ভারতীয় শাসনতন্ত্রে ৩৭০ অনুচ্ছেদ বাতিল কেন?

শাহাবুদ্দীন খালেদ চৌধুরী

26

সদ্য স্বাধীন পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠাতা মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর ফুসফুস মারাত্মকভাবে রোগাক্রান্ত। ডাক্তারের পরামর্শ কিছুদিন তাঁকে কোন স্বাস্থ্যকর স্থানে বিশ্রাম নিতে হবে। ১৯৪৭ সালের ২৪ আগস্ট তাঁর ব্রিটিশ সেক্রেটারি উইলিয়াম বার্ণীকে ডাক্তারের পরামর্শের কথা বললেন এবং সেপ্টেম্বর মাসেই কাশ্মীরে কিছুদিন বিশ্রামের জন্য যথাযথ কর্তৃপক্ষের সাথে আলোচনা করে তাঁর কাশ্মীর যাওয়ার দিনক্ষণ ঠিক করতে আদেশ দেন। কাশ্মীরের চারভাগের তিনভাগ মুসলিম অধ্যুষিত এলাকা হওয়ায় স্বভাবতঃ কাশ্মীর পাকিস্তানে যোগ দেওয়ার ব্যাপারে মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ প্রায় সুনিশ্চিত ছিলেন। এদিকে পাঁচ দিন পর জিন্নাহ সাহেবের ব্রিটিশ সেক্রেটারিকে কাশ্মীরের মহারাজা হরিসিং এর অফিস থেকে জিন্নাহ সাহেবের কাশ্মীর সফরের অনুমতি দেওয়ার অপারগতা জানিয়ে দেওয়া হলো। খবর শুনে জিন্নাহ সাহেব কিংকর্তব্যবিমূঢ়। প্রথম বারের মতো তিনি বুঝতে পারলেন কাশ্মীরে পাকিস্তানের অবস্থা নড়বড়ে। কাশ্মীরের মহারাজা হরিসিং কিছুতেই কাশ্মীরকে পাকিস্তানের সাথে এক হতে দেবেন না। পাকিস্তানের তদানীন্তন প্রধানমন্ত্রী লিয়াকত আলী খাঁন এই প্রতিকূল পরিস্থিতিতে করণীয় নির্ধারণ করতে জরুরি সভার আয়োজন করেন। ঐ উচ্চ পর্যায়ের সভায় সিদ্ধান্ত হয় কাশ্মীরকে পাকিস্তানের সাথে একীভূত করার জন্য জরুরি ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। অন্যথায় কাশ্মীর অচিরেই ভারতের নিয়ন্ত্রণে চলে যাবে। তবে কোন অবস্থাতেই কাশ্মীর দখলের যুদ্ধে পাকিস্তানি সেনা বাহিনীকে ব্যবহার করা যাবে না।
প্রধানমন্ত্রী লিয়াকত আলী খাঁনের সভাপতিত্বে এই সভার ৩ দিন পর এক অবসরপ্রাপ্ত সেনা অফিসার খুরশীদ আনোয়ারকে কাশ্মীর দখলের অভিযানের নেতৃত্বে নিয়োগ দেওয়া হয়। তিনি অতিদ্রæত গোত্র সর্দারদের সভা আহŸান করেন এবং তাদেরকে বুঝাতে সক্ষম হন দ্রæত গতিতে কাশ্মীরের দখলের ব্যবস্থা না করলে তা নিঃসন্দেহে ভারতের দখলে চলে যাবে। ভ্রাতৃপ্রতিম কাশ্মীরীদের পক্ষে জেহাদ শুরু করার জন্য নির্ধারিত স্থানে সংঘবদ্ধ হতে লাগল মুজাহিদ বাহিনী। মুজাহিদরা তাদের মুসলমান ভ্রাতৃবৃন্দের উপর হিন্দুদের অন্যায় আচরণের সমুচিত জওয়াব দেওয়ার দৃঢ় শপথগ্রহণ করল। কাশ্মীরের মহারাজা হরি-সিং এর সেনাবাহিনীতে যেসব মুসলমান সৈন্য ছিল তারা একসাথে বিদ্রোহ ঘোষণা করল এবং তাদের সেনাবাহিনীতে যেসব হিন্দু অফিসার ছিল তাদের হত্যাযজ্ঞ শেষ করল। শ্রী-নগরের সাথে টেলিফোন লাইন বিচ্ছিন্ন করে দেওয়া হল। তারা প্রথম আক্রমণেই কাশ্মীরের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শহর মোজাফরাবাদ দখল করে নিল, যেখান থেকে