বিশ্বের এক হাজারের মধ্যে নেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

লিটন দাশগুপ্ত

37

১৯২১ সালে বৃটিশ শাসনামলে অনেক চড়ায় উৎরায় পেরিয়ে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। শুরু থেকেই এই বিশ্ববিদ্যালয় ভারতবর্ষে দীর্ঘদিন যাবৎ প্রচুর খ্যাতি অর্জন করেছিল। কেবল ভারতবর্ষে নয়, বিশ্বে শীর্ষ স্থানীয় বিশ্ববিদ্যালয় গুলোর মধ্যে অন্যতম ছিল এই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। তাই একে প্রাচ্যের অক্সফোর্ড বলা হত। সেই প্রাচ্যের অক্সফোর্ড এখন বিশ্বের শীর্ষ এক হাজার বিশ্ববিদ্যালয়ের তালিকায় এর নাম নেই।
গত বৃহস্পতি বার লন্ডন ভিত্তিক শিক্ষা বিষয়ক সাময়িকী টাইমস হায়ার এডুকেশন কর্তৃক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর যে র‌্যাংঙ্কিং করা হয়েছে, তাতে প্রথম এক হাজারের মধ্যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্থান নেই। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন বাংলাদেশের কোন বিশ্ববিদ্যালয়ের নামই নেই। এখানে এই তালিকায় ভারতের ৩৬ টি বিশ্ববিদ্যালয় এবং পাকিস্থানের ৭ টি বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম রয়েছে। প্রথম স্থানে রয়েছে যুক্তরাজ্যের অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটি।
বৃটেনের লন্ডন ভিত্তিক শিক্ষা বিষয়ক সাময়িকী টাইমস হায়ার এডুকেশন কর্তৃক এই তালিকা তৈরী হয়েছে ৫ টি মানদন্ড বিশ্লেষণ করে। এই গুলো হলো- (১) শিক্ষার পরিবেশ (২) গবেষণার সংখ্যা (৩) গবেষণার উদ্ধৃতি (৪) গবেষণা থেকে আয় (৫) আন্তর্জাতিক যোগাযোগ। বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় বিশ্ববিদ্যালয় ছাড়াও গত মে মাসে এই সাময়িকী এশিয়ার সেরা বিশ্ববিদ্যালয়ের তালিকা প্রকাশ করে। সেখানে সেরা প্রায় ৫ শত বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম প্রকাশ করা হয়, এশিয়ার সেরা ৫ শয়ের মধ্যে বাংলাদেশের কোন বিশ্ববিদ্যালয় নেই।
অথচ এই বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রাক্তন ছাত্রছাত্রীর তালিকায় রয়েছে বাংলাদেশ রাষ্ট্রের জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, বর্তমান সরকারের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী দেশনেত্রী শেখ হাসিনা, প্রথম অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম, প্রথম প্রধান মন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ। পদার্থ বিজ্ঞানী এমএ ওয়াজেদ মিয়া, আব্দুল মতিন চৌধুরী, ডঃ অনুপম সেন, স্থপতি এফ আর খান, নোবেল বিজয়ী ডঃ মুহাম্মদ ইউনুস, কথা সাহিত্যিক বুদ্ধদেব বসু, হুমায়ূন আহমেদ, হুমায়ুন আজাদসহ আরো অনেক অনেক বরেণ্য ব্যক্তি।
