দেশ-দেশান্তর

ভারতের ইসলামী শিক্ষাকেন্দ্র ও রোহিঙ্গা প্রসঙ্গে

কাজি রশিদ উদ্দিন

28

ভারতে ধর্মীয় উগ্রপন্থীরা ইসলামী শিক্ষার কেন্দ্রগুলোকে নিশানা বানানো অনেক আগেই শুরু হয়ে গিয়েছে। মুসলিম পোর্সোনাল ল’কে সংরক্ষণ এবং ইসলামি শরিয়ার ধারা অব্যাহত রাখার বিশেষ ভ‚মিকা পালনকারী দ্বীনি মাদরাসা বা ধর্মীয় শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে ‘সন্ত্রাসের আস্তানা’ আখ্যা দিয়ে এগুলোকে বন্ধ করে দেয়ার দাবি আগে থেকেই সঙ্ঘ পরিবারের লোকেরা করে আসছে। কিন্তু এখন অল্প সংখ্যক মুসলিম নামধারী মহলও এ কাতারে শামিল হয়েছে যেরকম কিছু আওয়াজ বাংলাদেশেও দেখা গিয়েছিল এবং আর ততটা বলা হচ্ছে না। নিজের মামুলি রাজনৈতিক ফায়দার জন্য পুরো জাতিকে বদনামকারি ঈমান বিক্রেতা মুসলমানের সংখ্যা যদিও অনেক কম। কিন্তু বর্তমান ভারতিয় সরকারের আমলে তাদের গুরুত্ব হঠাৎ বেড়ে গিয়েছে। উত্তর প্রদেশের বেশকিছু উগ্রপন্থী হিন্দু নেতা সম্প্রতি ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ও ইউপির মুখ্যমন্ত্রী যোগী আদিত্য নাথকে পত্র লিখে দাবি করেছেন, মাদ্রাসাগুলোতে যেহেতু সন্ত্রাসের শিক্ষা দেয়া হয়, তাই এগুলো বন্ধ করে দিয়ে তার স্থানে কনভেন্ট স্কুল উচিত। তবে দুর্নীতির বিরুদ্ধে ভারতের সিবিআই এবং সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে এ জাতিয় অন্যান্য সংস্থা মাদ্রাসাগুলোর বিরুদ্ধে এ জাতিয় অভিযোগের কোনো ভিত্তি পায় নাই। (সূত্র : ইপিআই)
এ কথা বলার প্রয়োজন নেই যে, ভারতে ইসলামি মাদরাসাগুলো দ্বীনের দুর্গের মর্যাদা রাখে। মাদ্রাসাগুলোকে প্রতিষ্ঠা করতে উলামায়ে দ্বীন হাড় ক্ষয় করেছেন এবং নিজেদের কলিজার রক্ত ঝরিয়েছেন। আজ মাদ্রাসাগুলোকে ভারতে ইসলামের মাথা উঁচু করে রাখা ও টিকে থাকার সবচেয়ে বড় কেন্দ্র মনে করা হয়। ভারতের মুসলমানদের সব মতাদর্শের ধর্মীয় মাদ্রাসাগুলোর সমান গুরুত্ব রয়েছে। সবাইকে এর ধারাবাহিকতা টিকে থাকা ও উন্নতির জন্য ভাবতে দেখা যায়, ভারতে মাদ্রাসার অবদান অবিস্মরণীয়। ভারতের কয়েকটি ধর্মীয় মাদ্রাসা বিশ্ববিখ্যাত। ওগুলোর প্রতিষ্ঠাতা এবং শিক্ষা সমাপনকারী ছাত্ররা স্বাধীনতা যুদ্ধের আন্দোলনে অগ্রণী ভ‚মিকা পালন করে ইংরেজদের ভিত নাড়িয়ে দিয়েছিলেন। হাজার হাজার আলেমকে ফাঁসি দেয়া হয়। তাদের ‘কালাপানির শাস্তিও প্রদান করা হয়’। ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের পুরো ইতিহাস এ মাদ্রাসাগুলোর প্রতি ধর্মীয় মাদ্রাসাগুলো সর্বদা উন্নত চরিত্র ও শ্রেষ্ঠ মানবিক গুণাবলীর শিক্ষা দিয়েছে। যেখানে সাধারণ শিক্ষার কেন্দ্রগুলো চরিত্র গঠন ও আদর্শ থেকে দূরে। সেখানে এ মাদ্রাসাগুলোই তাদের শিক্ষার্থীদের সচ্চরিত্রবান ও আদর্শবান সঙ্ঘ পরিবারের মদদ পেয়ে মাদ্রাসাগুলোর দিকে অঙ্গুল তুলছে এবং কথিত সন্ত্রাসের সাথে সম্পৃক্ত করছে। ফলে পুরো জাতি আজ ক্ষুব্ধ। ইউপি হিন্দুত্ববাদি গ্রæপ গরু আর মাদ্রাসা নিয়ে ভারতের মারাত্বক খেলা শুরু করেছে। বিতর্কিত এসব পদক্ষেপে ভারতে চরম অস্থিরতা বিরাজ করছে বলেছেন ভারতের প্রখ্যাত মুসলিম নেতা মাসুম মুরাদাবাদী। উল্লেখ করা যায়, এবার ভারত সরকার মুসলিম পারিবারিক আইনে হস্তক্ষেপ করতে চাচ্ছে। তিন তালাক, গরু ও মসজিদ লাউডস্পিকারের মতো সমস্যাগুলোকে উদারতার সাথে সমঝোতার মাধ্যমে সমাধানের পদক্ষেপ গ্রহণ করা উচিত। যাতে সমস্যা আরো জটিল না হয়। ভারতের সবচেয়ে বড় রাজ্য উত্তর প্রদেশে যখন বিজেপি ক্ষমতায় ্এসেছে তখন থেকেই সেখানে মুসলমানদের জীবন-যাপন অসহনীয় হয়ে উঠেছে। প্রতিদিন নিত্য নতুন বাহানায় মুসলমান সংস্থা, মাদ্রাসা ও মক্তবগুলোকে কঠিন পরীক্ষায় ফেলা হচ্ছে। উদাহরণ স্বরূপ কয়েকদিন আগে ইউপির সংখ্যালঘু কল্যাণমন্ত্রী, ল²ীনারায়ণ চৌধুরী ঘোষণা করেছিলেন, রাজ্যের দুই হাজার ৩০০ মাদ্রাসা বন্ধ করে দেয়া হবে। কেননা তারা মাদ্রাসা বোর্ডকে বিস্তারিত তথ্য প্রদান করেনি। ওয়েবসাইটে বিস্তারিত তথ্য না দেয়ার অজুহাতে ওই সব মাদ্রাসাকে অস্তিত্বহীন হিসেবে অভিহিত করার প্রস্তুতি চলছে। যাতে এগুলো বন্ধ করে দেয়ার পথ সুগম হয়। উত্তর প্রদেশে ১৯ হাজার ১০৮টি মাদ্রাসা রয়েছে, তন্মধ্যে ১৬ হাজার ৮০৮টি মাদ্রাসা বোর্ডে নিবন্ধনকৃত এর আগে মাদ্রাসাগুলোতে জাতীয় উৎসবগুলোতে জাতীয় সঙ্গীত গাওয়া এবং তার ভিডিওগ্রাফি উপস্থাপন করা বাধ্যতামূলক করা হয়েছিল। এই নির্দেশ অমান্যকারী মাদ্রাসাগুলোকে আইনি হয়রানিও করা হয়। এখন মাদ্রাসাগুলোতে মুসলমানদের ধর্মীয় ছুটির সংখ্যা কমিয়ে দেয়া হচ্ছে। পক্ষান্তরে অন্য ধর্মের উৎসবগুলোতে মাদ্রাসা বন্ধ রাখতে জোর দেয়া হচ্ছে। কমিয়ে দেয়া হচ্ছে মাদ্রাসাগুলোর ঐচ্ছিক ছুটিও। যোগী সরকারের পক্ষ থেকে এ ধরনের পদক্ষেপ মাদ্রাসাগুলোকে হয়রানির উদ্দেশ্যে করা হচ্ছে। জানা যাচ্ছে না এরপর আরো কী দেখতে হবে ?
