বিলুপ্তির পথে ঐতিহ্যবাহী ছন

শাহাদাত হোসেন, চন্দনাইশ

13

টিন ও ইটের দাপটে হারিয়ে যাচ্ছে গ্রামবাংলার ঐতিহ্যবাহী ছন। একসময় গ্রামের সর্বত্র ছনের তৈরি বাড়ি দেখা গেলেও বর্তমানে আধুনিকতার ছোঁয়ায় গ্রামে-গঞ্জে ছনের তৈরি বাড়ি দেখা যায় না।
সবুজ পাহাড়ের বুকে ধুসর রঙে ছনের ছাউনী দেয়া ঘর এখন তেমন চোখে পড়ে না। পাহাড়ে এবং সমতল অঞ্চলে ঢেউটিনের ব্যবহার বেড়েছে। চাহিদা কমে যাওয়ায় পাহাড়ে আর আগের মত ছন চাষ করছেন না চাষীরা। ফলে প্রায় বিলুপ্তির পথে ঘর ছাউনীর জনপ্রিয় উপকরণ ছন।
গ্রামীণ এলাকার গরীব-মধ্যবিত্তর বাড়িঘরের ছাউনি ছন। সেকালে ছন মাটি কিংবা বেড়ার ঘরে ছাউনি হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে। গ্রামের মানুষ প্রতিবছর জানুয়ারি-মার্চ মাস পর্যন্ত বাড়িঘরে পুরাতন ছন সরিয়ে নতুন ছন ব্যবহার করে। এ সময়ে গ্রামবাংলার মানুষ ব্যস্ত থাকে ঘর ছাউনিতে। অর্থাভাবে টিনের পরিবর্তে ছনকে তারা ছাউনি হিসেবে ব্যবহার করে। অক্টোবর-ডিসেম্বর মাস পর্যন্ত পাহাড়ে ছন কাটা উৎসব চলে। কিছুদিন শুকানোর পর তা বিক্রির জন্য হাটে নিয়ে যাওয়া হয়। এক সময় পাহাড়গুলো এলাকাভিত্তিক ছনখোলা হিসেবে বেশ পরিচিত ছিল। কিন্তু কালের বিবর্তনে সেই দৃশ্য এখন আর তেমন চোখে পড়ে না। আধুনিক সভ্যতায় মানুষ এখন পাকা-আধাপাকা বাড়ি তৈরিতে ব্যস্ত। ছাউনিহিসেবে ব্যবহার করছে টিন।
উপজেলাসমূহের হাট-বাজারে এখন ছন খুব কমই দেখা যায়। ১০-১৫ বছর আগেও পাহাড়ি এলাকায় প্রচুর ছন উৎপন্ন হত। ক্রেতারা ক্রয় করে দেশের বিভিন্ন স্থানে নিয়ে যেত। পাহাড়ের ঢালু কিংবা উপরি ভাগে ফলমূলের চাষাবাদ, পাহাড় ন্যাড়া করা, পাহাড় কাটা ও পাহাড়ে আগুন লাগিয়ে জঙ্গল পরিষ্কারসহ বিভিন্নভাবে পাহাড় ধ্বংসের কারণে ছন বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে।
জানা যায়, চট্টগ্রাম জেলার বনভূমির আয়তন ১,৩৯,২৭৪ হেক্টর। এককালে এসব বনভূমিতে বনায়নের পাশাপাশি প্রচুর ছন উৎপন্ন হয়েছে। এক পরিসংখ্যানে জানা যায়, শুধু চট্টগ্রামে উৎপন্ন হয়েছে ১০ লাখ ভার (স্থানীয় নাম) ছন। বর্তমানে দুই থেকে চার হাত এবং আট থেকে দশ হাত লম্বা এক ভার ছনের দাম ৪০০-৫০০ টাকা। পাঁচ বছর আগে এক ভার ছনের দাম ছিল ৮০-১২০ টাকা। চট্টগ্রামের স্থানীয় চাহিদা মিটিয়ে ছন দেশের বিভিন্ন স্থানে চলে যেত। পাহাড়ি ছন থেকে উন্নতমানের সুতা ও দড়ি উৎপন্ন হয়। উপজেলার হাট-বাজারে সপ্তাহে দুই দিন ছনের হাট বসত। প্রতি হাটে শত শত ভার ছন উঠতো।
