বিশ্ববিপ্লবী চে গুয়েভরা

প্রফেসর আবু জাফর চৌধুরী

11


১৯৬৭ সালের ৮ অক্টোবর বিশ্ববিপ্লবী চে-গুয়েভরা নির্যাতিত মানুষের মুক্তির লক্ষ্যে সংগ্রামরত অবস্থায় নিজের জীবন বিসর্জন দেন। তিনি পেশায় ছিলেন ডাক্তার। ল্যাটিন আমেরিকার মানুষের দুঃখ-দুর্দশা দেখে দেখে হয়ে গেলেন বিপ্লবী। লেখা-পড়া শেষ করে ডাক্তারি পেশায় না গিয়ে শুরু করেন এলোমেলো দুরন্ত জীবন। ঐ সময় দেখা হয় তাঁর প্রথম স্ত্রী হিল্ডা গাডিয়ার সাথে। হিলডাকে নিয়ে বেরিয়ে পড়েন ল্যাটিন আমেরিকান দেশগুলোতে। মানুষের অভাব-অনটন, দুঃখ-দুর্দশা দেখে তিনি মোছড়ে পড়েন। তখন মার্কিন সাম্রাজ্যবাদী শক্তির ঘৃণ্য খেলায় ল্যাটিন আমিরিকান দেশগুলোতে একের পর এক সামরিক সরকার প্রতিষ্ঠিত হচ্ছিল। ১৯৫২ সনে কিউবায় শাসন ক্ষমতা দখল করলেন কালজেনসিও বাতিস্তা। ১৯৫৩ সনে ল্যাটিন আমেরিকান সর্বশেষ দেশ গুয়েতমালায় ও সামরিক বাহিনী ক্ষমতা দখল করলেন। তা দেখে চে-গুয়েভারার মন ব্যথায় ভারী হয়ে যায়। তিনি তাঁর মনের মধ্যে গুয়েতমালার অসংখ্য সাধারণ মানুষের জন্য গভীর বেদনাবোধ অনুভব করেন। এই সময় তাঁর স্ত্রী হিল্ডা গার্ডিয়া তাঁকে সান্তনা দেন এবং ফিদেল ক্যাস্ট্রো সম্পর্কে প্রথম ধারণা দিয়ে বলেন যে, কিউবার এক তরুণ বিপ্লবী এ সমস্ত অন্যায়ের বিরুদ্ধে বিপ্লবী কর্মকান্ড শুরু করেছেন। এ লক্ষ্যে তিনি একটি গেরিলা দলও গঠন করেছেন। সেই গেরিলা দলের নাম রাখা হয় ‘২৬জুলাই বিদ্রোহী দল’। ১৯৫৩ সনের ২৬ জুলাই ফিদেল ক্যাস্ট্রোর ছোট্ট গেরিলা দল কিউবার সান্টয়াগো-ডি কিউবায় অবস্থিত মানকাডা ব্যারাক আক্রমন করেছিলেন। সেই দিনকে স্মরণীয় করে রাখার জন্য তাঁদের গেরিলা দলের নাম রাখা হয় ‘২৬শে জুলাই বিদ্রোহী দল’।
চে-গুয়েভারা তাঁর স্ত্রীর কাছে ফিদেল ক্যাস্ট্রো সম্পর্কে জানতে পেরে তাঁর সান্নিধ্য পাওয়ার জন্য উম্মুখ হয়ে উঠেন। তিনি রাতের অন্ধকারে নদী সাঁতরিয়ে গুয়েতমালা থেকে মেক্সিকোয় পৌঁছেন। ফিদেল ক্যাস্ট্রো তখন মেক্সিকো সীমান্ত থেকে কিউবায় বিপ্লবী কর্মকান্ড পরিচালনা করছিলেন। মেক্সিকো পৌঁছার পর চে-গুয়েভারার পরিচয় হয় গুয়েতমালার এক বিপ্লবী রবার্তো কেসিরেসের সাথে। রবার্তো তাঁকে ফিদেলের ছোট ভাই রাউল ক্যাস্ট্রোর (বর্তমান কিউবান প্রেসিডেন্ট) সাথে পরিচয় করিয়ে দেন। রাউল তাঁকে নিয়ে যান ফিদেল ক্যাস্ট্রোর কাছে। এভাবে তাঁদের মধ্যে বিপ্লবী চেতনার সেতুবন্ধন রচিত হয়। প্রথম সাক্ষাতে দুই মহান বিপ্লবী পরস্পরকে বুঝে নেন। চে-গুয়েভায়ার নতুন বিপ্লবী যাত্রা শুরু হল ঐদিনই।
