বেড়েই চলছে বজ্রপাতে প্রাণহানি প্রয়োজন জনসচেতনতা

10

গত শুক্রবার দৈনিক পূর্বদেশে প্রকাশিত প্রতিবেদন সূত্রে জানা যায়, সম্প্রতি দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশে বজ্রপাতের প্রবনতা আগের যেকোন সময়ের চেয়ে কয়েগগুণ বেড়ে গেছে। যদিও এ প্রবনতা ভারত, শ্রীলঙ্কা, মিয়ানমার ও নেপালেও অধিক। কিন্তু বাংলাদেশে তা অনেকাংশে দুর্যোগে রূপ নিয়েছে। বিশেষজ্ঞমহল বজ্রপাত সম্পর্কে সচেতন হলে এ দুর্যোগ থেকে অনেকাংশেই রক্ষা পাওয়া যায় বলে মত দিয়েছেন। এ ব্যাপারে সরকারের পক্ষ থেকেও গবেষণা ও জনসচেতনতা বৃদ্ধি করা জরুরি। বিশেষ করে গণমাধ্যমে বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে জনসাধারণকে সচেতন ও সজাগ করে তোলা প্রয়োজন যাতে বজ্রপাতে হতাহতের ঘটনা এড়ানো যায়। বজ্রপাত নিয়ে গবেষণার বিষয়টিকে সরকারের পক্ষ থেকেও গুরুত্ব দেয়া দরকার।
বজ্রপাত ও শিলাবৃষ্টির মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগের ক্ষয়ক্ষতি বেড়েই চলেছে। গণমাধ্যমের খবর সূত্রে জানা যায়, দেশের বিভিন্ন স্থানে বজ্রপাতে গত মঙ্গলবার, বুধবার ও বৃহস্পতিবারে মোট ২২ জনের মৃত্যু হয়েছে। এর আগে রবি ও সোমবার সারাদেশে অন্তত ২৫ জনের মৃত্যু এবং দেড় শতাধিক মানুষ আহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। গত বছরের এ সময়ে মাত্র চার দিনে বজ্রপাতে মৃত্যু হয়েছে ৫৪ জন। এদের বেশিরভাগই কৃষক। ওই সময় আহত হয়েছিল যেকোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগে হতাহতের এই হার ভয়াবহ। বজ্রপাত একটি স্বাভাবিক প্রাকৃতিক দুর্যোগ হলেও বর্তমানে বজ্রপাতজনিত মৃত্যুর সংখ্যা এতটাই বৃদ্ধি পেয়েছে যে বিষয়টি সবাইকে ভাবিয়ে তুলছে।
দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদফতর, দুর্যোগ ফোরামসহ বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন ও গণমাধ্যমে প্রকাশিত হিসাব অনুসারে গত ৫ বছরে বজ্রপাতে সারাদেশে ৩ হাজারের বেশি মানুষের প্রাণহানি ঘটেছে। আবহাওয়া অধিদফতরের গত ৭ বছরের পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ২০১১ সাল থেকে চলতি বছর পর্যন্ত বজ্রপাতের সংখ্যা এবং হতাহতের পরিমাণ ক্রমাগত হারে বাড়ছে। অস্বাভাবিক খরা, বন্যা, সামুদ্রিক জলোচ্ছ¡াস ইত্যাদি প্রাকৃতিক দুর্যোগের মতো বজ্রপাত বৃদ্ধির জন্যও ভূমÐলের উষ্ণায়ন ও জলবায়ুর পরিবর্তনের প্রবণতাকে দায়ী করছেন আবহাওয়া বিশেষজ্ঞরা। শহরের তুলনায় গ্রামাঞ্চলেই বজ্রপাত ও এতে মৃত্যুর হার বেশি। গ্রামে-গঞ্জে আজকাল তাল, নারিকেল, সুপারি, বট প্রভৃতির মতো বড় বড় গাছের অভাব, বজ্র নিরোধক ব্যবস্থা না থাকা, কৃষি যন্ত্রপাতিতে ধাতব যন্ত্রপাতির ব্যবহার বৃদ্ধি ইত্যাদি কারণেও বজ্রপাতের হার বাড়ছে।
আবার আবহাওয়া বিশেষজ্ঞদের মতে, নদ-নদী শুকিয়ে যাওয়া, জলাভূমি ভরাট হওয়া আর গাছপালা ধ্বংস হয়ে যাওয়ার কারণে দেশে অভ্যন্তরীণ তাপমাত্রা এক থেকে দেড় ডিগ্রি সেলসিয়াস বেড়ে গেছে। বিশেষ করে বর্ষা আসার আগে মে মাসে তাপমাত্রা বেশি হারে বাড়ছে। এতে বাতাসে জলীয় বাষ্পের পরিমাণ বেড়ে যাচ্ছে। অতঃপর দক্ষিণে বঙ্গোপসাগর থেকে ভেসে আসা আর্দ্র বায়ু আর উত্তরে হিমালয় থেকে আসা শুষ্ক বায়ুর মিলনে বজ্রমেঘ, বজ্রঝড় ও বজ্রপাতের সৃষ্টি হচ্ছে। তবে বজ্রপাত বা প্রাকৃতিক দুর্যোগে হতাহতের প্রকৃত সংখ্যা পরিসংখ্যান বা পত্রিকায় প্রকাশিত সংখ্যার চেয়ে অনেক বেশি বলেই ধরে নেয়া যায়। আন্তর্জাতিক গবেষণায় দেখা গেছে, বিশ্বে বজ্রপাতজনিত মৃত্যুর এক-চতুর্থাংশই ঘটে বাংলাদেশে। এখানে মার্চ থেকে মে মাস পর্যন্ত বজ্রপাতের প্রকোপ সবচেয়ে বেশি থাকে। দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলে বজ্রপাত সবচেয়ে বেশি হয়।
বাংলাদেশে প্রতি বর্গকিলোমিটার এলাকায় গড়ে প্রায় ৪০টি বজ্রপাত হয়ে থাকে। বজ্রপাত সম্পর্কে সচেতন হলে এ দুর্যোগ থেকে অনেকাংশেই রক্ষা পাওয়া যায়। এ ব্যাপারে গবেষণা ও জনসচেতনতা বৃদ্ধি করা জরুরি। বিশেষ করে গণমাধ্যমে বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে জনসাধারণকে সচেতন ও সজাগ করে তোলা প্রয়োজন যাতে বজ্রপাতে হতাহতের ঘটনা এড়ানো যায়। বজ্রপাত নিয়ে গবেষণার বিষয়টিকে সরকারের পক্ষ থেকেও গুরুত্ব দেয়া দরকার।