বিশ্বাসের এক কঠিন ধ্বনি’র কবি আল মাহমুদ

মোস্তফা হায়দার

29

একজন কবি আল মাহমুদ। ভালবাসেন শব্দ, ভালবাসেন মা -মাটি ও মানুষ। ভালবাসেন শোকড়ের নিংড়ে চাষাবাদ করা লোকজ ঐতিহ্য। কবিতারা দূর্বোধ্যতার সীমারেখায় এসে এক নতুন দ্রাঘিমার সরুপথ আবিস্কার করে। আর গল্প বসবাসের আড়ালে পড়ে থাকা অথবা ঝরো হাওয়ায় খসে যাওয়া বনের বাস্তবচিত্রের মাসি মার হাতে লোহার চ্যাকা খাওয়া চিত্রকল্প অথবা প্রেয়সী মধ্যরাতে সুকৌশলে বিছানা ছেড়ে নতুন স্বাদ আস্বাদন করে এলিয়ে দেয়া যৌনতা, মৌনতার কথা সুন্দর কাঠামোতে উপস্থাপন করার নামই।
কাব্যের ঢঙ যখন খাসা হাতে তুলে এনে রূপ দিলেন একনতুন ধরণের যুথবদ্ধতার হাত ধরে তখন শব্দই আল মাহমুদ কে এনে দিলেন কবিত্বের খেতাব। কবিতাপত্রেরা কবিকে চিনতে ভুল করেনি। শব্দরা এ কবিকে ভালবাসতে বাসতে বানিয়ে ছাড়লেন সব কাজের শক্তিশালি এক কাজী।
আল মাহমুদ যখন শব্দকে আলিঙ্গন করেন তখন মনে হয় যেন সাপের বীন বাঁধা এক চিত্রের মতো বাক্য গঠন করে বলে যান সমাজের কথা,সত্যের কথা এবং নিরেট বাস্তবতার কথা। গল্প বাস্তবতায় ঘটে যাওয়া সময়ের জীবনপ্রণালী নিয়ে রঙের ফসরা সাজিয়ে হাটে। গল্প কথা বলে সময়ের। গল্প হাঁটে বাক্যের বাহাদুরিতে, চিত্রের সোহাগে।আল মাহমুদ এ কথাশিল্পের হেরেমে এমন এক স্থান দখল করে আছেন যেখানে অনেকের টিকেট পেতে সময় লাগবে আরো কিছুকাল।
কথাশিল্পের এ যাত্রায় আজ কবি আল মাহমুদের ৮৪তম জন্মদিবস।
বরষার এ ঘনবরিষণে ধুয়ে যায় আপাত ঝঞ্জাটের স্মৃতিটুকু তথা মসৃন মৃত্তিকায় লেগে থাকা খড়কুটো। যে টুকুতে কলুষিত বিষাক্ততা ছেয়ে গিয়ে পরিবেশ হয়ে যায় ধোঁয়াটে। তেমনি সময়ের হিজাবে চোখ রেখে আজ জাতি স্মরণ করতে বসেছে এক সিকি কম শতাব্দীর এক বটবৃক্ষকে। যে বৃক্ষের চতুর্পাশ ছেয়ে আছে সত্য, সুন্দর, আধুনিকতার সবটুকু নিয়ে। একজন মানুষের স্বপ্ন আর চাহিদার রৈখিকতায় ভালোবাসার বহির্প্রকাশ যেন একত্ববাদের কাছে নুয়ে দিয়ে বিশ্বাসের পরিধির করেছে সম্মান। ‘পাখির কাছে ফৃলের কাছে’ এ লাইনটুকুতে দুটি জীবনের ব্যপ্তি খোঁজে পায় পাঠকমহল।সীমানার চাদরে আসলেই দুটো জীবন ভেসে ওঠে। ‘আদদুনিয়াও মাজরাতুল আখেরাত’ অর্থাৎ দুনিয়া আখেরাতের শস্যক্ষেত্র। পাখিজীবন কাটিয়ে স্বাধীনতার পরশ মেখে ইহকাল করে যেতে যান কর্মের ডানায় ভর করে। কর্মের সবটুকুর ইচ্ছের চাদরে বসে কবি যখন হয়ে যান আপাদমস্তক বিশ্বাসের সারথী, তখন কবিকে পাওয়া যাবে ফুলের পাঁপড়ির মতো মনের কাছে, সুন্দরের কাছে, বিশাল ও অনন্ত সুখের সুভিনিউর কাছে, আবেহায়াতের কাছে। কবির চিরন্তন বিশ্বাসের কাছে নুয়ে না গিয়ে প্রগতিবাদিতার ইচ্ছের কাছে কতক হয়েছে কবির বিরোধী। এভাবে হয় না! কারণ বিশ্বাসীরা বেঁচে থাকে বিশ্বাসের ডানায় চড়ে আর বিশ্বাসহীনতার কাররবারিরা বেঁচে থাকে ভুয়া প্রগতির লেবাস ধরে। কবি আল মাহমুদের লক্ষ ছিল বিশ্বাসের সৃষ্টাকে খোঁজে নেয়ার। সব কালে বা যুগে বা শকাব্দিতে কিছু বিপদগামিরা চেতনার নকশায় ভরে পূজা করে যায় মানুষের মতবাদের বা মানুষের কৃষ্টের। আল মাহমুদ এ জায়গায় তাঁর অবস্থান পরিস্কার করতে গিয়ে বলেন—
‘আল্লাহ সেপাই তিনি দুঃখীদের রাজা
যেখানে আযান দিতে ভয় পায় মোমিনেরা
আর মানুষ করে মানুষের পূঁজা,
সেখানেই আসেন তিনি’
(বখতিয়ারের ঘোড়া)
কবি নিজের বিশ্বাস ও সুমহান অস্তিত্বের কথা স্বীকার করেন আপন আলোয়। শুধু যে কবির তা নয়। এটা বিশ্বাসি সবার। কবির ভাষায়-
আমাদের আযানই তো আমাদের স্বাধীনতা
আমাদের সিজদাই কো প্রকৃত পক্ষে মনুষত্বের জয়গান।
……
এসো সিজদায় লুটিয়ে পড়ি
তারপর শুরু হোক আমাদের অফুরন্তগতি
আমাদের কি কোনো শেষ আছে?