এবার প্রসঙ্গ পরিবর্তন ও রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন ইস্যু
বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের মধ্যে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন নিয়ে আলোচনার পর রোহিঙ্গাদের মিয়মানমারে ফেরত পাঠানোর প্রক্রিয়া কথা বলা হয়েছিল। কিন্তু নিজ দেশে ফেরত যাওয়ার ব্যাপারে রোহিঙ্গারা এখনো শংকার মধ্যে রয়েছে। নিপীড়নের মুখে চলে আসা রোহিঙ্গারা সেখানে কতটা নিরাপদে থাকতে পারবে তা নিয়ে আন্তর্জাতিক মহল থেকে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। মানবাধিকার সংস্থা ও সাহায্য সংস্থাগুলো বলছে, রোহিঙ্গারা ফিরে গিয়ে কতটা স্বাধীনভাবে চলাচল করতে পারবে তা নিয়ে সংশয় রয়েছে। ইতোমধ্যে বাংলাদেশে রোহিঙ্গাশিবিরে অবস্থানরত রাখাইনের প্রায় ৪০টি গ্রামের প্রতিনিধিরা ফিরে যাওয়ার ব্যাপারে কিছু শর্তের কথা জানিয়েছেন এর মধ্যে রয়েছে তাদের ফেরত নেয়ার পর মিয়ানমারের নাগরিকত্ব প্রদান। বসতবাড়ি ও চাষাবাদের জমি ফেরত দেয়া এবং সামরিক অভিযান বন্ধ করা।
শরণার্থী হয়ে মিয়ানমারের নাগরিকদের রাখাইনে ফেরত যাওয়ার ক্ষেত্রে এসব দাবি অত্যন্ত যৌক্তিক। আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে খবর এসেছে রোহিঙ্গাদের ফেরত নিয়ে মিয়ানমার সরকার তাদের বিভিন্ন ক্যাম্পে আটকে রাখবে। এখনো কয়েক হাজার রোহিঙ্গাকে খোলা আকাশের নিচে এমন কারাগারে রাখা হয়েছে। স্বাভাবিকভাবে রোহিঙ্গারা এক উদ্বাস্তু শিবির থেকে আরেক উদ্বাস্তুশিবিরে যেতে চাইবে না। রোহিঙ্গা নেতারা দাবি করছেন। জাতিসংঘের তত্ববধানে একটি নিরাপদ আশ্রয়কেন্দ্র গড়ে তুলে তাদের ফেরত নেয়া হোক। একইভাবে তাদের বসতবাড়ি ফেরত দেয়া হোক। আসলে নাগরিক অধিকার না পেলে রোহিঙ্গারা মিয়ানমারে গিয়েও উদ্বাস্তুর জীবনযাপন করবে। এছাড়া সেনা অভিযান অব্যাহত থাকলে রোহিঙ্গারা বিশেষ করে তরুণেরা ঝুকির মধ্যে পড়বে আর অল্পবয়সি যুবতি মেয়েদের পরিণাম যে কি অবস্থায় পড়তে পারে তা না হয় আর নাই বললাম। মিয়ানমার সেনাবাহিনী যে নিরীহ তরুণদের হত্যা করেছে ও তরুনিদের ধর্ষণ করেছে তার যথেষ্ট তথ্য প্রমাণ রয়েছে। সম্প্রতি ১০ নিরীহ রোহিঙ্গা তরুণকে হত্যার কথা স্বীকার করেছে দেশটির সেনাবাহিনী।
এমন পরিস্থিতিতে নিরাপত্তা নিশ্চিত করে রাখাইনে পাঠাতে হবে। এক্ষেত্রে প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়ায় আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে সম্পৃক্ত করার কোন বিকল্প নেই। বাংলাদেশের উচিত রোহিঙ্গাদের ফেরত পাঠানোর ব্যাপারে দু’দেশের মধ্যে যে ঐকমত্য হয়েছে বলে বলা হচ্ছে তার পরিধি আরো বাড়ানো। এই