বুল্লা বাবা

পান্থজন জাহাঙ্গীর

128

১।।
“এত বড় এক্সিডেন্ট কেমনে যে হলো! বেশ কজন স্পট ডেথ। আহতের সংখ্যা বেশি।কারো হাত কারো পা আবার কারো মাথা তেতলে গেছে। গরমে রক্ত-মাংসের গন্ধে যেন অস্থির জরুরি বিভাগ তার উপর অবার উঠকো ঝামেলা। ইস! কেন যে মানুষ অবুঝ হয়।হোক না এম পি বা মিনিস্টার। তাই বলে এ রকম এটেন্ডেনসের ভিড় আগে দেখেনি। একজন রোগীর সাথে এত গুলো মানুষের দৌঁড়ঝাপ?”কয়েকজন গুরুতর আহত রোগিফেলে এই রোগীর ট্রলির দিকে এগিয়ে গেলেন অভিজ্ঞ ডা: জাকারিয়া কামাল।হৈ হুল্লোড় শুনে তাড়াতাড়ি উঠতে গিয়ে হাতের সাথে ধাক্কা খেয়ে টেবিল থেকে বেন্ডিজের সুতা এবং স্যাভলনের প্লেটটাও নিচে পড়ে গেল।তিনি তাদেরকে জিগ্যেসকরলেন,‘আপনারা রোগির কি হন ?’তারা ঝটপট উত্তর দিলেন, ‘আমরা বাবার খাদেম।’ পেছনের চর্ম ও যৌন বিভাগের বেলকনি ধরে খালি ট্রলি চালিয়ে দ্রুত আসছিলেন ট্রলিম্যান আব্দুল। মুখে চাপদাড়ি। তিনি খাদেমদের উত্তর শুনে মৃদু আওয়াজে ভর্ৎসনা করে বললেন,’ওরা খাদেম নয়। ওরা কাঁদেম।’ডা:কামাল পরে রোগির ভর্তিফর্ম ও টোকেন দেখেন। লেখা আছে রোগীর নাম বিল্লা বাবা। ঠিকানা:বার নম্বর বারবনিতা গলি চার রাস্তার মুখ চট্টগ্রাম। তারপর তিনি তাড়াতাড়ি অনেকটা সিরিয়াল ব্রেক করে জরুরি চিকিৎসা দিয়ে বাবাকে মেডিকেলের ছাব্বিশ নাম্বার ওয়ার্ডে করিয়ে ঝামেলা কমালেন। তা না করলে এই রোগির এটেনডেনসের ভিড়ে অন্য রোগিরা হয়তো মারাও যেতে পারতো। কর্তব্যরত ডা: রোগীর ফাইল প্রস্তুত করলেন এবং অবস্থা দেখে দ্রুত এক্স রে করলেন। তারপর বললেন, “কোমর এবং মেরুদন্ডের হাড় ভেঙ্গে গেছে। তারচেয়েও গুরুতর জখম হয়েছে তার অন্ডকোষে। তাকে আই সি ইউ তে রাখা প্রয়োজন ।” বাবার খাদেমরা বললেন , “ যত টাকা দরকার আমরা দিব। যেখানে রাখলে বাবা বাঁচবে সেখানেই রাখেন।”পরদিন বেশিরভাগ পত্রিকায় হেডলাইন হয়েছে,” গুরুতর জখম হলেন বাবা।” আবার কোন কোন পত্রিকা নিউজ করেছে “জিন হাজির করতে গিয়েই কুপোকাত হলেন ভন্ড বাবা।”
বাবার খাদেমরা খুব ভয়ে ভয়ে আছে কারণ এর চেয়ে খারাপ কিছু আশংকা করছে তারা। প্রথমত: যদি তাদের বাবা না বাঁচে। দ্বিতীয়ত: এরকম আঘাত যদি তাদের উপরেও এসে পড়ে তাহলে নিস্তার নেই। কান টানলে তো মাথাও আসে। কারণ,এই বাবার যারা খাদেম তারাও বাবাগিরির অংশিদার। বাবার রিপ্রেজেনটিটিভ বলা যায়। বাবার বেশিরভাগ বিজ্ঞাপনে এরা অংশ নিয়েছে। সবাই বাবার কেরামতির এক একটা পেছনের নাটক। পুঁজি লগ্নিকারী ও বলা যায়। মাসে মাসে বাবার কাছ থেকে পারসেনটেইজ পায়। কেউ আমেরিকা কেউ সৌদি আরব আবার কেউ লন্ডন বা মালয়েশিয়া র প্রবাসী শিরোনামে ক্ষণে ক্ষণে টিভির পর্দার বিজ্ঞাপনে ঝিলিক দিয়ে উঠতো। যার যার এলাকা থেকে রোগী বা সমস্যাগ্রস্ত লোকদের পাঠানোই এদের কাজ ছিল। বাবার আলিশান গাড়ির কাচ একটাও নেই। মাজারের লাল গিলাপ আগুনে জ্বলে ছারখার হয়ে গেছে। বাবার আস্তানায় পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। ওসি স্বপনও বাবার নাকি ভক্ত ছিল তাই ফোন করার সাথে সাথেই চলে এসেছে। ভক্তদের আনাগোনা এখন দরবারে নেই বললেই চলে। তবে মেডিকেলে আনাচে কানাচে ভক্তরা পাহারা বসিয়েছে। তারা খুব রেগে আছেন।কিন্তু প্রকাশ্য কোন প্রতিবাদ করতে পারছেনা। কারণ ব্যাপারটি প্রমাণের দিক থেকে ধোঁয়াশা। কেউ বলছে জিনের সাথে বেয়াদবি করে মার খেয়েছে বাবা আবার কেউ কেউ অন্য কথাও বলছে।
