বেকারত্বের অভিশাপে জর্জরিত বিশ্ব বাংলাদেশও মুক্ত নয়

শাহাবুদ্দীন খালেদ চৌধুরী

3

২০০৮ সাল থেকে বিশ্বব্যাপী অর্থনৈতিক মন্দা এবং আর্থিক সংকটের কারণে যে বেকার সমস্যা সৃষ্টির শুরু হয়েছিল তার এখনও পরিসমাপ্তি লক্ষ্য করা যাচ্ছেনা। বিশেষ করে বিশ্বব্যাপী উচ্চমানের কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা প্রতি বৎসর কঠিন থেকে কঠিনতর হয়ে উঠেছে। বিশ্বব্যাপী ‘চাকরীহীনতাই’ তুমুল প্রতিবাদ এবং সামাজিক অস্থিরতা মূল কারণ। বাংলাদেশও সে একই কারণে বহুদিন থেকে সামাজিক অশান্তি ও জাতীয় জীবনের প্রতিক্ষেত্রে বিশৃংখলা বিরাজ করছে। দেশের বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার রিপোর্টেও একই মত প্রকাশ করা হচ্ছে। অনুরূপ এক গোয়েন্দা সংস্থার রিপোর্টে বলা হয়েছে বাংলাদেশে ¯œাতক ডিগ্রীধারীদের মধ্যে প্রায় ৪৭ শতাংশ বেকার। অবশ্যই এই রিপোর্টের সত্যতা নিয়ে কিছু মহল দ্বিমত প্রকাশ করেছেন কিন্তু বিশ্বব্যাংকের রিপোর্ট যখন এই রির্পোটটিকে সমর্থন করে রিপোর্টের সাথে একাত্মতা ঘোষণা করে, প্রতিবাদকারীরা এর উত্তরে কোন উচ্চবাক্য করতে আর শুনা যায় নাই। বাংলাদেশ ইন্সটিটিউট অব ডেভেলাপমেন্ট স্টাডিস বা ইওউঝ এর রিপোর্টে বলা হয়েছে বাংলাদেশে বিশ্ব বিদ্যালয়ের ডিগ্রীধারীদের মধ্যে ৩৮.৬ শতাংশ বেকার বিরাজ করছে। বাংলাদেশ বুরে‌্যা অব স্টেটস্টিক্্স এর পর্যবেক্ষণ মতে শতকরা ৪৬ জন বাংলাদেশি ডিগ্রীধারী বেকারত্বের অভিশাপে জর্জরিত হচ্ছে। আবার পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের অধীনে অর্থনৈতিক বিভাগের সাম্প্রতিক পর্যবেক্ষণে দেখা যায়, বর্তমানে বাংলাদেশের ১ কোটি ৩৮ লক্ষ লোক হয়তো আংশিক অথবা সম্পূর্ণভাবে বেকার রয়েছে। একজন শিক্ষিত ও দক্ষলোক যদি চাকরীর অভাবে নি¤œস্তরের চাকরী করতে বাধ্য হয় সে ক্ষেত্রে মনস্তাত্তি¡ক কারণে সে তার কাজের প্রতি পূর্ণ মনোযোগ দেয়না। সেভাবেও দেশ ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে। যে দেশে বেকারত্ব বেড়ে যায় সে দেশে অবশ্যই আইন শৃংখলা পরিস্থিতির অবনতি হবে। সরকারের আইন শৃংখলাতে বরাদ্দ বাড়াতে হয়।

১৯৮২ ইংরেজিতে প্রেসিডেন্ট রিগেনের সময় আমেরিকায় বেকারত্ব বেড়ে গিয়েছিল। বেকারত্বের হার ছিল ৮.৯ শতাংশ। তখনকার দিনে এই বেকারত্বের কারণে আমেরিকান সরকারকে বাৎসরিক ১৯ বিলিয়ন ডলার অপ্রত্যক্ষভাবে খরচ করতে হতো এবং প্রত্যক্ষভাবে বেকারদেরকে সাহায্য দিতে হয়েছিল ৬ বিলিয়ন ডলার।সে সময়ে আমেরিকার জন হপকিন বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজ বিজ্ঞানের অধ্যাপক মি: হারডে বেøনার তখন গবেষণা শেষে বলেছিলেন আমেরিকায় যদি ১ শতাংশ বেকার বাড়ে, সেক্ষেত্রে আমেরিকায় আত্মহত্যা ঘটবে ৪.১ শতাংশ। মানসিক হাসপাতালে ভর্তি হবে ৩.৪ শতাংশ, নরহত্যা বাড়বে ৫.৭ শতাংশ। দুর্ভাগ্য বশত: আমাদের দেশে বেকারত্বের ফলে আত্মহত্যার ঘটছে বা মানসিক রোগে কতজন আক্রান্ত হচ্ছে তার কোন হিসাব নেই তবে এই ক্ষেত্রে সে আমেরিকার থেকে পিছিয়ে নেই তা নিঃসন্দেহে বলা যায়।