প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া কতদিন, মাস বা বছর ধরে চলবে তা এখনও বলার সময় আসে নাই। ফলে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে সম্পৃক্ত করার যথেষ্ট সুযোগ রয়েছে। আমাদের মনে রাখতে হবে এর আগেও বেশকিছু রোহিঙ্গাকে ফেরত পাঠানো হয়েছিল। তাদের অনেকে আবার ফিরে এসেছে। মোট কথা হলো মিয়ানমারের নাগরিক হিসেবে সুযোগ-সুবিধা দেয়ার মাধ্যমে কেবল রোহিঙ্গা সমস্যার স্থায়ী সমাধান হতে পারে ও সম্ভব। এই প্রসঙ্গ এখানেই শেষ।
এবার ২০ ফেব্রিয়ারি মঙ্গলবার আমার একটি লেখার শিরোনাম ‘আসাম যেন আরেক মিয়ানমার না হয়’ ছাপা হয়েছিল। গত ২৪ ফেব্রুয়ারি, শনিবার ঢাকার দৈনিক নয়া দিগন্ত পত্রিকায় প্রথম পৃষ্ঠায় তিনজন বিশিষ্ট ব্যক্তিদের একটি খবর বেরিয়েছে, যার শিরোনাম হলো, ‘আসামের বাংলাভাষিদের ঠেলে দেয়ার শঙ্কা। ভারতের সেনা প্রদানের বক্তব্যের প্রতিক্রিয়া।
এই তিন জন ব্যক্তি হলো এম শাহীদুজ্জামান, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্র বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক, আলম ফজলুর রহমান প্রাক্তন বিডিআর প্রধান এবং প্রাক্তন নির্বাচন কমিশন সদস্য ও প্রাক্তন ব্রিগেডিয়ার জেনারেল, সেনাবাহিনী এম সাখাওয়াত হোসেন।
চীন ও পাকিস্তানের সাহায্য নিয়ে উত্তর-পূর্ব ভারতে বাংলাদেশিরা অনুপ্রবেশ করছে বলে ভারতের সেনাপ্রদান জেনারেল বিপিন রাওয়াতের মন্তব্যকে অত্যন্ত উদ্বেগজনক বলে মনে করেন বাংলাদেশের নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা। এর মাধ্যমে বাংলাদেশের ওপর মনস্তাত্বিক চাপ সৃষ্টির চেষ্টা করা হচ্ছে বলে মনে করেন তারা ‘রোহিঙ্গাদের মতো আসামের বাংলাভাষি মুসলমান নাগরিকদের জোর করে বাংলাদেশে ঠেলে দেয়ার দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ভারতের থাকতে পারে বলে শঙ্কা প্রকাশ করছেন।
এখানে খবর পাওয়া যাচ্ছে যে ভারতের আসাম রাজ্য সরকার সেখানকার বৈধ নাগরিকদের একটি তালিকা প্রকাশ করেছে, যে তালিকায় প্রায় দেড় কোটি বাসিন্দার নাম নেই। তাদের প্রায় সবাই মুসলিম। এদিকে আসামজুড়ে গভীর আতঙ্ক বিরাজ করছে। তালিকায় যাদের নাম নেই তাদেরকে বের করে দেয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে আসাম সরকার। তবে কেবল এ রাজ্যটি নয়, গোটা ভারতজুড়েই তথাকথিত ‘রাষ্ট্রবিহীন’ লাখ লাখ মানুষের তালিকা করা হচ্ছে বলে হুমকি আসছে নানা মহল থেকে।
বিশ্বখ্যাত ব্রিটিশ দৈনিক দ্য গার্ডিয়ান এক প্রতিবেদনে এ তথ্য তুলে ধরেছে। বাংলাদেশকে এসব খবরে উদ্বিগ্ন হবারই কথা। এসব ব্যাপারে আমাদের করনিয় সম্বন্ধে চিন্তা-ভাবনা করা অতি জরুরি বলে অভিজ্ঞ মহল মনে করেন।

লেখক : সাংবাদিক ও কলামিস্ট