বেহালা বাদক ছেলেটা

বিশ্বজিৎ সেন

26

ছেলেটা দারুণ বেহালা বাজায়। বোয়ালখালী উপজেলার করলডেঙ্গা পাহাড়ে সে কোন এক বড়গৃহস্থের গরু চড়ায়। তার আসল বাড়ি কোথায় তাও সে বিস্মৃত প্রায়।
বয়স তেরো-চৌদ্দ বছর। শ্যামলা গায়ের রঙ। উচ্চতায় পাঁচ ফুট তিন চার ইঞ্চির মতোই হবে। বেহালাটার প্রকৃত মালিককে জানে না সে। একদিন পাহাড়ের ভেতরে গরু চড়াতে গিয়ে একটা ঝোপের মধ্যে এটাকে কুড়িয়ে পায় সে। সেই থেকে এটা তার।
সে যার বাড়িতে থাকে, সেই গৃহকর্তার বেহালা বাদনের সুখ্যাতি আছে। ভোরে এবং সন্ধ্যায় তিনি যখন বেহালা বাজানা তখন এই ব্রজেশ্বর হা করে শুনে থাকে। অবশ্য তাতে কারো পাত্তা দেবার বা মাথা ঘামানো প্রশ্নই ওঠে না।
যেদিন ব্রজেশ্বর বেহালাটা নিয়ে এসে গৃহকর্তাকে দেখালো, ভূত দেখার মতোই চমকে উঠলেন তিনি।
কোত্থেকে পেলি?
পাহাড়ের এক ঝোঁপের ভেতর।
হতে পারে যুদ্ধের সময় পালিয়ে আসা কোন সম্ভ্রান্ত লোকের বেহালা। নাম ঠিকানা থাকলে তো পৌঁছে দিতে পারতাম। ঠিক আছে তুই’ই যখন কুড়িয়ে পেলি, এটা তোর কাছেই থাক ব্রজু। রাখালরা তো বাঁশিই বাজায়। তুই না হয় বেহালা বাজাবি। মন দিয়ে দেখবি আমি কীভাবে বাজাই, তাহলে ঠিকই শিখতে পারবি।
পঞ্চাশ-বায়ান্ন বছরের মতোই বয়স বিভূতি বাবুর। সাড়ে পাঁচ ফুট উচ্চতার গৌরবর্ণ মানুষটাকে দেখলেই মনে হয় সম্ভ্রান্ত বংশের উত্তরাধিকারী। তাঁর কথা শুনে ব্রজেশ্বর তো মহাখুশি। সে বেহালাটা নিয়ে এ দৌড়ে তার থাকার কক্ষে চলে গিয়েছিল সেদিন।
সবার শেখার ক্ষমতা এক না। অল্পদিনের মধ্যেই ব্রজেশ্বর বেহালার তারে ঝড় ও কান্নার সমন্বয় করার কৃতিত্ব অর্জন করে চমকে দিল গৃহকর্তাকে!
একদিন গৃহকর্ত পরীক্ষা নিলেন তার। ভালোভাবেই উত্তীর্ণ হলো সে। পরের দিন থেকে সে গরুর পাল পাহাড়ে নিয়ে যাবার সময় বেহালাটা সঙ্গে নিয়ে যায়। এরই মধ্যে তার বেহালা বাদনের সুনাম আশেপাশের পাড়া-গ্রামে ছড়িয়ে পড়তে লাগলো।
গরুরা আপন মনে চড়ে বেড়ায়। সে একাকী বসে গাছের ছায়ায় বেহালা বাজায়। আশে পাশের কয়েক গাঁয়ের অনেক মানুষ সে পাহাড়ে যায় কাঠ-শন-বাঁশ আনার জন্য। কেউ কেই যায় জুমের ক্ষেত-খামারে। তাদের অনেকের সাথে এরই মধ্যে তার ভাব জমে গেছে।
অ ভাইপুত, তোর আসল বাড়িয়ান কঁডে অ বা’জি?
কাকা, আমি এখন আর স্মরণ করতে পারি না।
ও:। ফ’রি গিয়েসগুই ফাআন?
রফিকের শেষ হতেই বলে ওঠে টুইট্যা।
কেন্ গরিবি বাআজি, কুয়ালের ফট খারাপ ওয়ে আরকি। বিয়ার বয়স ত হই আইয়ের। ক’নে তোরে বিয়া গরাইবো? ক’নে তোর মত উগ্যা ভাদাইম্যারে মাইয়া দিবো? তোরে দেইলে মননান কাঁদি উডে ক্যানগরি বা’জি।
কথাগুলো শুনে কেমন অন্যমনস্ক হয়ে যায় ব্রজেশ্বর।
শনের বড় এক গোজভার কাঁধ থেকে নামিয়ে রেখে যোগেশ বলতে থাকে,-অ বা’জি ভাগ্যভালাি বাঁশি ন বাজাঅর। আঁর ঠাম্মার মুখত্ হুন্নি যে, বাঁশি বাজাইলে নাকি পরি নামিয়েরে পিডত্ বোয়ায় তুলি লইযাগোয়।
উপস্থিত পাঁচজনের সবাই একবাক্যে সহমত পোষণ করে সাথে সাথেই।
