। ’’ তিনি বলেন ‘‘ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে হলে একজন বিচারপতিকে দুর্বলের পক্ষে ঝুঁকে থাকতে হয়।’’
এই গন্ডগোলের মধ্যে বি.জে.পি নেতাদের মধ্যে কিছু পরস্পর বিরোধী কর্মকান্ড লক্ষ্য করার মতো ছিল। যেমন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ এক বিবৃতিতে সমস্ত রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের কাছে উত্তেজনাপূর্ণ রাজনৈতিক বিবৃতি না দিতে অনুরোধ করলেন কিন্তু পরক্ষণে-ই দেখা গেল তাঁর দলের নেতা বি.এল সন্তোষ এক টুইট বার্তায় বললেন, ‘‘এখন খেলা শুরু হয়েছে, হামলাকারীদের ভারতীয় আইন সম্পর্কে এক, দুইটা শিক্ষা দিতে হবে।’’ এই বিবৃতির পর যদি মনে করা হয়, অমিত শাহের নির্দেশ পার্টির কিছু নেতা মানছে না, সেটা কিন্তু বিশ্বাস করা যায় না এবং কারণ অমিত শাহ হলেন নরেন্দ্র মোদীর বিশ্বস্থ সহচর, এবং এই সরকারের ক্ষমতার দিক দিয়ে মোদির পরেই অমিত শাহের স্থান। নরেন্দ্র মোদি নিজেই দাঙ্গা হাঙ্গামা চলার সময় থেকে প্রায় ৬৯ ঘণ্টার মতো সময় এই ব্যাপারে কোন মন্তব্যই করেন নাই। এই দীর্ঘ সময় ধরে তিনি কেন নীরবতা পালন করেছিলেন তাও ভাববার বিষয়।
গত কয়েক মাস ধরে বি.জে.পির বিভিন্ন নেতা বিরোধীদের উদ্দেশ্যে সুপরিকল্পিতভাবে উস্কানীপূর্ণ এবং অপমানকর বক্তব্য দিতে শুরু করেছিলেন। উদাহরণ স্বরূপ কর্নাটাকের বি.জে.পির নির্বাচিত এম.এল.এ সোমনাথ শেখর রেড্ডি এক বক্তৃতায় বলেছিলেন, ‘‘আমরা হলাম ৮০ শতাংশ আর তোমরা হলে ১৭ শতাংশ। চিন্তা কর, আমরা যদি তোমাদের বিরুদ্ধে অবস্থান নেই, তোমাদের অবস্থা কি হবে?’’ ২০১৯ সালে অমিত শাহের মতো গুরুত্বপূর্ণ নেতা বলেছিলেন, ‘‘মুসলমানরা হলো উইপোকা এবং বহিরাগত এদেরকে এক এক করে বঙ্গোপসাগরে নিক্ষেপ করা হবে।’’ এই বক্তব্যের ফলে ভারতের মর্যাদা, অখন্ডতা, সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ ভারতীয় বৈচিত্রের মধ্যে ঐতিহাসিক ঐক্যে ফাটল এসে যাচ্ছে তা বুঝবার ক্ষমতা উল্লেখিত নেতাদের থাকতে পারে না।
ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনে মহাত্মা গান্ধী সহ অগণিত নেতা জড়িত ছিলেন। তাঁরা নিজের সমস্ত কিছু বিসর্জন দিয়ে দেশের স্বাধীনতা আন্দোলনে কায়মনোবাক্যে অংশ গ্রহণ করেছিলেন এবং ভারতের এই বৈচিত্র্যময় ঐক্য ধরে রাখার জন্য একটি শ্রেণী সৃষ্টি করে গেছেন। যাঁরা প্রায় সবাই সত্যিকার শিক্ষায় শিক্ষিত, তাঁদের মানবতাবোধ প্রচন্ড, মনেপ্রাণে অসাম্প্রদায়িক, তাঁরা ধর্মহীন নয় ব্যক্তিগত জীবনে, তবে রাষ্ট্রীয় ব্যাপারে সত্যিকার অর্থে ধর্মনিরপেক্ষ, মানবতার সেবায় কোন সময়ে তাঁদের ধর্ম বাধা হয়ে দাঁড়ায় না। তাঁদের ধর্মীয় চেতনায় মানবতায় মুখ্য। ভারতের স্বাধীনতার পর এই শ্রেণীর মানুষ উচ্চ শিক্ষার কারণে ভারতে বেড়েছে এবং অহরহ বাড়তে আছে। কাজেই ভারতের সাম্প্রদায়িক শক্তি যদি মনে করে ভারত বিভাগের সময় যে পরিস্থিতি ছিল তা আবার সৃষ্টি করা যাবে তাহলে বলতে হবে তারা সত্যিকার অর্থে আহমকের স্বর্গে বসবাস করছে। ইহা মানতে হবে ভারতের ক্ষমতাসীন দলের অদূরদর্শিতা এবং জাতি বিদ্বেষ এই অবস্থার সৃষ্টি করেছে।