কাশ্মীরের রাজধানী শ্রী-নগরের দূরত্ব মাত্র ১৩৫ মাইল। শ্রী-নগর পর্যন্ত বিস্তৃত রাস্তায় কোন সেনাবাহিনীর টহল ছিল না। বলতে গেলে কোন পাহারাই ছিলনা। কিন্তু পাঠানেরা অরক্ষিত শ্রী-নগরের দখলের কথা চিন্তায় না এনে নিজেদেরকে লুটপাটে নিয়োগ করল। পাঠানদের লুটপাটে ব্যস্ততার সুযোগ নিয়ে মহারাজা হরিসিং কালবিলম্ব না করে ভারতের সাথে অক্টোবরের ৬ তারিখ (১৯৪৭ সালে) কাশ্মীরের ভারতভুক্তির চুক্তির সই করেন। ভারত তখনই তড়িৎগতিতে ১,০০,০০০ (১ লক্ষ) সেনা কাশ্মীরের নিরাপত্তায় নিয়োজিত করে। তখন থেকেই কাশ্মীরের মোজাফরাবাদসহ কিছু অংশ পাকিস্তানের দখলে রয়েছে যাকে পাকিস্তান আজাদ কাশ্মীর নামে আখ্যায়িত করে। বাকী কাশ্মীরের সিংহভাগ ভারতের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।
যাই হউক, ১৯৪৯ সালে ভারতের শাসনতন্ত্রে ৩৭০ ধারা এবং ৩৫-এ ধারা সংযোজন করে কাশ্মীরকে স্বায়ত্ত শাসনের মর্যাদা দেওয়া হয়। যেমন ভারতের বাকী প্রত্যেকটা রাজ্যের বিধান সভার মেয়াদকাল ৫ বৎসর কিন্তু কাশ্মীরের বিধান সভার মেয়াদ কাল ৬ বৎসর দেওয়া হয়েছে। পর-রাষ্ট্র এবং প্রতিরক্ষাসহ দু’একটা বিষয় ছাড়া সরকারের অন্যান্য বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ব্যাপারে শাসনতন্ত্রে কাশ্মীর সরকারকে স্বাধীনতা দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু বর্তমানে ঐসব শাসনতান্ত্রিক ধারা বাতিল করে এবং কাশ্মীর রাজ্যকে দু’ভাবে বিভক্ত করে দিল্লীর কেন্দ্রীয় শাসনের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসা হয়েছে। শাসনতন্ত্রে এই সংশোধনকে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী “কাশ্মীরীদের বন্ধন-মুক্তি” বলে অভিহিত করেছেন। কাশ্মীরের প্রত্যেক দলের নেতৃবৃন্দ ইহার তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছেন। ইতিমধ্যেই কাশ্মীরের রাজনৈতিক দলগুলির প্রত্যেকটা উল্লেখযোগ্য নেতাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। বর্তমানে যেহেতু বিধান সভা নেই, সেজন্য গভর্নরের শাসন চলছে। এই পরিস্থিতিতে কাশ্মীরের বিধান সভার অনুমোদন ছাড়া ৩৭০ ধারা এবং ৩৫ এ ধারা লোক সভায় বাতিল করা যায় কিনা তা নিয়েই বিরাট প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। ইতিমধ্যেই কেন্দ্রীয় সরকারের সিদ্ধান্তকে আপত্তি জানিয়ে সুপ্রীম কোর্টে মামলা করা হয়েছে। সুপ্রীম কোর্ট রোলও জারি করেছেন। ১৯৫৯ সাল থেকে প্রায় চার দফা ৩৭০ ধারা বাতিল চেয়ে ভারতীয় সুপ্রিম কোর্টে রিট হয়েছে কিন্তু প্রত্যেকবার সুপ্রিম কোর্ট ৩৭০ ধারা অলঙ্ঘনীয় বলে রায় দিয়েছেন। কাশ্মীরের উন্নয়নে ৩৭ ধারা একটি বাঁধা বলে নরেন্দ্র মোদী তাঁর বক্তব্যে ইদানীং উল্লেখ করেছেন। নরেন্দ্র মোদীর বক্তব্যটি সঠিক নয়। কারণ বর্তমানে ভারতের ১৮টি রাজ্যে কাশ্মীরেরও বর্তমান দারিদ্র্যসীমার অনেক নিচে অবস্থান করছে। ঐ সব রাজ্যে দারিদ্র্যের হার ১০.৩৫ শতাংশ যা ভারতের গড়পড়তা দারিদ্র্যতার অনেক উপরে।
