বিশ্ব অর্থনৈতিক স্বার্থ এবং রাজনৈতিক সংঘাত

আবদুল হাই

18

বিশ্ব অর্থনৈতিক মন্দা শুরু হয় ২০০৮ সালে। তা বিশ্ব রাজনীতির ভিতকে দারুণভাবে নাড়া দেয়। চীন সাম্প্রতিকালে সামরিক শক্তি সামর্থেই কেবল বলীয়ান নয় এর সাথে সাথে অর্থনৈতিক সক্ষমতাও অর্জন করেছে যথেষ্ট। যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে পোশাক রপ্তানিতে একচ্ছত্র প্রভাব বিস্তার করে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য অঙ্গনে ১ নাম্বারে অবস্থান করছে। ঈযরহবংব ুঁধহ এর মূল্যমান হ্রাস করে সুলভমূল্যে পণ্যসামগ্রী রপ্তানি করে চীন স্বীয় পণ্যকে আন্তর্জাতিক বাজারে জনপ্রিয় করে তুলেছে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের বাজার এবং পণ্যমূল্যকে অধ্যয়ন করে ঐসব দেশে সুলভে দ্রব্য যোগান অব্যাহত রেখে আসছে। ইতিপূর্বে বাংলাদেশ বৈদ্যুতিক ঘাটতিজনিত সমস্যাকে মাথায় রেখে চীন সুলভে চার্জ লাইট, বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম, জেনারেটর ইত্যাদির বিস্তৃত বাজার সৃষ্টি করেছে। পণ্য সম্ভারগুলো আর্থিক ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে বিদ্যমান। মোবাইল মুটোফোনের বিরাট বাজার চীনের দখলে। আমাদের পাদুকা শিল্প চীনের হাতে পুরোপুরি পর্যুদস্তু এখন চীনের তৈরি সেন্ডেল, স্যু বাজার চীনের হস্তগত। কোটি কোটি টাকার খেলনা সামগ্রী চীন থেকেই আমদানি হয়। সৌদি আরবে হজ মৌসুমে টুপি, জায়নামাজ তদবির ছড়ার বিরাট চালান হয় চীন থেকে। বিশ্ব অর্থনৈতিক মন্দার মূলহোতা হচ্ছে চীন। পোশাক শিল্পে ১৩৬ ক্যাটাগরির আইটেম চীনের তৈরি। যেখানে বাংলাদেশে ১টি কোটের সেলাই দিতে হয় ২ থেকে ৩ হাজার টাকা সেক্ষেত্রে চীন ২০,০০ টাকর বিনিময়ে দৃষ্টিনন্দন কোট রপ্তানি করছে বাংলাদেশে। আমাদের দেশের রাষ্ট্রদূতরা বিদেশে অবস্থান করে শুধু বিরাট অঙ্কের বেতন ও সুযোগ সুবিধা ভোগ করে আসছে দেশের রপ্তানি বাণিজ্য এবং শ্রমবাজার খোঁজার ব্যাপারে এদের ভূমিকা নেই বললেই চলে।
এসব রাষ্ট্রদূতরা দেশের সম্পদ নয় বরং বোঝা। যাদের কর্মকান্ড আশাব্যঞ্জক নয় তাদের দেশে ফিরিয়ে আনা উচিত। প্রত্যেকটা দেশ স্বীয় স্বার্থের কথা চিন্তা করে। সৌদি আরবের কথায় ধরা যাক, যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান স্বীয় দেশের লোকদের কর্মসংস্থানের কথা চিন্তা করে বিদেশি শ্রমিক নিয়োগ বন্ধ করে দিচ্ছে। সেখানে সেলম্যানশীপ, গাড়ির চালনা, দোকানদারী, ব্যাংক, অফিস ক্ষেত্রে বিদেশিদেরকে নির্মমভাবে তাড়িয়ে তৎস্থলে সৌদি লোক নিয়োগের কথা ঘোষণা দিয়েছে। বিদেশি যারা পরিবার নিয়ে কর্মরত তাদের ক্ষেত্রে উচ্চতর ট্যাক্স আরোপ করে দিয়েছে। বলার এবং করার কিছুই নেই। সে দেশে বাংলাদেশের ২২ লক্ষ মানুষ জীবন জীবিকার তাগিদে অবস্থান করে আসছে। এরা যদি সবাই চলে আসে রেমিট্যান্সের ক্ষেত্রে আমাদের বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের পথ বন্ধ হয়ে যাবে।