(দিগ্বিজয়ের ধ্বনি- না কোন শূন্যতা মানিনা)
একজন মানুষ বেঁচে থাকে তার কর্মে, বিশ্বাসের সামিয়ানায় চড়ে। আস্থার সমন্বয়ে এসে কবিরা হারায় তার খেই। ইমরুল কায়েস জগতবাদি একবড় মাপের কবি হয়েও তার সময়ে পায়নি মুহাম্মদের মন। কে জানতো বিশ্বাসের কেদারায় চড়ে হাসসান বিন সাবিত হয়ে গেলেন তাওহীদবাদের এক সুপারিশপ্রাপ্ত সিপাহসালার। কেউ হারায় জাগতিকতা, কেউ হারায় বকেয়াবাদের বিশ্বাসের কোলাজ। অবাক করে বিষয় নিয়ে কবি আল মাহমুদও সফলভাবে চড়ে বসেছেন তাওহীদের পায়ায়। কবির ভাষায়—
‘আমরা তো বলেছি আমাদের যাত্রা অনন্তের কালের।
উদয় ও অস্তের ক্লান্তি আমাদের কোনোদিনই বিহবল করতে পারেনি।
আমাদের দেহ ক্ষতবিক্ষত
আমাদের রক্তে সবুজ হয়ে ইঠেছিল মূতারর প্রান্তর।
পৃখিবীতে যু গোলাপ ফুলফোটে তার লাল বর্ণ আমাদের রক্ত’
(আমাদের মিছিল – না কোন শূন্যতা মানি না)
কবির গন্তব্যের ভাববিষয় নিয়ে কবির চিনন্তাশীলুাই আমাদের জানান দেয় নুহের কিস্তির কথা। যে কিস্তিতে চড়ে পরবর্তী প্রজন্ম পেয়েছে বেঁচে থাকার নতুন অর্ঘ। নুহের ডাকে সাড়া দেয়া মানুষগুলোই আমাদের ইতিহাস। এবারের প্রজন্মের দায়। চিন্তাশীলকার নতুন মেরুকরণই বলা যায়। নজরুল আর ফররুখের পরের সারথিই বলা যায় কবি আল মাহমুদ কে। বহুদূর থেকে দেখেছেন বিশ্বাসের সুরের ইচ্ছে ঘুড়ি। যে ঘুড়ি উড়তে জানে আপনভাবে, আপনছন্দে। কবির ভাষায়—-
পৌঁছুতে চাই প্রভ‚ তোমার সান্নিধ্যে
তোমার সিংহাসনের নীচে একটি ফুরফুরে
প্রজাপতি হয়ে।
যার পাখায় আঁকা অনাদিকালের অনন্ত রহস্য।
(প্রার্থনার ভাষা – দ্বিতীয় ভাঙ্গন)
কবি বুঝতে পেরেছেন আরশের মালিকের চাদরের নিচের ছায়া বা কুরসির পায়ায় বসে থেকে পেতে চান তার বিশ্বাসের প্রতিদান। বিশ্বাসিরা মরে একবার। কাপুরুষ অথবা বিশ্বাসহীন জাতি মরে বার বার। আল মাহমুদ বিশ্বাসের সারথী হতে গিয়ে এ জাতির মগজে ঘুন ধরা লোকদের কাছে কিছুটা হেননস্তা হলেও বৃহত সমুদ্রের কোলে কবি হয়েছেন নন্দিত এক সাদা চাদরের প্রতিবিম্ব। বিশ্বাস তাঁকে চিন্তার ভাঁজ ভাঙ্গতে বাধ্য করলেও বিবেক শুন্যতার বন্ধুরা থেকে যাবেন ক্ষনিকের স্থানে। আর কবি আল মাহমুদ যাকে অনন্তের কানন ঘেঁসে আবেহায়াতের কাছে, সাদা ফুলের কাছে, মৌ মৌ বিমুগ্ধতার কাছে।
পূণ্যের পেয়ালা কানায় কানায় ভরে গেলে যে কোন মানুষের লক্ষমাত্রা পৌঁছে যায় তার ইচ্ছে পুরুষের কাছে। স্রষ্টার ঘোষণা, ফাজকুরুনি আজ কুরুকুম, অর্থাৎ -‘তোমরা আমাকে স্মরণ করো, আমি তোমাদের ডাকে সাড়া দেবো’।