তিনি নিজেই বলেছেন “ভাবতে অবাক লাগে কেমন অনায়াসে আমি বিপ্লবের আগুনে ঝাঁপিয়ে পড়লাম। পেশায় আমি ডাক্তার অথচ হয়ে গেলাম বিপ্লবী বলতে গেলে পুরো ল্যাটিন আমেরিকার রাজনৈতিক অস্থিরতা আমাকে বিপ্লবের পথে ঠেলে দিয়েছে।” সুতরাং এটা পরিষ্কার যে, ল্যাটিন আমেরিকার বিভিন্ন দেশের সামরিক একনায়কতন্ত্র তিনি মেনে নিতে পারছিলেন না। পতুর্গিজ নাবিক কলম্বাস স্পেনের রাজা ফার্ডিনাক-এর সাহায্যে কয়েকটি জাহাজ নিয়ে ভারতবর্ষে আসার জন্য বের হয়ে আমেরিকায় পৌঁছে যান। তারপর ইউরোপীয়দের আমেরিকা মহাদেশে গমন শুরু হয়। তিনি দেখেন যে, ধীরে ধীরে কিভাবে রেড ইন্ডিয়ান সংস্কৃতিকে গুঁড়িয়ে দিচ্ছে স্পেনীয় ভাষা-ভাষীরা, পুরানো ইন্কা সংস্কৃতির ভগ্নাবশেষের উপর কিভাবে ক্যাথলিকেরা গীর্জা তৈরি করছেন। তিনি এগুলো মেনে নিতে পারছিলেন না, ক্ষমাও করতে পারছিলেন না। তাই বিপ্লবের অগ্নিমন্ত্রকে বুকে ধারণ করে জীবনের কঠিন পথকে বেছে নিয়েছিলেন। তিনি ছিলেন আর্জেন্টিনার নাগরিক। কিন্তু ব্যাপক অর্থে তিনি বলতেন “কিউবা আমার স্বদেশ, গুয়েতমালা আমার স্বদেশ, ভেনিজুয়েলা আমার স্বদেশ, আর্জেন্টিনা আমার স্বদেশ, বলিভিয়া আমার স্বদেশ, ল্যাটিন আমেরিকার যে কোন বিপ্লবী আমার সহকর্মী, আমার অন্তরঙ্গ বন্ধু, আমার একান্ত আপনজন। আমি নিজেকে কোন নির্দিষ্ট স্থান অথবা কালের গন্ডিতে আবদ্ধ রাখতে চাই না।”
চে-গুয়েভারা তার বিপ্লবী কর্মকান্ড প্রথমে গুয়েতমালতেই শুরু করেছিলেন যখন বামপন্থী সরকারকে মার্কিনীদের মদদে অপসারণ করা হয়েছিল। সেখানে তিনি তরুণদের সংগঠিত করে গেরিলা দল গঠন করেছিলেন। কিন্তু টিকতে না পেরে মেক্সিকোতে গিয়েছিলেন। সেখানে ফিদেলের সাথে মিলে বিপ্লবী কর্মকান্ড পরিচালনা করার সময় মেক্সিকো সরকার তাঁদেরকে বন্দী করেন। ৫৭ দিন জেল খেটে মেক্সিকোর জেল মুক্তি পাওয়ার পর সেখানে তারা আর নিরাপদ নয় ভেবে মেক্সিকো উপকূল ত্যাগ করে কিউবায় প্রবেশ করেন।
