বেড়ে চলেছে রোহিঙ্গা দুর্ভোগে স্থানীয়রা

শফিক আজাদ, উখিয়া

31

মিয়ানমার সেনাবাহিনী ও বর্ডার গার্ড পুলিশ (বিজিপি) এবং রাখাইন উগ্রবাদীদের হাতে নির্যাতনের শিকার লাখ লাখ রোহিঙ্গা নাফ নদী, উঁচুপাহাড় আর বনজঙ্গল পেরিয়ে আশ্রয় নিয়েছে বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্তের এপারের উখিয়া-টেকনাফের পাহাড়ি বনে-জঙ্গলে।

গত আগস্ট থেকে আজ পর্যন্ত রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশ বন্ধ হয়নি। সরকার এসব রোহিঙ্গাদের মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে আশ্রয় দিলেও রোহিঙ্গার সংখ্যা বাড়ার কারণে বাড়ছে উখিয়া-টেকনাফবাসীর দীর্ঘশ^াস।

একাধিক সূত্রে জানা গেছে, জীবন বাঁচাতে এক কাপড়ে বাংলাদেশে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গারা দিন কাটাচ্ছেন নানা দুর্দশায়। সরকারি ও আন্তর্জাতিক সংস্থার সাথে পাল্লা দিয়ে ত্রাণ তৎপরতা চালিয়ে যাচ্ছে সারা দেশের মানুষ। রোহিঙ্গাদের চিকিৎসায় স্থাপন করা হয়েছে অনেকগুলো মেডিকেল ক্যাম্প। বিপুল সংখ্যক রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশের কারণে সবচেয়ে বেশি চাপের মধ্যে পড়েছে উখিয়া-টেকনাফের স্থানীয় বাসিন্দারা।

নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্য, যাতায়াত, চিকিৎসাসহ নানামুখি ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন তারা। মানবিকতার স্বার্থে ভোগান্তি সহ্য করলেও এসব বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বিশেষ পদক্ষেপ চেয়েছেন স্থানীয়রা।

রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোতে ত্রাণ তৎপরতা চালাতে প্রতিদিনই উখিয়া-টেকনাফে ভিড় করছেন সারাদেশ থেকে আসা প্রচুর মানুষ। ত্রাণ দেয়ার পাশাপাশি অনেকেই আসছেন তাদের দুঃখ-দুর্দশা নিজের চোখে দেখতে। তাদের বেশিরভাগই কয়েকদিন অবস্থান করছেন সেখানে। বাইরের লোকজনের জন্য কক্সবাজার-টেকনাফ সড়কে দেখা দিয়েছে পরিবহন সংকট। রাস্তায় দীর্ঘক্ষণ অপেক্ষা করেও যানবাহন মিলছে না স্থানীয়দের। পরিবহন সংকটের সাথে পাল্লা দিয়ে বেড়েছে ভাড়া।

কক্সবাজার থেকে উখিয়া পর্যন্ত অটোরিকশকা ভাড়া ৭০ টাকা থেকে বেড়ে হয়েছে ১২০টাকা। উখিয়া থেকে কুতুপালং রোহিঙ্গা ক্যাম্পের যে ভাড়া ১০টাকা ছিল এখন তা ৩০টাকা। সেই সঙ্গে বেড়েছে বাস ভাড়াও। বিগত এক মাস ধরে এভাবেই স্থানীয়দের যাতায়াতে গুণতে হচ্ছে অতিরিক্ত ভাড়া।

অন্যদিকে রোহিঙ্গা ইস্যুর পর দক্ষিণ চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারের স্থানীয় বাসিন্দাদের ঢাকা যাতায়াতে তৈরি হয়েছে নতুন সংকট। হিমশিম খেতে হচ্ছে বাসের টিকিট যোগাড়ে।

এছাড়া কক্সবাজার থেকে ঢাকা-চট্টগ্রাম যাতায়াতে স্থানীয়দেরও প্রতিটি চেক পোস্টে দেখাতে হচ্ছে জাতীয় পরিচয়পত্র। এ নিয়ে অনেকেই পড়ছেন বিব্রতকর পরিস্থিতিতে।

অন্যদিকে কক্সবাজার-টেকনাফে সড়কটি এমনিতেই আঁকাবাঁকা। ত্রাণ তৎপরতায় নিয়োজিত প্রচুর ট্রাক, বাস ও প্রাইভেট গাড়ির কারণে চাপ বেড়ে গেছে এ সড়কে। তার ওপর প্রতিদিনই উখিয়া-টেকনাফের রোহিঙ্গা ক্যাম্প পরিদর্শনে আসছেন সরকারের মন্ত্রীসহ দেশি-বিদেশি গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিবর্গ। তাদের প্রটোকলের কারণে সে চাপ আরও বাড়ছে। ফলে যানজট লেগে থাকছে দীর্ঘসময়। নষ্ট হচ্ছে প্রচুর কর্মঘণ্টা।

