শুভ বুদ্ধপূর্ণিমা

বুদ্ধের শান্তি ও সুখের আহবান জগতে ছড়িয়ে পড়ুক

42

‘জগতের সকল প্রাণী সুখী হোক’ এ মন্ত্র মুগ্ধতা ছাড়িয়ে একসময় মানুষের মনে স্থান করে নিয়েছিলেন সিদ্ধার্থ। পরে বোধিজ্ঞান লাভের মাধ্যমে তিনি হয়ে উঠেছিলেন গৌতম বুদ্ধ। আজ সেই মহামতি গৌতম বুদ্ধের জন্ম, বোধিজ্ঞান ও মহাপরিনির্বাণ লাভের ঐতিহাসিক দিন। আজকের এ দিনটি শুভ বুদ্ধ পূর্ণিমা। বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীরা প্রধান ধর্মীয় উৎসব হিসাবে অত্যন্ত ধর্মীয় ভাবগম্ভির পরিবেশে আনন্দ ও উৎসবের সাথে পালন করে থাকেন। ইতিহাস থেকে জানা যায়, গৌতম বুদ্ধের শুভজন্ম, বোধিজ্ঞান ও মহাপরিনির্বাণ লাভ এই ত্রি-স্মৃতিবিজড়িত বৈশাখী পূর্ণিমা বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের কাছে এটি বুদ্ধ পূর্ণিমা নামে পরিচিত। যথাযথ ধর্মীয় ভাবগম্ভীর পরিবেশে বৌদ্ধ সম্প্রদায় তাদের এ প্রধান ধর্মীয় উৎসব উদ্যাপনের লক্ষ্যে নানা কর্মসূচি গ্রহণ করেছে। বিশ্ব শান্তি কামনায় প্রদীপ প্রজ্বলন ও সমবেত প্রার্থনা অনুষ্ঠিত হবে।
বুদ্ধ পূর্ণিমা বিশ্ব বৌদ্ধদের বৃহত্তম ধর্মীয় ও জাতীয় উৎসব। ইদানীং বিশ্বব্যাপী ঘটা করে বুদ্ধ পূর্ণিমা পালিত হতে দেখা যায়। জাতিসংঘের সদর দফতরে বুদ্ধ পূর্ণিমা উদ্যাপন করা হয়ে থাকে। সিদ্ধার্থের জন্ম, বুদ্ধত্ব লাভ এবং বুদ্ধের মহাপরিনির্বাণ লাভের মতো মহান ত্রি-স্মৃতিবিজড়িত শুভ বুদ্ধ পূর্ণিমা এখন সর্বজনীন উৎসব।
বাংলাদেশেও ব্যাপক আনুষ্ঠানিকতার মাধ্যমে বুদ্ধ পূর্ণিমা উদ্যাপিত হয়ে আসছে। এদিনে সরকারি ছুটি থাকে। মহামান্য রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী, ও সংসদের বিরোধীদলীয় নেতারা এদিন বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের শুভেচ্ছা বিনিময় করে থাকেন। স্থানীয় ও জাতীয় পত্রিকা বুদ্ধপূর্ণিমা উপলক্ষে বিশেষ ক্রোড়পত্র, সম্পাদকীয় এবং নিবন্ধ প্রকাশ করে থাকে। সরকারি ও বেসরকারি টিভি চ্যানেলে বুদ্ধ পূর্ণিমাবিষয়ক বিশেষ অনুষ্ঠান সম্প্রচার করতে দেখা যায়। তবে তা সংখ্যায় কম। অথচ বুদ্ধ পূর্ণিমার তাৎপর্য ও গুরুত্ব নিয়ে সংবাদ এবং গণমাধ্যমে আরও বেশি আলোচনা হওয়া দরকার। বৌদ্ধ ধর্মের প্রধান ধর্মীয় গ্রন্থ ত্রিপিটকে উল্লেখ আছে, জগৎ অনাচার, পাপাচারে নিমজ্জিত হলে