আসলে যে কারণে বিজেপি শাসনতন্ত্রে ৩৭০ এবং ৩৫ এ ধারা বাতিল করতে চায় তা হলো পার্টির মূল আদর্শ ‘হিন্দুত্ববাদ’ কায়েম করা। ২০১৯ সালের নির্বাচনের সময় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্রমোদী এবং বিজেপি প্রধান অমিত শাহ প্রকাশ্যে ঘোষণা দিয়েছিলেন যে তাঁরা আবার নির্বাচিত হলে ৩৭০ এবং ৩৫ বাতিল করবেন। গত নির্বাচনে এব্যাপারে তারা কোন রাখঢাকের আশ্রয় নেন নাই। যারাই বিজেপির মূল উদ্দেশ্য সম্পর্কে জ্ঞান রাখেন তারা সবাই জানেন, উনাদের আসল উদ্দেশ্য হলো সারা ভারতবর্ষকে সমপ্রকৃতিতে (ঐড়সড়মবহবড়ঁং) রূপ দেয়া যা করতে হলে সারা ভারতে ‘হিন্দুত্ববাদ’ কায়েমের কোন বিকল্প নেই। কাজেই বিজেপি তাঁদের মৌলিক কর্মসূচি বাস্তবায়ন করতে হলে ৩৭০ এবং ৩৫ এ ধারা বাতিল করার কোন বিকল্প তাঁদের সামনে নাই। নরেন্দ্রমোদীর ক্ষমতায় আসার পর থেকে ‘গো রক্ষা কর্মসূচি’ ‘জয় শ্রী রাম’ এবং এন. আর. সির. নামে আসামে মুসলমানদের জাতীয় নাগরিকত্ব কেড়ে নেওয়া সবই একই সূত্রে গাঁথা। সবই বিজেপির উগ্র জাতীয়তাবাদ ভিত্তিক কর্মসূচি বাস্তবায়ন ছাড়া অন্য কিছু নয়। ‘দেশপ্রেমিক ভারতীয়’ এবং দেশদ্রোহী ভারতীয়কে অনেক আগেই আর. এস. এস. ঠিক করে রেখেছে, কাশ্মীরেই সে নাটক শেষ করা হবে। এই নাটক শেষ হবে শুধু ভারতের সমরূপ বা (ঐড়সড়মবহবড়ঁং) রূপ আসার পর। এই যুদ্ধ ভারতের স্বাধীনতার স্থপতিদের বিরুদ্ধেও; কারণ তাঁরা ‘বহুত্বের মধ্যে ঐক্য’ বা টহরঃু রহ উরাবৎংরঃু সৃষ্টি করার জন্য আজীবন সংগ্রাম করেছেন, বৎসরের পর বৎসর জেল কেটেছেন, অনেকের জীবন প্রদীপ ফাঁসির মঞ্চে নিভেছে। অনেকেই সারা জীবন জেল কেটে লাশ হিসেবে জেল থেকে বের হয়েছেন। বর্তমানে ভারতীয় কংগ্রেসের অবস্থাও শোচনীয়। কারণ সে কালের ভারতের রতœগুলি আর কোথাও নেই। রাহুল গান্ধীর পদত্যাগের পর কংগ্রেসে নেতৃত্ব শূন্যতা দেখা দিয়েছে। এই পরিস্থিতিতে বি.জে.পি বিরোধী দলে বিরাট বিভক্তি ঘটাতে সক্ষম হয়। ফলে আম-আদমী পার্টি (এ.এ.পি.), বহুজন সমাজপার্টি (বি.এস.বি.), বিজু জনতা দল, টেলেগু দেশাম পার্টি সহ আরও দু’একটা ছোট দল বর্তমান কাশ্মীর ইস্যুতে সমর্থন জানায় বিজেপিকে। এমন কি কংগ্রেসের লোকসভা সদস্য সিন্ধিয়াও বিজেপিকে এই ব্যাপারে নিজের ভোট দিয়ে সমর্থন জানিয়েছেন।
যাই হউক, বিজেপি তাঁদের হিন্দুত্ব নীতি নিয়ে এগিয়ে চলার জন্য দৃঢ়ভাবে সংকল্প নিয়েছে। ভারতের স্থপতিরা বারবার বলেছেন ভারতের ঐক্য বহুত্বের মধ্যে খুঁজতে হবে। নরেন্দ্র মোদীর নেতৃত্বে বর্তমান বিজেপি মহাত্মা গান্ধীসহ ভারতের সব স্থপতিদের গড়া বহুত্ববাদকে চ্যালেঞ্জ দিয়েছেন। বহুত্ববাদ না হলে ভারতের কি দশা হবে তাঁদের উদ্ধৃতি দিয়ে চেষ্টা করবো পরে লিখতে।
লেখক : কলামিস্ট