উখিয়া-টেকনাফের স্থানীয় বাসিন্দাদের সংখ্যা চার লাখের কাছাকাছি। বিগত বছরগুলোতে আরাকান থেকে পালিয়ে এসে ক্যাম্পে আশ্রয় নেয়া রোহিঙ্গাদের সংখ্যা ছিল আানুমানিক সোয়া দুইলাখ। এ পরিমান লোকজনের নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিস-পত্রের যোগান দিতেই হিমশিম খেতো স্থানীয় বাজারগুলো।

চলতি বছরের ২৫ আগস্ট আরাকানে মিয়ানমার সেনাবাহিনীর অভিযানের পর গত একমাসেই জীবন বাঁচাতে বাংলাদেশে অনুপ্রবেশ করেছে প্রায় সাড়ে ১০ লাখ রোহিঙ্গা। জাতিসংঘের হিসেবে সংখ্যাটা ৫ লাখ ৮২ হাজার হলেও বিশ্লেষকদের মতে এ সংখ্যা ১০ লাখের নিচে নয়।

এ বিপুল পরিমান লোকের নিত্যপ্রয়োজনীয় চাহিদা মেটাতে পারছে না স্থানীয় বাজারগুলো। ফলে উখিয়া-টেকনাফে নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের দাম বেড়েছে দুই থেকে তিনগুণ। বিশেষ করে সবজির দাম বেড়েছে অধিক হারে।

এখানে প্রতি কেজি আলু বিক্রি হচ্ছে ৪৫ টাকা, বেগুন ৭০, বরবটি ৬৫, কাঁচা মরিচ ২০০, টমেটো ২০০, শশা ৪০ টাকা। যা রোহিঙ্গা আসার আগে বিক্রি হয়েছে বর্তমানের চেয়ে অর্ধেক দামে।

সরজমিন বালুখালী পানবাজারে দেখা গেছে, রোহিঙ্গাদের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত নুরুল হকের দীর্ঘদিনের দখলকৃত জায়গা বেহাত হয়ে গেছে। যেটুকু আছে তাতে দোকান নির্মাণ করা হলে আইন-শৃংখলা বাহিনীর লোকজন তা ভেঙ্গে দেবে।

বর্তমানে এই পরিবারে দুর্ভোগ নেমে এসেছে। তার মতো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে আরো অসংখ্য পরিবার। তাদের দাবি, রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশে তারা সবচেয়ে বেশি লোকসান দিয়েছে। এগুলো পূরণ করার জন্য তাদেরকে স্থায়ীভাবে কোন ব্যবসা-বাণিজ্য করার সুযোগ দেওয়া হোক। কারণ এক সময় এই পরিবার পাহাড়ে লাকড়ি কেটে, নাফ নদীতে মাছ শিকার করে জীবিকা নির্বাহ করতেন। কিন্তু এখন সব শেষ।

এদিকে ২ হাজার একর জমির মধ্যে রোহিঙ্গাদের পুনর্বাসন করার সরকারি ঘোষণা থাকলেও পরববর্তী আরো ৪ হাজার একর জায়গা নির্ধারণ করেছে সরকার। এরপর এখন পর্যন্ত ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে রোহিঙ্গা। যেখানে সেখানে রোহিঙ্গাদের ঝুপড়ি তৈরির কারণে একদিকে নষ্ট হচ্ছে সামাজিক বনায়ন। অন্যদিকে ব্যক্তি মালিকানাধীন পতিত জমিতেও বসতি গড়েছে তারা। ফলে রোহিঙ্গাদের ব্যাপারে স্থানীয়দের মধ্যে তৈরি হচ্ছে মতবিরোধ।

বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়া রোহিঙ্গাদের বেশিরভাগই ক্যাম্প ও অস্থায়ী আশ্রয় নিয়েছেন উখিয়া উপজেলার পালংখালী ইউনিয়নে। উখিয়ার বালুখালী, জামতলী বাঘঘোনা, তাজনিরমার ঘোনা, হাকিমপাড়াসহ নতুন রোহিঙ্গা ক্যাম্প ও বস্তিগুলো গড়ে উঠেছে এ ইউনিয়নে।

পালংখালী ইউনিয়নের চেয়ারম্যান এম গফুর উদ্দিন চৌধুরী বলেন, রোহিঙ্গা সমস্যা আন্তর্জাতিক সমস্যা এবং মানবিক বিষয়। কিন্তু মানবিকতার কারণে অনেক ভোগান্তি সহ্য করছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। আমার ইউনিয়নে স্থায়ী বাসিন্দার সংখ্যা যেখানে ৫০ হাজার, সেখানে ৮ লাখ রোহিঙ্গা অবস্থান নেয়ার পর কী ধরনের সমস্যাা হতে পারে- তা আন্দাজ করতে পারেন।

তিনি বলেন, আমার ইউনিয়নের প্রতিটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এখন বন্ধ। কিছুদিন পরই পিইসি, জেএসসি, এসএসসি, এইচএসসি, দাখিলসহ নানা পাবলিক পরীক্ষা। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকা ও পড়াশোনার স্বাভাবিক পরিবেশ বিঘিœত হওয়ায় তাদের পরীক্ষায় অংশগ্রহণ নিয়ে আশংকা তৈরি হয়েছে। অন্যদিকে বিপুল সংখ্যক রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশের কারণে নিত্যপণ্য ও গাড়ি ভাড়া দিন দিন বাড়ছে।