২।।
আজ থেকে সাত বছর আগের কথা। তাজকিয়ার সাথে রমণের বিয়ে হয়েছিল। অ্যাফেয়ার মেরেজ। কলেজ জীবনে তাজকিয়ার ডিপার্টমেন্টে রমণ ছিল চোখে পড়ার মতো ছেলে। সব মেয়ে গুলো তার পেছনেই লাইন দিত। সুদর্শন রমণকে নিয়ে মেয়েগুলোর মধ্যে টানাটানি, কানাকানি, রেষারেষি কম হয়নি কিন্তু শেষ পর্যন্ত রমণ তাজকিয়ারই হলো।রমণ কে অন্যদের কাছ থেকে ছিনিয়ে নিতে অনেক কাঠখড় পুড়তে হয়েছে তাজকিয়ার । কারণ, অন্যজনের ভালোবাসার মানুষকে ভাগিয়ে নিয়ে আসাটা চাট্টি খানি কথা নয়। ব্যবসায়ী পিতার একমাত্র মেয়ে তাজকিয়া তার জন্য কাড়ি কাড়ি টাকাও উড়িয়েছে। অধিকাংশ রেস্টুরেন্ট এবং কফি শপের পরিচিত মুখ ছিল তারা। কিন্তু সেই প্রেম ভালোবাসাকে যখনই বৈধতা দিয়ে তারা রঙিন সুতোয় বেঁধে আরো পাকাপোক্ত করতে চাইল তখনই তাজকিয়ার পরিবার পথের কাঁটা হয়ে দাঁড়লো । তারা মাস্টার্স ডিগ্রিতে পড়ুয়া তাজকিয়ার জন্য এ রকম ছেলেকে কিছুতেই মেনে নিবে না। প্রথমতো সে তাজকিয়ার চেয়ে একবছর জুনিয়র দ্বিতীয়ত সে এখনো সামাজিক ও অর্থনৈতিকভাবে প্রতিষ্ঠিত নয় । রমণ ফিজিক্স থেকে সে সময় মাত্র ফোর্থ ইয়ার ফাইনাল দিয়েছে। সুতরাং প্রতিষ্ঠিত হওয়ার প্রশ্নই আসেনা কিন্তু সব বাবা মায়েরা মেয়েদের জন্য এ রকমই তো চায় এবং এটাই শ্বাশ্বত । তবে তাজকিয়ার প্রেম-ভালোবাসার কাছে বয়স টয়স এগুলো ফালতো ইস্যু। একবছর ছোট হয়েছ কি হয়েছে। ছেলেরা যদি ছোট মেয়েদের বিয়ে করতে পারে মেয়েরা কেন ছেলেদের পারবেনা। তাছাড়া তাজকিয়ার কাছে এটি একটা বড় প্রেস্টিজেরও ইস্যু।
বয়স কে ইস্যু বানিয়ে যদি রমণ কে হারাতে হয় তবে তাজকিয়ার শুধু প্রেমে পরাজিত হওয়া নয় বরং পুরা গ্রুপের কাছে একটা মার খাওয়ার মতো। তখন সুসাইড করে মেডিকেলের মর্গে পড়ে থাকা ছাড়া আর কোন পথ নেই। কারণ, পুরা ফ্রেন্ড সার্কেলই তার এবং রমণের এ প্রেম কে মেনে নিতে পারেনি। বিশেষত:রমণকে ছিনিয়ে নেওয়াটা।
সুতরাং তাজকিয়াই মারটা দিল তাও আবার দীর্ঘ দিনের পালিত সম্পর্ক নিজ বান্ধবীকে। অতপর দুজনে পালিয়ে বিয়ে এবং একেবারে কক্সবাজারে হানিমুন এবং সেখান থেকে পুলিশ দিয়ে ধরে এনেই রমণের জেল। প্রেম বিয়ে এবং জেল ইত্যাদির খপ্পরে পড়ে যেখানে মাস্টার্স দেয়া হচ্ছেনা সেখানে তাদেরই ডিপার্টমেন্ট এর দয়ালু টিচার রহিম স্যারের কল্যাণে রমণের মাস্টার্স পাশ করা হল। তিনি সব লাইন ঘাট করে রমণ কে পুলিশ পাহারায় পরীক্ষা নিয়ে পাশ করালেন। রহিম স্যারের কি স্বার্থ এখানে? অনেকেরই প্রশ্ন।কিন্তু ফিজিক্স ডিপার্টমেন্ট এর একজন মেধাবী ছাত্রের প্রেমের কারণে স্বশুরের দেয়া মামলায় জেলে পঁচে মাস্টার্স থেকে ড্রপআউট হবে অস্তত ডিপার্টমেন্টের এর চেয়ারম্যান হিসেবে তিনি সেটা চাননি হয়তো। তাছাড়া তার তখন ক্ষমতাও ছিল। ছিল পরোপকারীও।