শুরু-হল তাঁদের জীবনের ভয়ংকর ঝঞ্ঝাবিক্ষুব্ধ দিনগুলো। সত্য যে বড় কঠিন, সেই সত্যকে তাঁরা গ্রহণ করলেন। বিপ্লব তো আর ছেলের হাতের মোয়া নয়, জীবনের ঝুঁকি নিয়ে গেরিলা সংগ্রহ, প্রশিক্ষণ, সাথে সাথে সাধারণ মানুষকে, কৃষক-শ্রমিকদের সম্পৃক্ত করা, তারপর রাষ্ট্রীয় সামরিক শক্তির মোকাবিলা করা ছিল অত্যন্ত কঠিন বিষয়। কিউবায় ঢুকে তাঁরা পূর্ব থেকেই দেশের অভ্যন্তরে ক্রিয়াশীল গোপন বাহিনীর সাথে যোগাযোগ করলেন। কিউবার অভ্যন্তরে তাঁরা প্রথমে সীমান্ত চৌকিগুলোকে আক্রমনের নিশানা করলেন, তারপর অভ্যন্তরে যাত্রা শুরু করলেন। এ যাত্রায় কখনো জয়, কখনো পরাজয়, জয় লাভ করলে আনন্দে উল্লাস, দখলকৃত অস্ত্র-শস্ত্রে শক্তি বৃদ্ধি, আর পরাজিত হলে হতাশা কমরেড হারানোর বেদনাকে সাথী করে এগিয়ে চলা এ ছিল তাঁদের বিপ্লবী যাত্রার নিত্যসঙ্গী। মাত্র মুষ্টিমেয় কয়েকজন বিপ্লবী নিয়ে ফিদেল যে যাত্রা শুরু করেছিলেন ধীরে ধীরে এ যাত্রাপথে কৃষকেরা তাঁদের সাথে সম্পৃক্ত হলেন, জনতা সমর্থন দানে এগিয়ে আসলেন। বিপ্লবী যাত্রপথে তাঁরা কখনো উপোস থেকেছেন, কখনো আঁখ ক্ষেতে, কখনো বনে-বাদাড়ে আশ্রয় নিয়েছেন তবে ভেঙ্গে পড়েননি। ১৯৫৯ সনে বিপ্লব সফল হয়। ক্যাস্ট্রো সরকার গঠন করেন। তিনি ছিলেন জাতীয়তাবাদী মূলতঃ সমাজতন্ত্রী ছিলেন না। ক্ষমতা গ্রহণের পর তিনি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সফরে গিয়েছিলেন। তৎকালীন মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সনের সাথে দেখাও করেছিলেন। কিন্তু মার্কিন সরকার কোন প্রকার সাহায্য-সহযোগিতা বা সমর্থন না দিয়ে বরং বিরোধিতা শুরু করে দিল। এরপর ক্যাস্ট্রো সমাজতন্ত্রের দিকে ঝুঁকে পড়েন। চে-গুয়েভারা ফিদেলের সাথে যোগ দেওয়ার পর থেকে ক্রমে ক্রমে হয়ে গেলেন কিউবা বিপ্লবের দ্বিতীয় নেতা। যদিওবা তিনি কিউবার নাগরিক ছিলেন না। বিপ্লবের পর তাঁর উপর দায়িত্ব পড়েছিল ন্যাশনাল ব্যাংক প্রধানের। তিনি ছিলেন পেশায় ডাক্তার, অর্থনীতির কিছুই জানা ছিলনা। তিনি দিনে দিনে নিজকে ঐ দায়িত্ব পালনের জন্য তৈরি করে নিয়েছিলেন এবং কঠোর দায়িত্ববোধ থেকে তিনি কাজটি সফলভাবে পালন করেছিলেন। তিনি বিপ্লোক্তর কিউবার ভংগুর অর্থনীতিকে মজবুত গড়ে