ব্রজেশ্বর ভয় পেয়ে যায়। নিজেকে নিজে আশ্বস্ত করে সে মনে মনে এই বলে যে, আমি তো বাঁশি বাজাচ্ছি না। বেহালা বাজাচ্ছি। পরি বেহালা বাজানো পছন্দ করে না। সুতরাং নেমে এসে পিঠে তুলে নেবে না কোনোদিনও।
বিড়ি ও পান পর্ব শেষ করে কেউ বাঁশের ভাড়, কেউ শণের ভাড়, কেউ লাকড়ির ভাড়, কেউবা সবজির ভাড় কাঁধে নিয়ে বাড়ির পানে পা বাড়ালো ওরা।
আবারো একাকী পড়ে রইলো ব্রজেশ্বর। পাশের ঝর্ণায় গিয়ে হাত মুখ পা ধূয়ে এসে সে টিফিন ক্যারিয়ার খুলে ভাত খেতে বসলো। দুটো বানর গাছটার শাখায় বসে দুপুরের ঝিমুনির ফাঁকে ফাঁকে ব্রজেশ্বরের ভাত খাওয়া দেখছে।
আশেপাশে কোথাও একটা বনমোরগ এর উপস্থিতি জানান দিচ্ছে উচ্চস্বরে ডাক দিয়ে।
খাওয়া সেরে ঝর্ণার জলে টিফিন ক্যারিয়ার ধূয়ে কয়েকটা কুলি ককরে ব্রজেশ্বর আবার গাছতলায় এসে বসলো।
বেহালাটা তুলে নিয়ে ছড়িটার কয়েকটা টান দিল এর তারে। পাহাড়ে এমন কিছু নাম না জানা কীট-পতঙ্গ আর পাখির ডাক শোনা যায়, সাধারণত যা সমতলে শোনা যায় না। এমন কিছু ফুল ফোটে ঝর্ণার আশেপাশে, মনটাকে কেমন করে নাড়িয়ে দেয়, সমতলে দেখাই যায় না যেসবের।
হৃদয়বিদারক এক করুণসুর তুলে নিল ব্রজেশ্বর বেহালায় তার কেমন এক ঘোরের মধ্যেই। বানর দুটো শাখা ছেড়ে নেমে এলো মাটিতে। তার থেকে চার-পাঁচ হাত দূরত্বে পাশাপাশি বসে পড়ে দু’টোই ভদ্র নম্রভাবে। একটা বনমোরগ সাথে চারটা মুরগির নিয়ে নেমে আসলো
তার থেকে বিশ-তিরিশ হাত দূরে।
রৌদ্রের তীব্রতা হ্রাস পেতে শুরু করেছে- গরুগুলো ধীরে ধীরে দূর থেকে ব্রজেশ্বরের আশেপাশে এসে যাচ্ছে-কিছু কিছু বুনোফুলের ঘ্রাণ তীব্র থেকে তীব্রতর হয়ে উঠছে।
হঠাৎ ব্রজেশ্বরের গাটা যেন শিরশির করে ওঠে। কী কারণে তা বুঝে উঠতে পারলো নাা সে। বেহালা বাদনে ব্যাঘাত ঘটলো হঠাৎ।
বাদন বন্ধ করলে কেন?
ভীষণভাবে চমকে ওঠে ব্রজেশ্বর পেছন দিক থেকে ভেসে আসা এক নারীকন্ঠস্বরে!
অনিন্দ্যসুন্দরী এক নারী নর্তকীর বেশে দাঁড়িয়ে আছে তার থেকে সাত-আট হাত দূরে এক ঝোপের সামনে!-পেছন ফিরে দেখে ব্রজেশ্বর।
আপন কে?
সঙ্গীত অন্ত:প্রাণ এক অপ্সরা। নাম নৈবেদ্যা। তার দেহ থেকে অচেনা পারফিউমের গন্ধ ভেসে আসছে ব্রজেশ্বরের নাসারন্দ্রে।
তুমি কি বিশ্বাস করো প্রত্যেকটি বাদ্যযন্ত্রেরও প্রাণ আছে?
না, বিশ্বাস করিনা। -বললো ব্রজেশ্বর দৃঢ়প্রত্যয়ে।
অট্টহাসিতে পাহাড়ের সুবজসংসারটাকে নাচিয়ে দিল নৈবেদ্যা! বাছা, উল্টাপাল্টা কথা বলো কেন বাপু? এই তো বললে সুরটা তুমি না, বেহালা নিজেই বাজায়?
নিজের বোকামীতে নিজেই বোবা হয়ে যায় ব্রজেশ্বর।
কী নাম তোমার?
ব্রজেশ্বর।
শোনো ব্রজেশ্বর, প্রত্যেক বাদ্যযন্ত্রেরই প্রাণ থাকে। তবে তা জড়ত্বে আচ্ছন্ন থাকে। সত্যিকারের বাদক তার একাগ্রতা আর অনুশীলন দিয়ে সেই জড়তার আচ্ছনতা কাটিয়ে তাকে প্রাণবন্ত করে তোলে। আমি তোমার বাদনমাধুর্যে বেহালাটার প্রাণস্পন্দন শুনেছি।
মোরগ-মুরগিগুলো আরো কাছে এসে গেছে। কোন ফাঁকে যে বানর দুটো পুনরায় শাখায় উঠে বসেছে!
আমার সাথে যাবে বাছা! পিঠে নিয়ে উড়ে যাবো!
কোথায়?
কোন এক সাগরদ্বীপে!
আপনার তো পাখা নেই।
অপ্সরাগণ পাখা ছাড়াই উড়তে পারে। যাবে?
সম্মতিজ্ঞাপক মাথা নাড়ে ব্রজেশ্বর।