অতপর রমণের শ্বশুরের বরফ গলল। নিজেরই দেয়া অপহরণ মামলা তুলে নিলেন। জেল থেকে ছাড়িয়ে নিয়ে ফুলের মালা গলায় দিয়ে রমণকে বুকে টেনে নিয়ে শ্বশুর বাড়ি জিন্দাবাদ বললেন।
৩।।
এরপর চারটা বছর রঙিন ডানায় ভর করে উড়ল দুজনই। কিন্তু পরের চারটা বছর তেমন সুখকর নয়।অক্ষমতা এবং অপূর্ণতায় একেবার জ্বলে পুড়ে মরছে তারা। প্রতিনিয়ত সমালোচনায় হৃদয়টা কুরে কুরে খেয়েছে । মাঝে মাঝে মনে হয় এ জীবন পুরোটাই ব্যর্থ। কিছুদিন পরপর তাদের মধ্যে জগড়া হয়। এই বিবাদে জড়ানো যেমন অপমানের না জড়ানোও অপমানের। আর স্বামী -স্ত্রীর এই কলহের খবর তাদের পুরানো ফ্রেন্ড সার্কেলের মধ্যেই চাউর হয়ে গেছে। যেটা আরো অপমানের। বন্ধুদের কেউ কেউ এটাকে অভিশাপ বলতে চায়। সেটা হচ্ছে ঐন্দ্রিলা কে রমণের ছ্যাকা দেয়ার অভিশাপ। ঐন্দ্রিলার বড় স্বপ্ন ছিল রমণকে নিয়ে। আর সে স্বপনে বিষ ঢেলেছিল নাকি তাজকিয়া। ঐন্দ্রিলাও মাঝে মাঝে তাদের সাথে যোগ দেয়। তারা দারুল কাবাবে মুরগির রান চিবাই আর রমণ-তাজকিয়ার কিস্তা কাহিনী চাউর করে। তারা বলতে চায় তাজকিয়াই ছিল যতসব নাটেরগুরু। তাজকিয়ার কারণেই রমণ ও ঐন্দ্রিলার মধ্যে ব্রেকআপ হয়েছে।
তবে এ সমালোচনা তাজকিয়া ও রমণের কাছে মূখ্য কোন বিষয় নয়। বিয়ের পর সকল দম্পতির কাছে সন্তান লাভ যেমন পরম চাওয়া তাদের কাছেও তাই। তারা এখন আল্লাহর কাছে শুধু যে কোন রকম একটা সন্তান চায়, কালো হোক আর ধলা হোক,ছেলে হোক আর মেয়ে হোক,ল্যাঙ্গা আঁতুর যাই হোক, শুধু তাদেরকে মা বাবা ডাকলেই চলবে। যার কারণে তারা এখন দ্রুত পদক্ষেপ নিতে চাই। ডাক্তারের কাছে তারা কাড়ি কাড়ি টাকা ঢেলেছে। কাজের কাজ কিছুই হয়নি। তাছাড়া পরস্পরকে দোষারোপ করার মনোভাব তাদের মধ্যে কথা কাটাকাটি থেকে অনেকটা হাতাহাতির পর্যায়েও নিয়ে গেছে। তাদের সংসার এখন যুদ্ধক্ষেত্র। যেন একই ক্যাম্পে দুইজন শত্রুকে পাশাপাশি ঘুমাতে হচ্ছে।
কলহ হবেনা কেন! আতœীয় স্বজন থেকে শুরু করে ফ্রেন্ড সার্কেল এমন কি বাসায় খয়রাত নিতে আসা ভিক্ষুকটি পর্যন্ত তাদের মাতৃত্ব বা পিতৃত্বের ব্যর্থতা নিয়ে কথা তুলে। রমণ মাঝে মাঝে এসব নিন্দুক বা সমালোচকদের মুখে থুতু ছিটায়। তার প্রশ্ন কেন, মানুষের ব্যক্তিগতজীবন নিয়ে তাদের এত কৌতুহল ?
অফিসে গেলে সহকর্মীদের যন্ত্রণা। বেড়াতে গেলে আত্মীয় স্বজনদের এবং বাড়িতে আবার মা বাবার ঘ্যানঘ্যানানি -এসব তাদের কাছে এখন একেবারেই অসহ্য। সবার একই কথা বলে। ছেলে-মেয়ে হচ্ছে না কেন? তাছাড়া সব দায় শেষমেষ তাজকিয়ার দিকেই ছুটে যায়। তখন তাজকিয়ার মুখের দিকে তাকানো যায়না। যেন মেয়ে হয়ে জন্মই তার পাপ।
এ বার থেকে তারা আর কোথাও যাবে না ঠিক করেছে। তার চেয়ে ঘরের কোণেই পড়ে থাকাই ভালো।কিন্তুরেহাই কি আছে? কাছের মানুষগুলোও কম শয়তান নয়। এইতো সেদিন রাতে আড়ালে শ্বাশুড়ির একটা বিশ্রী একটা গালি ছুটে বসলো। শ্বাশুড়ি বিছানা ঝাড়ু দিতে দিতে বলে,‘ ঢেমসি অজাইত্ত্যা মাগি খেয়ে খেয়ে শুধু চর্বি বাড়াচ্ছে। আমার কিন্তু নাতি নাতনি চাই চাই। নাহলে এসপার ওসপার কোন কিছু করেই ফেলবো।’ তাজকিয়ার শ্বাশুড়ি যে আড়লে আবডালে কত গালি দেয়। নিজের কাছের মানুষগুলো একথা বললে কে কান না দিয়ে পারে। তাছাড়া ছেলের অ্যাফেয়ার ম্যারেইজ প্রথম প্রথম তিনিও মানেননি। তবে রমণকে জেল খাটানোর কারণে তাজকিয়ার উপরে তার একটা প্রচ্ছন্ন রাগও আছে। আর এখন এত বছরেও সন্তান না হওয়ার কারণে সেই চাপা আগুন এখন আরো দ্বিগুন হয়ে কুলকাঠের মতো জ্বলছে।
