মধ্যরাতের রান্না

বিম্বিত জীবনের শব্দরেখা মধ্যরাতের কান্না

ইলিয়াস বাবর

23

সুভাস সর্ব্ববিদ্যার গল্পযাপন আমাদের চোখ এড়ায় না, তার নানাবিধ কারণও আছে। তিনি গল্পবয়ানে ঐতিহ্যিক ধারার সাথে যোগ করেন সমসাময়িক কথাবার্তা। নিটোল একটা কাহিনি নির্মাণের ভেতর দিয়ে তিনি মূলত আঁকার প্রয়াস পান সামাজবদ্ধ মানুষদের ছবি; এই ছবির সাথে জুড়ে যায় ইতিহাসের সারাৎসার, বর্তমানের নানাবিধ রঙচিত্র। সুভাসের গল্পসাধনা আমাদের কাছে তার মনোবিশ্বের ভাবনাসমূহের সাথে পরিচিত হবার সুযোগ দেন তো বটেই, নানা চরিত্রের সাথে কথা বলার আস্ত আয়োজনও রাখে। এদিক দিয়ে গল্পকার সুভাস সর্ব্ববিদ্যা শরতচন্দ্রের গোত্রভুক্ত। পাঠককে আখ্যানের ভেতরে পরিভ্রমণ করিয়ে তিনি পরিচয় করে দেন সমাজস্থিত লোকসকলের অভ্যাস আর চেতনাজাত সঞ্জিবনীর সাথে। কথোপকথন, পরিপার্শ্ব অংকন আর গাঁথুনীর আশ্রয়ে এসব গল্পে আমাদের নিজেদের সাথেই মোলাকাত হয় প্রায় সময়। ফলে, সুভাষ ভাষাচিত্রি হিসেবে নিজের মুখ আর মুখায়বের মাধ্যমে মিমাংসা করতে চান যাবতীয় ক্লান্তি ও ক্ষুধার, অভাব ও অভিযোগের, পুরস্কার ও সন্দেহের।
আমরা সুভাষ সর্ব্ববিদ্যার ‘মধ্যরাতের কান্না’ গল্পকিতাবের আলোকে দেখার চেষ্টা করি গল্পকারের মানসভূগোল। ‘ঐ দ্বীপে সুখের নোঙর’ গল্পের নির্ঝর, ‘অতঃপর রাশেদ’ গল্পের রাশেদ, ‘একজন মেরাজ আলি’ গল্পের মেরাজ আলি, ‘বেলা শেষে’ গল্পের শাওন— এরা প্রত্যেকেই সমাজের শ্রেণিপ্রথায় অবস্থান করে একেবারে নিচের দিকে, যাদের সামনে সান্ত¡না হয়ে কেবলি জেগে থাকে বেঁচে থাকা, দু’মুঠো খাওয়া। নির্ঝর বাবা মারা যাবার পর সংসারের হাল ধরে, বিয়ের সময় মনে উকি মারে পাত্রী তার মাকে দেখে রাখবে তো! রাশেদ জগৎসংসারে পোড় খাওয়া লোকদের কাতারে পড়ে, চাকরি বাগানোর চালাকি জানা নেই বলে টিউশনি করে পেট চালায়, পরিবার চালায়। কিন্তু এই চাকচিক্যময় নগরবাসে তার মতো সৎ গৃহশিক্ষকের দাম নেই, ইতিহাস শোনাতে গিয়ে তিনি খুঁইয়ে বসেন নতুন টিউশন। মেরাজ আলীর দুঃখ কে শুনবে তবে? বহু কষ্টে মেয়ে মরিয়মকে পড়ালেখা করায় অথচ বকাটেদের লিপ্সার শিকার মরিয়ম! সমাজে প্রচলিত বিচারব্যবস্থা আর পুলিশি অপতৎপরতায় অসহায় এক বাবার নাম মেরাজ আলী। ওদিকে শাওন নামের যে লোকটি কোর্টে দাঁড়ায়, মিথ্যে মামলার আসামি; তিনিই একদা দুর্ঘটনা থেকে বাঁচায় বিচারিক হাকিমকে। চরিত্রগুলোর প্রধান সাযুস্য এই, এরা সংগ্রামী, অসহায়, বিচারহীন সমাজের বিচারপ্রার্থী। চরিত্রগুলোর খতিয়ানে আমরা গল্পগুলো দেখলে হয়তো এটাই বলবো, এইসব ঘটনা এই সমাজে আকচার ঘটে থাকে; দেখেও না দেখার ভানে আমরা এড়িয়ে যাই। অথচ একজন গল্পকার মানবিক অবনতিকে আঁকেন তার গল্পের শরীরে। হয়তো নাটুকেপনা ভর করে কিছুটা, অপ্রত্যাশিত অনেকানেক ক্লেদও আসে, তবুও গল্পগুলোয় খেলা করে আমাদের লোকজ জীবনের নানা অভ্যাসহেতু উপাদান আর উপাচারের ঢালা। কোন কোন গল্প অনেকটা সিনেমার স্ক্রিপ্টের ভূমিকায় মেতে ওঠে, কোন পার্শ্বচরিত্র ঢুকে পড়ে অহেতুক তবুও সুভাষের মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি আর নিম্নশ্রেণির প্রতি এই অঙ্গিকার আমাদের আশাবাদী করে, নিয়ে যায় ভাবনার অতলান্তে। গল্পপাঠে এই প্রশ্ন আর দীর্ঘশ্বাসই বড় হয়— এখনো বেড়ে চলছে ব্যবধান, স্বাধীনতার সুফল ভোগ করতে পারছে না নিম্নবর্গের অনেকেই। চাতুরিহীন এই চরিত্রকতিপয় কথা বলে যায় চাষা, জেলে আর কামারের ছেলের হয়ে, মাটিলগ্ন মায়ের সন্তান হয়ে; যারা কি না অন্যায় করে না বরং প্রতিষ্ঠিত অন্যায়ের সিস্টেমে জর্জরিত। প্রকৃত অবস্থার আলোকে এই গল্পভূগোল নির্মাণে সুভাষের সরলতাকে অভিনন্দন জানাতেই হয়।
