বিশ্বের এক হতাশ চিত্র

শাহাবুদ্দীন খালেদ চৌধুরী

20

দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের সময় তিন মিত্র শক্তি যুক্তরাষ্ট্র, ব্রিটেন এবং রাশিয়ার মধ্যে দু’টি শীর্ষ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়েছিল। ১৯৪৩ সালের নভেম্বর মাসে প্রথম সম্মেলনটি অনুষ্ঠিত হয়েছিল ইরানের রাজধানী তেহরানে এবং ১৯৪৫ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে দ্বিতীয় সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়েছিল ইয়াল্টাতে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ট্রুম্যান, ব্রিটেনের প্রধানমন্ত্রী চার্চিল এবং সোভিয়েট ইউনিয়নের একচ্ছত্র নেতা কমরেড্্ ষ্টালিন, উভয় সম্মেলনেই অংশগ্রহণ করেছিলেন। দু’টি সম্মেলনই অত্যন্ত সফলতার সহিত সম্পন্ন হয়েছিল। বিশ্বব্যাপি তখন এমন একটি আশার সঞ্চার হয়েছিল যে বিশ্বের মানুষের মধ্যে যে ঐক্য সৃষ্টি হয়েছে তা বহুকাল ব্যাপি অটুট থাকবে এবং বিশ্ব শান্তি কায়েম হবে। অস্ত্র প্রতিযোগিতা বন্ধ হবে। বিশ্বের সমস্ত সম্পদই মানবতার কল্যাণে ব্যবহার হবে। মানবতার বিজয় সুনিশ্চিত হবে। তদানীন্তন বিশ্বের সেরা ম্যাগাজিন আমেরিকার ‘Time’ এ ইয়াল্টা সম্মেলনের পরে বড় আশাবাদী হয়ে মন্তব্য করেছিল। ‘All doubts about the big three ability to co-operate in peace as well as in war seem to have been swept away’ অর্থাৎ ‘শান্তির সময় এবং যুদ্ধের সময় তিন শক্তির সহযোগিতার সক্ষমতা সম্পর্কে সবার সন্দেহ মুছে গেছে।’
যুদ্ধের সমাপ্তির পর দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের তিন মিত্রশক্তির শেষ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়েছিল জামার্নির পোর্টসডামে। উপস্থিতও ছিলেন তাঁরা তিন জনই। আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ট্রুম্যান, ব্রিটেনের প্রধানমন্ত্রী মি. চার্চিল এবং সোভিয়েট ইউনিয়নের কমরেড ষ্টালিন। যুদ্ধে মিত্রশক্তির বিজয়ের সূচনাতেই তাঁদের ভাবাবেগ কোথায় যেন উবে গেল। বিশ্বে কার শক্তিমত্তা বেশি হবে (বিশেষ করে আমেরিকার এবং সোভিয়েট ইউনিয়নের মধ্যে) এ নিয়ে ঠান্ডা যুদ্ধ শুরু হয়ে গেল। তাঁদের মধ্যে আনুষ্ঠানিক বৈঠক আরম্ভ হয়েছিল ১৬ জুলাই ১৯৪৫ সালে। কিন্তু বিশ্ব মানবতার ভাগ্যের পরিহাস এই সম্মেলনে মিত্রশক্তিগুলোর মধ্যে পারস্পরিক কোন সমস্যার ত কোন সামাধান হলো না বরং উপস্থিত সমস্ত সমস্যাবলি জটিল আকার ধারণ করল।
পরস্পরের প্রতি আক্রমনাত্মক মনোভাব শুরু হয়ে গেল। এই সম্মেলনে কোন সমস্যারই সমাধান হলনা বরং সে সম্মেলন থেকে পরষ্পরের প্রতি আক্রমান্তক মনোভাব প্রত্যেকের জাতীয় নীতিতে পরিণত হয়ে গেল। আমেরিকা এবং সোভিয়েট ইউনিয়নের আন্তর্জাতিক বিভিন্ন বিষয়ের উপর ঐক্যমতের অভাবে আমেরিকা এবং রাশিয়ার মধ্যে ঠান্ডা যুদ্ধ শুরু হলো। বিশ্বব্যাপি এই ঠান্ডা যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়ল। জাতিসংঘের মতো যেসব প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা হয়েছিল, সেসব প্রতিষ্ঠানগুলি দুই পরাশক্তির ঐক্যমতের অভাবে প্রাণহীন হয়ে পড়ল এবং দুই পরাশক্তির মধ্যে পারমাণবিক অস্ত্রের প্রতিযোগিতা এমনভাবে আরম্ভ হল যে অতি অল্প সময়ে উভয়দেশ কয়েকটা পৃথিবী এক সাথে ধ্বংস করার ক্ষমতা সম্পন্ন আণবিক অস্ত্রের ভান্ডার গড়ে তুলতে দ্বিধা করল না। পোর্টসডামে তিন পরাশক্তির মধ্যে শান্তি চুক্তির পরিবর্তে যে ঠান্ডা যুদ্ধের সূচনা হয়েছিল তা এখন বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে তীব্রভাবে চলছে।