৪।।
রাতে খাওয়া দাওয়ার পর তাজকিয়া এবং রমণ দুজনই টিভি দেখছিল। এমন সময় হঠাৎ বাবার কেরামতি নিয়ে টিভির পর্দা কেঁপে উঠলো। সাথে কাঁপলো রমণ ও তাজকিয়ারও বুক। কারণ সব কিছুর সারমর্ম ছিল সাক্ষাতেই সমাধান। নি:সন্তান দম্পতিদের সন্তান লাভের গ্যারান্টি তারমধ্যে আবার এক দম্পতিও বিবৃতি দিল। ‘আমরা সাতবছর নি:সন্তান ছিলাম। আমরা অনেক জায়গায় গিয়েছি। অবশষে আমরা বাবার আশীর্বাদে সন্তান লাভ করলাম। আমরা এখন খুব সুখী। ‘তাদেরি সুখের কথা শুনে তাজকিয়া, আরো অসুখী হয়ে পড়লো কারণ এসব বাবা টাবার প্রতি রমণের কোনো বিশ্বাস নেই। বরঞ্চ বাবাদের উপর রমণের একটা চাপা ক্ষোভ রয়েছে। তার কারণ শৈশবে তার সামনেই তার ছোট ভাই কে ঝাটা দিয়ে পিটিয়ে মেরেছিল। রমণ সব কিছু তখন বুঝতো শুধু প্রতিবাদ করতে পারেনি। কারণ জন্মদাতা বাবার ছিল সেই বাবার প্রতি গভীর বিশ্বাস। বাবার কথা শুনলেই রমণের সারা শরীর ঘৃনায় এবং ক্ষোভে রি রি করে উঠে। কেমন বর্বর হলে মানুষ একটা শিশুকে জিন তাড়ানোর নামে ঝাটা পিটা করে মারতে পারে। রমণের বুক থেকে সেই শোকের পাথরটা এখনো নামেনি।
রাস্তাঘাটে এসব ভন্ডবাবার আস্তানা দেখলে তার মুতে দিতে ইচ্ছে করে। ধর্মের আড়ালে ব্যবসা। এ কথা ভাবতে ভাবতে আবার তাদের কান ঝাঁঝরা হলো বাবার টিভি কাপাঁনো বিজ্ঞাপনে। এবার রমণ মনে মনে ভাবে, তিনিও কি তার ছোট ভাইয়ের খুনি সেই বাবার মতো? যে চুল দাড়িতে কচুরি পানার শিকড় বেধেঁ জট করে জটি ফকির বলে ধান্ধা করতো । ময়লা জামা, গলার মালা,গোঁফ দাড়ি শরীর থেকে গাজার গন্ধ ওয়াক থু রমণের হঠাৎ বমি আসলো
– একি এত রাতে তুমি বমি করছো কেন? কি হয়েছে? দেখি জ্বর টর আসছে কিনা?

– আরে দুর ছাই কিচ্ছুই হয়নি। তোমার ঐ ভন্ডবাবাটা।
-কি ভন্ড? কে ভন্ড? না জেনে মানুষের নামে গীবত করবে না।বাপ হওয়ার মুরোদ নাই পাড়াপরশী যখন সমালোচনা করেতখন বমি আসে না? আমি বাবার কাছে যাইতে বললে তোমার বমি আসে। তাছাড়া বাবার তো অনেক কেরামতি কথা নিজেই শুনলে। চব্বিশ ঘন্টার মধ্যে যে কোন সমস্যার সমাধান, নি:সন্তান দম্পতির সন্তাান লাভ। পানির উপর দিয়ে নাকি বাবা হেটে যেতেও পারে। কেরামতি না থাকলে কেউ কি পানির উপর দিয়ে হেঁটে যেতে পারে?
-তাহলে তোমার বাবারে বলো না ভূ-মধ্যসাগরে অভিবাসন প্রত্যাশি মানুষগুলোরে পার করাইতে। অথবা রোহিঙ্গাদের নাফ নদী পার করিয়ে দিতে। তাহলে আর এত গুলো নৌকাডুবি হতো না। আর মানুষও মরতো না।
৫।।
বাইরে রাত্রির ঘোর অন্ধকার। সাই সাই করে পাখা ঘুরছে। বাতাসে দেয়ালে ঝুলানো একটা ক্যালেন্ডার এর কয়েকটা পাতা পত পত করছে তাজকিয়ার চোখ দুটোতে একটু ঘুম আসে আবার যায়। এর মধ্যে একটা কাক হঠাৎ নিদ্রা ভেঙে ডেকে উঠল। তাজকিয়া চোখ খুলে রমণের কপালে হাত রাখল। আর বলল
-শুনো রমণ। আমিও তো পীর টীর এ গুলোতে বিশ্বাসী নই।
– তাহলে কেন যেতে বলছো?