গ্রন্থের নামগল্প ‘মধ্যরাতের কান্না’র শরীরজুড়ে মুক্তিযুদ্ধের নানা ঘটনাপ্রবাহ আর জনজীবন ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে থাকে যেন। ওই সময়ে হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের ত্যাগ আর দুর্দশাকে গল্পকার মিনতি দেবীর বয়ানে তুলে আনেন দারুণভাবে। বর্তমানের প্রেক্ষিতে স্মৃতিসঞ্চয় খুঁড়ে এক ঠাকুরমা তার নাতিকে একাত্তরের রক্তাভ অভিজ্ঞতা আর সংক্ষুব্ধ জীবনের সংবেদ শোনাতে শোনাতে তুলে আনেন জ্যান্ত একাত্তর! অসম্ভব চমৎকার শুরু আর সম্ভাবনা গল্পটিতে জড়িয়ে থাকলে শেষতক প্রায় বৈচিত্রহীন চর্বিতচর্বন বলেই জ্ঞাত হয় আমাদের। কিন্তু প্রজান্মন্তরে একাত্তরে অগ্নিবীজ জাগানোর জন্যে এরচে বড় বিকল্প লেখকের কাছে খোলাও ছিল না সম্ভবত। ‘নীলাম্বরির পাখির পালক’ গল্পটিকে সময়ের প্রতিনিধিত্বশীল গল্প বলেই আমাদের ধারণা। সমকালে ভার্চুয়াল পরিচয়, প্রণয় এবং দুর্ঘটনাকে বর্ণনা করতে গিয়ে গল্পকার সমকালের আসক্তি ও অসহায়ত্বকে এঁকে যান বিশ্বস্থভাবে। নিশাদ— যে কি না ফেক আইডির বন্ধুর প্রেমে অথবা প্রতারণায় মৃত্যুযাত্রী, মারা গেছেন ইজ্জতটা খুঁইয়ে; যারা বাবা প্রবাসী— সব মিলিয়ে সময়ের বিষবাষ্পকে গল্পকার মূর্ত করেন পাঠকের সামনে। এই আহাজারি আর আসক্তির ভেতরে বড় নাকাল আমাদের সময়, এখানে মানুষ নানাভাবে নাই হয়ে যায়, বিশেষত ভগ্নিস¤প্রদায়। তরুণদের ভেতর এই প্রবাহক্ষতি, এই অনিশেষ দহনের কালে গল্পকার নিশাদকে দিয়ে দেখিয়ে দেন তাবত অসচেতন, অহৃদয়তার কথা। অথচ ‘আলো ছায়া’ গল্পের আরেক নিশাদকে দেখি বসের অপপ্রস্তাবে সাড়া না দিয়ে মামলার আসামী হতে, বিভাস সরকারের সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিতে। ভালোমন্দের এই আলো-আঁধারিতে মানুষের যে প্রবৃত্তি তা গল্পকার ধরবার চেষ্টায় বারবার হাতড়ান। এবং মরীচিকা” গল্পে স্কুলে শিক্ষকরাজনীতির সাথে গল্পকার প্রিয়াংসুর ভারাক্রান্ত হৃদয়ের প্রতিবেশী বানান পাঠকদের। বিসিএস কত বড় নিয়ামক পাত্রীপক্ষ বা প্রেমের ক্ষেতে সম্ভবত তাই এ গল্পের সারকথা।
‘মধ্যরাতের কান্না’য় সুভাষ সর্ব্ববিদ্যা মানুষের ভূগোলে থেকে মানুষেরই মানবিক জীবন প্রত্যাশার যে শিল্পীত প্রার্থণা করেন তা অসাধারণ। কিছু গল্পে বাড়তি মেদ আছে হয়তো, কোথাওবা অতি নাটুকেপনা তবুও মাটিলগ্ন এই গল্পচাষ আমাদের প্রতিদিনকার জীবনকে দেখার যে বোধ তা আরো বেশি শানিত করবে বলেই মনে হয়। এখানে অনেক গল্পের সুযোগ ছিল নভেলা হওয়ার— পরিপার্শ্ব নিয়ে কথাসাহিত্যে এই দম সবাই রাখতে পারে না বলেই সুভাষ সর্ব্ববিদ্যাকে নিয়ে আমাদের সুপ্রচুর আশা আছে!
মধ্যরাতের কান্না
সুভাষ সর্ব্ববিদ্যা
গ্রন্থমেলা ২০১৯
পুঁথিনিলয়, ঢাকা
প্রচ্ছদ, মামুন হোসাইন
মূল্য : ১৫০