গ্রামের লোকেরা জ্বালানি এবং গরু-মহিষের খাদ্য হিসাবে ছন ব্যবহার করেছে। চট্টগ্রামের ৩০-৪০ হাজার হেক্টর এলাকায় ছন উৎপন্ন হতো। পাহাড়ের জঙ্গল পরিষ্কার করে মাটিকে হালকা খুঁড়ে দিলে ভাল ছন হয়। একই পাহাড়ে ফলদ ও বনজ গাছের পাশাপাশি ছনও হয়। বিভিন্ন কারণে পাহাড় ধ্বংসের কারণে এবং রীতিমত পাহাড় পরিষ্কার না করার কারণে পাহাড়ের ছন বিলুপ্ত হতে যাচ্ছে। পর পর দু’বার ছন না কাটলে সেই পাহাড়ে আর ছন হয় না। ফি বছর ছন কাটলে এবং আগাছা পরিষ্কার করে দিলে ভাল ছন হয়।
চট্টগ্রাম জুড়ে এক সময় চন্দনাইশে উৎপাদিত পাহাড়ী এলাকার ছনের কদর ছিল বেশ। বর্তমানে উৎপাদন খরচের চেয়ে বিক্রি কম হওয়ায় চাষীরা আগের মত ছন চাষ করছে না। ফলে কম দামের ঢেউটিনের ব্যবহার বৃদ্ধি পাচ্ছে। খড়া থেকে পানের বরজ সহ বিভিন্ন সবজি ক্ষেত রক্ষা করতে চাষীরা ছন দিয়ে রোগ প্রতিরোধক বেড়া ও ছালা তৈরি করেন। এ সময় বাজারে এর প্রভাব পড়লে চৈত্র মাসের মৌসুমের শেষভাগে ছনের দাম বেড়ে ৩০০-৪০০ টাকায় বিক্রি হয়। এক সময় বিভিন্ন এলাকার লোকজন চন্দনাইশের দোহাজারী, খানহাট, বাগিচাহাট এসে ছন কিনে নিয়ে যেত। তখন পাহাড়ী এলাকায় প্রচুর ছন চাষ হত। বর্তমানে নেহায়েত অস্বচ্ছল মানুষেরা সামর্থ্য না থাকায় ছনের উপর ভরসা রাখছেন মাথা গোঁজার জন্য।
বেশ কয়েকজন চাষীর সাথে কথা বলে জানা যায়, ছনের বাগানে বড় কোন গাছ থাকলে এবং ছনের স্থানে চারা পড়লে বৃদ্ধিতে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি হয়। ফলে উৎপাদন কমে যায়। তাই চাষীরা ছন চাষের স্থানে তেমন বড় ধরনের কোন গাছ রোপণ করতেন না। বর্ষাকালে ছনের চাহিদা প্রচুর। সে সময়ে ছন পাওয়া যায় না বিধায় আশ্বিন মাসে অধিকাংশ ক্রেতারা ছন ক্রয় করে সংরক্ষিত করে রাখে। বর্ষাকাল আসার আগেই অধিকাংশ ছন ব্যবহারকারীরা তাদের পুরানো ঘরের চালা খুলে নতুনভাবে ছন দিয়ে ঘর মেরামত করে নিত।
ছনের ব্যবহার আগের চেয়েও কমে গেলে এখনো পর্যন্ত প্রতি ভার ছনের দাম ৩শ’ থেকে ৪শ’ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। উপজেলার লালুটিয়া, ধোপাছড়ি, লট এলাহাবাদ এসব পাহাড়ী এলাকায় প্রচুর ছনের চাষ হতো এক সময়। এখন চাহিদা কমে যাওয়ায় এসব এলাকায় আগের মত ছন চাষ করা হচ্ছে না। বর্তমানে উপজেলার খাঁনহাট ও দোহাজারীতে পর্যাপ্ত পরিমাণ ছন পাওয়া যায়। তবে অনেকেই এখনো সে ছন দিয়ে বাড়ির চালা বানিয়ে বাড়ি তৈরি করছে।
চাষীদের মতে, ঢেউটিনের ব্যবহার বেড়ে যাওয়ায় পাহাড়ে ছনের উৎপাদন কমে গেছে, ব্যবহারও কমে গেছে। ছন এখন অনেকটা বিলুপ্তির পথে। তারপরও গ্রামবাংলার অনেক সাধারণ মানুষ এখনো ছনের চালা সম্বলিত ঘর ব্যবহার করে পুরোনো ঐতিহ্য ধরে রেখেছে।