– ওই যে আমাদের দুর্বলতায় মানুষ যে আঘাত করছে! এই জন্য একটু চেষ্টা তদবির করতে বলেছি। এতে তুমি রাগ করোনা। আল্লাহর নাম নিয়ে চলো গিয়ে দেখি।
– ঠিক আছে গিয়ে দেখতে পারো। তবে ভন্ডামী আমার পছন্দ নয়। ভন্ডামী করলে আমি সহ্য করবো না। সারারাত দুজনই উত্তেজনায় ঘুমাতে পারেনি। তবে এই উত্তেজনায়ও ভিন্নতা আছে। সকালে দুজনই অনেক দেরি করে উঠলো। তবে তাজকিয়ার শ্বাশুড়ি কিছুই বললনা। আড়ালেই সব শুনে গেলেন। কারণ তিনি এ ব্যাপারে ভালো জানেন। ডায়াবেটিস রোগী বেশি তেমন কিছু খায়না। দু একটা রুটি আর অল্প ভাজি ছাড়া। তিনি আজ নিজের রুটিটা নিজেই বানিয়ে খেলেন।
শুক্রবারের সকাল। এ রকম সকালে রমণ অনেকটা আয়েশ করে ঘুমায়। সপ্তাহ ব্যাপী চাকরির ব্যস্ততা ও ক্লান্তিগুলোকে এই দুইদিনে ঘসে ঘসে তুলে। কিন্তু ঘুমে- জাগরণে একটা পাখির ডাক তাকে শৈশবেই নিয়ে গেল। রমণের মা বলতো এই পাখিটা নাকি গোশ্ত কুটোনী পাখি। অর্থাৎ এই পাখি ডাকলে নাকি মেহমান আসে। তাই পাখিটি গুশ্ত কুটো গুশ্ত কুটো বলে রব করছিল। রমণ একটু পাশ ফিরল। দেখল জানলার পর্দার ফোকর দিয়ে শো শো করে বাতাস ঢুকছে।রমণ উঠে পড়ল। ধীর পায়ে রান্নাঘরে গিয়ে দেখল তাজকিয়ার হাত রক্তে সয়লাব হয়ে গেছে।
সকাল সকাল তাজকিয়ার শ্বশুর তাজা তাজা ইলিশ নিয়ে আসলো। ইলিশের নাকি জোঁ চলছে। তাই দামেও সস্তা মানেও ভাল। সুতরাং জোড়া ইলিশে তার রসনা বিলাস হবে আজ। তাজকিয়া খুব সতর্কতার সাথে ইলিশের পেটে এক াতে ধরে হাতের দুই আঙ্গ্গুুল ঢুকিয়ে অন্যহাতে পেট টিপেটিপে ডিম বের করে করছে।’ ইস এতো ডিম! ‘তাজকিয়ার আফসোস হয়। ‘কেন মানুষ এতো নিষ্ঠুর?এই ডিমঅলা ইলিশগুলো কেন যে মারে! একেবারে লাখ লাখ কোটি কোটি ইলিশ সন্তান কে হত্যার সামিল!’
মাছ কাটতে কাটতে তাজকিয়ার মাথাটা চক্কর দিয়ে উঠল। সে মাছ কাটার বটকি টা তাড়াতাড়ি দিয়ে ঠেলে দিয়ে হাত ধুয়ে বিছানায় শুয়ে পড়ল। বেমি রক্ত দেখলে তার মাথা এমনিতেই ঘোরে। আড়াল থেকে শ্বাশুড়ি দেখে রইল এবং তার বুঝতে বাকি নেই তার বৌ মা খুব টেনশনে আছে। কারণ গতকালই তারা ঠিক করেছে বাবার কাছে যাবে। তাই সকাল সকাল তার প্রাণটা কেমন জানি জেগে উঠল। উত্তেজনায় আহ্লাদী হয়ে ঘরদোর গোছাচ্ছিল কিন্তু আগের রাতটা যে নির্ঘুম কাটল তা একেবারে ভুলে গেছে। হয়তো রক্ত চাপ বেড়ে গেছে। এর মধ্যে লাইজু চলে আসলো। তাজকিয়ার শ্বাশুড়ি বলল, শুনো বুয়া, মাছগুলো ভালো করে কেটে কুটে রান্না করো। আর শুনো ডিমগুলো কড়া করে পেয়াজ দিয়ে ভূনা করো। যাতে বৌ মা খেয়ে বের হতে পারে।
তাজকিয়ার মনে আজ অনেক খুশি। সে চোখ বন্ধ করে শ্বাশুড়ির কথাগুলো শুনে। যদি সন্তান লাভ হয়। যদি মনের আশা পূর্ণ হয়। যদি বংশের প্রদীপ বা উত্তরাধীকারের আগমন ঘটে, তাহলে যা চায় বাবাকে দিতে রাজি।
আকাশে কটকটে রোদ। গরমে ভিজে গেল রমণের ভিতরের গেঞ্জিটা। শাদা শার্টের ভিতরটা পরিস্কার দেখা যাচ্ছে। খুব দ্রুত পৌঁছে গেল বাবার দরবারে। ড্রাইভার আসেনি। তার প্রতিবেশি নাকি মারা গেছে। যে কোন গুরুত্বপূর্ণকাজে ড্রাইভারের কাজটা আরো গুরুত্বপূর্ণ হয়ে যায়। এ এক জ্বালা!অটোরিকশার চালককে দু শ টাকা ভাড়া দিল কিন্তু পঞ্চাশ টাকা রিটার্ন না নিয়ে বলল, ওগুলো আপনাকে বকশিশ দিলাম। একটা মকসুদ নিয়ে বের হয়েছি। দোয়া করিয়েন।