বিগত এক দশকে তথা ২০০৮ এর বিশ্ব অর্থনৈতিক মন্দার পর থেকে বিশ্ব রাজনীতি এবং বিশ্ব অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন বা মেরুকরণ হয়েছে। যা অদ্যাবধি চলমান এছাড়া ও মার্কিন মন্দার পর পরই ২০০৯ সালে গ্রিস সরকারি ঋণ সংকটে পড়েছে। এ সংকটকালীন পরিস্থিতিতে ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত দেশগুলোর মধ্যে একাঙ্গীকরণ প্রক্রিয়া ও জোরদার হয়েছে। দ্বিতীয় পর্যায়ে সূচনা হয়েছে বিশ্বায়নের প্রতি স্বল্প প্রতিশ্রুতিবদ্ধ ট্রাম্পের প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হওয়ার মধ্যদিয়ে। এর ফলে ঊট বা ইউরোপিয়ান ইউনিয়নে জোটবদ্ধ থাকা নিয়ে শঙ্কার সৃষ্টি হয়েছে। ২০০৮ এর বিশ্বমন্দা পরবর্তী রাজনৈতিক অর্থনীতির তৃতীয় পর্যায়টি শুরু হয়। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বিভিন্ন দেশের শুল্ক বিরোধ বা শুল্ক যুদ্ধ শুরু হয়েছে। তা নতুন এক অধ্যায় সূচনা করে। সুলভমূল্যে চীনের উৎপাদিত পণ্য মার্কিন বাজারে প্রবেশের কারণে চীন অর্থনৈতিকভাবে শক্তিশালী হতে থাকে এটা মার্কিন সরকারের চক্ষুগুলোর কারণ যার জন্য চীনের বিরুদ্ধে শুল্ক যুদ্ধে অবতীর্ণ হয়ে চীনের রপ্তানি বাণিজ্যের ওপর প্রভাব বিস্তার করতে শুরু করেছে। পক্ষান্তরে বাংলাদেশের উত্তরোত্তর সাফল্য দেখে জিএসপি সুবিধা বন্ধ করে দিয়েছে। মার্কিন বাইং এলাইন্স আমাদের পোশাক শিল্প কারখানা পরিদর্শন করে বিভিন্ন নির্দেশনা ও ব্যবস্থাপত্র দিয়ে তাদের মত কারখানার পরিবেশ সৃষ্টি না করাতে অনেক পোশাক শিল্পে অর্ডার বাতিল করে দিয়েছে। রাজনৈতিক নতুন মেরুকরণ নিয়ে ঊট এর জোটবদ্ধ থাকা নিয়েও সৃষ্টি হয়েছে শঙ্কা। এর সাথে ইৎবীরঃ এর পরিবর্তে ঊীরঃ ভৎড়স ইৎবীরঃ এর সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে যা নতুন মাত্র যোগ করেছে। দ্বিতীয় বিশ্ব যুদ্ধোত্তরকালে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের মধ্যে সমান শুল্কহার প্রবর্তন করে বা শুল্করোহিত করে একটি সাধারণ বাজার সৃজনের প্রয়াস লক্ষ্য করা যায়। ইউরোপের সাধারণ বাজার (ঊঁৎড়ঢ়বধহ ঈড়সসড়হ গধৎশবঃ) প্রথম যে কয়েকটি দেশ এর সদস্য হয়, এসবের মধ্যে পশ্চিম জার্মানি, ফ্রান্স, বেলজিয়াম, ইটালি, নেদারল্যান্ড ও লাক্সেমবার্গ। ১৯৫০ সালে ঊট গঠিত হয় এ ছয় দেশ নিয়ে। পরবর্তীতে ১৯৭৩ সালে ব্রিটেন, ডেনমার্ক ও আয়ারল্যান্ড এ বাজারে যোগদান করায় বর্তমানে ঊট এর সদস্য সংখ্যা নয়। নিজেদের মধ্যে সামগ্রীক অর্থনৈতিক উন্নতিসাধনের জন্য এ সংস্থা গঠিত হয়েছিলো ১৯৫৭ সালে রোমে। সে সুবাদে অবাধে