বোধ

ইসলাম তরিক

7

ভাদ্র মাস। প্রচন্ড গরম। গাছের পাতা একটুও নড়ছে না। ভাপসা গরমে জনপ্রাণ অতিষ্ঠ হয়ে ওঠেছে। ঘামে তরতর করে ভিজে যাচ্ছে শরীর। সারাদিন তীব্র রোদের শেষে সন্ধ্যায় রোদের তেজ কম হলেও কমেনি গরমের তেজ। এই তীব্র গরমের মধ্যেই মজিদ মাস্টার ধান ক্ষেতে কিটনাশক ছিটানোর জন্য রওনা হলেন। বাইরে গরম তুলনামূলক কম হলেও ধান ক্ষেতে গরমের প্রকট অনেক বেশি। মজিদ মাস্টার কিটনাশক পানিতে মিশিয়ে কন্টিনিয়ার ভর্তি করলেন। তারপর কন্টিনিয়ার ঘাড়ে ঝুলিয়ে, কিটনাশক এক্সপ্রে করা শুরু করলেন। বাম হাতে মেশিন পাম্প করছেন আর ডান হাতে নল ধরে তিনি ধানে কিটনাশক এক্সপ্রে করছেন। গরমে তাঁর শরীর থেকে তরতর করে ঘাম ঝরে পড়ছে। সেদিকে তাঁর কোনো ভ্রæক্ষেপ নেই। মনের আনন্দে দেখেশুনে, খুব সূক্ষ্যভাবে তিনি প্রতিটি ধানের মাথায় এক্সপ্রে করে চলছেন। নিজের সন্তানকে তিনি যতটুকু ভালোবাসেন, ঠিক ততটুকু ভালোবাসা আর মমতা দিয়ে তিনি ফসল ফলান।
চারদিক থেকে মাগরিবের আযান ভেসে আসছে। সবাই মাঠ থেকে ঘরে ফিরছে। মজিদ মাস্টারও দ্রæত ঘরে ফেরার জন্য তাড়াহুড়ো করছেন, কিন্তু এক্সপ্রে করা শেষ হচ্ছে না তাঁর। গোধূলি লগ্নে কাজ করতে মজিদ মাস্টারের মন্দ লাগে না। কিন্তু লোকে কী ভাববে? তাই তিনি লোক ভয়ে আশেপাশে তাকালেন। কেউ আছে কিনা তা দেখে নিলেন। নাহ্ কেউ নেই। তিনি আপন মনে আবার এক্সপ্রে করতে লাগলেন। হঠাৎ দূরের একটি জমি থেকে রমজান মেম্বার চিৎকার করে ডাকে ওঠলেন,
– মাস্টার…অ…মাস্টার…। সন্ধ্যা ঘনিয়ে এলো বাড়ি যাবেন না?
রমজান মেম্বারের কণ্ঠ শুনে মজিদ মাস্টার বিব্রত বোধ করলেন। এই লোকটি বড্ড বেয়াদব! মুখে যা আসে তা বলে মানুষকে অপমান করে। তার কথার জবাব দিতে ইচ্ছে করছে না মজিদ মাস্টারের। তবুও মানবতার খ্যাতিরে তিনি জবাব দিলেন,
– হ্যাঁ, যাবো। কন্টিনিয়ারের ঔষধটুকু শেষ হলেই চলে যাবো ভাই।
রমজান মেম্বার একসময় মজিদ মাস্টারের জমির কাছে এসে বললেন,
– মাস্টার জীবনে অনেক গতর খাটলেন। চাকরির পাশাপাশি দিনরাত পরিশ্রম করে অনেক জমাজমি করলেন। কিন্তু এতসব করে কী লাভ বলেন? নিজে সারাজীবন মাস্টারি করলেন। আর ছেলের জন্য কী করলেন? একটি মাত্র ছেলে আপনার তাকে তো শিক্ষিত করতে পারলেন না। খরচের ভয়ে ছেলেকে পড়াশোনা করাচ্ছেন না? নাকি তাকেও আপনার মতো পাক্কা চাষী বানাবেন?
রমজান মেম্বারের কথা শুনে মজিদ মাস্টার এবার রেগে গেলেন। তিনি র্ককশ স্বরে বললেন,
-ছেলে যখন আমার তখন চিন্তাটাও আমার। আমার ছেলেকে নিয়ে তোমাকে ভাবতে হবে না। তুমি যাও তো যাও তো এখান থেকে। কাজে ব্যঘাত ঘটাও না।