বর্তমানে ভারত রাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিক উভয় সংকটে রয়েছে। দুটোই ভয়াবহ সংকট। এর মধ্যে যারা আবার সাম্প্রাদায়িক সংকট সৃষ্টি করছে তাদের হয়তো দেশপ্রেম নেই অথবা ভারতের বর্তমান সমস্যা গুলি বুঝবার যথেষ্ট জ্ঞান নেই। বর্তমান পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে পুঁজি বিনিয়োগকারীদের আস্থা সম্পূর্ণভাবে উঠে যাবে। তাতে পুঁজি বিনিয়োগ ক্ষেত্রে ভারতকে একটি বিরাট সংকট মোকাবিলা করতে হবে। এই পরিস্থিতি শুরু হয়ে গেছে। ইতিমধ্যে বিরাট বিরাট অংকের টাকা ভারত থেকে পাচারের ঘটনা ঘটে গেছে। অনেকগুলি ঘটনার খবর ইতিমধ্যে ভারত সরকার পেয়ে গেছে যা আন্তর্জাতিক সংবাদ মাধ্যমে ইতিমধ্যেই প্রকাশিত হয়েছে। বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর থেকে যে বিরাট বিরাট অংকের মুদ্রা ভারত থেকে বিভিন্ন দেশে পাচার হয়েছে এবং যেগুলির খবর পাওয়া গেছে তার পরিমাণ শুনলে ভারতের ভবিষ্যৎ নিয়ে অর্থনীতিতে অভিজ্ঞ কোন লোক আশাবাদী হতে পারেনা।
ভারতের সাবেক প্রধানমন্ত্রী যিনি একজন বিশ্ববিখ্যাত অর্থনীতিবিদ মনমোহন সিং সম্প্রতি “দি হিন্দু” নামে ভারতীয় ইংরেজি পত্রিকায় একটি কলাম লিখেছেন, তিনি বলেছেন “আসল বিপদের সামনে দাঁড়িয়ে আছে ভারত একই সাথে তিন দিক থেকে। এই ত্রিভুজ ভারতের আত্মাকে ক্ষত বিচ্ছিন্ন করে দিবে।’’ তাঁর মতে উদার গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে উন্নয়নের মডেল হিসাবে যে ভারত গড়ে উঠেছিল তা চলমান বিশৃঙ্খলা, অর্থনৈতিক মন্দা এবং বিশ্বজুড়ে ‘‘করোনা ভাইরাসের’’ প্রভাব এই ত্রিভুজ ভারতের আত্মাকে ক্ষতবিক্ষত করে দিবে। একই সাথে অর্থনৈতিক ও গণতান্ত্রিক শক্তি হিসাবে ভারত ধ্বংস হয়ে যাবে বলে তিনি শঙ্কা প্রকাশ করেন। জনগণের রক্ষার যে ধর্ম আইন-রক্ষাকারী সংস্থাগুলি পালন করার কথা, বিচার বিভাগ এবং গণমাধ্যম ও তাদের স্ব-স্ব দায়িত্ব পালন করতে ব্যর্থ হয়েছে। ভারতের অর্থনীতির দুর্দশার কারণও এখানে নিহিত রয়েছে। উদ্যোক্তারা, বিনিয়োগকারীরা ও শিল্পপতিরা নতুন প্রকল্পে বিনিয়োগ করছেনা সামাজিক উত্তেজনা ও সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা ইহার প্রধান কারণ। বিনিয়োগ কম, কর্মসংস্থান কম এবং আয় কম এই ভয়াবহ চক্রে ভারতের অর্থনীতি বর্তমানে আটকে গেছে।
ভারতে বসবাসরত সকল মুসলমানদেরকে নিয়ে একটি নতুন রাষ্ট্র সৃষ্টি করলে তা হবে জনসংখ্যার দিক দিয়ে বিশ্বের অষ্টম রাষ্ট্র। আবার ভারতে বসবাসরত দলিতদের নিয়ে বিশ্বে একটি নতুন রাষ্ট্র করলে তা হবে বিশ্বের সপ্তম রাষ্ট্র (জনসংখ্যায়) হবে। এই পরিস্থিতিতে এদেরকে বাদ দিয়ে যারা ভারত চালাতে চায় তাদের স্থান পাগলা গারদ ছাড়া অন্য কোথাও হতে পারে তা কেহ বিশ্বাস করতে পারে?
লেখক : কলামিস্ট