প্রথম বিশ্বযুদ্ধে প্রায় ৯ মিলিয়ন (৯০ লক্ষ) লোক মারা গিয়েছিল। কিন্তু প্রথম বিশ্বযুদ্ধের কারণগুলি এত অস্পষ্ট ছিল, এখনও প্রথম মহাযুদ্ধের কারণগুলি নিয়ে বিতর্কের শেষ নেই। দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের ক্ষয়ক্ষতি প্রথম বিশ্বযুদ্ধের চাইতে অনেক বেশি। যুদ্ধক্ষেত্রেই ১৫ মিলিয়ন অর্থাৎ দেড় কোটি মানুষ মারা গিয়েছিল। দ্বিতীয় মহাযুদ্ধে মৃতের সংখ্যা সর্বমোট ৬০ মিলিয়ন বা ৬ কোটি বলে স্থির করা হয়েছে। দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের সময় যুক্তরাষ্ট্রের কাছে তিনটি এটম্ বোমা ছিল আর কোন দেশের কাছে কোন আণবিক অস্ত্র ছিলনা। কিন্তু বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া গ্রেট ব্রিটেন, ফ্রান্স, চীন এমন কি ভারত, পাকিস্তান এবং উত্তরকোরীয়াও আণবিক অস্ত্রের অধিকারী। অনেকের বদ্ধমূল ধারণা যে ইসরাইলেরও আণবিক বোমা রয়েছে। বিশেষজ্ঞদের হিসাব মতে বিশে^ বর্তমানে সত্তর হাজারের মতো আণবিক বোমা রয়েছে। এদের প্রত্যেকটা বোমা হিরোশিমা নাগাসাকিতে যে বোমা ব্যবহার করা হয়েছিল তার চাইতে অনেক বেশি শক্তিশালী। বর্তমানে বিশ্বে বিভিন্ন দেশের কাছে যে আণবিক বোমার মজুত রয়েছে তাতে কয়েকটা পৃথিবী ধ্বংস করা যাবে।
জাতিসংঘ গঠন হওয়ার পর থেকে সারা বিশ্বে এক শত বিশটিরও বেশি বিশ্বের বিভিন্ন দেশে যুদ্ধ সংঘটিত হয়েছে। এই সব যুদ্ধে এই পর্যন্ত ১৮ মিলিয়ন বা ১কোটি ৮০ লক্ষ লোকের মৃত্যু হয়েছে। সোভিয়েট ইউনিয়নের প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী নিকিতা ক্রুশ্চেভ একবার বলেছিলেন, There are those who don’t seem able to get into their heads that in the next war, victory would be barely distinguishable from the vanquished. A war between Soviet Union and the United States would almost certainly end in mutual defeat. অর্থাৎ কতকগুলি মানুষ একথাটা তাদের মাথায় ঢোকাতে সক্ষম হয় না যে, আগামী যুদ্ধে বিজয়ী আর পরাজিতদের মধ্যে পার্থক্য করা যাবে না। সোভিয়েট ইউনিয়ন এবং যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে যেকোন যুদ্ধে নিশ্চিতভাবে উভয়েরই পরাজয় ঘটবে।
বিংশ শতাব্দীতে মানবজাতির কারিগরী উন্নয়ন তাদের রাজনৈতিক এবং আধ্যাত্মিক উন্নয়নকে ছাড়িয়ে গেছে। একবিংশ শতাব্দীতেও এই হারে উন্নয়ন ঘটলে মানবজাতি ক্ষতিগ্রস্ত হবে। কারণ মানবজাতির যদি শুধু বৈষয়িক উন্নয়ন হয়ে থাকে এবং রাজনৈতিক ও আধ্যাত্মিক উন্নয়ন বন্ধ থাকে তাহলে নিশ্চিতভাবে সে অবস্থা মানবজাতিকে ধ্বংস করে দিবে। রাজনৈতিক এবং নৈতিক উন্নতির সাথে সাথে যুদ্ধের আশংকা কমে যাবে এবং শান্তি প্রতিষ্ঠার কারণে সুবিধাদি (Opportunities) বেড়ে যাবে।