আমাদের কবি আল মাহমুদ স্রষ্টার চিন্তনশালায় বসে বার বার ডেকে গেছেন বিশ্বাসের অনুপম সেই স্রষ্টাকে। যার কাছে যে কোন মানুষের আশ্রয়। বিশ্বাসি হোক বা না হোক। যেতেই তো হবে তাঁর কাছে। তিনিই যেহেতু আমাদের সৃষ্টিকর্তা। কবি আল মাহমুদ তা চেয়েছেন জগৎের মালিকের কাছ থেকে। স্রষ্টার শোকরানার জায়নামাজে বসে কবি চাইতে চাইতে চির আবাসের বাসিন্দা হলেনই। কবির সুখের কী দারুণ আকুতি। তা যেন প্রতিটি পাঠককে ভাবতে বসায় বসায়। চাওয়া পাওয়ার শেষ ষোলকলায় কবি যেন হেঁসে হেঁসে শুক্রবারের খাটিয়ায় চড়ে পাড়ি দিলেন অনন্তের জগতে। আহা কী মনোস্কামনাই না কবিকে পাইয়ে দিলেন তাঁর স্রষ্টা। কবির ভাষায়-
‘স্মৃতির মেঘলাভোরে শেষ ডাক ডাকছে ডাহুক
অদৃশ্য আত্মার তরী কোন ঘাটে ভিড়ল কোথায়?
কেন দোলে হৃদপি- আমার কি ভয়ের অসুখ?
নাকি সেই শিহরণ পুলকিত মাস্তুল দোলায়!
আমার যাওয়ার কালে খোলা থাক জানালা দুয়ার
যদি হয় ভোরবেলা স্বপ্নাচ্ছন্ন শুভ শুক্রবার’
কবি মৃত্যুকে কত সাদরে আলিঙ্গন করার সাহস দেখালেন। মৃত্যুকে ভয় পায় না এমন লোকের সংখ্যা খুব কম। মৃত্যু যনন্ত্রণায় মানুষ চটপট করলেও বাঁচতে চায়। শক্তির সকল বাহু ব্যবহার করে মানুষ থেকে যেতে চান মায়াময় জাক্কুম স্বাদের এ পৃথিবীতে। কবি আল মাহমুদ তার ব্যতিক্রম স্বরে বিশ্বাসের পরিস্ফুটন ঘটালেন। ভেঙ্গে দিলেন যমদূতের ডানায় থাকায় মৃত্যুপরীকে। সেই ইচ্ছের বাতায়নটুকু আমরা পাঠ করি ঠিক এভাবে-
কোনও এক ভোরবেলা রাত্রি শেষে শুভ শুক্রবারে
মৃত্যুর ফেরেশ্তা এসে যদি দেয় যাওয়ার তাকিদ
অপ্রস্তুত এলোমেলো এ গৃহের আলো অন্ধকারে
ভালোমন্দ যা ঘটুক মেনে নেবো এ আমার ঈদ।
কবির এতোটুকুন আবেদনে স্রষ্টার সাড়া দেয়াটাই ইচ্ছের কাছে নুয়ে যাওয়া উচিত সকল চিন্তাশীল মানব মানবীর। কী বা পাওয়ার থাকে এমনটাই যদি হয়ে যায় ইচ্ছের প্রকাশে! তিনিতো সাড়া দেন চাওয়া মাত্রই। চাইতে জানতে হবে। ধ্যানের পরিসর বাড়াতে হবে। ছাড়তে হবে প্রগতির নামে ভূয়া বুজুর্গগীরী।প্রকৃত প্রগতি হলো সব কিছুর মূলকে স্বীকার করেই। আপনার আপনকে চিনতে না পারাটাই ব্যাক্তি বা জাতিগোষ্ঠীর ভূল প্রকিয়া। মে যাত্রায় কবি আল মাহমুদ নিরেট প্রগতির লেবাস নিয়ে চিরস্খায়ী হতে পেরেছেন বাংলা সাহিত্যে। বাংলা সাহিত্য আল মাহমুদের কোন সৃষ্টিকে যেমন অস্বীকার করতে পারবে না তেমনি আর বুঝিয়ে দিতে পারবে না কবির প্রাপ্যটুকু। রাষ্ট্ট তুমি বন্ধক থেকে গেলে আল মাহমুদের সৃষ্টির কাছে।