রমজান মেম্বার চলে গেল। মজিদ মাস্টার আপন মনে আবার এক্সপ্রে কারা শুরু করলেন। কিছুক্ষণ এক্সপ্রে করার পর মজিদ মাস্টার থোমকে দাঁড়ালেন। রমজান মেম্বারের কথাটি কান থেকে মজিদ মাস্টারের হৃদয়ে তীরের মতো বিগ্ধ হলো। তিনি এক্সপ্রে করা বন্ধ করলেন। জমির আইলে বসে মাথায় হাত দিয়ে ভাবতে লাগলেন। সত্যিই তো রমজান মেম্বার মন্দ বলেনি। জীবনের শেষ প্রান্তে এসেও একটি অল্প শিক্ষিত লোকের মুখে এমন উপদেশ শুনতে হবে এমনটি তিনি কখনো আশা করেননি। তিনি একটু কৃপণ স্বভাবের । খরচের জন্য সবসময় একটু ভয় করলেও, নিজের সন্তানের এমন ক্ষতি তিনি চান না। চাকরির সুবাদে তিনি সারাজীবন অন্যের ছেলেমেয়েকে শিক্ষাদান করেছেন। কিন্তু তিনি কোনো দিনই ভাবেননি নিজের ছেলের কথা। স্কুল শেষ করে তিনি অজানা এক নেশায় ছুটে এসেছেন ফসলের মাঠে। জমা-জমিতে তিনি যতটা সময় ব্যয় করেছেন, তার এক চতুরাংশ সময় যদি তিনি একটি মাত্র সন্তানের পেছনে ব্যয় করতেন, তাহলে ছেলেটা আজ উচ্চ শিক্ষিত হয়ে যেত। তাঁর সঙ্গে চাকরি করা অনেক মাস্টারের ছেলেমেয়েই আজ প্রতিষ্ঠিত। কেউ ভালো চাকরি করছে। কেউবা ভার্সিটিতে পড়ছে। কিন্তু তাঁর ছেলে?
ছেলের কোনো দোষ নেই। সে পড়ালেখা করতে চায়। কিন্তু খরচের ভয়ে তিনি সেদিকে তেমন গুরুত্ব দেন না। কিন্তু এই কৃপণতা করে কী লাভ? কার জন্য সে এই জমা-জমিগুলো কিনছেন? নাহ্ তিনি আর ভাবতে পারছেন না।
অন্ধকার নেমে এসেছে চারদিক। কিটনাশকের কন্টিনিয়ার ঘাড়ে নিয়ে ঢুলতে ঢুলতে মজিদ মাস্টার বাড়িতে এলেন। বাড়িতে এসেই ছেলেকে ডাক দেন।
– আব্দুল মালেক…।
আব্দুল মালেক দৌঁড়ে এসে বলে,
– হ্যাঁ বাবা, বলো?
– সন্ধ্যায় পড়তে বসোনি বাবা?
হঠাৎ বাবার মুখে লেখাপড়ার কথা শুনে ছেলে আব্দুল মালেক ঘাবড়ে যায়। কী উত্তর দেবে তার কোনো ভাষা খুঁজে পেল না। কিন্তু ছেলের পাশে দাঁড়িয়ে থাকা স্ত্রী আলেয়া বেগম ভেঙচি কেটে বলল,
-মাস্টার তোমার মাথা কি ঠিক আছে? ইদানিং তুমি কী সব আজেবাজে বকতে শুরু করেছ? জানো না ছেলে পড়ালেখা ছেড়ে দিয়েছে?
মজিদ মাস্টার আমতা আমতা করতে করতে বললেন,
– না মানে এমনিতেই জিজ্ঞাসা করলাম আর কী।
– যাও হাত মুখ ধুয়ে আসো খাবার দেবো।
মজিদ মাস্টার স্ত্রীকে দেখে একটু ভয় পান। মহিলাটি অল্প কথাতেই রেগে যায়। কথা বাড়ালে আবার কী থেকে কী যে ঘটে যায় তা বলা মুশকিল। তাই তিনি আর কথা বাড়ালেন না।
মজিদ মাস্টার স্ত্রীর কথায় বাধ্য ছেলের মতো হাত মুখ ধুয়ে রাতের খাবার খেয়ে শুয়ে পড়লেন। কিন্তু আজ অন্যান্য দিনের মতো শুয়ে পড়ার সঙ্গে সঙ্গে তাঁর চোখে ঘুম আসে না। এপাশ ওপাশ করতে থাকে তিনি। স্ত্রীর ধমকে তিনি নড়াচড়াও বন্ধ করে দিলেন। রাত ১টা বেজে গেল। তবুও মজিদ মাস্টারের চোখে ঘুম নেই। রমজান মেম্বারের কথাটি তাঁর কানে বারবার ভেসে আসছে। নিজেকে আজ বড্ড অপরাধী মনে হচ্ছে তাঁর। নিজের শিক্ষা-দীক্ষা নিয়েও তাঁর সংশয় হচ্ছে। কী শিখলেন জীবনে? নিজে উচ্চ শিক্ষা গ্রহণ করেছেন। কিন্তু তাঁর সন্তান? যতবার তিনি নিজের বিবেকের কাছে প্রশ্নগুলো করছেন, ততবারই তিনি বিবেকের কাছে হেরে যাচ্ছেন। স্ত্রীর সঙ্গে কথাগুলো শেয়ার করলে হয়তো তিনি একটু শান্তি পেতেন। কিন্তু স্ত্রীকে এত রাতে জাগানো কি ঠিক হবে? তাছাড়া এসব কথা শুনলে এই মধ্যরাতে আলেয়া বেগম ক্ষেপে গিয়ে তুলকাম কাÐ ঘটাতে পারেন। নাহ্ ওকে এসব বলার দরকার নেই। ছেলে লেখাপড়া ছেড়ে দিয়েছে তো কী হয়েছে? আগামীকাল থেকে সে আবার কলেজে যাবে। তাকে পড়াশোনা করাতেই হবে। যত টাকাই খরচ হোক ছেলেকে উচ্চ শিক্ষিত করে তুলতেই হবে। দৃঢ় প্রতিজ্ঞা নিয়ে মজিদ মাস্টার ঘুমানোর চেষ্টা করলেন।