আসলে আমাদের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলি চাকরীর বাজারে চাহিদা অনুযায়ী ছাত্রদেরকে পারদর্শী করে গড়ে তুলতে ব্যর্থতার পরিচয় দিচ্ছে। অন্যদিকে যে হারে দেশে বেকার সৃষ্টি হচ্ছে সে অনুপাতে চাকরী সৃষ্টি করার সক্ষমতা দেখাতে অর্থনীতি চরম ব্যর্থতার পরিচয় দিচ্ছে। সম্প্রতি পর-রাষ্ট্রমন্ত্রী আমাদের অর্থনীতির এই ব্যর্থতার কথা স্বীকার করেছেন এবং আগামী পাঁচ বৎসরে দেশে দেড়কোটি চাকরী সৃষ্টি করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে বলে ঘোষণা দিয়েছেন।
দুর্ভাগ্যের বিষয় গত দুই বৎসর ধরে বিদেশেও চাকরী কমতে শুরু করেছে। ২০১৭ সালে বিদেশে আমাদের দেশের দশ লক্ষ লোকের কর্মসংস্থান হয়েছিল। ২০১৮ সালে তা কমে দাঁড়িয়েছে ৭,৩৪,১৮৯ তে। আমাদের ম্যান পাওয়ার বুরে‌্যার হিসাব মতে চলতি বৎসরে (২০১৯) প্রথম ৮ মাসে বিদেশে আমাদের ৪,১৭,০৮৪ জনের চাকরীর সংস্থান হয়েছে। বুরে‌্যার মতে বৎসর শেষে এ সংখ্যা ৬,২৫,৬২০ জনে পৌঁছাতে পারে। অর্থাৎ গত বৎসরের তুলনায় চলতি বৎসরেও বিদেশে আমাদের চাকরীর সংস্থান কমে যাবে। এছাড়াও গত বৎসরের আই.সি.টি. ডিভিশনের এক নিরীক্ষায় দেখা যায়, বর্তমানে পাঁচ ধরনের বিশেষ শিল্পে প্রায় ৫৩.৮ লক্ষের মত চাকরীর সংস্থান রয়েছে-গার্মেন্টস, খাদ্য, কৃষি, ফার্নিচার, পর্যটন, চামড়া ও পাদুকা শিল্পে। কিন্তু আগামী দুই দশকে এই সব শিল্পে আগত চতুর্থ শিল্প বিপ্লবে উৎপাদন কলা কৌশলে যে বৈপ্লবিক পরিবর্তন আসছে তাতে এই সব শিল্পে কর্মসংস্থান কমে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
আমাদের পর-রাষ্ট্রমন্ত্রী সম্প্রতি স্বীকার করেছেন যে সরকার যতই চেষ্টা করুক না কেন বেসরকারি উদ্যোগ ছাড়া দেশের বেকার সমস্যার সমাধান কিছুতেই সম্ভব নয়। কিন্তু দুঃখের বিষয় বিভিন্ন সরকারের ব্যাংকিং ব্যাবস্থায় অযাচিত হস্তক্ষেপের ফলে বাংলাদেশের ব্যাংকিং ব্যবস্থায় এক ভয়াবহ ঋণ খেলাপী সমস্যার সৃষ্টি হয়েছে। দেশের ব্যাংকিং ব্যবস্থায় সর্বমোট যা ঋণ রয়েছে তার প্রায় ১১ শতাংশ ঋণ খেলাপী ঋণে পরিণত হয়েছে। অনেকেই এই ঋণের টাকায় কানাডা, মালেশিয়ায় ইত্যাদি জায়গায় দৃষ্টিনন্দন বাড়ি করেছে। অর্থাৎ যথেষ্ট পরিমাণ টাকা এবং ঋণ গ্রহীতা সরকারের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেছে। একথা অস্বীকার করার উপায় নেই যে ঋণ খেলাপীরা প্রতিক্ষেত্রে তাদের এই জঘন্যতম কু-কর্মে রাজনৈতিক সহযোগিতা পেয়েছে। বর্তমানে বাংলাদেশ বিশ্বে ব্যবসার জন্য সুবিধাজনক দেশের তালিকায় ১৯০ দেশের মধ্যে ১৭৬ নম্বরে রয়েছে। অর্থনীতির ছাত্র হিসেবে আমি দৃঢ়ভাবে বলছি আমাদের এই অধঃপতনের জন্য শুধু এই ঋণ খেলাপীরাই সম্পূর্ণভাবে দায়ী। অবশ্য এই জন্য তাদের সহযোগীরাও কম দায়ী নয়। অবশ্য সব চাইতে এর মূল কারণ হলো “ঈড়সসবৎপরধষরুধঃরড়হ ড়ভ চড়ষরঃরপং” অর্থাৎ রাজনীতির বাণিজ্যিকীকরণ। বিভিন্ন দেশি ও বিদেশি ব্যবসায়িক সংগঠনের মতে বাংলাদেশে এখনও অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য যথেষ্ট অবকাঠামোগত উন্নয়নের প্রয়োজন রয়েছে। দুভার্গ্যবশত: অবিশ্বাস্য পন্থায় ভয়াবহ দুর্নীতির কারণে অবকাঠামো উন্নয়নের কাজ দ্রæত সম্পন্ন হচ্ছে না এবং একই কারণে বিভিন্ন অবকাঠামোর কাজ টেকসইও হচ্ছেনা।