৬।।
বাবার বাসায় ঢুকতেই সামনে পড়ল এক বিশাল ডিজিটাল ব্যানার। বাবার ছবি এবং তার কেরামতির ফিরিস্তি। প্রথমেই চোখে পড়ল বাবার অভ্যর্থনা কক্ষ। দ্বিতীয় কক্ষ আগুন ফকিরের মাজার। আগুন ফকির আগুনে পুড়ে মরে ছাই হলেও সে নাকি এখনও জিন্দা ঘুমাচ্ছেন এই মাজারে। কোন একসময় নাকি নিজের কেরামতির আগুনে পুড়ে ভস্ম হয়েও আবার মমি হয়ে আছেন এখানে। বুল্লা নাকি তার একনিষ্ঠ খাদেম ছিল। মাজারে পাথরের ফলকে এমনই লেখা। উপরে দামি লাল গিলাপে ঢাকা এই মাজারটিই বুল্লা বাবার বড় সম্পদ। তবে এ নিয়ে অন্যকথাও আছে। অনেকে বলে, আগুন ফকির নাকি আদৌ কোন ফকির ছিলনা। তিনি ছিলেন একজন পাগল। শহরের ডাস্টবিন থেকে পঁচা বাসি খাবার খেয়ে ফুটপাতে ঘুমাতো। আর বুল্লা ছিল ঐ ফুটপাতের হকার। তখন সে ছিল তাগড়া জোয়ান। বলদের মতো রাতদিন খাটতো কিন্তু কপাল খোলেনি বুল্লার। একদিন তার মাথায় ভুত চাপলো। হঠাৎ বড় লোক হওয়ার স্বপ্ন দেখল বুল্লা। অবশেষে বুল্লা ফন্দি আটলো। ইদের দিন সারামাসটা খুব ব্যস্ত কাটলো বুল্লার। বেচাকেনায় এত মগ্ন ছিল যে যথাসময়ে টিকিট করতেই ভুলে গেলো। ফুটপাতে বেচাকেনা ও মানুষ দেখতে দেখতেই মাস গেলো বুল্লার।ফলাফল বুল্লা বাড়ি যেতে পারেনি। রাতের শহর। কোন জনমানব নেই। সব মার্কেট বন্ধ। মার্কেট ওবুথগুলোতে জনা কয়েক সিকিউরিটি গার্ড ছাড়া। বুল্লার গায়ে আদিমতা ভর করলো। ইদের ছুটিতে শহরের ডাস্টবিনে আর কোন খাবার নেই। সিটিকপোরেশন কর্মিরা পরিস্কার করে বিøচিং পাউডার ছিটিয়ে দিয়েছে।ক্ষুধায় কাতর পাগলটি ছিল খুব পিপাসার্ত। সে পাগলটিকে একবোতল ফান্টায় একপাতা ঘুুমের ওষুধ মিশিয়ে খাওয়াইল।পাগলটি তা মজা করে ঢক ঢক করে গিললো। তারপর দিল জীবনের শেষ ঘুম। এর পর বুল্লা চোখ বন্ধ করে তার শরীরে দিল আগুন। আগুন দিয়ে বুল্লা দিনে যে চৌকিতে পোশাকের পসরাত সাজাতো সে চৌকির নিচে বসে পাহারা দিল। শুধু অদূরে পাশের এটিএম বুথের একজন সিকিউরিটি বুথের ভিতর থেকে দরজার ফাঁক দিয়ে এই ন্যাক্কারজনক কান্ডটি দেখছিল। অনেকদিন পর সে এই সত্য প্রকাশ করছিল। কিন্তু ততদিনে বুল্লার বানানো মাজারে চুন লেপালেপিতে সব সত্য শাদা চুনের নিচে চাপা পড়ছিল। এই মাজারটির ডানে ঘুরে অনেকটা সরসংকীর্ণ পথ অতিক্রম করলেই বুল্লা বাবার দরবার। আলিশান ফুল, পত্র পল্লবে সাজানো বাবার ঘুমানোর পালঙ্ক। হিন্দু ভক্তরা বাবাকে এসব ফুল ফল দিয়ে যায় প্রতিদিন। বাবা এখান থেকে বের হয়না। বাবার গদির পেছনে সৌখিন শিল্পির আঁকা ইয়া বড় এক ডানাঅলা পরীর ছবি। সমগ্র জিন জাতির বাদশাহ। তার প্রমাণে এই ছবি রাখা। তাছাড়া রমণ বুঝতে পারল এ তার শৈশবে দেখা ভাইকে মেরে ফেলার সেই বাবার মতো নয়। সেই বাবা ছিল অনেকটা পেরত। নোংরা একটা ভন্ড। চুল থেক ছালাপঁচা গন্ধ আসতো। আর এই বাবার ছবি দেখে বুঝতে পারল এই বাবার পুঁজিও ভালো এবং লক্ষ্যও উচু দরের কাস্টমার । বাবা পোশাক আশাকে অনেকটা স্মার্ট। এই ডিজিটাল যুগে মার্কেটিং ভালই বুঝেন বাবা। তবে বাবা আধ্যাতিœক সাধক হলেও বাবার রোমে কোন জায়নামাজ নেই। তার নাকি শরিয়ত পালন করতে হয় না। সে নাকি এগুলোর উর্ধে। রমণ ঘুরে ঘুরে দর্শনার্থীর মতো পর্যবক্ষণ করছেন। আড়াল থেকে দেখল,বাবা আলিশান পাগড়ি পরে তজবি জপছে। বাহ! পাশে ক্যাশ বাক্সও রাখছে। একজন খাদেম নিয়ে গেলেন বাবার কক্ষে। দরজার পেছনে আরেকটা ডিজিটাল ব্যানার আবার চোখে পড়ল। বড় বড় রঙিন অক্ষরে লেখা” উপমহাদেশের বিখ্যাত তান্ত্রিক সাধকগুরু ,সমগ্র জিন জাতির বাদশাহ, কোরান,গীতা বাইবেল বিশারদ,পরিস্তান গ্রাজুয়েট মগাতান্ত্রিক সাধক ইত্যাদি ইত্যাদি…