দিয়েছিলেন। ক্ষমতার স্বাদ পাওয়া এ সমস্ত দায়িত্ব তাঁর মোটেই পছন্দ ছিলনা। তিনি ছিলেন জাত বিপ্লবী বিশ্ব বিপ্লবী। বিপ্লবকে কোন দেশের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখার মানসিকতা তাঁর ছিলনা। সমাজতন্ত্রের খাঁপ তৈরি করে জনগণকে তাতে ভরে দেবার মানসিকতাকে তিনি ক্ষতিকর ও অস্বাস্থ্যকর মনে করতেন। তাঁর মতে, আগে সমাজবাদী মানুষ তৈরি করতে হবে, জনগণকে সমাজবাদে উদ্বুদ্ধ করতে হবে, জনগণের ধ্যান-ধারণাকে ব্যক্তি স্বার্থের কারাগার থেকে মুক্ত করতে হবে। তারপর জনগণ নিজেদের প্রয়োজনের নিরিখে সমাজতন্ত্রের অবয়ব তৈরি করে নেবে। স্বাধীনতা ও মুক্তির আস্বাদ তাতে তেতো হবে না। এই ধারণা বা বিশ্বাস থেকেই তাঁর মনের মধ্যে নতুন দিগন্তের উম্মোচন হল। আজীবনের বিপ্লবী চে-গুয়েভারা অত্যাচারে জর্জরিত সারা পৃথিবীর মানুষের আর্তনাদ শুনতে পাচ্ছিলেন প্রতিনিয়ত। এশিয়া, আফ্রিকার দেশে দেশে মেহেনতী মানুষ মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের দোসরদের বিরুদ্ধে যুদ্ধেরত। কিন্তু তিনি ল্যাটিন আমেরিকাকেই বেঁচে নিলেন তাঁর পরবর্তী বিপ্লব সংঘটিত করার জন্য। তিনি ফিদেল ক্যাস্ট্রোকে একটি চিঠি লিখে গোপনে বলিভিয়ায় উপস্থিত হলেন ১৯৬৬ সনের নভেম্বর মাসে। বিপ্লবের অমোখ আহব্বান সংগীতের মূর্ছনার মতো তাঁর কানে বাজছে। তিনি কোন বন্ধন মানেন না না পরিবারের, না রাষ্ট্রের। বলিভিয়ায় প্রবেশের পর সেখানে তিনি একটি গেরিলা দল গঠন করলেন। আশ্রয় নিলেন জঙ্গলে। জঙ্গলে শুয়ে শুয়ে তিনি স্বপ্ন দেখছেন লক্ষ কোটি মানুষ এগিয়ে আসছেন। তিনি তার প্রতিধ্বনি শুনতে পাচ্ছেন, ওদের চোখের দৃষ্টি প্রতিজ্ঞায় ভাস্বর, দেহে ইস্পাত কাঠিন্য, মনে আমরণ সংগ্রাম স্পৃহা, তাঁর মৃত্যু হয় হউক, ওরাই পৃথিবীর ভবিষ্যৎ। সত্যিই মৃত্যু এগিয়ে এলো। তিনি ধরা পড়লেন মার্কিন মদদপুষ্ট বলিভিয়ার জান্তার হাতে এক খন্ডযুদ্ধে আহত অবস্থায়। সালটা হল ৮ অক্টোবর ১৯৬৭। পরের দিনই তাঁকে হত্যা করা হয়। কিন্তু তাঁর চেতনা যুগে যুগে, দেশে দেশে তরুণদেরকে আকর্ষণ করে, তাদের মনকে নাড়া দেয়। আজকে বিশ্বের কোটি কোটি তরুণের মাঝে তিনি স্বপ্নের বিপ্লবী, মুক্তির দিশারী। তিনি অমর, অবিনশ্বর।

লেখক : শিক্ষাবিদ, গবেষক