আমাদের দেশ থেকে চাকরীর উদ্দেশ্যে বিদেশে যাওয়ার জন্য যা খরচ হয় তা অন্য দেশের খরচের সাথে তুলনা করলে কিংকর্তব্যবিমূঢ় হওয়া ছাড়া কোন উপায় থাকেনা। সরকারকেও এই ব্যাপারে সজাগ হতে হবে। রিক্রুটিং এজেন্টগুলিকেও সাহায্যের জন্য সরকারকে এগিয়ে আসতে হবে, যাতে রিক্রুটিং এজেন্টরা বিদেশে ভাল কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করতে পারে। নেপাল, ফিলিপাইন ইত্যাদি দেশ থেকে আমাদের দেশের তুলনায় অনেক কম খরচে সেখানকার রিক্রটিং এজেন্টরা বিদেশে লোক পাঠাচ্ছে। সে ক্ষেত্রে আমরা কেন পারব না। কি কারণে আমরা অপারগ হচ্ছি তার সমাধান জরুরী ভিত্তিতে বের করতে হবে। একথা সংশ্লিষ্ট সবাইকে স্মরণ রাখতে হবে, বেকারত্ব সমাধানের সবচাইতে সহজ উপায় হলো দেশের চাকরী প্রার্থীদের যুগোপযোগী শিক্ষায় শিক্ষিত করে গড়ে তোলা। বর্তমান আমাদের দেশের গার্মেন্ট ফ্যাক্টরীগুলিকে বিশেষ বিশেষ পদের জন্য ভারত থেকে লোক আনতে হয় এবং দেশের প্রায় ফ্যাক্টরীগুলিকে বাধ্য হয়ে তাই করতে হচ্ছে। অথচ এইদেশে ঐসব পদের উপযুক্ত করে গড়ে তোলার জন্য ব্যবস্থা করা যায়। কিন্তু সরকার এবং সংশ্লিষ্টরা এই ব্যাপারে উদাসীনতার পরিচয় দিচ্ছে। মোদ্দা কথা আমাদের অর্থনীতির সার্বিক উন্নয়নে যে শিক্ষার প্রয়োজন তা আমাদের দেশের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো থেকেই আসতে হবে। অন্যথায় এসব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের জন্য কোটি কোটি টাকা খরচ প্রশ্নবিদ্ধ হবে এবং সমগ্রজাতি এই বিপুল খরচটাকেই জাতীয় অপচয় মনে করবে।
সম্প্রতি এক সমীক্ষায় দেখা গেছে আমাদের দেশে প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়গুলি থেকে যাঁরা বের হচ্ছেন তাঁদের চাকরি প্রাপ্তির হার হচ্ছে প্রায় ৪১ শতাংশ কিন্তু পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলি থেকে যাঁরা বের হচ্ছেন তাঁদের চাকরী প্রাপ্তির হার হলো ৩২%। ইহার একটি কারণ হলো প্রাইভেট ইউনিভার্সিটিগুলি যেভাবে দ্রæত শিক্ষার যুগোপযোগী ক্যারিকুলাম পরিবর্তন করতে পারে, পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলি সেভাবে পারেনা। বর্তমান বিশ্বে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে জ্ঞানের কোন বিকল্প নেই। কাজেই এই বিশ্বে বক-জ্ঞানী দিয়ে আর এই দেশ বেশি দিন চালানো সম্ভব নয়।
বিশ্বে কর্মসংস্থানের সব তথ্য উপাত্ত পর্যালোচনা করে এই সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়া যায় যে বিশ্বব্যাপী ব্যাপক বেকারত্বের অভিশাপে জর্জরিত হওয়ার একটা আশু সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে। বিশ্বের পরাশক্তিগুলি অস্ত্র বিক্রয়ের জন্য প্রায় পাগল হয়ে যাওয়ার উপক্রম হয়েছে। সেসব দেশের রাষ্ট্র বা সরকার প্রধানেরা নিজেরাই অন্যান্য দেশগুলিও সরকার প্রধানদের অস্ত্র কেনার জন্য উৎসাহিত করছে। বিশ্বের প্রায় দেশে যতক্ষণ শুধু দেশপ্রেমিক নয় সাথে সাথে মানবপ্রেমিকও নেতৃত্বে না আসবে ততক্ষণ পর্যন্ত বিশ্বের কোন সমস্যাই সমাধান হওয়ার নয়।
লেখক : কলামিস্ট