বাবা আড়চোখে তাকালেন তাজকিয়ার দিকে। কেমন জানি সুনশান ভৌতিক পরিবেশ। জিনটিন ভাব দেখানোর জন্য হয়তো এমন আবহ করা হয়েছে। পাশে একজন যুবক বসে আছে। প্রেমিকা নাকি এখন তার কথা শোনেনা। তাকে এড়িয়ে চলে। তাই বাবার কাছে এসেছে রাজমোহনী তাবিজের জন্য। বাবা তাকে মেয়ে বশিকরণের মন্ত্র শিখালেন
“ধুল ধুল ধুলিয়ে
এই ধুল পরি দিনু
প্রেমিকা লাগিয়ে
হাত জলুক পা জলুক
জলুক মাথার বিষ
মুখ না দেখিলে
তোর কলিজা পুড়িয়ে
হইবে শেষ।”
এই বলে তার দিকে ঝুঁকে গলা ঝাঁকিয়ে দিল এক ঝাটার বারি আর ঝাটার বারি খেয়ে যুবক পকেট থেকে নতুন হাজার টাকার নোট বের করিয়ে দিলো। এটি দেখে রমণের মনটা কেমন জানি আবার বিষিয়ে উঠল। তাজকিয়ার জ্বালায় টিকতে না পেরেই এখানে আসা। তারপরও মনকে বলল, “থাক আসছি যখন দেখে যাই।”
৭।।
এই বার যুবক উঠলো। বাবা নজর দিলেন নি:সন্তান দম্পতির দিকে। কি কোন সন্তান হয়নি?
– না বাবা
-অনেক টাকা তো উড়াইছো। তারপর বাবার কাছে আসছো।
বাবাকে বিশ্বাস করতে মন চাই না বুঝি?
-না, না বাবা। আসলে…
– শুনো তাজকিয়া। সন্তান লাভের একটাই পদ্ধতি। সেটা হচ্ছে বিশ্বাস। আর এ জন্য জিন হাজির করতে হবে। তার কাছ থেকে পরামর্শ নিয়ে আমি তোমাদের চিকিৎসা করবো।
– একি বাবা আপনি তো আমার নামও জানেন।
– জানবো না কেন! আমি সব জানি। বাবার ওপর রমণের যে বিশ্বাস নেই সেটাও জানি। প্রেম করে বিয়ে করছো সেটাও জানি। নিষ্পাপ মেয়েটাকে ধোকা মেরেছো সেটাও জানি। বিয়ের পর সাথে সাথে সন্তান নাওনি। এনজয় করছো বেশ কয়েক বছর। সব তথ্য আমার জিনগুলো আমাকে দিয়ে দেয়। জিনের বাদশাহ আর এমনি এমনি হয়েছি?
বাবার এসব দরবেশী কথা শুনে দুজনই থ বনে গেলা। দুজনই জিহবায় কামড় খাইলো। যেন সত্যি সত্যি বাবা কিছুক্ষণের জন্য জিন হয়ে গেলেন।এরপর বাবা কিছুক্ষণ চোখ বন্ধ করে রাখলেন। এটা নাকি এস্তেহারা। চোখ খুলে রমণকে বললেন,”শুনো রমণ কিছুক্ষণের মধ্যেই আমার জিনটা হাজির হবে। সে আবার পর্দানশিন মহিলা জিন। অর্থাৎ ইনি হচ্ছেন পরী। তুমি যেহেতু পর পুরুষ তাই তোমাকে চলে যেতে হবে। তুমি বাইরে কক্ষে যাও। আধাঘন্টা পরে এসো। কেমন যেন নকল সুরে নাক টেনে টেনে কথাগুলো বললেন। বাবার কথা শুনে তাজকিয়ার শরীরে শিন করে একটা কাপঁন দিল। জীবনে কখনো জিন দেখেনি। কতরকম জিনের কথা শুনেছে। ভাবতেই গা কাঁটা দিয়ে উঠলো। রমণের মন কিছুতেই সাই দিচ্ছে না তাজকিয়াকে একা রেখে বাইরের কক্ষে আসতে। সে মনে মনে বলল,”ভেতরে থাকলে অসুবিধা কি? জিনের আবার পর্দা কি? শালা বদমাশ। “ রমণ বের হয়ে আসার পর বাবা তাজকিয়ার বুকেরদিকে চেয়ে রইলেন। সে জোরে একটা নিশ্বাস নিল। ভয়ে দম আটকে আসছে তার।বাবার দৃষ্টিকেন তার বুকের দিকে?