কয়লা, লোহা ও ইস্পাতের বাণিজ্য চলে এবং শিল্পে প্রভূত উন্নতি সাধিত হয় সাধারণ বাজার বহির্ভুত দেশের সাথে এ ছয়টি দেশকে। সমান শুল্ক হারে বাণিজ্য চালাতে হয়। এ সাধারণ বাজারে মূলধন ও শ্রমিক এক দেশ থেকে অন্য দেশে অবাধে যাতায়াত সুচিত হয়। অর্থনৈতিক উন্নয়ন সাধনের জন্য একটি ইউরোপীয় লগ্নী ব্যাংক গঠন হয়। ডলারের বিপরীত শক্তিশালী ইউরো মুদ্রা প্রচলন করা হয়।
ইউরোপীয় অবাধ বাণিজ্য অঞ্চল (ঊঁৎড়ঢ়বধহ ভৎবব ঃৎধফব অংংড়পরধঃরড়হ) সংক্ষেপে ঊঋঞঅ গঠিত হবার ফলে ব্রিটেন, সুইজারল্যান্ড, অস্ট্রিয়া, পর্তুগাল, সুইডেন, নরওয়ে ও ডেনমার্ক এসব দেশের মধ্যে বিনা শুল্কে অবাধ বাণিজ্য চলতো অন্যান্য দেশের সঙ্গে বাণিজ্য করতে নিজস্ব শুল্কনীতি গ্রহণ করতো। অবাধ বাণিজ্য এলাকা গঠিত হবার পর অন্তর্ভুক্ত দেশসমূহে বাণিজ্যিক উন্নতির হার হয়েছে ৪%, অথচ ইউরোপীয়ান সাধারণ উন্নতির হার ছিলো শতকরা ২৯ ভাগ।
এর মূল কারণ ছিলো সাধারণ সৃষ্টির মূল উদ্দেশ্য ছিলো সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নের প্রতিদ্ব›দ্বী শক্তি হিসেবে নিজেদের অর্থনীতি শক্তিশালী করা। কিন্তু অবাধ বাণিজ্য অঞ্চল গঠনকারী দেশের মধ্যে এমন কোন রাজনৈতিক উদ্দেশ্য ছিলো না। অবাধ বাণিজ্য সমিতির সদস্য রাষ্ট্র যতটা উৎসাহ নিয়ে ততটা উদ্দেশ্য সফল হয়নি। বিশেষত ১৯৭৩ সালে ব্রিটেনের ইউরোপীয় সাধারণ বাজারে যোগ দেওয়ায় অনেক সন্দেহ জন্ম দেয়।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাথে বিভিন্ন দেশের সঙ্গে শুল্ক যুদ্ধ শুরু হয়েছে। শুল্ক আরোপের সিদ্ধান্তের জন্য চীন ও অন্যান্য দেশের রপ্তানি বাণিজ্যের ওপর অশনিসংকেত শুরু হতে চলেছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র স্বীয় স্বার্থে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোকে বিনিয়োগে নিরুৎসাহিত করে সংঘাত ও যুদ্ধের মধ্যে ঠেলে দিয়েছে এর পাশাপাশি সিরিয়া সংঘাত আরব যুদ্ধজোট গঠনে উৎসাহিত করে আসছে।
উত্তেজনা প্রশমনের কোন উদ্যোগ নেই। ইরাক, লিবিয়াকে নাস্তা-নাবুত করে এখন কাতার, ইয়েমেন, ইরান, তুরস্কের মত দেশগুলোর উপর নব্য উপনিবেশিক অস্ত্র হিসেবে অবরোধ অস্ত্র প্রয়োগ শুরু করেছে। আমাদের মত ছোট দেশ বাংলাদেশ নব্য উপনিবেশিক অস্ত্র প্রয়োগের বাইরে নয়।
সাম্প্রতিক রোহিঙ্গা সমস্যা যতদূর মনে হয় দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতময় পরিস্থিতির দিকে ধাবিত হচ্ছে। তাই আমাদের সরকার বিনিয়োগ লঘু করে অত্যাধুনিক অস্ত্র সংগ্রহের ব্যাপারে উঠেপড়ে লেগেছে। বিরাট অঙ্কের অর্থব্যয়ের মাধ্যমে বাংলাদেশ সামরিক সক্ষমতা অর্জনে তৎপর। বিশ্ব পরিস্থিতি যেদিকে যাক, এসবের ফলে আমাদের অর্থনীতির সংকটে করণীয় স্থির খুব বেশি প্রয়োজন।

লেখক : অর্থনীতি বিশ্লেষক