জগতের কল্যাণে এবং মানুষকে জীবনের সঠিক পথ দেখাতে জীবের দুঃখমোচনে সম্যক সম্বুদ্ধের আবির্ভাব ঘটে। ভারতবর্ষে মানুষে মানুষে ভেদাভেদ জাত-পাতের চরম বৈষম্য, ধর্মের নামে প্রাণযজ্ঞ আর হিংসায় মানুষ যখন মেতে উঠল, মানুষকে আলোর পথ দেখাতে বুদ্ধ ধরায় এসেছিলেন। তিনি মানুষকে কেবল মানুষ হিসেবে দেখেছিলেন। তাঁর সাধনা ও সুখ কামনা ছিল সব প্রাণীর জন্য। বৌদ্ধ ধর্ম পৃথিবীর প্রাচীন ধর্মগুলোর অন্যতম। সকল প্রাণী সুখী হোক, এর চেয়ে মহান উচ্চারণ আর হয় না। বাংলাদেশে প্রচলিত ধর্মগুলোর মধ্যে বৌদ্ধ ধর্ম একটি। বলা দরকার, এ ভূখন্ডের প্রাচীনতম ধর্মও বটে। বৌদ্ধদের বিশেষ করে, ধর্মভীরু বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের জীবনযাত্রা লক্ষ্য করে দেখা যায়, তারা আন্তরিকভাবে সেবাধর্মে খুবই বিশ্বাসী এবং মানুষের কল্যাণ ছাড়া অন্য কোন চিন্তা তাদের অসুখী করে। এ রকম চিন্তা করা কারও উচিত নয় বলেই তারা মনে করেন। কিন্তু সম্প্রতি বিশ্বব্যাপী উগ্র মৌলবাদ ও সাম্প্রদায়িকতার যে উত্থান তা থেকে বৌদ্ধ ধর্মও বাদ যায় নি। সম্প্রতি মিয়ানমার , শ্রীলঙ্কা ও চীনের কিছু কিছু উগ্র ভিক্ষু ভিন্ন ধর্মাবলম্বীদের প্রতি যে বিদ্ধেষ ও প্রতিহিংসা চরিতার্থ করে চলছে তাতে শান্তিকামী মানুষ হতাশ না হয়ে পারছে না। অতি সম্প্রতি শ্রীলঙ্কায় ধর্মীয় উগ্রবাদীদের যে বর্বর হামলার ঘটনা ঘটেছে তা অতীতের ঘটনাসমূহের প্রতিশোধ বলেও অনেকে মন্তব্য করেছেন। আমরা মনে করি, কোন ধর্মই প্রতিশোধ ও প্রতিহিংসার মাধ্যমে মানুষের শান্তি ও কল্যাণ নিশ্চিত করতে পারে না। কারণ প্রত্যেক ধর্মের মূল বাণী হচ্ছে শান্তি শান্তি আর শান্তি। গৌতম বুদ্ধ এ শান্তি শুধু মানুষের জন্য কামনা করেন নি, বরং সকল প্রাণীর জন্যই তাঁর আহবান ছিল। আমরা আশা করি, আজ শুভ বুদ্ধ পূর্ণিমার আলোয় প্রজ্বলিত বিহারে প্রার্থনা হোক ‘জগতের সকল প্রাণী সুখী হোক’।
উল্লেখ্য যে, বৌদ্ধ ইতিহাস মতে, আজ থেকে প্রায় ২৬৪২ বছর পূর্বে গৌতম বুদ্ধের আবির্ভাব ঘটে। খ্রিস্টের জন্মের ৬২৩ বছর আগে সিদ্ধার্থের (পরবর্তী সময়ে গৌতম বুদ্ধ) জন্ম হয়। তিনি ৩৫ বছর বয়সে অর্থাৎ খ্রিস্টপূর্ব ৫৮৮ অব্দে বুদ্ধত্ব জ্ঞান বা বোধিজ্ঞান লাভ করেন। আর গৌতম বুদ্ধ মহাপরিনির্বাণ প্রাপ্ত হন ৮০ বছর বয়সে। অর্থাৎ (৬২৩-৮০) খ্রিস্টপূর্ব ৫৪৩ অব্দে।