সে ভাবলোতার পোশাক কি বেশি অশালীন? লম্বাঅফহোয়াইট কামিজের ভেতর গোলাপি ব্রা,গলায় চিকন শিকলের সোনার লকেট আর গরমে হাল্কা মেকআপ।তাজকিয়া তার ছটফট কাধে হাত রাখল। ব্রার ফিতাটা আরেকটু আঙ্গ্গুুল দিয়ে ভেতরে গুঁজে দিল। তারপরও তার অস্বস্তি কমলোনা। সে নিজেও তার চোখ জোড়া নিচু করে তার বুকটা এক ঝলক দেখে নিল। দেখলো নিশ্বাসের তালে তালে তার সুডৌল স্তন দুটো উঠানামা করছে। ছাত্রজীবনে এ নিয়ে সে কম ভোগেনি। কি ছেলে কি মেয়ে সবাই তার বুকের দিকে চেয়ে থাকতো। সুঠাম দেহ। চওড়া বুক। একহারা গড়ন। রাজহংসীর মতো গলা তার নিচে একটা কালো তিল। ছোট থাকতে ঘরে সবাই আদর করে ডাকতো পরী। দুটো ডানা পরিয়ে দিলে যেন সত্যি সত্যি আকাশে উড়াল দিবে। মা ভয় না পাওয়ার জন্য বলতো, ওরা তোর বুকের দিকে তাকায় না। তারা আসলে তোর তিলটার দিকে তাকায়। ফর্সা ত্বকে তিলগুলো মানুষের দৃষ্টি কাড়ে বেশি।
যাই হোক, সে বাবাকে সাহস করে বলল, আপনি আমার দিকে এভাবে চেয়ে আছেন কেন বাবা? বাবা বলল, আমি তোর কলবের দিক তাকাচ্ছি। তুই বেশি ভয় পাচ্ছিসরে মা। এই নে ধর জিন আসার আগেই এই দুধটুকু খেয়ে নে। এই বলে বাবা তার সামনে ফ্লাক্স থেকে এক গ্লাস দুধ ঢেলে দিলেন এবং বললেন,” এইবার তুই পরীর আসনে গিয়ে বস মা। বাবার আসনের ঠিক ডান পাশের ফুলে ফুলে সাজানো পালঙ্কটিই নাকি পরীর আসন। বাবার কাছে আগত সব নি:সন্তান মহিলাদের বাবা একই কথা বলে এবং এপালঙ্কে শোয়ায়। “তোমার সাথে সরাসরি মহিলা জিন কথা বলবে মা।” বাবা বলল। তার আগেই বাবার খাদেম একটা আয়না, এক ডজন মোমবাতি, কিছু জবা ফুল দিয়ে গেলো। এবার বাবা ভেতর থেকে তার রুমের দরজাটা বন্ধ করে দিল। দুধ খেয়েই তাজকিয়ার মাথাটা ভো ভো করে চক্কর দিল। সে রমণকে ডাক দেওয়ার চেষ্টা করল কিন্তু পারল না। বুঝতে পারছেনা তার কেন এমন লাগছে।
বাবাকে সে জিগ্যেস করতে চাইল এ কি দুধ তিনি খাওয়াইলেন! কিন্তু পারলো না। রাজ্যের সব ঘুম তা চোখে হানা দিল। বিছানায় ঢলে পড়ল তাজকিয়া । আগর বাতির গন্ধে ভরা নিরব নিস্তব্ধ কক্ষে হলুদ গাদায় ভরা বিছানায় যেন সত্যি সত্যি বাবার সেই কেরামতির আজ্ঞাবহ দাস একটা পরি শুয়ে রইল।
এদিকে রমণের টেনশান বাড়ছে। সে ক্যাশিয়ারকে জিগ্যেস করল বাবার কি হইছে এত দেরি করছে কেন? ক্যাশিয়ার একটু গলা উচিয়ে বলল, ভাই বাবার কাছে আসলে সবাই এরকম করেন কেন? ডাক্তারের কাছে গেলে তো ঘন্টার পর ঘন্টা চলে যায় তারপরও তো বসে থাকেন। তার আচরণে রমণের সন্দেহটা আরো বেড়ে গেলো। রমণের মোবাইল নেট চালু ছিল। সে মেসেঞ্জারে কয়েকজন বন্ধুকে আসার জন্য জরুরী বার্তা পাঠালো। তারপর পাড়ার আরও কয়েকজন বন্ধুকে সরাসরি ফোন দিল। তখন তারা ক্রিকেটে খেলা শেষ করে বাড়ি ফিরছিল। সবার হাতে ছিল একটা করে স্টাম্প। তারা দ্রুত গাড়ি নিয়ে চলে আসলো।
রমণের ভিতরের সূর্যটা প্রখর তাপ ছড়াচ্ছে। একবারে কুলকাঠের আগুনের মতো। মাথার মগজটা যেন ভট ভট করে সেদ্ধ হচ্ছে। দর দর করেকপাল বেয়ে ঘাম নামছে। শাদা শার্ট আর ভেতরের গেঞ্জিটা যেন মুহূর্তেই আরেক প্রস্থ ভিজে উঠল। সমগ্র জিনকুলের শিরোমনি বুল্লাবাবা সব জানেন কিন্তু কয়েকটা উদ্ধত জিন হননের ইচ্ছায় হাতে একটা করে স্টাম্প নিয়ে তার দিকে হন হন করে এগিয়ে আসছে শুধু তা জানলো না।