এইতো গেল লন্ডন ভিত্তিক শিক্ষা বিষয়ক সাময়িকী টাইমস হায়ার এডুকেশন এর এক হাজার বিশ্ববিদ্যালয় গুলোর র‌্যাংঙ্কিং এর কথা। এটি ছাড়াও ইতোপূর্বে স্পেন ভিত্তিক একটি আন্তর্জাতিক গবেষণা কেন্দ্র ‘ওয়েবওমেটিক্স র‌্যাংঙ্কিং অব ওয়ার্ল্ড ইউনিভার্সিটিজ’ কর্তৃক বিশ্বের সেরা বিশ্ববিদ্যালয় গুলোকে র‌্যাংঙ্কিং করা হয়েছিল। সেখানে প্রথম দুই হাজার বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে বাংলাদেশের কোন বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম ছিলনা। এই তালিকাটিতে ২০৬১ তম বিশ্ববিদ্যালয়ের স্থান পায় বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, ২১৩৪ তম স্থানে রয়েছে বাংলাদেশ প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় বা বুয়েট, আর ২২৭৫ নম্বর তালিকায় রয়েছে এক কালের প্রাচ্যের অক্সফোর্ড খ্যাত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। এই তালিকায় ১ম স্থানে রয়েছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের হার্ভার্ট বিশ্ববিদ্যালয়।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এককালে শিক্ষক ছিলেন মহামহোপাধ্যায় হরপ্রসাদ শাস্ত্রী, রমেশ চন্দ্র মজুমদার, ডঃ মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ, ডঃ জ্যোতির্ময় গুহ ঠাকুরতা, মুনির চৌধুরী, মুহাম্মদ আব্দুল হাই, ডঃ আহমেদ শরীফ, আনোয়ার পাশা, গোবিন্দ চন্দ্র দেব, এনামুল হক, হরপ্রসাদ ভট্টাচার্য, সত্যেনন্দ্র নাথ বসু, শ্রীনিবাস কৃষ্ণান, ডঃ মুহাম্মদ ইব্রাহীম, নলিনী মোহন বসু প্রমুখ প্রথিতযশা ব্যক্তিবর্গ। এই বিদ্যাপিঠ প্রতিষ্ঠালগ্নে বিভিন্ন প্রথিতযশা বৃত্তিধারী ও বিজ্ঞানীদেও দ্বারা কঠোরভাবে মান নিয়ন্ত্রণ হবার প্রেক্ষাপটে, আর তাঁদের ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় শীর্ষস্থানীয় বিদ্যাপিঠ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সুখ্যাতি অর্জন করেছিল। বর্তমানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রায় ৪০ হাজার শিক্ষার্থী, ১৮শ এর উপর শিক্ষক রয়েছে।
একটি দেশ কতটুকু উন্নত হয়েছে বা আগামীতে কত টুকু পর্যায়ে উন্নীত হতে পারে তার সম্ভাব্য অনুমিত সিদ্ধান্ত গ্রহন করা যেতে পারে ঐ রাষ্ট্রের শিক্ষা সংক্রান্ত যাবতীয় তথ্যাবলীর উপর ভিত্তি করে। এখন কথা হচ্ছে শিক্ষার গুনগত মান বৃদ্ধি বা শিক্ষার মান উন্নয়ন জরুরী। বর্তমানে দেশে শতাধিক বিশ্ববিদ্যালয় রয়েছে। অনন্য সৌন্দর্যমন্ডিত সুরম্য বিশাল অট্টালিকা বিশিষ্ট ভৌত অবকাঠামো সমৃদ্ধ প্রতিষ্ঠান, কিংবা হাজার হাজার শিক্ষার্থী ভর্তি কিংবা শত শত শিক্ষক নিয়োগ, পাশের হার বৃদ্ধি ইত্যাদি শিক্ষার মান নির্দেশ করে না। শিক্ষার মান আন্তর্জাতিকভাবে গ্রহনযোগ্য হতে হবে। আমাদের ভুলে গেলে চলবেনা, তৎকালীন বৃটিশ সরকার এই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেছিল, আর সেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় একটি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠায় গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছিল। আর সেই রাষ্ট্রই হচ্ছে বাংলাদেশ। তাই বাংলাদেশের এই বিশ্ববিদ্যালয়কে বিশ্বের সেরা শীর্ষ তালিকায় স্থান করে নিতে হবে, ফিরিয়ে আনতে হবে হারানো গৌরব।