SIPRT(International Peace Research Institute) নামে একটি সংস্থার হিসাব মতে শুধু ২০১৫ সালেই বিশ্বের দেশ রক্ষাখাতে খরচ করা হয়েছে ১৬৭৫ বিলিয়ন ডলার। এই টাকার যদি শুধু মাত্র ১৩ শতাংশ খরচ করা হয় বিশ্বে ক্ষুধা সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে। সারা বিশ্বয়ের প্রাইমারি এবং মাধ্যমিক শিক্ষার জন্য ঐ টাকার অর্থাৎ (১৬৭৫ বিলিয়ন) এর ১২ ভাগ খরচ করলে সমস্যার সমাধান হয়ে যায়। সারা বিশ্বের মানুষের স্বাস্থ্য সেবার জন্য ঐ টাকার শতকরা মাত্র ৫ শতাংশ যথেষ্ট বলে বিবেচিত হবে। বিশ্বের যে সব নেত্রীবৃন্দ মানুষকে উপবাস রেখে মানুষকে মারার অস্ত্র তৈয়ার করে এবং তাদেরই টাকায়। এই সব নেত্রীবৃন্দের কোন বিবেক আছে ইহা মনে করাই পাপ হবে।
সম্প্রতি আণবিক অস্ত্র সমৃদ্ধ ৯টি দেশের মধ্যে ৭টি দেশের জনমত জরিপ করে জানা যায় ঐ সব দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ লোক পারমাণবিক অস্ত্রের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে। এত বিরোধিতা সত্তে¡ও ২০১১ সালে পারমাণবিকসমৃদ্ধ দেশগুলি ১০৫ বিলিয়ন ডলার খরচ করেছে। প্রতি ঘণ্টায় অগণিত মানুষ সারা বিশ্বে অনাহারে মারা যাচ্ছে। কিন্তু বিশ্বে পারমাণবিক অস্ত্রের উৎপাদন, রক্ষণ এবং আধুনিকায়নে প্রতি ঘণ্টায় ১২ মিলিয়ন ডলার খরচ করা হচ্ছে।
রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন সম্প্রতি চতুর্থবারের মত রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হয়েছেন। নির্বাচিত হওয়ার পরে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের সাম্প্রতিক বাণিজ্য যুদ্ধের তীব্র সমালোচনা করেছেন। তিনি তৃতীয় বিশ্ব যুদ্ধের আশংকা করছেন এবং হুশিয়ারী উচ্চারণ করে বলেছেন যে তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ, বিশ্ব সভ্যতার অবসান ঘটাবে। কিন্তু তিনিও প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের মাত্র মাস খানেক আগে রাশিয়ার পারমাণবিক অস্ত্রভান্ডারে নতুন এবং অত্যাধুনিক অস্ত্রের নতুন সংযোজনের কথা গর্বভরে ঘোষণা করেছিলেন।
পরিশেষ যুক্তরাষ্ট্রের প্রাক্তন প্রেসিডেন্ট এবং চীনের সাথে যুক্তরাষ্ট্রের বিশ্বব্যাপি আলোড়ন সৃষ্টিকারী ক‚টনৈতিক এবং বিশাল বাণিজ্যিক সম্পর্কের রূপকার নিক্সনের লেখা ‘১৯৯৯’ বই থেকে উদ্ধৃতি দিয়ে আমার লেখার ইতি টানব। ঐ বইতে তিনি ভারত এবং পাকিস্তান সম্পর্কে লিখেছেন- For two poorest nations in the world to be spending $8 billion a year for arms to be used against each other is obscene. The time is long past for strong statesmen in both the countries to declare peace with each other and declare war on the poverty that plaque both the countries.’ অর্থাৎ ‘বিশ্বের দুটি দরিদ্রতম দেশ বৎসরে ৮ বিলিয়ন ডলার অস্ত্রের জন্য খরচ করছে, এক দেশ অপর দেশের বিরুদ্ধে। অথচ উভয় দেশ শক্তিশালী নেতৃত্ব কায়েম করে এবং উভয় দেশের মধ্যে শান্তি স্থাপন করে, দারিদ্রের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করার সময় অতীত হয়ে গেছে।’

লেখক : কলামিস্ট